বন্দর নিয়ে স্বপ্নের কথা শোনালেন চেয়ারম্যান

আজাদী প্রতিবেদন

বৃহস্পতিবার , ২৫ এপ্রিল, ২০১৯ at ৬:১২ পূর্বাহ্ণ

ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি বাসযোগ্য পৃথিবী রেখে যেতে চট্টগ্রাম বন্দর গ্রহণ করেছে গ্রিন পোর্ট ধারণা। এরই অংশ হিসেবে বন্দরের যন্ত্রপাতিগুলো ইউরোপীয় ইমিশন স্ট্যান্ডার্ড অনুসরণে সংগ্রহ করা হচ্ছে। বন্দর জেটিতে অবস্থানরত সব জাহাজে শোর পাওয়ার সরবরাহের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। নতুন সব নির্মাণকাজে বিশেষ করে সব ইয়ার্ড ও জেটির ছাউনিতে সোলার প্যানেল বসানোর পরিকল্পনা রয়েছে। এ বন্দরকে দক্ষিণ এশিয়ার রিজিওনাল হাবে পরিণত করার স্বপ্নও সুদূর পরাহত নয়।
কথাগুলো বললেন, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের (চবক) চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল জুলফিকার আজিজ। ১৩২তম বন্দর দিবস উপলক্ষে গতকাল বুধবার দুপুরে শহীদ ফজলুর রহমান মুন্সী অডিটোরিয়ামে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। প্রতি বছর ২৫ এপ্রিল বন্দরের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে বন্দর দিবস উদযাপন করে বন্দর কর্তৃপক্ষ। এসময় বন্দর নিয়ে তিনি শোনালেন আশার কথা, বেশ কিছু স্বপ্নের কথাও বললেন।
বন্দর চেয়ারম্যান বলেন, বহির্নোঙরে অবস্থানরত বড় জাহাজ থেকে পণ্য লাইটার করে খালাস করতে কর্ণফুলী নদীর তীরে সদরঘাটে নির্মাণ করা হয়েছে পাঁচটি লাইটারেজ জেটি। জাহাজের অপেক্ষমাণ সময় কমানো ও দ্রুত পণ্য খালাস করার লক্ষ্যকে সামনে রেখে এ জেটিগুলো নির্মাণ করা হয়েছিল। উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে বিভিন্ন গ্রুপকে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে এসব জেটি। বন্দরের ইতিহাসে বেসরকারি খাতে জেটি পরিচালনার দায়িত্ব দেয়ার উদ্যোগ এটিই প্রথম।
তিনি আরো বলেন, জেটি বরাদ্দের পর চুক্তি অনুযায়ী শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের পণ্য লাইটার জেটিতে এনে খালাস করতে পারবে। আমদানিকৃত পণ্য এনে নিজেদের জেটিতে খালাস করার সুযোগ পাওয়ায় শিল্প গ্রুপগুলোর পণ্য পরিবহন খরচ ও সময় অনেক কমবে। পাঁচটি জেটি ছাড়াও পর্যায়ক্রমে আরো ১৫টি লাইটার জেটি নির্মাণ করছে কর্তৃপক্ষ। এর মধ্যে লালদিয়া এলাকায় ইনকনট্রেড ডিপোর পাশে পাঁচটি লাইটার জেটির নির্মাণ কাজ চলছে। এছাড়া চান্দগাঁওয়ের হামিদচরে পাঁচটি ও সীতাকুণ্ড এলাকায় পাঁচটি লাইটার জেটি নির্মাণ করা হবে।
