বাংলাদেশ-ভারতের চুক্তি এবং চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরের প্রস্তুতি

প্রফেসর ড. নারায়ন বৈদ্য

বৃহস্পতিবার , ৭ নভেম্বর, ২০১৯ at ৫:১১ পূর্বাহ্ণ
32

অর্থনীতি বিষয়ের মধ্যে কতগুলো শাখা বিষয় রয়েছে। তার মধ্যে ‘আন্তর্জাতিক অর্থনীতি’ হচ্ছে একটি। অর্থনীতির জনক এ্যাডাম স্মিথ লিখিত গ্রন্থ ‘Wealth of Nation’- এ অর্থনীতির বিভিন্ন দিক সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেন। কোন কোন অর্থনীতিবিদ তাকে পুঁজিবাদের জনক বলেও আখ্যায়িত করেন। কারণ তিনি মনে করেন, অর্থনৈতিক সমাজে যে মৌলিক সমস্যাসমূহ রয়েছে ( ১। কি উৎপাদন করা হবে? ২। কিভাবে উৎপাদন করা হবে? ৩। কার জন্য উৎপাদন করা হবে?) এ মৌলিক সমস্যা সমূহ সমাধান করার জন্য কাকেও হস্তক্ষেপ করতে হবে না। আপন থেকে সমস্যাসমূহ সমাধান হয়ে যাবে। ইহাকে অটো মেকানিজম বলে। তিনি ইহাকে ‘অদৃশ্য হস্ত’ বলে আখ্যায়িত করেন। তাঁর গ্রন্থে তিনি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নিয়েও আলোচনা করেছেন। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নিয়ে তিনি যে তত্ত্ব প্রদান করেন তা ‘পূর্ণ সুবিধা তত্ত্ব’ নামে পরিচিত। এ তত্ত্বে তিনি প্রমাণ করেন, যে দেশ যে পণ্য উৎপাদনে পূর্ণ সুবিধা ভোগ করে (অর্থাৎ কম খরচে উৎপাদন করতে পারে) সেই দেশ সেই পণ্য উৎপাদন করে এবং উদ্বৃত্ত অংশ বিদেশে রপ্তানি করে। এভাবে দুইটি দেশের মধ্যে রপ্তানি হলে উভয় দেশ যেমন লাভবান হয় তেমনি বিশ্বের মোট উৎপাদনও বাড়ে। আধুনিক আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে কৃষিপণ্যের সাথে শিল্পপণ্যকেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়। অর্থাৎ কৃষি ও শিল্প পণ্য উভয় ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সংগঠিত হতে পারে।
সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে মানুষের চিন্তাধারারও পরিবর্তন এসেছে। সরকারি আয়ের পরিমাণ বৃদ্ধি করার জন্য এবং নিজ দেশের শিল্পসমূহকে রক্ষা করার জন্য প্রতিটি দেশের সরকার আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে তথা আমদানি ও রপ্তানির ওপর বিভিন্ন প্রকারের কর, ট্যারিপ, আবগারি শুল্ক আরোপ করে থাকে। নিজ দেশে উৎপাদিত যে সব পণ্যের চাহিদা বিদেশে বেশি সে সব পণ্যের ওপর উক্ত দেশ অধিক শুল্ক আরোপ করে থাকে। তাছাড়া যে সব পণ্য আমদানি করা হলে নিজ দেশের শিশু শিল্পগুলো রক্ষা করা সম্ভব নয়, সরকার সেইসব পণ্যের আমদানি নিষিদ্ধ করে অথবা উক্ত পণ্যসমূহের ওপর উচ্চ হারে শুল্ক আরোপ করে। আবার রাষ্ট্রীয় নীতি অনুসারে উন্নয়নের গতিকে দ্রুত করার জন্য এবং সঞ্চয়ের পরিমাণকে বৃদ্ধি করার জন্য সরকার বিলাস পণ্যের ওপর অতি উচ্চহারে শুল্ক আরোপ করে থাকে। এরূপ উচ্চহারে কর আরোপের প্রধান উদ্দেশ্য হলো মধ্যবিত্ত শ্রেণি যাতে উক্ত বিলাস পণ্য ব্যবহার করতে না পারে। এতে মোট সঞ্চয়ের পরিমাণ বৃদ্ধি পাবে। বৃদ্ধিপ্রাপ্ত সঞ্চয়কে বিনিয়োগ করে শিল্পকারখানা স্থাপন এবং গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটাতে পারলে দেশের প্রবৃদ্ধির পরিমাণ অনেকাংশে বৃদ্ধি পাবে। দেশ উন্নত হবে। এ কারণে বিশ্বের কোন কোন দেশ একত্রিত হয়ে নিজদের মধ্যে বিভিন্ন শুল্ক সংগঠন