বটবৃক্ষের ছায়া

আরিফ রায়হান

বুধবার , ১৯ জুন, ২০১৯ at ১০:৫৯ পূর্বাহ্ণ
65

বাবা। ছোট্ট একটি শব্দ। এই শব্দে লুকিয়ে আছে বিশালতা। বাবার ছায়াতলে আমরা সবচেয়ে বেশি নিরাপদ ও প্রশান্তি লাভ করি। বাবার সাথে আমরা কতো কিছুর তুলনা করার চেষ্টা করি। কেউ বলেন, বাবা পরম নির্ভরতার প্রতীক, কেউ বলেন, বাবা মানে বটবৃক্ষ, কেউ বলেন, বাবা মানে শক্তি-সাহস। আসলে উপমাগুলোর প্রতিটিই সঠিক এবং নিঁখুত। কেননা আমরা জন্মের পর মায়ের পাশাপাশি কথা বলতে শিখি বাবার কাছ থেকে। হাঁটতে শিখি আমরা বাবার হাত ধরে। এছাড়া আমরা শক্তি-সাহস ও প্রেরণা পাই বাবার কাছ থেকে। আরো একটু এগিয়ে বলা যায়, ভরসার অপর নাম বাবা। সন্তানের কাছে বাবাই তো পরম নির্ভরতার প্রতীক। বটবৃক্ষের ছায়ার মতো বাবা আদর-স্নেহ এবং শাসনে আগলে রাখেন সন্তানকে। বাবার স্নেহ-শাসনে বেড়ে উঠা সন্তান কখনো দিক হারায় না। সন্তানের চলার পথকে মসৃন করতে একজন বাবা তার সবটুকুই উজার করে দেন। তাইতো কোন কোন সময় বাবা নিজের ভেতর মাতৃরূপকেও ধারণ করেন। হাজারো কষ্ট সয়ে তিলে তিলে যে সন্তানকে বড় করেন।
কখন বাবা দিবস ?
বিশ্বে নানা দেশে ভিন্ন ভিন্ন তারিখে বাবা দিবস পালিত হয়। তবে অধিকাংশ দেশে প্রতি বছর জুন মাসের তৃতীয় রোববার বাবা দিবস পালিত হয়। এটিই আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বাবা দিবস। গত ১৬ জুন আমরা মহাসমারোহে পালন করেছি দিবসটি। বিশেষ করে স্যোসাল মিডিয়ায় বাবা দিবস বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করে। অনেকেই বাবার আবার অনেকেই নিজের সাথে বাবার ছবি আপলোড করে বাবার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছেন।
কিভাবে এলো বাবা দিবস ?
গ্রেস গোল্ডেন ক্লেটন নামে এই মহিলা বাবা দিবসের প্রচলন শুরু করেন। তিনিই প্রথম দিনটি পালনের জন্য আবেদন জানান। তাঁর মাথায় ধারণাটি আসে ১৯০৭ সালে। সে বছরের ডিসেম্বর মাসে ভার্জিনিয়ার মোনোংয়াতে ভয়াবহ খনি বিস্ফোরণে প্রাণ হারান সাড়ে তিনশোর বেশি পুরুষ। তাদের মধ্যে সিংহভাগ ছিলেন সন্তানের বাবা। এই বিস্ফোরণে প্রায় এক হাজার শিশু তাদের বাবাকে হারায়। এসব শিশুর মনোবেদনা পশ্চিম ভার্জিনিয়ার ফেয়ারমন্টবাসী ক্লেটনকেও দারুণভাবে পীড়া দেয়। ক্লেটন স্থানীয় মেথোডিস্ট গির্জার যাজককে খনি বিস্ফোরণে শহীদ বাবাদের সম্মানে ১৯০৮ সালের ৫ জুলাই (রোববার) বাবা দিবস হিসেবে উৎসর্গ করার অনুরোধ জানান। ৫ জুলাইকে বাবা দিবস করার দাবি জানানোর কারণ, সেদিন ছিলো ক্লেটনের বাবার জন্মদিন। তবে তার বাবা বেঁচে ছিলেন না।
