বাংলাদেশের মহাকাশ জয়

আইমান তাহরিন

বুধবার , ১০ এপ্রিল, ২০১৯ at ৯:০৪ পূর্বাহ্ণ
38

মহাকাশের পথে স্বপ্নযাত্রার সূচনাটা হয়েছিলো স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হাত ধরে। সময়টা ছিলো ১৯৭৫ সালের ১৪ জুন। বেতবুনিয়ায় দেশের প্রথম ভূ-উপগ্রহ কেন্দ্র উদ্বোধনের মাধ্যমে তিনি প্রথম বাংলাদেশকে মহাকাশ জয়ের স্বপ্ন দেখাতে শুরু করেন। কিন্তু সেই বছর ১৫ আগস্ট তাকে সপরিবারে হত্যার পর আর সব যাত্রার মতো এ যাত্রা থেমে যায়। এরপর ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় এসে তৎকালীন সরকার থমকে যাওয়া সেই যাত্রার প্রাথমিক শুরুটা করলেও ২০০১ সালে সরকার বদলে তা আলোর মুখ দেখেনি। কিন্তু ২০০৯ এবং ২০১৪ পর পর দুই মেয়াদে ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ সরকার অবশেষে বাংলাদেশের মহাকাশ যাত্রার স্বপ্ন বাস্তবায়ন করেন।
আর সেই মাহেন্দ্রক্ষণটি ছিলো ১১ মে। এদিন যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ সফলভাবে উৎক্ষেপণ করা হয়। স্পেসএক্সের সর্বাধুনিক রকেট ফ্যালকন-৯ এর মাধ্যমে স্যাটেলাইটটি ১১৯.১ দ্রাঘিমাংশে পৌঁছায়। এর পরই অরবিট টেস্টসহ নানা ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা সবই সম্পন্ন হয়। বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইটের মাধ্যমে সেপ্টেম্বরে ঢাকায় অনুষ্ঠিত সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ সরাসরি সমপ্রচার করার পরীক্ষাতেও এটি সফলতা দেখিয়েছে। পরে স্যাটেলাইটের মাধ্যমে দুবাইতে এশিয়া কাপ ক্রিকেটের সমপ্রচার-সহ আরও কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষাও করেছে বাংলাদেশ টেলিভিশন। শুধু তাই নয় উৎক্ষেপনের ৬ মাসের মাথায় ফ্রান্সের থ্যালেস অ্যালেনিয়া প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে এর নিয়ন্ত্রণ বুঝে নেয় বাংলাদেশ।
বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ নির্মাণ করেছে ফ্রান্সের থ্যালেস অ্যালেনিয়া নামের একটি প্রতিষ্ঠান। স্যাটেলাইটের কাঠামো তৈরি, উৎক্ষেপণ, ভূমি ও মহাকাশের নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, ভূ-স্তরে দুটি স্টেশন পরিচালনার দায়িত্ব এ প্রতিষ্ঠানের। এ প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে দুই হাজার ৯৬৭ কোটি টাকা। স্যাটেলাইটে আছে ৪০টি ট্রান্সপন্ডার। এগুলোর মধ্যে প্রাথমিকভাবে ২০টি ব্যবহার করবে বাংলাদেশ। অন্যগুলো নেপাল, ভুটান ও মিয়ানমারের মতো দেশের কাছে ভাড়া দেয়া হবে। স্যাটেলাইট বঙ্গবন্ধু-১ এর গ্রাউন্ড স্টেশন তৈরি করা হয়েছে গাজীপুর ও রাঙ্গামাটিতে।
মহাকাশ বা জ্যোতির্বিজ্ঞান গবেষণা, আবহাওয়ার পূর্বাভাস, টিভি বা রেডিও চ্যানেল, ফোন, মোবাইল ও ইন্টারনেট যোগাযোগ প্রযুক্তি, নেভিগেশন বা জাহাজের ক্ষেত্রে দিকনির্দেশনাসহ বিভিন্ন কাজে এটি ব্যবহৃত হচ্ছে স্যাটেলাইটটি।এছাড়া দূর-সংবেদনশীল তথ্য, মাটি বা পানির নিচে অনুসন্ধান ও উদ্ধারকাজে ব্যবহার করা যাবে এটি। মহাশূন্য এক্সপ্লোরেশন, হারিকেন-ঘূর্ণিঝড় ও প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের পূর্বাভাস, গ্লোবাল পজিশনিং বা জিপিএস, গামা-রে বারস্ট ডিটেকশনের কাজেও লাগবে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১।
এরিমধ্যে রাষ্ট্রীয় তিনটি টেলিভিশন চ্যানেলসহ আরও বেসরকারি সাতটি চ্যানেল বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইট থেকে সেবা নিচ্ছে। রাষ্ট্রীয় তিন চ্যানেল হলো- বিটিভি ওয়ার্ল্ড, সংসদ বাংলাদেশ টেলিভিশিন এবং বিটিভি চট্টগ্রাম। অন্যদিকে সেবা নেয়া সাত বেসরকারি চ্যানেল হচ্ছে- সময় টিভি, ডিবিসি নিউজ, ইন্ডিপেনডেন্ট টিভি, এনটিভি, একাত্তর টিভি, বিজয় বাংলা এবং বৈশাখী টিভি গত কিছুদিন থেকে বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইটের ট্রান্সমিশন ব্যবহার করছে।
স্যাটেলাইটটিকে ব্যবসায়িকভাবে সফল করতে ইতোমধ্যেই থাইল্যান্ডের থাইকমের সঙ্গে কোম্পানি সঙ্গে চুক্তি করেছে বিসিএসসিএল। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্যবসার দিকটি তারাই দেখবে। আগামী সাত বছরের মধ্যে এ খরচ উঠে আসবে বলে হিসাব করেছে উৎক্ষেপণকারী সংস্থা বিটিআরসি। এরই মধ্যে সরকারের মন্ত্রণালয়গুলোও সেবা নিতে শুরু করেছে। ক্ষমতাসীন সরকারের ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণের অগ্রযাত্রায় অন্যতম অংশীদার স্যাটেলাইট বঙ্গবন্ধু-১ যে শুধু সেবাই দিচ্ছে তা নয়, বিশ্ব দরবারে তথ্যপ্রযুক্তির প্রতিযোগী দেশগুলোর কাতারে নিজেদের শক্তিশালী অবস্থানের জানান দিচ্ছে।

x