বর্তমান প্রজন্মের আচরণগত সংকট ও আমাদের করণীয়

বিচিত্রা সেন

শুক্রবার , ১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ at ৫:১২ পূর্বাহ্ণ
18

বর্তমান যুগ বিশ্বায়নের যুগ। খুব বেশি দূরে যাবার দরকার নেই। গত বিশ বছরে পাল্টে গেছে অনেক কিছু। পাল্টে গেছে আমাদের সামাজিক প্রেক্ষাপট। পাল্টে গেছে আমাদের পারিবারিক জীবন। গত বিশ বছর আগেও আমাদের চারপাশে চোখ বুলোলে দেখতে পেতাম যৌথ পরিবারের ছড়াছড়ি। প্রায় প্রতিটি পরিবারেই ছিল দাদা-দাদী, চাচা-চাচী, ফুফুসহ আরও কিছু নিকটাত্মীয়। এখন শহরে যৌথ পরিবারের সংখ্যা হাতে গোনা। গ্রামেও অতি দ্রুত ভেঙে পড়ছে যৌথ পরিবার।
এতে করে দ্রুত পাল্টে যাচ্ছে আমাদের সামাজিক ব্যবস্থা। একক পরিবারে বেড়ে ওঠার কারণে আমাদের নতুন প্রজন্ম অনেক রকম সামাজিক রীতিনীতি থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। আমরা যারা পূর্ববর্তী প্রজন্ম তারা সামাজিক রীতিনীতি এবং আচার-কানুনগুলোর শিক্ষা পেতাম পরিবার থেকেই।বলাবাহুল্য এ শিক্ষা যে সবসময় বাবা মা দিতেন তা নয়,দাদা-দাদী কিংবা বয়োজ্যেষ্ঠ যে কোনো কেউ এ শিক্ষা দেওয়ার অধিকার রাখতেন। এমনো দেখা যেতো একটা পরিবারের শিশুদের শাসন করা বা আদব কায়দা শিক্ষা দেওয়ার ভার পরিবারের একজন বিশেষ চাচা কিংবা মামার ওপর বর্তাতো। ক্ষেত্রবিশেষে তা কখনো কখনো চাচী, জেঠি, মামী, ফুপুর ওপরও পড়তো।
এখন পাল্টে গেছে সময়। বিশ্বায়নের যুগে বিশ্বের সাথে পাল্লা দিয়ে আমাদের সমাজও এগিয়ে চলছে। আর্থিক সচ্ছলতা মানুষকে স্বাচ্ছন্দ্যময় জীবনের দিকে আকৃষ্ট করছে। নারীরাও বাইরের জগতে নিজেকে সম্পৃক্ত করছে নানাভাবে।এর যেমন অনেক সুফল রাষ্ট্র পাচ্ছে, তেমনি আবার কিছু কুফলও সময়ের সাথে সাথে দৃশ্যমান হচ্ছে। আমরা হারাচ্ছি আমাদের ঐতিহ্যকে, সাংস্কৃতিক ও নৈতিক মূল্যবোধকে।
বর্তমান প্রজন্মের মূল্যবোধ নিয়ে আমরা বেশিরভাগ মানুষই শংকায় আছি। বর্তমান প্রজন্মকে বলা হচ্ছে মাথা নিচু করা প্রজন্ম। তবে এ অভিধা তাদের কাপুরুষতাকে ইঙ্গিত করে নয়। মূলত ইন্টারনেটের কারণেই তারা এ খেতাব পেয়েছে। বর্তমানে ইন্টারনেট এতটাই সহজলভ্য যে তা এখন হাতের মুঠোয় অর্থাৎ মুঠো ফোনে। আর বর্তমান প্রজন্ম সারাক্ষণ ঘাড় গুঁজে আছে সেই মুঠোফোনে। সারাক্ষণ মাথা নিচু করে ইন্টারনেটে ডুবে থাকে বলেই তাদের এ অভিধায় অভিহিত করা হয়।
