বনাঞ্চল, বন্যপ্রাণী অভয়াশ্রম ও পাহাড় কেটে সড়ক!

সীতাকুণ্ডে বারৈয়াঢালা থেকে ফটিকছড়ির হাজারীখীল পর্যন্ত ২১ কিমি সড়কের প্রকল্প সওজের, বন বিভাগের বাধা

এম এস আকাশ, ফটিকছড়ি

শুক্রবার , ২৩ নভেম্বর, ২০১৮ at ৭:১৪ পূর্বাহ্ণ
139

সংরক্ষিত বনাঞ্চল, বন্যপ্রাণী অভয়াশ্রম ও পাহাড় কেটে সড়ক নির্মাণ করছে সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগ। ফটিকছড়ি-সীতাকুণ্ড সংরক্ষিত বনাঞ্চলের ২১ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণের জন্য দরপত্র আহ্বানও করেছে তারা। কিন্তু নেওয়া হয়নি পরিবেশ ও বন বিভাগের ছাড়পত্র।
বন ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ সড়ক নির্মাণ হলে বনাঞ্চল, পরিবেশ ধ্বংস হবে, বিপন্ন হবে জীববৈচিত্র্য। উল্লেখ্য, বন ও পরিবেশ আইনে সংরক্ষিত বনাঞ্চলে রাস্তা বা প্রকল্প তৈরির আগে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের অনুমতিপত্র ও পরিবেশ ছাড়পত্র নেওয়া বাধ্যতামূলক।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সড়ক ও জনপদ বিভাগ (সওজ) সম্প্রতি সীতাকুণ্ডের বারৈয়াঢালা হয়ে ফটিকছড়ির হাজারীখীল পর্যন্ত ২১ কিলোমিটার দীর্ঘ বাইপাস সড়ক তৈরির জন্য প্রকল্প তৈরি, দরপত্র আহ্বান ও ঠিকাদার নিয়োগের কাজ চূড়ান্ত করেছে। বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে ৫৬ কোটি টাকা। ২০১৯ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে এর কাজ শেষ হওয়ার কথা।
সীতাকুণ্ডের বারৈয়াঢালা থেকে ফটিকছড়ির হারুয়ালছড়ি ইউনিয়নের লম্বাবিল এই সড়কের মৌলিক অংশ হচ্ছে ফটিকছড়ি-সীতাকুণ্ড সংরক্ষিত বনভূমি। অথচ এই সড়ক নির্মাণ প্রকল্প শুরুর আগে কোনো সমীক্ষা করা হয়নি। নেওয়া হয়নি সংশ্লিষ্ট কোনো দপ্তরের অনাপত্তিপত্র।
এদিকে গত ১৪ আগস্ট বারৈয়াঢালা রেঞ্জের দক্ষিণাঞ্চলীয় সংরক্ষিত বনভূমি পেরিয়ে রামগড়-সীতাকুণ্ড বনাঞ্চলের মধ্য দিয়ে এ সড়ক নির্মাণের জন্য জঙ্গল পরিষ্কারের চেষ্টা চালায় সওজ। এ সময় বারৈয়াঢালার রেঞ্জ কর্মকর্তা ও বিট কর্মকর্তাসহ হাজারীখিল বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য এলাকার সিএমসি ও সিপিজি সদস্যরা কাজে বাধা দেন। এ ঘটনার পর চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগের বিভাগীয় কর্মকর্তা সওজকে একটি চিঠি দিয়ে আপত্তির কথা জানান।
চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগের হাজারীখিল রেঞ্জের হাজারীখিল ও ফটিকছড়ি বিট এলাকায় বন বিভাগ ও ক্রেলের সহযোগিতায় ২০১০ সালে ২ হাজার ৯ শত ৮ হেক্টর পাহাড়ি অঞ্চলে সরকারিভাবে গড়ে উঠেছে বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য। এখানে ২শ ৫০ প্রজাতির গাছ ও ১শ ৫০ প্রজাতির পাখি রয়েছে বলে বন ও বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন। বাংলাদেশের বিরল প্রজাতির বৈলাম গাছ রয়েছে এই বনে। এর উচ্চতা প্রায় ১০০ মিটার, যা বাংলাদেশে সবচেয়ে উঁচু বৃক্ষ হিসেবে পরিচিত। এই গাছ বাংলাদেশের অন্য কোথাও দেখা যায় না। বন্য প্রাণীর মধ্যে রয়েছে ‘বন ছাগল’ নামে বিরল প্রজাতির আরেক প্রাণী। এই অঞ্চলে অভয়ারণ্য ঘোষণার পর ক্রমান্বয়ে বন্যপ্রাণীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে বলে জানিয়েছেন হাজারীখিল বন কর্মকর্তা মো. কাউছার হোসেন।