বন্দর চেয়ারম্যান বলেন, বর্তমানে বন্দরের ১০ লাখ বর্গমিটার ইয়ার্ডে ২০ ফুট দীর্ঘ ৫০ হাজার কন্টেইনার ধারণ ক্ষমতা রয়েছে। এ অবকাঠামোতে বছরে ৪০ লাখ কন্টেইনার হ্যান্ডলিং করতে পারব। বে-টার্মিনাল হলে কাস্টমসের কার্যক্রম সেখানে স্থানান্তর করা হবে। জাহাজের গড় অবস্থানকাল একদিনে নেমে আসবে। সেখানে ৬ হাজার ট্রাক-কাভার্ডভ্যান ধারণ ক্ষমতার টার্মিনাল থাকবে। তখন আমরা ৭০ লাখ কন্টেইনার হ্যান্ডলিং করতে পারব। আগামী সপ্তাহে বে-টার্মিনাল প্রকল্পের ডিপিপি মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। আশা করি, ৩ মাসের মধ্যে ঠিকাদার নিয়োগের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে। ইয়ার্ড-শেডগুলো এমনভাবে তৈরি করা হবে, যাতে শীত, গ্রীষ্ম, বর্ষায় দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা, সপ্তাহের ৭ দিন, বছরের ৩৬৫ দিন কাজ চলে। মূল কাজ শুরুর এক বছরের মধ্যে অপারেশন শুরু হবে। আশা করি, ২০২১ সালের মধ্যে দৃশ্যমান অগ্রগতি হবে।
জুলফিকার আজিজ বলেন, আবারও নতুন উদ্যমে শুরু হয়েছে কর্ণফুলী নদীর ড্রেজিং। ফলে জেটিতে ভিড়তে পারবে অধিক ড্রাফটের জাহাজ। আনুষ্ঠানিকভাবে গত বছরের সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হয়েছে সদরঘাট থেকে বাকলিয়ার চর পর্যন্ত কর্ণফুলী ড্রেজিং প্রকল্পের কাজ। বাংলাদেশ নৌ বাহিনী ৪২ লাখ ঘনমিটার ড্রেজিং প্রকল্পের কাজ করছে। এ জন্য চট্টগ্রাম বন্দরের খরচ হচ্ছে ২৪২ কোটি টাকা। চার বছরে সম্পূর্ণ ড্রেজিং হবে। তবে পলির ধরন, পাথর, পলিথিন, ইট-কংক্রিটের কাঠামো, ডুবে থাকা ছোট ছোট নৌযানের অংশবিশেষের কারণে মাঝে মাঝে কাজে বিঘ্ন ঘটছে।
তিনি বলেন, খাদ্যশস্য, ক্লিংকার, স্ক্র্যাপ আমদানি প্রতি বছর বাড়ছে। যুক্ত হচ্ছে পাথর, স্টিল শিট, স্টিল পাইপের মতো নতুন নতুন পণ্য। বেড়েছে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র, কর্ণফুলী টানেল ও পদ্মা সেতুর মতো মেগা প্রকল্পের পণ্য সামগ্রী আমদানি। তাই ভবিষ্যৎ চাহিদা সামনে রেখে পতেঙ্গার লালদিয়ায় মাল্টিপারপাস টার্মিনাল নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পতেঙ্গার ১৪ ও ১৫ নম্বর খালের মাঝামাঝি লালদিয়া চরে এটি নির্মিত হবে। যেখানে ১০ মিটার ড্রাফটের জাহাজ ভিড়তে পারবে।
বন্দরের সক্ষমতা বাড়ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ২০১৭ সালে জাহাজের সর্বোচ্চ গড় অবস্থানকাল ৭-৮ দিন পর্যন্ত ছিল। এরপর কি গ্যান্ট্রি ক্রেন সংযোজনের ফলে কন্টেইনার হ্যান্ডলিংয়ে গতি বেড়েছে। কন্টেইনার জাহাজকে কম সময় জেটিতে অবস্থান করতে হচ্ছে। বহির্নোঙরে আসার পর সরাসরি জেটিতে ভিড়ার রেকর্ডও হয়েছে। সাধারণ পণ্যের জাহাজ শূন্য থাকায় সেখানেও কন্টেইনার জাহাজ ভিড়ানো হচ্ছে। ফলে ১২-১৪টি কন্টেইনার জাহাজ একসঙ্গে হ্যান্ডলিং সম্ভব হচ্ছে। ২০১৭ সালে বন্দরে জাহাজ আসে ৩ হাজার ৩৭০টি, ২০১৮ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৭৪৭টি। জাহাজের অপেক্ষমাণ সময় কমার সঙ্গে সঙ্গে ইয়ার্ডে কন্টেইনার ডুয়েল টাইম কমে এসেছে। আমদানিকারকদের এখন সপ্তাহজুড়ে পণ্য হাতে পাওয়ার জন্য অপেক্ষায় থাকতে হচ্ছে না। চলতি বছর আরো ৪টি গ্যান্ট্রি ক্রেন যুক্ত হবে চট্টগ্রাম বন্দরে। বর্তমানে ৩ হ্যাজ যুক্ত জাহাজ এনসিটিতে ভিড়লে বাড়তি সুবিধা পাচ্ছে। সব মিলে কন্টেইনার পরিবহনে গতিশীলতা বেড়েছে ৩০ শতাংশ। বন্দরের রাজস্ব বৃদ্ধির পাশাপাশি ব্যবহারকারীদের অর্থ ও সময় সাশ্রয় হচ্ছে।
তিনি জানান, ২০১৭ সালে ২০ ফুট দীর্ঘ ২৬ লাখ ৬৭ হাজার কন্টেইনার হ্যান্ডলিং করলেও ২০১৮ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২৯ লাখ ৩ হাজার। প্রবৃদ্ধি ৯ শতাংশ।
বন্দর চেয়ারম্যান বলেন, বে-টার্মিনাল হলে বন্দরের সক্ষমতা বাড়বে তিন গুণ। প্রকল্প এলাকার ৬৭ একর জমি বন্দরকে বুঝিয়ে দিয়েছে জেলা প্রশাসন। এর বিপরীতে ৩৬৪ কোটি টাকা জেলা প্রশাসনকে দিয়েছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। সমপ্রতি কেন্দ্রীয় ভূমি বরাদ্দ কমিটিতে ৮০৩ একর খাস জমি বরাদ্দের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে বন্দর জেটিতে জোয়ারের সময় সর্বোচ্চ ৯ দশমিক ৫ মিটার ড্রাফটের (জাহাজের পানির নিচের অংশ) ১৯০ মিটার লম্বা জাহাজ ভিড়তে পারে। বে-টার্মিনালে এর চেয়ে বেশি ড্রাফটের বড় বড় জাহাজ জোয়ারের অপেক্ষা ছাড়াই ২৪ ঘণ্টা ভিড়তে পারবে।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন বন্দরের সদস্য (প্রশাসন ও পরিকল্পনা) মো. জাফর আলম, সদস্য (প্রকৌশল) কমডোর খন্দকার আকতার হোসেন, সচিব মো. ওমর ফারুক প্রমুখ।
বন্দর দিবস আজ
আজ বন্দর দিবস। চট্টগ্রাম বন্দর আজ পা রাখছে ১৩৩তম বর্ষে। আজ সকাল ৮টায় জাতীয় পতাকা ও বন্দর পতাকা উত্তোলনের মাধ্যমে বন্দর চেয়ারম্যান দিবসের সূচনা করবেন।
১৩২ বছর আগে কর্ণফুলী নদীর মোহনায় এদিনে প্রতিষ্ঠিত হয় দেশের এই প্রধান সমুদ্র বন্দর। ইংরেজ শাসনের প্রথম দিকে ইংরেজ ও দেশীয় ব্যবসায়ীরা বার্ষিক এক টাকা সেলামির বিনিময়ে নিজ ব্যয়ে কর্ণফুলী নদীতে কাঠের জেটি নির্মাণ করেন। পরে ১৮৬০ খ্রিস্টাব্দে প্রথম দুটি অস্থায়ী জেটি নির্মিত হয়।
১৮৭৭ খ্রিস্টাব্দে চট্টগ্রাম পোর্ট কমিশনার গঠিত হয়। ১৮৮৮ সালে চট্টগ্রাম বন্দরে দুটি মুরিং জেটি নির্মিত হয়। ১৮৮৮ সালের ২৫ এপ্রিল চট্টগ্রাম পোর্ট কমিশনার কার্যকর হয়। এরপর ১৮৯৯-১৯১০ সালের মধ্যে চট্টগ্রাম পোর্ট কমিশনার ও আসাম বেঙ্গল রেলওয়ে যুক্তভাবে চারটি স্থায়ী জেটি নির্মাণ করে। ১৯১০ সালে বন্দরের সঙ্গে রেলওয়ে সংযোগ হয়। ১৯২৬ সালে চট্টগ্রাম বন্দরকে মেজর পোর্ট ঘোষণা করা হয়।