বহুমাত্রিক নজরুল ও একটি আত্মজিজ্ঞাসা

উত্তম কুমার আচার্য্য

শুক্রবার , ৩১ আগস্ট, ২০১৮ at ৫:৩১ পূর্বাহ্ণ
187

কবি নজরুলের গদ্যে অসামপ্রদায়িক চেতনা ছিল অসাধারণ। এ চেতনা তিনি জাতীয় ঐক্য সৃজনের কাজে ব্যবহার করেছেন বিস্ময়কর কুশলতায়। ‘একসময় ভারতবর্ষে ঔপনিবেশিক শাসকেরা নিজেদের শাসনশোষণের স্বার্থে ‘দ্বিজাতিতত্ত্বের চাল চালতে শুরু করে। এতে বিভক্ত হয়ে পড়ে প্রধান দুই সমপ্রদায়। নজরুল ঠিকই বুঝেছিলেন এ সামপ্রদায়িকতা জাতীয় মুক্তি সংগ্রামকেই বাধাগ্রস্ত করবে। তিনি নবযুগএ লিখেন– ‘ঐ শোন নবযুগের অগ্নিশিখা নবীন সন্ন্যাসীর মন্ত্রবাণী। ঐ বাণীই রণক্লান্ত সৈনিককে নব প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ করিয়া তুলিতেছে। ঐ শোনো তরুণ কণ্ঠের বীরবাণী আমাদের মধ্যে ধর্ম বিদ্বেষ নাই, জাতিবিদ্বেষ নাই, জাত্যাভিমান নাই।’ শুধু রাষ্ট্রীয় জীবন নয় নিজের জীবন থেকেও সামপ্রদায়িকতার বিষবৃক্ষ উপড়ে ফেলার কথা বলেছেন তিনি। ‘আমি মানুষকে ভালোবাসতে পেরেছি। জাতি ধর্মভেদ আমার কোনদিনও ছিলনা, আজও নেই। আমাকে কোনদিন তাই কোন হিন্দু ঘৃণা করেন নি।

আমি হব সকাল বেলার পাখি, সবার আগে কুসুমবাগে উঠব আমি ডাকি,……………আমরা যদি না জাগি মা কেমনে সকাল হবে, তোমার ছেলে উঠলে মাগো রাত পোহাবে তবে।’ জীবনের প্রথম পাঠগ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত ছোট্ট কবিতাটি এখনও আমাদের স্মৃতিপটে সমুজ্জ্বল। এ কবিতা কাজী নজরুল ইসলামের। এ কবিতাটি বিদ্রোহী কবির। এ কবিতা আমাদের জাতীয় কবির।

বর্ধমান জেলার আসানসোল মহকুমার চুরুলিয়া গ্রামের দুখুমিয়া আমাদের জাতীয় কবি কেমন করে হলেন তাতো তাঁর এ ছোট্ট কবিতাটিও বলে দিচ্ছে। এ কবিতার শেষ লাইনগুলো আমাদের দেশের শিশুদের মনে জেগে ওঠার বাসনার বীজ ও তাগিদ। স্বাধীনতার, মুক্তির ভোর আনতে হবে, পরাধীনতার রাত্রির অবসান তবেই হবে। তাই জাগতে হবেনা জাগলে সে রাত পোহাবে না। কবি নজরুল তাঁর জীবনব্যাপী, যদিও তাঁর সুস্থ জীবন ছিল কর্মের ব্যাপকতা আর অবদানের তুলনায় নিতান্তই স্বল্পস্থায়ী, নানা লেখায় তিনি প্রবলভাবে এবং সহজভাবে উচ্চারণ করেছেন দ্রোহের কথা, জাতীয় ঐক্য, স্বাধীনতার কথা, মানবতার কথা, সাম্যের কথা তথা শোষণ বঞ্চনার অবসানের কথা, সুস্পষ্ট ও সুনির্দিষ্টভাবে অসামপ্রদায়িকতার কথা এবং অবশ্যই প্রেমের কথা যা মানবীয় অনুভূতি তার ত্যাগের প্রকৃত প্রতিভু, যেটিকে কোনরূপ ভনিতা না করে বলতে গেলেই বলতে হয়আমাদের সহজাত, স্বভাবজাত।