এ প্রজন্ম মুঠোফোনে এতটাই আসক্ত যে তারা এখন টিভিও দেখে না। একটা সময় বিশেষ করে ৭০ এর দশকে ৮০ এর দশকে বিটিভি ছিল মূল্যবোধ তৈরি করার কারিগর। সংবাদগুলোর কথা বাদ দিলে বিটিভির প্রতিটি অনুষ্ঠান নির্মিত হতো শিক্ষামূলক কোনো ম্যাসেজ দিয়ে। যদিও সে সময়েও টিভি দেখাটা সময়ের অপচয় বলে বিবেচিত হতো।কিন্তু বর্তমানে আমরা বুঝতে পারছি টিভির মাধ্যমে আমাদের প্রজন্ম অনেক ভালো কিছুও শিখতে পেরেছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের নাটকগুলোর মাধ্যমে আমাদের প্রজন্ম পারিবারিক ও সামাজিক মূল্যবোধকে লালন করতে শিখেছে। কিন্তু বর্তমানে স্যাটেলাইট চ্যানেলের দাপটে বিটিভি মুমূর্ষু অবস্থায় দিন যাপন করছে। আর বাণিজ্যিক চ্যানেলগুলো মূল্যবোধ তৈরির চেয়ে মূল্যবোধ ধ্বংসতেই ভূমিকা রাখছে বেশি। তাই বর্তমান প্রজন্মের কাছে মূল্যবোধ শেখার জন্য কোনো মাধ্যম নেই। একক পরিবারে এককভাবে বড় হওয়ার কারণে তারা না পাচ্ছে যৌথ পরিবারের ঘনিষ্ঠ আত্মীয় স্বজনের আদর, না পাচ্ছে দুর্বিনীত আচরণের জন্য কঠোর কোনো শাসন। যার ফলে তাদের মধ্যে আচরণগত ঘাটতি রয়ে যাচ্ছে।
বর্তমান প্রজন্মের সাথে আচরণগত সংকটে আমরা মা-বাবারা অনেকসময় দিশেহারা হয়ে পড়ি। দেখা যায় বাসায় কোনো আত্মীয়স্বজন আসলে তারা যেমন নিষ্পৃহ থাকে, তেমনি মা-বাবার সাথে কোনো সামাজিক কিংবা পারিবারিক অনুষ্ঠানে যেতেও তাদের তীব্র অনীহা। তাই বলে তারা যে খুব একটা বন্ধুবান্ধব মিলে সময় কাটায় তাও নয়।একটু লক্ষ্য করলে দেখা যায় একই বয়সের ছেলেমেয়েরা একই সাথে বসেছে ঠিকই আড্ডা দিতে কিন্তু তাদের সবার চোখ স্ব স্ব মোবাইল স্ক্রিনে। দশের মাঝে থেকেও তারা কেমন যেন একক।
তাদের এ ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য তাদেরকে ক্রমাগত নিঃসঙ্গও করে দিচ্ছে। আগে যেমন কিশোর-কিশোরী বা তরুণ-তরুণীরা আপন ভাইবোন কিংবা চাচাতো-মামাতো-খালাতো ভাইবোনদের কাছে নিজেদের গোপন কথাগুলো শেয়ার করে কোনো একটা পরামর্শ চাইতে পারতো, এখন সে সুযোগও অনেকটা কমে গেছে। প্রায় সব পরিবারে একটা বা দুটো সন্তান হওয়াতে সবাই কেমন যেন একক সত্তা নিয়ে বেড়ে ওঠাতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ছে। যার ফলে তাদের মধ্যে একদিকে যেমন স্বার্থপরতা মাথা চাড়া দিয়ে উঠছে, অপরদিকে তেমনি হতাশা কিংবা দুঃখবোধও প্রকট হয়ে উঠছে। একের পর এক মাঠ দখল,উন্মুক্ত পরিবেশের অভাব, পাড়ায় পাড়ায় ক্লাব সংগঠনগুলোর বিলুপ্তি, বিভিন্ন ক্লাসে সিলেবাসের অত্যধিক চাপ তাদেরকে অস্থির এক প্রজন্মে পরিণত করছে।
আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে বর্তমান যুগের মা-বাবারা বিভিন্ন সামাজিক কিংবা পারিবারিক কাজে বহির্জগতের সাথে বেশি সংশ্লিষ্ট। ফলে সন্তানরা তাঁদেরকে তুলনামূলকভাবে কম কাছে পায়। এতেও অনেকসময় তাদের মনোজগতে বিরূপ প্রভাব ফেলে। যা তাদের আচরণে প্রকট হয়ে ওঠে। ইদানীং একটা কথা প্রায় সবার মুখেই শোনা যায় যে, বর্তমান প্রজন্ম বয়োজ্যেষ্ঠদের প্রতি যথাযথ সম্মান দেখায় না। তাদের আচরণ উদ্ধত,ভাষা অসংযত। কিন্তু গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে বোঝা যায় আসলে মূল্যবোধের সংজ্ঞাই তাদের কাছে পাল্টে গেছে। আমরা তাদের যে আচরণকে বেয়াদবি মনে করছি তাদের কাছে সেটা বেয়াদবি নয়। অর্থাৎ জেনে বুঝে তারা স্বেচ্ছায় বেয়াদবিটা করছে না,এটা তাদের মূল্যবোধের অবক্ষয়। ছোটবেলা থেকেই তাদের শিক্ষাদানের মধ্যে বড় একটা গলদ রয়ে গেছে। আমাদের প্রজন্ম কিংবা আমাদের পূর্ববর্তী প্রজন্ম বাল্যশিক্ষা থেকে যে নৈতিক শিক্ষাগুলো অর্জন করেছিলাম,আজ তাদের জন্য তেমন কোনো নৈতিক শিক্ষার বই নেই। আরও আছে আদর্শ শিক্ষকের সংকট। যার ফলে বর্তমান প্রজন্মের আচরণগত সংকট ও আমাদের করণীয়
বিচিত্রা সেন
বর্তমান যুগ বিশ্বায়নের যুগ। খুব বেশি দূরে যাবার দরকার নেই। গত বিশ বছরে পাল্টে গেছে অনেক কিছু। পাল্টে গেছে আমাদের সামাজিক প্রেক্ষাপট। পাল্টে গেছে আমাদের পারিবারিক জীবন। গত বিশ বছর আগেও আমাদের চারপাশে চোখ বুলোলে দেখতে পেতাম যৌথ পরিবারের ছড়াছড়ি। প্রায় প্রতিটি পরিবারেই ছিল দাদা-দাদী, চাচা-চাচী, ফুফুসহ আরও কিছু নিকটাত্মীয়। এখন শহরে যৌথ পরিবারের সংখ্যা হাতে গোনা। গ্রামেও অতি দ্রুত ভেঙে পড়ছে যৌথ পরিবার।
এতে করে দ্রুত পাল্টে যাচ্ছে আমাদের সামাজিক ব্যবস্থা। একক পরিবারে বেড়ে ওঠার কারণে আমাদের নতুন প্রজন্ম অনেক রকম সামাজিক রীতিনীতি থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। আমরা যারা পূর্ববর্তী প্রজন্ম তারা সামাজিক রীতিনীতি এবং আচার-কানুনগুলোর শিক্ষা পেতাম পরিবার থেকেই।বলাবাহুল্য এ শিক্ষা যে সবসময় বাবা মা দিতেন তা নয়,দাদা-দাদী কিংবা বয়োজ্যেষ্ঠ যে কোনো কেউ এ শিক্ষা দেওয়ার অধিকার রাখতেন। এমনো দেখা যেতো একটা পরিবারের শিশুদের শাসন করা বা আদব কায়দা শিক্ষা দেওয়ার ভার পরিবারের একজন বিশেষ চাচা কিংবা মামার ওপর বর্তাতো। ক্ষেত্রবিশেষে তা কখনো কখনো চাচী, জেঠি, মামী, ফুপুর ওপরও পড়তো।
