বাংলাদেশকে ফেরাতে হবে তার কক্ষপথে

সম্প্রীতি বাংলাদেশের আত্মপ্রকাশ

রবিবার , ৮ জুলাই, ২০১৮ at ৮:৫৭ পূর্বাহ্ণ
141

সামপ্রদায়িক সমপ্রীতি বজায় রাখার মাধ্যমে বাংলাদেশকে তার আজন্ম লক্ষ্য ধর্মনিরপেক্ষতা টিকিয়ে রাখার আহ্বান এসেছে একটি আলোচনা সভা থেকে। গতকাল শনিবার জাতীয় জাদুঘর মিলনায়তনে ‘সমপ্রীতি বাংলাদেশ’ নামক নতুন সংগঠনের আত্মপ্রকাশ অনুষ্ঠানে বক্তারা এ আহ্বান জানান। ‘গাহি সাম্যের গান’ স্লোগানে এই সংগঠনের আনুষ্ঠানিক যাত্রালগ্নে সমাজের নানা পেশার শীর্ষস্থানীয়রা বক্তব্য দেন। খবর বিডিনিউজের।

অনুষ্ঠানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সৈয়দ আনোয়ার হোসেন বলেন, মানুষের মধ্যে বিভাজনের উপাদান তিনটিধর্ম, রাজনীতি ও ব্যক্তিস্বার্থ। সেই বিভাজন দূর করার কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। কেবল বায়বীয় বাচনিক উচ্চারণের মাধ্যমে নয়, সক্রিয় কার্যক্রমের মাধ্যমে দেশকে কক্ষপথে ফিরিয়ে আনতে হবে। তিনি বলেন, বাংলাদেশ যে লক্ষ্য নিয়ে স্বাধীন হয়েছে, সেখান থেকে কক্ষচ্যুত হয়েছে। কক্ষচ্যুত বলছি এজন্য যে, সাম্য, মানবিক মর্যাদায় আর সামাজিক ন্যায়বিচার কি আছে? সংবিধানে রাষ্ট্রধর্ম আছে, বঙ্গবন্ধুতো রাষ্ট্রধর্মের কথা বলেননিআজকে রাষ্ট্রধর্ম আছে, আবার ধর্মনিরপেক্ষতাও আছে। তেলে আর জলে কখনো মেলে না। ‘রাজনৈতিক গণতন্ত্রের’ আগে ‘সামাজিক গণতন্ত্র’ ফেরানোর আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, গণতন্ত্র মানে কেবল ভোটাধিকারের ব্যাপারে পরিণত হয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ধর্মনিরপেক্ষতা ছাড়া কোনো গণতান্ত্রিক দেশ চলতে পারে না। রাষ্ট্রের সঙ্গে ধর্মের কোনো সম্পর্ক থাকবে না, রাষ্ট্রধর্ম পালনে বাধা দিবে না এবং ধর্ম পালনে উৎসাহিতও করবে না। গণতান্ত্রিক দেশে এসব শর্ত মানতে হবে।

পুঁজিবাদী কাঠামোর কারণে এসব শর্ত থেকে বাংলাদেশ অনেক ‘দূরে সরে আছে’ মন্তব্য করে তিনি বলেন, অসুস্থ সমাজে বাস করছি আমরা। হত্যা, ধর্ষণ, গণধর্ষণ হচ্ছে প্রতিনিয়ত, শিশুধর্ষণ হচ্ছে, যেটা পাকিস্তানি হানাদাররাও করেনি। প্রকৃতি ধ্বংস হচ্ছে, বেকারত্ব বাড়ছে। এই অসুখের নাম পুঁজিবাদ। অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, মানুষে মানুষে যদি সাম্য প্রতিষ্ঠা করতে না পারি, ধর্মে ধর্মে সমপ্রীতি আসবে না। হানাহানি বাড়তে থাকবে।

শাসকদের কারণেই’ জনগণ ধর্মের দিকে যাচ্ছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, শাসকরা চান, জনগণ ইহজাগতিকতা নিয়ে না ভাবুক, পরজগৎ নিয়ে ভাবুক। তাদের শাসনশোষণে সুবিধা হয়। আবার দুনিয়ায় অপরাধের বিচার হচ্ছে না, সে বলছে একদিন বিচার হবে; তার মানে পরকালমুখী হচ্ছে।

আরেক ইমেরিটাস অধ্যাপক এ কে আজাদ চৌধুরী বলেন, বারবার ক্ষমতা পরিবর্তন হয়, আর আঘাত গিয়ে পড়ে সংখ্যালঘু মানুষদের উপরে। সেজন্য মানুষের মধ্যে ঐক্য তৈরি করা জরুরি। মানুষে মানুষে বিভেদ সৃষ্টি হলে সমপ্রীতি রক্ষা করবে না। ব্যক্তিস্বার্থ সব সময় সমপ্রীতিকে নষ্ট করে। সাম্য তো নেই। সমতার কথাও যদি বলি, আমাদেরকে মানুষের মধ্যে বিভেদ দূর করতে হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বলেন, বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার মাধ্যমে বাংলাদেশকে হত্যা করা হয়েছে, আধুনিকতাকে হত্যা করা হয়েছে, ধর্মনিরপেক্ষতাকে হত্যা করা হয়েছে। সে কারণে একবিংশ শতাব্দীতে এসেও আমাদেরকে ধর্মীয় সমপ্রীতির কথা বলতে হচ্ছে। তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দেশ গড়ার জন্য কেবল সংগঠন গড়ে তুলে নয়, নাগরিকদেরকে ঐক্যবদ্ধ করতে হবে।