নজরুল দ্রোহের কথা বলেছেন। তাঁর কাব্যের কেন্দ্রীয় ভাব’বিদ্রোহ’ বলেছেন বেশিরভাগ সমালোচক। ‘বিদ্রোহী’ কবিতাটিকে এ দিকটির উপযুক্ত প্রতিনিধি হিসেবে বাছাই করা হয়। এ কবিতার কয়েকটি পংক্তি-‘মহাবিদ্রোহী রণক্লান্ত, আমি সেইদিন হব শান্ত/যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দনরোল আকাশে বাতাসে ধ্বনিবে না/অত্যাচারীর খগড়কৃপাণ ভীমরণভূমে রণিবে না।” এরসাথে উল্লেখ করা যায় “বলবীর, চিরউন্নত মম শির/শিরনেহারী আমারি/নত শির ওই শিখর হিমাদ্রির।”

মূলতঃ বিশ শতকের অসন্তুষ্ট, ক্ষুব্ধ বাঙালি মানস তাঁর ‘বিদ্রোহী’ কবিতায় প্রোজ্জ্বল হয়েছে। এটি জাতীয় জাগরণকেও উদ্বুদ্ধ করেছে। এ বিদ্রোহের রূপ তাই বর্ণিল ও বিসতৃত। স্বাধীনতাকামী জনগণের উপর ঔপনিবেশিক শাসন ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে তিনি সমগ্র জাতির মুখপাত্রের মতোই প্রতিবাদ, প্রতিরোধের কথা বলেছেন, স্বাধীনতার কথা বলেছেন। বললেন, ‘কারার ওই লৌহকপাট/ভেঙে ফেল্‌ কর্‌রে লোপাট রক্তজমাট শিকলপূজার পাষাণবেদী……….’। নজরুলোত্তর সময়ে (বাকরুদ্ধ হবার পরে) বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে তাঁর এ কবিতা মুক্তিসেনাদের এবং মুক্তিকামী জাতির মগ্ন চৈতন্যে স্ফূলিঙ্গ সংযোগ করেছিল যেমনটা করেছিল ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনেও।

কাজী নজরুল ইসলাম মানবতাবাদী কবি। মানবতার ধারণাটি সাম্যের সাথে সম্পৃক্ত থাকবে এটাই স্বাভাবিক। মানবতা ও সাম্যবাদ তাঁর লেখায় উঠে এসেছে অনন্য মাত্রায়। ‘সাম্যবাদী’ কবিতায় তিনি লিখলেন, ‘গাহি সাম্যের গান/মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান…..।’ তিনি দেখেছিলেন স্বাধীন দেশে একটি শোষণমুক্ত সমাজের স্বপ্ন। তিনি লিখলেন, ‘সেদিন দেখিনু রেলে/কুলি বলে এক বাবুসাব তারে ঠেলে দিল নিচে ফেলে/ চোখ ফেটে এল জল/এমনি করে কি জগৎ জুড়িয়া মার খাবে দুর্বল!’ আরো লিখলেন– ‘প্রার্থনা করো, যারা কেড়ে খায় তেত্রিশ কোটি মুখের গ্রাস/যেন লেখা হয় আমার রক্ত লেখায় তাদের সর্বনাশ।’ বাংলার অন্নদায়ী কৃষকের জন্য তাঁর কণ্ঠে ধ্বনিত হয়েছেগাহি তাহাদের গান/ধরণীর হাতে দিল যারা আনি ফসলের ফরমান।’

