বহুমাত্রিক শান্তনু বিশ্বাস

ইউসুফ ইকবাল

বৃহস্পতিবার , ১৮ জুলাই, ২০১৯ at ৫:২৪ পূর্বাহ্ণ
78

চট্টগ্রামের নাট্যাঙ্গনের অনুকরণীয় আইকন শান্তনু বিশ্বাস (১৯৫৪-২০১৯)। চট্টগ্রামে নিয়মিত নাট্যচর্চার উন্মেষকালের অন্যতম মেধাবী সারথি তিনি। নাটক রচনা, নির্দেশনা, অভিনয় এবং নাট্যনির্মাণের সকল স্তরে ছিল তার স্বচ্ছন্দ বিচরণ। এছাড়া, সংগীত রচনা, সুরারোপ এবং সংগঠন পরিচালনা, পত্রিকা সম্পাদনায়ও তার প্রাতিস্বিক প্রতিভার পরিচয় পাওয়া যায়। শান্তনু বিশ্বাস ছিলেন শিল্পের বিবিধ শাখায় বিস্তৃত জ্ঞানের অধিকারী। চট্টগ্রামে তিনি বহুমাত্রিক সাংস্কৃতিক কর্মী হিসাবে সকলের কাছে অনুকরণীয় ও আদর্শ হয়ে উঠেছিলেন।
নাট্যচর্চার প্রারম্ভে শান্তনু বিশ্বাস ছিলেন মূলত অভিনেতা। এরপর আত্মপ্রকাশ নাট্যকার হিসাবে। অভিনেতা হিসাবে তিনি গণায়ন নাট্যসম্প্রদায়ের মাধ্যমে নাট্যচর্চা শুরু করেন। এ দলের প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য তিনি। ১৯৭৮ সালে ‘অঙ্গন থিয়েটার ইউনিট’ প্রতিষ্ঠিত হলে শান্তনু বিশ্বাস যোগ দেন এ দলে। অঙ্গনে তিনি নাট্যকার ও নির্দেশক হিসেবে প্রথম আত্মপ্রকাশ করেন। এ দলে তার রচিত তিনটি নাটক মঞ্চস্থ হয়। নাটকগুলো হলো- ‘কালো গোলাপের দেশ’ ‘দপ্তরী রাজদপ্তরে’ ও ‘নবজন্ম‘। প্রথম দুইটি মিলন চৌধুরীর নির্দেশনা। ‘নবজন্ম’ নাট্যকার নির্দেশিত নাটক। ১৯৮২ সালে শান্তনু বিশ্বাস ‘কালপুরুষ নাট্যসম্প্রদায়’ নামে নিজেই গড়ে তোলেন নাট্যদল। এখানেই তিনি নিজস্ব নাট্যচিন্তা নিয়ে স্বকীয় ভঙ্গিতে আত্মপ্রকাশ করেন। এসময় তিনি নিবিড় নাট্যচিন্তায় নিমগ্ন হন। নবনাট্য আন্দোলনের সম্ভাবনা, সংকট ও সীমাবদ্ধতা নিয়ে একাধিক প্রবন্ধ রচনা করে নাট্যচিন্তক হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। নিজস্ব ও সম্মিলিত নাট্যভাবনা প্রকাশের জন্য সম্পাদনা করেন নাট্যপত্রিকা। নাট্যচর্চার পাশাপাশি ভিন্নধারার সংগীত শিল্পী হিসেবে শান্তনু বিশ্বাস উভয় বাংলায় সমাদৃত। এই বহুমাত্রিক সাংস্কৃতিক প্রতিভার কর্ম ও সৃজনের চিন্তনে কেন্দ্রে ছিলো দেশ ও মানুষ। মানুষের কল্যাণের কথা আমৃত্যু প্রচার করেছেন। মৃত্যুর পর মানুষের কল্যাণে দেহটিও দান করে গেছেন।
মৌলিক নাটক রচনায় শান্তনু বিশ্বাসের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। তাঁর রচিত নাটকগুলো হলো- ‘কালো গোলাপের দেশ’, ‘দপ্তরী রাজ দপ্তরে’, ‘নবজন্ম’ ‘ভবঘুরে’ ‘ইনফরমার’ ‘নির্ভার’ ‘মৃণালের চিঠি’ (মুলগল্প: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এর ‘স্ত্রীর পত্র’), ‘ক্ষীরের পুতুল’ (মুলগল্প: অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর) প্রভৃতি নাটক। বিদেশী নাটকের অনুবাদেও তার পারঙ্গম প্রতিভার পরিচয় মেলে। তার অনুদিত নাটকগুলো হলো- ‘খোলা হাওয়া’ (এন এফ সিম্পসন এর ‘হাউ আর ইউর হ্যান্ডলস), ‘প্রার্থী’ (হ্যারল পিন্টার এর ‘এপ্লিক্যান্ট’) ‘মাতৃচরিত’ (এ্যালেন আইকবোর্ন এর ‘মাদার ফিগার’) প্রভৃতি।