এদিকে ১৯৮৫ সালে রাষ্ট্রপক্ষ একটি ঐতিহাসিক ফলক স্থাপনের মাধ্যমে ফেয়ারমন্টকে বাবা দিবসের জন্মস্থান হিসেবে ঘোষণা করে। ওই সময় থেকে প্রতি বাবা দিবসে গির্জায় দিনটির মাহাত্ম বর্ণনা করা হতো। তাছাড়া বাবা দিবসকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দেয়ার ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছেন আরও এক নারী। ১৯০৯ সালের আগে ওয়াশিংটনে বাবা দিবস পালিত হতো না। তখন স্থানীয় গির্জায় সোনোরা স্মার্ট নামে ওয়াশিংটনবাসী এক নারী মা দিবস পালনের কথা শোনেন। মা দিবস পালনের রীতি রয়েছে। কিন্তু বাবা দিবস পালনের রীতি নেই জেনে তিনি অবাক হন। তাই বাবা দিবস পালনের আবেদন জানিয়ে তিনি স্থানীয় ধর্মীয় নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করেন। সোনোরা স্মার্টও নিজের বাবার জন্মদিনের দিন (৫ জুন) বাবা দিবস পালন করার আবেদন জানান। তবে হাতে সময় কম ছিলো বলে ওই বছরের ১৯ জুন এ অঙ্গরাজ্যে প্রথম বাবা দিবস পালন করা হয়। ১৯১৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সংসদে বাবা দিবসকে ছুটির দিনের তালিকায় তুলতে একটি বিল উপস্থাপন করা হয়। ১৯১৬ সালে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসন বিলটি অনুমোদন করেন। সাত বছর পর, ১৯২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ৩০তম প্রেসিডেন্ট কেলভিন ক্যুলিজ বাবা দিবসকে জাতীয় দিবসের মর্যাদা দেন। ১৯৬৬ সালে প্রেসিডেন্ট লিন্ডন বি জনসন রাষ্ট্রীয়ভাবে জুনের তৃতীয় রোববার বাবা দিবস বলে ঘোষণা করেন। সেই সময় থেকেই বিশ্বের সব বাবাদের সম্মানে প্রতি বছর পালিত হচ্ছে বাবা দিবস। ১৯৭২ সালে তখনকার আমেরিকান প্রেসিডেন্ট নিজে একটি আইনে স্বাক্ষর করে বাবা দিবসকে জাতীয় মর্যাদা দেন। সেই থেকে আজ পর্যন্ত বিশ্বের সব বাবাদের সম্মানে পালিত হয়ে আসছে বাবা দিবস। আবার কিছু দেশ ভিন্ন মাসের কয়েকটি ভিন্ন তারিখে বাবা দিবস পালন করে। কিন্তু পৃথিবীর একটি বড় অংশ যেমন- বাংলাদেশ, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, চিলি, কলাম্বিয়া, কোস্টারিকা, কিউবা, সাইপ্রাস, চেক প্রজাতন্ত্র, ফ্রান্স, গ্রিস, হংকং, ভারত, আয়ারল্যান্ড, জ্যামাইকা, জাপান, মালয়েশিয়া, মেঙিকো, নেদারল্যান্ড, পাকিস্তান, ফিলিপাইন, সিঙ্গাপুর, দক্ষিণ আফ্রিকা, শ্রীলংকা, সুইজারল্যান্ড, ভেনিজুয়েলা ও জিম্বাবুয়েসহ আরও কিছু দেশে জুনের তৃতীয় রোববার বাবা দিবস পালন করা হয়।
আমরা অত্যন্ত উদ্বেগের সাথে লক্ষ্য করি কিছু কিছু সন্তান আছেন যাঁরা বাবাকে শেষ বয়সে বৃদ্ধাশ্রমে রেখে আসেন। বাবাকে বোঝা মনে করেন। কিন্তু আমাদের মনে রাখা উচিত অসহায় এই বাবার মতো আমরাও একদিন বৃদ্ধ হবো। তাহলে আমাদেরও ঠিকানা হবে সেই বৃদ্ধাশ্রমে। বাবা দিবসে পৃথিবীর সব বাবার প্রতি জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা।

x