কবি নজরুল অতি অবশ্য এবং সুনির্দিষ্টভাবে অসামপ্রদায়িকতার কবি। বিচিত্র প্রকাশে, তাঁর লেখনিতে সমপ্রদায় নিরপেক্ষ ভাবটি দেদীপ্যমান। তিনি লিখলেন– “অসহায় জাতি মরিছে ডুবিয়া জানেনা সন্তরণ/কাণ্ডারী! আজ দেখিব তোমার মাতৃমুক্তিপণ!/ হিন্দু না ওরা ‘মুসলিম’ ঐ জিজ্ঞাসে কোন জন? / কান্ডারী! বলো ডুবিছে মানুষ সন্তান মোর মা’র!” (কাণ্ডারী হুঁশিয়ার, সর্বহারা)। কিংবা– “গাহি সাম্যের গান/যেখানে আসিয়া এক হয়ে গেছে সব বাধা ব্যবধান/যেখানে মিশেছে হিন্দুবৌদ্ধমুসলিমক্রীশ্চান!” (সাম্যবাদী)। জাত ও ধর্মব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে তাঁর লেখনী ছিল ক্ষুরধার। যেমন-“জাতের নামে বজ্জাতি সব জাত জালিয়াত খেলছো জুয়া/ছুঁলেই তোর জাত যাবে? জাত ছেলের হাতের নয়তো মোয়া।” তিনি আরও লিখলেন– ‘সকল জাতই সৃষ্টি যে তার, এ বিশ্বমায়ের বিশ্বঘর/মায়ের ছেলে সবাই সমান,তার কাছে নাই আত্মপর।’ প্রথমোক্ত কবিতায় তিনি ‘জাতজালিয়াত’ বলতে যারা ‘জাতজুয়াড়ী বা ধর্মব্যবসায়ী তাদের বিরুদ্ধে প্রবল ধিক্কার তুলেছেন। উপমহাদেশের দু’টি প্রধান ধর্মাবলম্বী হিন্দু ও মুসলমানের কথা তাঁর কবিতায় ও গানে এসেছে এভাবে– ‘মোরা একইবৃন্তে দু’টি কুসুম হিন্দু মুসলমান/মুসলিম তার নয়নমণি হিন্দু তার প্রাণ।’ আরও উল্লেখ করতে গেলে– ‘ভারতের দুই নয়নতারা হিন্দু মুসলমান/দেশ জননীর সমানপ্রিয় যুগল সন্তান, হিন্দু মুসলমান। এই সাথে তিনি পরাধীনতার শৃঙ্খল হতে দেশকে মুক্ত করার মানসে জাতিগত সমপ্রীতি ও জাতীয় ঐক্যের ডাক দিয়ে গেছেন। স্বাধীনতার আহ্বান করে গেছেন, লেখক হিসেবে নিজে তাতে অংশগ্রহণ করেছেন। হিন্দু মুসলিম ঐক্য প্রচেষ্টা ও জাতীয় জাগরণ আকাঙ্ক্ষায় তিনি লিখলেন– ‘মাভৈ!,মাভৈ! এতদিনে বুঝি জাগিল ভারতে প্রাণ/সজীব হইয়া উঠিয়াছে আজ শ্মশান গোরস্থান।’ একই কবিতায়– ‘খালেদ আবার ধরিয়াছে অসি অর্জ্জুন ছোঁড়ে বাণ/জেগেছে ভারত, ধরিয়াছে লাঠি হিন্দু মুসলমান।’ কবি আবদুল কাদির সম্পাদিত নজরুল ইসলাম রচনাবলী চতুর্থ খণ্ডের ‘নজরুল পত্রাবলী’ থেকে কিছু উদ্ধৃতি এখানে প্রাসঙ্গিক হতে পারে। তিনি তাঁর কবিসত্তার সঙ্গে সামাজিক সত্তাকে একীভূত করে না দেখার জন্য সবাইকে আহ্বান জানিয়ে লিখেছেন– ‘আমি মুসলমান কিন্তু আমার কবিতা সকল দেশের, সকল কালের এবং সকল জাতির। কবিকে হিন্দু কবি, মুসলমান কবি ইত্যাদি বলে বিচার করতে গিয়ে এত ভুলের সৃষ্টি।’ আর একটি পত্রে লিখলেন– ’আমার বিদ্রোহী পড়ে যাঁরা আমার উপর বিদ্রোহী হয়ে ওঠেন, তাঁরা যে হাফেজ রুমীকে শ্রদ্ধা করেন এ’ত আমার মনে হয় না। আমিতো আমার চেয়েও বিদ্রোহী মনে করি তাঁদের। এঁরা কি মনে করেন, হিন্দুজ দেবদেবীর নাম নিলেই সে কাফের হয়ে যাবে? তাহলে মুসলমান কবি দিয়ে বাঙলা সাহিত্য কোন কালেই সম্ভব হবে না, জৈগুন বিবির পুঁথি ছাড়া।’ তিনি আরও একটি পত্রে লেখেন– ‘বাংলা সাহিত্য সংস্কৃতের দুহিতা না হলেও পালিত কন্যা। কাজেই হিন্দুর ভাবধারা এতে এমন ওতপ্রোতভাবে জড়িত যে, ও বাদ দিলে বাঙলা ভাষার অর্ধেক ফোর্স নষ্ট হয়ে যাবে। ইংরেজি সাহিত্য হতে গ্রিকপুরাণের ভাব বাদ দেওয়ার কথা কেউ ভাবতে পারে না। বাঙলা সাহিত্য হিন্দু মুসলমানদের উভয়েরই সাহিত্য। এতে হিন্দু, দেবদেবীর নাম দেখলে মুসলমানদের রাগ করা যেমন অন্যায়, হিন্দুরও তেমনি মুসলমানদের দৈনন্দিন জীবনযাপনের মধ্যে নিত্য প্রচলিত মুসলমানি শব্দ তাঁদের লিখিত সাহিত্যে দেখে ভুরু কোঁচকানো অন্যায়। তাই তাঁদের এ সংস্কারে আঘাত হানার জন্যই মুসলমানি শব্দ ব্যবহার করি বা হিন্দু দেবদেবীর নাম নিই।’ যেমন, তিনি ‘নবযুগ’ এ প্রলয়োল্লাস’ (তোরা সব জয়ধ্বনি কর/ওই নূতনের কেতন ওড়ে কালবৈশাখীর ঝড়……..) কবিতার পটভূমিকায় লিখেছেন– ‘আজ মহাবিশ্বের মহাজাগরণ, আজ মহামাতার মহা আনন্দের দিন, ………আজ নারায়ণ আর ক্ষীরোদসাগরে নিদ্রিত নন,…….ঐ শোনো মা জগদ্ধাত্রীর শুভ শঙ্খ। ঐ শোনো ইস্রাফিলের শিঙ্গায় নব সৃষ্টির উল্লাসঘন রোল।’