এখন পাল্টে গেছে সময়। বিশ্বায়নের যুগে বিশ্বের সাথে পাল্লা দিয়ে আমাদের সমাজও এগিয়ে চলছে। আর্থিক সচ্ছলতা মানুষকে স্বাচ্ছন্দ্যময় জীবনের দিকে আকৃষ্ট করছে। নারীরাও বাইরের জগতে নিজেকে সম্পৃক্ত করছে নানাভাবে।এর যেমন অনেক সুফল রাষ্ট্র পাচ্ছে, তেমনি আবার কিছু কুফলও সময়ের সাথে সাথে দৃশ্যমান হচ্ছে। আমরা হারাচ্ছি আমাদের ঐতিহ্যকে, সাংস্কৃতিক ও নৈতিক মূল্যবোধকে।
বর্তমান প্রজন্মের মূল্যবোধ নিয়ে আমরা বেশিরভাগ মানুষই শংকায় আছি। বর্তমান প্রজন্মকে বলা হচ্ছে মাথা নিচু করা প্রজন্ম। তবে এ অভিধা তাদের কাপুরুষতাকে ইঙ্গিত করে নয়। মূলত ইন্টারনেটের কারণেই তারা এ খেতাব পেয়েছে। বর্তমানে ইন্টারনেট এতটাই সহজলভ্য যে তা এখন হাতের মুঠোয় অর্থাৎ মুঠো ফোনে। আর বর্তমান প্রজন্ম সারাক্ষণ ঘাড় গুঁজে আছে সেই মুঠোফোনে। সারাক্ষণ মাথা নিচু করে ইন্টারনেটে ডুবে থাকে বলেই তাদের এ অভিধায় অভিহিত করা হয়।
এ প্রজন্ম মুঠোফোনে এতটাই আসক্ত যে তারা এখন টিভিও দেখে না। একটা সময় বিশেষ করে ৭০ এর দশকে ৮০ এর দশকে বিটিভি ছিল মূল্যবোধ তৈরি করার কারিগর। সংবাদগুলোর কথা বাদ দিলে বিটিভির প্রতিটি অনুষ্ঠান নির্মিত হতো শিক্ষামূলক কোনো ম্যাসেজ দিয়ে। যদিও সে সময়েও টিভি দেখাটা সময়ের অপচয় বলে বিবেচিত হতো।কিন্তু বর্তমানে আমরা বুঝতে পারছি টিভির মাধ্যমে আমাদের প্রজন্ম অনেক ভালো কিছুও শিখতে পেরেছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের নাটকগুলোর মাধ্যমে আমাদের প্রজন্ম পারিবারিক ও সামাজিক মূল্যবোধকে লালন করতে শিখেছে। কিন্তু বর্তমানে স্যাটেলাইট চ্যানেলের দাপটে বিটিভি মুমূর্ষু অবস্থায় দিন যাপন করছে। আর বাণিজ্যিক চ্যানেলগুলো মূল্যবোধ তৈরির চেয়ে মূল্যবোধ ধ্বংসতেই ভূমিকা রাখছে বেশি। তাই বর্তমান প্রজন্মের কাছে মূল্যবোধ শেখার জন্য কোনো মাধ্যম নেই। একক পরিবারে এককভাবে বড় হওয়ার কারণে তারা না পাচ্ছে যৌথ পরিবারের ঘনিষ্ঠ আত্মীয় স্বজনের আদর, না পাচ্ছে দুর্বিনীত আচরণের জন্য কঠোর কোনো শাসন। যার ফলে তাদের মধ্যে আচরণগত ঘাটতি রয়ে যাচ্ছে।