গড়ে তোলে। যেমন ইইসি (ইউরোপীয়ান ইকনমিক কমিউনিটি)। এরূপ সংগঠনের প্রধান উদ্দেশ্য হলো যে, নিজদের মধ্যে উৎপাদিত পণ্য শুল্ক বিহীনভাবে আমদানি ও রপ্তানি করা। কাজেই আধুনিক অর্থনীতিতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যকে কাজে লাগিয়ে প্রতিটি দেশ উন্নয়নের গতিকে দ্রুত করতে চায়। অতিসম্প্রতি আমেরিকা ও চীনের মধ্যে যে বাণিজ্য যুদ্ধ চলছে তা হলো আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে শুল্ক আরোপ নিয়ে। শুধু শুল্ক আরোপ নিয়ে দুই বা ততোধিক দেশের মধ্যে বাণিজ্য যুদ্ধের ইতি টানার জন্য বর্তমান সময়ে বিভিন্ন দেশের মধ্যে বিভিন্ন প্রকারের চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক সই করতে দেখা যায়। গত ৫ অক্টোবর (২০১৯) ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে দেশটির প্রধানমন্ত্রীর সাথে বাংলাদেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর শীর্ষ বৈঠকে বাংলাদেশ-ভারত সাতটি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক সই হয়। এছাড়া উদ্বোধন করা হয়েছে তিনটি যৌথ প্রকল্প। এ বিষয়গুলো নিয়ে রাজনীতির মাঠ বেশ সরগরম। আসলে চুক্তি ও যৌথ প্রকল্পগুলো কি তা অনেকে জানে না। এ চুক্তিগুলো নিম্নরূপ:
১। স্বাক্ষরিত একটি সমঝোতা স্মারকের আওতায় ফেনী নদীর ১.৮২ কিউসেক পানি প্রত্যাহার করতে পারবে। আর ভারত এই পানি নিয়ে ত্রিপুরা সাবরুম শহরে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ প্রকল্পে ব্যবহার করবে।
২। উপকূলে সার্বক্ষণিক মনিটরিং ব্যবস্থার (কোয়েস্টাল সারভাইল্যান্স সিস্টেম- সিএসএস) বিষয়ে একটি সমঝোতা স্মারকে সই করেছে দুই দেশ।
৩। চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর দিয়ে ভারতীয় পণ্য পরিবহণের বিষয়ে একটি স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর (এসওপি) সই করেছে দুই দেশ।
৪। বাংলাদেশকে দেয়া ভারতের ঋণের প্রকল্প বাস্তবায়নে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে।
৫। সহযোগিতা বিনিময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে ইউনিভার্সিটি অব হায়দরাবাদের মধ্যে সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে।
৬। সাংস্কৃতিক কার্যক্রম বিনিময় নবায়ন সংক্রান্ত সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে।
৭। যুব উন্নয়নে সহযোগিতা নিয়ে দুটি সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে।
যৌথ প্রকল্পসমূহ:
১। খুলনায় ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্সে ‘বাংলাদেশ-ভারত প্রফেশনাল স্কিল ডেভেলপমেন্ট ইনস্টিটিউট’।
২। ঢাকার রামকৃষ্ণ মিশনে বিবেকানন্দ ভবন।
৩। বাংলাদেশ থেকে ত্রিপুরায় এলপিজি (লিকুইড পেট্রোলিয়াম গ্যাস) আমদানি।
এখানে উল্লেখযোগ্য যে, এলজিপি ও এলএনজি (লিকুইড ন্যাসারেল গ্যাস) এর মধ্যে পার্থক্য আছে। বিদেশ থেকে জাহাজ ভর্তি এলপিজি গ্যাস এনে তা সিলেন্ডারজাত করে রপ্তানি করাই যৌথ প্রকল্পের উদ্দেশ্য। এলএনজি গ্যাস নয়। কিন্তু চট্টগ্রাম ও মোংলা সমুদ্র বন্দর দিয়ে ভারতীয় পণ্য পরিবহন করা হলে বন্দরের ওপর চাপ বাড়বে। এতে সেবা দিতে চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর কতটুকু প্রস্তুত?