কবি নজরুলের গদ্যে অসামপ্রদায়িক চেতনা ছিল অসাধারণ। এ চেতনা তিনি জাতীয় ঐক্য সৃজনের কাজে ব্যবহার করেছেন বিস্ময়কর কুশলতায়। ‘একসময় ভারতবর্ষে ঔপনিবেশিক শাসকেরা নিজেদের শাসনশোষণের স্বার্থে ‘দ্বিজাতিতত্ত্বের চাল চালতে শুরু করে। এতে বিভক্ত হয়ে পড়ে প্রধান দুই সমপ্রদায়। নজরুল ঠিকই বুঝেছিলেন এ সামপ্রদায়িকতা জাতীয় মুক্তি সংগ্রামকেই বাধাগ্রস্ত করবে। তিনি নবযুগএ লিখেন– ‘ঐ শোন নবযুগের অগ্নিশিখা নবীন সন্ন্যাসীর মন্ত্রবাণী। ঐ বাণীই রণক্লান্ত সৈনিককে নব প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ করিয়া তুলিতেছে। ঐ শোনো তরুণ কণ্ঠের বীরবাণী আমাদের মধ্যে ধর্ম বিদ্বেষ নাই, জাতিবিদ্বেষ নাই, জাত্যাভিমান নাই।’ শুধু রাষ্ট্রীয় জীবন নয় নিজের জীবন থেকেও সামপ্রদায়িকতার বিষবৃক্ষ উপড়ে ফেলার কথা বলেছেন তিনি। ‘আমি মানুষকে ভালোবাসতে পেরেছি। জাতি ধর্মভেদ আমার কোনদিনও ছিলনা, আজও নেই। আমাকে কোনদিন তাই কোন হিন্দু ঘৃণা করেন নি। ব্রাহ্মণেরাও ঘরে ডেকে আমাকে পাশে বসিয়ে খেয়েছেন ও খাইয়েছেন’ (আমার সুন্দর)