বর্তমান প্রজন্মের সাথে আচরণগত সংকটে আমরা মা-বাবারা অনেকসময় দিশেহারা হয়ে পড়ি। দেখা যায় বাসায় কোনো আত্মীয়স্বজন আসলে তারা যেমন নিষ্পৃহ থাকে, তেমনি মা-বাবার সাথে কোনো সামাজিক কিংবা পারিবারিক অনুষ্ঠানে যেতেও তাদের তীব্র অনীহা। তাই বলে তারা যে খুব একটা বন্ধুবান্ধব মিলে সময় কাটায় তাও নয়।একটু লক্ষ্য করলে দেখা যায় একই বয়সের ছেলেমেয়েরা একই সাথে বসেছে ঠিকই আড্ডা দিতে কিন্তু তাদের সবার চোখ স্ব স্ব মোবাইল স্ক্রিনে। দশের মাঝে থেকেও তারা কেমন যেন একক।
তাদের এ ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য তাদেরকে ক্রমাগত নিঃসঙ্গও করে দিচ্ছে। আগে যেমন কিশোর-কিশোরী বা তরুণ-তরুণীরা আপন ভাইবোন কিংবা চাচাতো-মামাতো-খালাতো ভাইবোনদের কাছে নিজেদের গোপন কথাগুলো শেয়ার করে কোনো একটা পরামর্শ চাইতে পারতো, এখন সে সুযোগও অনেকটা কমে গেছে। প্রায় সব পরিবারে একটা বা দুটো সন্তান হওয়াতে সবাই কেমন যেন একক সত্তা নিয়ে বেড়ে ওঠাতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ছে। যার ফলে তাদের মধ্যে একদিকে যেমন স্বার্থপরতা মাথা চাড়া দিয়ে উঠছে, অপরদিকে তেমনি হতাশা কিংবা দুঃখবোধও প্রকট হয়ে উঠছে। একের পর এক মাঠ দখল,উন্মুক্ত পরিবেশের অভাব, পাড়ায় পাড়ায় ক্লাব সংগঠনগুলোর বিলুপ্তি, বিভিন্ন ক্লাসে সিলেবাসের অত্যধিক চাপ তাদেরকে অস্থির এক প্রজন্মে পরিণত করছে।
আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে বর্তমান যুগের মা-বাবারা বিভিন্ন সামাজিক কিংবা পারিবারিক কাজে বহির্জগতের সাথে বেশি সংশ্লিষ্ট। ফলে সন্তানরা তাঁদেরকে তুলনামূলকভাবে কম কাছে পায়। এতেও অনেকসময় তাদের মনোজগতে বিরূপ প্রভাব ফেলে। যা তাদের আচরণে প্রকট হয়ে ওঠে। ইদানীং একটা কথা প্রায় সবার মুখেই শোনা যায় যে, বর্তমান প্রজন্ম বয়োজ্যেষ্ঠদের প্রতি যথাযথ সম্মান দেখায় না। তাদের আচরণ উদ্ধত,ভাষা অসংযত। কিন্তু গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে বোঝা যায় আসলে মূল্যবোধের সংজ্ঞাই তাদের কাছে পাল্টে গেছে। আমরা তাদের যে আচরণকে বেয়াদবি মনে করছি তাদের কাছে সেটা বেয়াদবি নয়। অর্থাৎ জেনে বুঝে তারা স্বেচ্ছায় বেয়াদবিটা করছে না,এটা তাদের মূল্যবোধের অবক্ষয়। ছোটবেলা থেকেই তাদের শিক্ষাদানের মধ্যে বড় একটা গলদ রয়ে গেছে। আমাদের প্রজন্ম কিংবা আমাদের পূর্ববর্তী প্রজন্ম বাল্যশিক্ষা থেকে যে নৈতিক শিক্ষাগুলো অর্জন করেছিলাম,আজ তাদের জন্য তেমন কোনো নৈতিক শিক্ষার বই নেই। আরও আছে আদর্শ শিক্ষকের সংকট। যার ফলে বিদ্যালয় কিংবা সমাজ থেকে তার অর্জিত শিক্ষা ত্রুটিপূর্ণ রয়ে যাচ্ছে।