চুক্তি অনুযায়ী ভারত থেকে পণ্য এনে দুই বন্দর ব্যবহার করে শুধু ভারতেই নিতে পারবে, ভিন্ন কোন দেশ থেকে ভারতে নিতে পারবে না। অর্থাৎ জাহাজের মাধ্যমে ভারত থেকে পণ্য চট্টগ্রাম বন্দর কিংবা মোংলা বন্দরে এনে সেখান থেকে বাংলাদেশের সড়ক পথ ব্যবহার করে ভারতের সাত রাজ্য- আসাম, মেঘালয়, অরুণাচল প্রদেশ, ত্রিপুরা, মনিপুর, নাগাল্যান্ড ও মিজোরাম নিতে পারবে। আমাদের দুই বন্দর ব্যবহার করে রাজ্যগুলো লাভবান হবে বেশি। বাংলাদেশের খুব বেশি লাভ হবে না, আবার ক্ষতিও হবে না। কারণ এর মাধ্যমে আমরা নির্ধারিত ট্যারিফ পাবো। কিন্তু দুই বন্দরকে ব্যবহার করে বাংলাদেশের সড়ক পথে যাবে পণ্যগুলো। এ মুহূর্তে চট্টগ্রাম বন্দর সেই সুবিধা দিতে সক্ষম হলেও পণ্যগুলো সড়কপথে নেওয়ার উপযোগিতা যাচাই করা জরুরি। তাছাড়া পণ্য শুল্কায়নে কাস্টমসের সক্ষমতাও নিশ্চিত করা প্রয়োজন। মোংলা বন্দর সম্পর্কিত প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, মোংলা বন্দরে কনটেইনার ওঠানামা সক্ষমতার অনেকটাই অব্যবহৃত আছে। ফলে ভারতকে সুবিধা দিলে বাড়তি কোন চাপ তৈরি হবে না। কিন্তু বন্দর ব্যবহারকারীরা বলেছেন, বাড়তি পণ্য সামাল দিতে কাস্টমস উপযোগী কিনা তাও যাচাই করা প্রয়োজন। কারণ চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরে লোকবল সংকট রয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী ভারত থেকে আসা পণ্যভর্তি কনটেইনারে ইলেকট্রনিক সিল থাকবে। ফলে সেই পণ্য নজরদারিতেও যথেস্ট প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। চুক্তি অনুসারে, নিরাপত্তার স্বার্থে অবৈধ ও নিষিদ্ধ পণ্য যাতে চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর ব্যবহার করে ভারতে প্রবেশ এবং বের হতে না পারে সে জন্য পণ্যের স্ক্যান করতে হবে। কিন্তু চট্টগ্রাম বন্দরে এই মুহূর্তে সেই সক্ষমতা নেই। ১২টি গেটের মধ্যে মাত্র ৫টিতে স্ক্যান মেশিন রয়েছে। আর পণ্য স্ক্যানিং এর কাজটা করে কাষ্টমস। ফলে কাস্টমসেরও সক্ষমতা বাড়ার প্রয়োজন রয়েছে। অবশ্য এ কথাও ঠিক যে, কর্তৃপক্ষ চেষ্টা করলে পণ্য পরিবহন শুরু হতে হতে বন্দরের সব গেটে স্ক্যানিং মেশিন যুক্ত করা সম্ভব হবে। আর পণ্য এসেসমেন্ট করা, সিল লক করা ও শুল্ক আদায় কার্যক্রম সম্পন্ন করতে জরুরি ভিত্তিতে লোকবল নিয়োগ দিতে হবে। তাছাড়া বন্দর ব্যবহার করে পণ্যগুলো বাংলাদেশের সড়কপথ ব্যবহার করে ভারতের সাত রাজ্যে যাবে। সেই সড়কগুলোর চলাচল নির্বিঘ্ন করতে হবে। তবেই এ বিশাল কর্মযজ্ঞ মসৃণভাবে সম্পন্ন হবে।
লেখক : পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক, বিজিসি ট্রাস্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ

x