নজরুল দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন, ‘জাতীয় মুক্তি মানে গণমানুষের মুক্তি, একক কোন ধর্মের মানুষ বা সমপ্রদায় গোষ্ঠীর মুক্তি নয়। এটি এমন একটি প্রক্রিয়া যে প্রক্রিয়ার মধ্যে প্রতিক্রিয়াশীলতা ঢুকে পড়লে স্বাধীনতার স্বপ্ন সুদূরপরাহতই থেকে যাবে। ফলে তিনি হিন্দু মুসলমানের সমস্ত বিভেদ ভুলে গিয়ে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামের কথা বলেছিলেন। তিনি জানতেন, সামপ্রদায়িক যে বিভেদ তখন দেখা দিয়েছিল সেটা আগে কখনো দেখা যায়নি। তীব্র ব্যাঙ্গের সঙ্গে এ সামপ্রদায়িকতাকে কটাক্ষ করে তাই বলেছিলেন, ‘এ ল্যাজ গজালো কি করে? এর আদি উদ্ভব কোথায়?’ ‘বাংলা সাহিত্যে মুসলমান’ প্রবন্ধে তিনি লিখেন– ‘হিন্দু হিন্দু থাক, মুসলমান মুসলমান থাক, শুধু একবার এই মহাগগনতলের সীমাহারা মুক্তির মাঝেদাঁড়াইয়ামানব! তোমার কণ্ঠে সেই সৃষ্টির আদিম বাণী ফুটাও দেখি। বল দেখি, “আমার মানুষ ধর্ম।” দেখিবে, দশদিকে সার্বভৌমিকের সাড়ার আকুল স্পন্দন কাঁপিয়া উঠিতেছে।’ এরকম আরও অসংখ্য উদ্ধৃতি তাঁর রচনা থেকে দেয়া যায়। মূলতঃ তাঁর মানবতাবোধকেই অন্যান্য সকল অভীধা অনুসরণ করেছে বা সহগামী হয়েছে। নজরুল শুধু হিন্দু মুসলমান নয়, সব শ্রেণীর মানুষের ঐক্যের কথা, মিলনের কথা বলেছিলেন’ (‘উপনিবেশবাদ ও নজরুল’, মাসুদুজ্জামান)। তিনি লিখেন, ‘আজ আমাদের নতুন করিয়া মহাজাগরণের দিনে আমাদের সেই শক্তিকে ভুলিলে চলিবে নাযাঁহাদের উপর আমাদের দশ আনা নির্ভর করিতেছে, অথচ আমরা তাঁহাদিগকে উপেক্ষা করিয়া আসিতেছি। সে হইতেছে আমাদের দেশের তথাকথিত ছোটলোক সমপ্রদায়।………এ তথাকথিত ছোটলোকদের অন্তর কাঁচের ন্যায় স্বচ্ছ………ইঁহারাই দেশে যুগান্তর আনিবে, অসাধ্য সাধন করিবে’ – (উপেক্ষিত শক্তির উদ্বোধন)। ‘বাংলা কবিতায় ইতিহাসঐতিহ্য, মিথপুরাণ ব্যবহারে নজরুল ইসলামই প্রথম অসামপ্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গীর পরিচয় দিয়েছেন। প্রসঙ্গত স্মরণ করা যায় সমালোচকের এ বিবেচনা, ‘নজরুলের পুরাণ প্রয়োগের উজ্জ্বলতম দিকটি এই যে, তিনি হিন্দু মুসলমান তথা বাঙালির সমবায়ী ঐতিহ্যকে তুলে ধরেছেন। উভয় ঐতিহ্যের ব্যবহারে নজরুল একক, মহান শিখরে অধিষ্ঠিত এবং বাঙলা ভাষা সাহিত্যে অতুলনীয়………..। মিথ পুরাণ, ইতিহাস ঐতিহ্যের সমকালদর্শী অসামপ্রদায়িক ব্যাখ্যাই বাংলা কবিতায় নজরুলের প্রাতিস্বিকতার উজ্জ্বলতর মাত্রা (নজরুল ইসলাম/কবি ও কবিতা, আবদুল মান্নান সৈয়দ)