সেদিন এক প্রথিতযশা অধ্যাপক এ প্রসঙ্গে বলছিলেন সারাজীবন তিনি পথেঘাটে ছাত্রছাত্রী কিংবা ওইবয়সীদের সালাম পেতে পেতে অভ্যস্ত। ইদানীং তিনি খেয়াল করলেন কিছু কৈশোরোত্তীর্ণ তরুণ তাঁকে প্রতিদিন একই পথে দেখলেও সালাম দেয় না। ব্যাপারটা তাঁর কাছে খুব কৌতূহলোদ্দীপক মনে হলো। তিনি একদিন তাঁদের একজনকে ডাক দিয়ে কাছে এনে জানতে চাইলেন ওরা তাঁকে চেনা সত্ত্বেও সালাম দেয় না কেন? তরুণটির উত্তর শুনে তিনি খুব অবাক হলেন। কারণ তরুণটি তাঁকে খুব সংকোচের সাথে বললো, ‘স্যার, আপনাকে সালাম দিতে খুব ইচ্ছে হয়, কিন্তু আপনি যদি বিরক্ত হোন তাই ভয়ে সালাম দিই না।’ উত্তরটা আমাদেরকেও কঠিন ভাবনায় ফেলে দেয়। কারণ সালাম দিলে কেউ বিরক্ত হবে এ ভাবনা যে প্রজন্ম ভাবতে পারে,বুঝতে হবে তাদের সাথে আমাদের মানসিক দূরত্ব অনেক গভীর হয়ে গেছে।
এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পেতে চাইলে আমাদের সবাইকে সক্রিয় হতে হবে। নীরবে দেখে যাওয়া নয়, অভিমানে দূরে সরে যাওয়া নয়, আমাদের পরবর্তী প্রজন্মকে সঠিক আদর্শে মানুষ করতে চাইলে আমাদের সবাইকে দায়িত্ব নিতে হবে। তাদের সাথে বন্ধুর মতো মিশে বোঝাতে হবে তাদের আচরণের অসংগ্নলতা। ছোটবেলা থেকেই তাদেরকে সুস্থ পরিবেশ দিতে হবে। তাদের নিয়ে যেমন আত্মীয় স্বজনের বাড়ি যেতে হবে, তেমনি আত্মীয়স্বজনকেও মাঝে মাঝে নিজের বাড়িতে নিমন্ত্রণ করে বোঝাতে হবে আমাদের সামাজিক বন্ধন। যে কোনো কিছু তাদের এককভাবে দেওয়ার মানসিকতা পরিহার করে সবকিছু ভাগ করে নেওয়ার মানসিকতা ছোটবেলা থেকেই শেখাতে হবে। তাদের ভালো কাজগুলোকে মূল্যায়ন করতে হবে।তাদের ছোট ছোট আনন্দগুলোতে উৎসাহ দিয়ে বোঝাতে হবে তাদের সাথে আমরা একাত্ম। আবার তাদের অন্যায় আচরণকে প্রশ্রয় না দিয়ে প্রয়োজনে তাদের মৌখিকভাবে শাসন করতে হবে। এছাড়াও ছোটবেলা থেকে ভালো বই,বড় বড় মনীষীদের জীবনীগ্রন্থ, ভ্রমণকাহিনী পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে পারলে চরিত্র গঠনে তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। মোটকথা আদরে শাসনে স্নেহে ভালোবাসায় তাদেরকে আমাদের সাথে একাত্ম করে রাখতে হবে। তবেই হয়তো প্রজন্মের সাথে প্রজন্মের দূরত্ব কমে আসবে। সুস্থ থাকবে মানুষ, সুস্থ থাকবে সমাজ, এগিয়ে যাবে দেশ।
লেখক : গল্পকার; অধ্যাপক, বাংলাদেশ নৌবাহিনী কলেজ-চট্টগ্রাম। বিদ্যালয় কিংবা সমাজ থেকে তার অর্জিত শিক্ষা ত্রুটিপূর্ণ রয়ে যাচ্ছে।