এছাড়া হাজারীখীল বনে বনকুকুর, বনমোরগ, তক্ষক, গিরগিটি, মুখপোড়া হনুমান, বানর, গুইসাপ, বড় অজগর, হরিণ, মেছোবাঘ, বন্যশূকর রয়েছে। উল্লেখযোগ্য বৃক্ষ হলো সেগুন, গর্জন, গামারি, চাপালিশ, তেলসুর, জারুল, লোহাকাঠ, ছাতীয়ান, গুটগুট্টা ও লটকন। পাখির মধ্যে রয়েছে মথুরা, শালিক, ঘুঘু, চড়ুই, টিয়া, বক, দোয়েল, ময়না।
প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবস্থাপনা ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার বন, পরিবেশ ও মৎস্য অধিদপ্তরের উদ্যোগে ইউএসএইডের আর্থিক সহযোগিতায় ২০১৪ সালের ২৭ নভেম্বের হাজারীখীল বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যে সহ-ব্যবস্থাপনা কমিটি (সিএমসি) গঠন করা হয়। দুটি বনবিটে ২১ সদস্যের মোট ৪২ জন সিপিজি সদস্য সর্বদা বন রক্ষায় কাজ করছেন বলে জানিয়েছে সিএমসি সভাপতি মো. জসিম উদ্দিন।
ন্যাচারাল ইকো-টুরিজম প্রোগ্রাম কো-অর্ডিনেটর অপু নজরুল বলেন, সীতাকুণ্ড-ফটিকছড়ির বন-জঙ্গল-ঝর্না আমার দীর্ঘ দিনের চেনা অঞ্চল। এসব পাহাড়ি অঞ্চলের মানুষ এক সময় জঙ্গল থেকে গাছ কাটত। লাকড়ি করে বিক্রি করত। ২০১০ সালে হাজারীখীল বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য ঘোষণার সহ-ব্যবস্থাপনা সমিতির মাধ্যমে তারা বিকল্প জীবিকায়নে ফিরে গেছে। এরপর থেকে এখানে প্রচুর সাপ-ব্যঙ্গ-বিচ্ছু, বন ছাগল, বন মোরগ, হরিণ, মেছোবাঘের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। এই বনে সড়ক নির্মাণ হলে পরিবেশের ক্ষতি হবে। পরিবেশের স্বার্থে এই সড়ক নির্মাণ বন্ধ রাখা জরুরি।
বাংলাদেশ ফেড়ারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন (বিএফইউজে) কেন্দ্রীয় যুগ্ম সম্পাদক সাংবাদিক মহসীন কাজী হারুয়ালছড়ি গ্রামের বাসিন্দা। তিনি বলেন, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের বাইপাস সড়ক হিসেবে হাটহাজারীর বড়দিঘির পাড় থেকে সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারী এবং ফটিকছড়ির নারায়ণহাট হতে শ্বেতছড়া হয়ে মীরসরাই সদর পর্যন্ত দুটি সড়ক তৈরি করা হয়েছে। এই সড়কগুলো কতটুকু কাজে আসছে তা আগে পর্যবেক্ষণ করা দরকার। শ্বেতছড়া-মীরসরাই সড়কে অহরহ সরকারি বনাঞ্চলের কাঠ চুরি, পাচার ও চোরাই কাঠ আটকের খবর পত্রিকায় আসছে। এখানে যদি সড়ক নির্মাণ হয়, নষ্ট হবে সীতাকুণ্ড-ফটিকছড়ির সংরক্ষিত বনাঞ্চল এবং ২০১০ সাল বন অধিদপ্তরের গড়ে তোলা বন্যপ্রাণী অভয়াশ্রমের। সড়ক ও জনপদ বিভাগের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী রবিউল হোসেন বারৈয়ারঢালা এলাকায় সড়ক নির্মাণের প্রাথমিক কাজ করতে গিয়ে বন বিভাগের বাধা পাওয়ার কথা স্বীকার করে বলেন, বন বিভাগের লোকজনের সাথে তো আমরা মারামারি করে সড়ক নির্মাণ করব না। তাই এ ব্যাপারে মন্ত্রণালয় থেকে অনুমতির বিষয় জানিয়ে সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে চিঠি লিখেছি।
এ ব্যাপারে চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগের বিভাগীয় কর্মকর্তা বখতেয়ার নূর সিদ্দিকী জানান, সংরক্ষিত বনের ভেতর রাস্তা নির্মাণে পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের বিধিনিষেধ রয়েছে। বাংলাদেশে কয়েকটি সংরক্ষিত বনাঞ্চলের মধ্যে সীতাকুণ্ড-ফটিকছড়ির সংরক্ষিত বনাঞ্চল তথা হাজারীখীল বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য একটি। সড়ক ও জনপদ বিভাগ এই বনাঞ্চলের ভিতর দিয়ে সড়ক নির্মাণের জন্য কাজ শুরু করেছে। বন বিভাগ থেকে কোনো অনাপত্তিপত্র নেয়নি। এজন্য আমরা বাধা দিয়েছি। এ বিষয়ে আপত্তি জানিয়ে বন অধিদপ্তর এবং সড়ক ও জনপদ বিভাগে একাধিক পত্র প্রেরণ করা হয়েছে।

x