কাজী নজরুল ইসলাম বিদ্রোহী কবি। তবে একথা আমরা স্বীকার করে নিই যে, তাঁর বিদ্রোহী সত্তার বিকাশে প্রেরণা যুগিয়েছে মানবতা, মানুষের জন্য ও দেশের জন্য প্রেম, পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে মুক্তিকামনা, সাম্যপ্রতিষ্ঠা প্রভৃতি। কিশোর বয়সে লেটো গানের দলে গান গাইতে, গান রচনা ও অভিনয় করতে গিয়ে তাঁর প্রেমধর্মের চেতনার ধারণ ও বিস্তার। এ চেতনা ছিল রাধাকৃষ্ণ বিষয়ক এবং ভক্তিরসের বিভিন্ন প্রাকারে জারিত।’ সমালোচকেরা মনে করেনকৈশোরে উপ্ত প্রেমধর্মের সে বীজ তাঁর পরবর্তী জীবনে মানবতা ও প্রেমের অসাধারণ বিকাশ ঘটিয়েছিল। নজরুলের প্রেমের গান ও কবিতা বাংলা সাহিত্যে অসাধারণ কিন্তু সাধারণের বোধসীমার একেবারে কাছাকাছি। তাঁর কয়েকটি প্রেমের গানের কিয়দংশ তুলে ধরা যাক– ‘তুমি সুন্দর তাই চেয়ে থাকি প্রিয় সে কি মোর অপরাধ/চাঁদেরে হেরিয়া কাঁদে চকোরীনি বলেনা তো কিছু চাঁদ’। এবং ‘আমার দেয়া ব্যথা ভোলো/আজ যে যাবার সময় হলো’, একই গানে– ‘ব্যথা দেয়ার কিযে ব্যথা/ আমি জানি জানে বিধাতা।’ কিংবা, ‘মোর প্রিয়া হবে এসো রাণী, দেবো খোঁপায় তারার ফুল।’ এবং ‘শাওন রাতে যদি স্মরণে আসে মোরে, বাহিরে ঝড় বহে নয়নে বারি ঝরে……..।’ কিংবা– ‘তোমারি আঁখির মতো আকাশের দুটি তারা।’ মহাকবি কালিদাসের মেঘদূত কাব্যের ভাব নিয়ে তিনি লিখেন– ‘পরদেশী মেঘ যাওরে ফিরে, বলিও আমার পরদেশীরে।’ ভৈরবী রাগে অসীম স্রষ্টাকে উদ্দেশ্য করে বলেন– ‘প্রভাত বীণা তব বাজে, উদার অম্বর মাঝে।’ এবং, ‘অঞ্জলি লহো মোর সংগীতে ……….।’ কিংবা অন্য সুরে ‘মোর ঘুমঘোরে এলে মনোহর, নমোনম, নমোনম, নমোনম/শ্রাবণ মেঘে নাচে নটবর ……।’