শান্তনু বিশ্বাস রচিত মৌলিক নাটকের মধ্যে তাঁর প্রতিনিধিত্বশীল নাটক ‘ইনফরমার’। নাটকটির আখ্যান মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক। ১৯৮২ সালে নাটকটি কালপুরুষ এর প্রযোজনায় প্রথম মঞ্চস্থ হয়। ‘কালপুরুষ’ এর অর্ধশতাধিক প্রদর্শনী ছাড়াও একাধিক দল দেশে ও পশ্চিমবঙ্গে নাটকটির শতাধিক মঞ্চায়ন করেছে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ধারায় নাটকটি অনন্য সংযোজন। তার শিল্পচেতনার কেন্দ্রে রয়েছে মুক্তিযুদ্ধ। তার কাছে মুক্তিযুদ্ধ যুগপৎ বিপুল আনন্দ ও অপরিমেয় বেদনার মহাকাব্য। কেননা মুক্তিযুদ্ধে তিনি হারিয়েছেন অগ্রজ অতনু বিশ্বাসকে। হারানোর এ বেদনাকে তিনি একাকী বহন করেছেন আমৃত্যু- সে সাথে মুক্তিযুদ্ধের দুঃসহ স্মৃতি ও দৃপ্ত চেতনাকে তিনি আমৃত্যু লালন করেছেন।
নাট্যাঙ্গনে শান্তনু বিশ্বাসের অনন্য অবদান নাট্যপত্রিকা ‘প্রসেনিয়াম’। ১৩৮৯ বঙ্গাব্দের ফাল্গুন মাসে (মার্চ,১৯৮৩) শান্তনু বিশ্বাসের সম্পাদনায় ৫,জুবিলী রোড, চট্টগ্রাম থেকে তৎ-কর্তৃক প্রকাশিত হয় ‘প্রসেনিয়াম’ ষাণ্মাসিক নাট্যপত্রের প্রথম সংখ্যা। ১৩৯৬ বঙ্গাব্দের জৈষ্ঠ্যমাসে (জুন,১৯৮৮) ষষ্ঠ সংখ্যা প্রকাশের পর ‘প্রসেনিয়াম’-এর যবনিকা পড়ে। পত্রিকাটির প্রধান প্রবণতা ছিল সমকালীন বাংলাদেশের নাট্যচর্চার গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণ এবং বিশ্বনাট্য ও নাট্যভাবনার সাথে নাট্যকর্মীদের পরিচয় করিয়ে দিয়ে তাদের বোধের জগতকে সমৃদ্ধ করা। এ লক্ষ্যে ‘প্রসেনিয়াম’-এর প্রতি সংখ্যায় মৌলিক নাটক ও প্রবন্ধের পাশাপাশি প্রকাশিত হয়েছে একাধিক বিদেশি নাটক ও প্রবন্ধের অনুবাদ।
ভিন্নধারার সংগীত শিল্পী হিসাবে দুই বাংলায় শান্তনু বিশ্বাস সমাদৃত হয়েছেন। তিনি গান গাইতেন নিজের লেখা, নিজের সুরের গান। প্রকাশিত হয়েছে গানের একক ও যৌথ সংকলন ‘পোস্টম্যান’ ‘চিরকুট’ ‘খড়কুটো’ ‘ঝিনুক ঝিনুক মন’ ‘আবহমান’ ‘সব তোমাদের জন্য’ প্রভৃতি এবং গীতিসংকলন ‘খোলাপিঠ’।
গত ১২ জুলাই চট্টগ্রামের এই বহুমাত্রিক মেধাবী শিল্পী ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব মৃত্যুবরণ করেন। ২০১৬ সালে নোটারী পাবলিকের মাধ্যমে তিনি তার মরদেহ চট্টগ্রাম মেডিকেলের এনাটমি বিভাগে দান করার অঙ্গীকার করেছিলেন। ১৪ জুলাই তার সহধর্মিনী এ মহান শিল্পীর ইচ্ছার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে মরদেহ মেডিকেল কর্তৃপক্ষকে হস্তান্তর করেন। চট্টগ্রামের এই মহান শিল্পীর স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাই।

x