সেদিন এক প্রথিতযশা অধ্যাপক এ প্রসঙ্গে বলছিলেন সারাজীবন তিনি পথেঘাটে ছাত্রছাত্রী কিংবা ওইবয়সীদের সালাম পেতে পেতে অভ্যস্ত। ইদানীং তিনি খেয়াল করলেন কিছু কৈশোরোত্তীর্ণ তরুণ তাঁকে প্রতিদিন একই পথে দেখলেও সালাম দেয় না। ব্যাপারটা তাঁর কাছে খুব কৌতূহলোদ্দীপক মনে হলো। তিনি একদিন তাঁদের একজনকে ডাক দিয়ে কাছে এনে জানতে চাইলেন ওরা তাঁকে চেনা সত্ত্বেও সালাম দেয় না কেন? তরুণটির উত্তর শুনে তিনি খুব অবাক হলেন। কারণ তরুণটি তাঁকে খুব সংকোচের সাথে বললো, ‘স্যার, আপনাকে সালাম দিতে খুব ইচ্ছে হয়, কিন্তু আপনি যদি বিরক্ত হোন তাই ভয়ে সালাম দিই না।’ উত্তরটা আমাদেরকেও কঠিন ভাবনায় ফেলে দেয়। কারণ সালাম দিলে কেউ বিরক্ত হবে এ ভাবনা যে প্রজন্ম ভাবতে পারে,বুঝতে হবে তাদের সাথে আমাদের মানসিক দূরত্ব অনেক গভীর হয়ে গেছে।
এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পেতে চাইলে আমাদের সবাইকে সক্রিয় হতে হবে। নীরবে দেখে যাওয়া নয়, অভিমানে দূরে সরে যাওয়া নয়, আমাদের পরবর্তী প্রজন্মকে সঠিক আদর্শে মানুষ করতে চাইলে আমাদের সবাইকে দায়িত্ব নিতে হবে। তাদের সাথে বন্ধুর মতো মিশে বোঝাতে হবে তাদের আচরণের অসংগ্নলতা। ছোটবেলা থেকেই তাদেরকে সুস্থ পরিবেশ দিতে হবে। তাদের নিয়ে যেমন আত্মীয় স্বজনের বাড়ি যেতে হবে, তেমনি আত্মীয়স্বজনকেও মাঝে মাঝে নিজের বাড়িতে নিমন্ত্রণ করে বোঝাতে হবে আমাদের সামাজিক বন্ধন। যে কোনো কিছু তাদের এককভাবে দেওয়ার মানসিকতা পরিহার করে সবকিছু ভাগ করে নেওয়ার মানসিকতা ছোটবেলা থেকেই শেখাতে হবে। তাদের ভালো কাজগুলোকে মূল্যায়ন করতে হবে।তাদের ছোট ছোট আনন্দগুলোতে উৎসাহ দিয়ে বোঝাতে হবে তাদের সাথে আমরা একাত্ম। আবার তাদের অন্যায় আচরণকে প্রশ্রয় না দিয়ে প্রয়োজনে তাদের মৌখিকভাবে শাসন করতে হবে। এছাড়াও ছোটবেলা থেকে ভালো বই,বড় বড় মনীষীদের জীবনীগ্রন্থ, ভ্রমণকাহিনী পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে পারলে চরিত্র গঠনে তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। মোটকথা আদরে শাসনে স্নেহে ভালোবাসায় তাদেরকে আমাদের সাথে একাত্ম করে রাখতে হবে। তবেই হয়তো প্রজন্মের সাথে প্রজন্মের দূরত্ব কমে আসবে। সুস্থ থাকবে মানুষ, সুস্থ থাকবে সমাজ, এগিয়ে যাবে দেশ।
লেখক : গল্পকার; অধ্যাপক, বাংলাদেশ নৌবাহিনী কলেজ-চট্টগ্রাম।