শ্যামা সংগীত রচনা করে গাইলেন– ‘শ্যামা নামের লাগলো আগুন আমার দেহের ধূপকাঠিতে …….।’ ভজনসংগীত লিখেন-‘রুমঝুম, রুমঝুম, নূপুর বাজে/ আসিল রে প্রিয় আসিল রে।’ কীর্তন রচনা করলেন– ‘হৃদি পদ্মে চরণ রাখ বাঁকা ঘনশ্যাম/বাঁকা শিখিপাখা নয়নবাঁকা বঙ্কিম ঠাম।’ ইসলামী গজল রচনা ও সুর করলেন– ‘এ কোন মধুর শরাব দিলে আলআরাবী সাকী।’ কিংবাতোরা দেখে যা’ আমিনা মায়ের কোলে/ মধুপূর্ণিমার যেন চাঁদ দোলে।’ এবং ‘বিশ্বদুলালী নবীনন্দিনী খাতুনে জান্নাত ফাতেমা জননী।’ অথবা ‘আল্লাহকে যে পাইতে চায় হযরতকে ভালোবেসে ……….।’ এছাড়াও, ‘বক্ষে আমার কাবার ছবি চক্ষে মোহাম্মদ রাসূল ……।’ কিংবা ‘ও মন রমজানের ওই রোজার শেষে এলো খুশীর ঈদ….।’ ইত্যাদি। কবি নজরুলের উপর্যুক্ত গান ও কবিতায় মানবপ্রেম ও সৃষ্টিকর্তার প্রতি প্রগাঢ় ভালবাসা একাকার হয়ে ধরা দেয়। ‘এ সূত্রে এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন নজরুলের ঐতিহ্যিক উত্তরাধিকার প্রসঙ্গটি। উত্তরাধিকারের ব্যাপকতায় নজরুল ইসলাম ছিলেন ঋদ্ধিশালী’ (নজরুল ইসলাম ও রিনেসাঁস, মোতাহের হোসেন চৌধুরী)। ‘নজরুল জন্মসূত্রে ভারতীয়, তাই ভারতীয় উত্তরাধিকারকে তিনি আপন উত্তরাধিকার বলেই জেনেছেন এবং গ্রহণ করেছেন। অন্যদিকে ধর্মসূত্রে তিনি ছিলেন পশ্চিম এশীয় তথা ইসলামের অতীত গৌরব এবং ঐতিহ্যের উত্তরাধিকারী। তিনি সচেতনভাবে উভয় ঐতিহ্যকে লালন করেছেন আপন কবিসত্তায়। তাই একই কবিতায় ভারতীয় ঐতিহ্যের সাথে সার্থকভাবে তিনি মেলাতে পেরেছেন পশ্চিম এশিয়ার ইতিহাসঐতিহ্য; যে হাতে লিখেছেন শ্যামা সংগীত, সে হাত দিয়েই লিখতে পেরেছেন গজল আর ইসলামী গান’ (নজরুলের কবিতায় মিথ ও ঐতিহ্যচেতনা, বিশ্বজিৎ ঘোষ)। কবি নজরুলের জীবন আমাদের জাতীয় জীবন ও জাতির ইতিহাসের সাথে কাকতালীয়ভাবে সাযুজ্যপূর্ণ। তাঁর মনটি যেন চিরন্তন বাঙালি মানস। এ দু’য়ে মিলেই তো আমাদের জাতীয় চেতনার মূল সুরটি সৃজিত হয়েছে কিংবা আমরাই এতে সে সুরটি খুঁজে পেয়েছি। তাঁকে আমাদের জাতীয় কবি হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে আমরা জাতি হিসেবে গরীয়ান হয়েছি। কিন্তু আমাদের প্রিয় কবি নজরুলের আদর্শ কতটুকু ধারণ ও লালন আমরা করতে পেরেছি আমাদের ব্যক্তিগত ও জাতীয় জীবনে? অথচ সমতা অর্জনের লক্ষ্যে সামাজিক সাম্যের জন্য আমরা নিরন্তর চেষ্টা করছি যা’ নজরুল বহু আগেই চিন্তা করেছিলেন। একটি জাতির জাতীয় মূলনীতি বা রাষ্ট্রীয় মূলনীতি সে জাতির জাতীয় আদর্শের দর্পণ। আমাদের রাষ্ট্রীয় মূলনীতিসমূহ কি জাতীয় কবি নজরুলের ভাবাদর্শকে ধারণ ও স্মরণ করে? আজ বড় বেশি প্রয়োজন এ প্রশ্নের উত্তর অনুসন্ধান করা। কবি নজরুলকে শুধু জাতীয় কবি ঘোষণা করাই প্রতুল নয় কিংবা তাঁর সৃষ্টিচর্চার জন্য ইন্সটিটিউট স্থাপন, জাতীয়ভাবে জন্মমৃত্যু দিবস পালনই যথেষ্ট নয়। প্রয়োজননীতি ও কর্মে তাঁকে জাতীয়ভাবে প্রতিষ্ঠা করা।

x