ডাকসুর সাবেক সহসভাপতি মাহফুজা খানম বলেন, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের মূলমন্ত্র ছিল একটি অসামপ্রদায়িক রাষ্ট্র গঠন। ’৭৫ এ বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর থেকে ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনের যে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল, তা এখনও চলমান। এখন তরুণ সমাজের দায়িত্ব বাংলাদেশকে অসামপ্রদায়িক রাষ্ট্র গড়ার।

অনুষ্ঠানে বৌদ্ধ ধর্মীয় নেতা শুদ্ধানন্দ মহাথেরো বলেন, আমরা বাঙালি। বাঙালিরা যদি মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান মিলে একসাথে কাজ করতে পারি তাহলে সমপ্রীতি বজায় থাকবে। কারণ আমরা তো এক ভাষায় কথা বলি। সামপ্রায়িক সমপ্রীতি রক্ষা করতে পারলে বাঙালিত্বও ফিরে আসবে।

ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক সামীম মো. আফজাল বলেন, মদিনা সনদ সব ধর্মের সমপ্রীতির দৃষ্টান্ত; আর তার প্রতিফলন ঘটেছে বাহাত্তরের সংবিধানে। সব ধর্মের মানুষের অধিকার সেখানে সমুন্নত রাখা হয়েছে। জামায়াতে ইসলামীর প্রতিষ্ঠাতা আবুল আলা মওদুদী, মিশরের মুসলিম ব্রাদারহুড, তুরস্কের ফতেহ গুল ও জাকির নায়েকরা ইসলামের ‘ভুল ব্যাখ্যা’ দিয়েছে ও দিচ্ছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। মুসলমানদের ধর্মীয় পিতা ইবরাহীম (.)। কিন্তু বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু হতে কোনো অসুবিধা নাই। তেমনিভাবে আমার সোনার বাংলা জাতীয় সঙ্গীত হতেও ইসলামের সঙ্গে কোনো সাংঘর্ষিক অবস্থান নেই।

রামকৃষ্ণ মিশনের সাধারণ সম্পাদক স্বামী গুরু সেবানন্দ বলেন, ধর্মের বিভাজন নয়, ধর্মের সহাবস্থানের কথাই তুলে ধরা হয়েছে সব ধর্মে। বাংলাদেশের সংখ্যালঘুরাও সে মতো তাদের জীবন পরিচালনা করতে চায়। সবার মধ্যে সমপ্রীতি বজায় থাকুক।

খ্রিস্টান অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি নির্মল রোজারিও বলেন, হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান সবার দেশ বাংলাদেশ। এর জন্য সকলকে একসঙ্গে দেশকে সমৃদ্ধির দিকে এগিয়ে নিতে হবে। যদিও সামপ্রতিক সময়ে আমরা এর কিছুটা ব্যত্যয় হতে দেখেছি। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় ফিরে গেলে সেখান থেকে উত্তরণ করা সম্ভব হবে।

সমপ্রীতি বাংলাদেশের সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়ে সাংবাদিক আবেদ খান বলেন, খণ্ড খণ্ডভাবে প্রকাশের চেয়ে একটি প্ল্যাটফর্ম থেকে এগিয়ে যাওয়া প্রয়োজন। সামপ্রদায়িক শক্তির যে উত্থান, তাতে তরুণ প্রজন্ম কোনো না কোনোভাবে বিভ্রান্ত হবে। তাদেরকে সেই বিভ্রান্তি থেকে ঐক্যবদ্ধভাবে দূরে সরিয়ে আনতে হবে। ধর্মীয় রাজনীতি নিয়ে তিনি বলেন, ধর্মের রাজনীতি রাজনীতির ধর্মকে হত্যা করে। একাত্তরের সেক্টর কমান্ডার্স ফোরামের মহাসচিব সাংবাদিক হারুন হাবীব বলেন, যে বাংলাদেশের সৃষ্টি সমপ্রীতির শক্তির মধ্য দিয়ে, যে বাংলাদেশের সব অর্জন সমপ্রীতির শক্তির মধ্য দিয়ে, সেই বাংলাদেশকে এগোতে হবে সমপ্রীতির শক্তির মধ্য দিয়ে। যদিও আমরা অনেক উত্থান পতন দেখেছি, তবুও সামপ্রদায়িক সমপ্রীতি অটুট ছিল বিভিন্ন অর্জনে।

আমরা অনেক ক্ষেত্রে অনেক এগিয়েছি। কিন্তু সামপ্রদায়িক সমপ্রীতির দিক থেকে এগোতে পারিনি।

সমপ্রীতি বাংলাদেশের আহ্বায়ক সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবদুল মান্নান, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কথাসাহিত্যিক মুহাম্মদ জাফর ইকবাল, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি সারওয়ার আলী, জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি শফিকুর রহমান, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি গোলাম কুদ্দুছ, ইসকনের প্রতিনিধি সুখীল দাস, সংগঠনের সদস্য সচিব মামুন আল মাহতাব বক্তব্য দেন।

একাত্তরে শহীদ পরিবারের সন্তান ডা. নুজহাত চৌধুরীর পরিচালনায় উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে জাতীয় অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের ভিডিওবার্তা প্রচার করা হয়। জাতীয় সঙ্গীতের মাধ্যমে সূচনা হওয়া অনুষ্ঠানে অতিথিদের পাশাপাশি শিক্ষার্থী, ধর্মীয় সংগঠনের কর্মী ও সংস্কৃতিকর্মীদের উপস্থিতিতে পরিপূর্ণ ছিল জাতীয় জাদুঘরের প্রধান মিলনায়তন।

x