বছরের শেষ উপহার এস এ গেমসে ১৯ সোনার পদক

স্পোর্টস ডেস্ক

বুধবার , ১১ ডিসেম্বর, ২০১৯ at ৯:২১ পূর্বাহ্ণ

 

 

আরো একটি বছর শেষ হতে চলল। এই বছরে ক্রীড়াঙ্গন থেকে খুব বেশি সুখের খবর আসেনি। ফুটবলে ভারতের বিপক্ষে ড্র করলেও সুখের কোন খবর নেই। ক্রিকেটেতো কেবলই ব্যর্থতা আর ব্যর্থতা। তবে বছরের শেষ দিকে এসে এস এ গেমস দিল সবচাইতে বড় আনন্দের উপলক্ষ্যটা। দক্ষিণ এশিয়ান গেমসের (এসএ) ১৩তম আসর বসেছিল নেপালে। হিমালয় কন্যাদের দেশে নতুন করে ইতিহাস গড়েছে লালসবুজের প্রতিনিধিরা। ১৩ তম এই আসরটি বাংলাদেশের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। কারণ এসএ গেমসে এবার যে রেকর্ড গড়ে দেশের পতাকা উঁচিয়ে ধরেছে আন্তর্জাতিক মঞ্চে। সদ্য শেষ হওয়া এই আসর থেকে বাংলাদেশ ফিরছে রেকর্ড ১৯ টি স্বর্ণপদক নিয়ে। দেশের বাইরে সর্বোচ্চ তো বটেই সব মিলিয়ে বাংলাদেশের ইতিহাসের সর্বোচ্চ স্বর্ণপদক জয়ের আসর নেপালে অনুষ্ঠিত ১৩তম এসএ গেমসের এবারের আসরটি। এর আগে ২০১০ সালে এসএ গেমসের ১১তম আসর বসেছিল বাংলাদেশে। আর সেবারই নিজেদের ইতিহাসের সর্বোচ্চ সংখ্যক স্বর্ণপদক জয় করে বাংলাদেশ। ১১তম আসরে সব মিলিয়ে মোট ১৮টি স্বর্ণপদক নিজেদের অর্জনের খাতায় যোগ হয়। আর সদ্য সমাপ্ত এসএ গেমসে সেই রেকর্ড ছাড়িয়ে ১৯টি স্বর্ণপদক নিজেদের নামের পাশে যোগ করেছে লালসবুজের প্রতিনিধিরা। নেপালের অনুষ্ঠিত এসএ গেমসের এবারের আসরের সর্বোচ্চ ১০টি স্বর্ণপদক এসেছে আর্চারি থেকে। আর্চারির ১০টি ইভেন্টের স্বর্ণপদকই বাগিয়ে নিয়েছে বাংলাদেশ। এমন সাফল্য আর বাংলাদেশ দেখেনি কখনোই।

তবে ১৩তম আসরে বাংলাদেশের প্রথম স্বর্ণপদক আসে তায়কোয়ান্দোর হাত ধরে। গেমসের দ্বিতীয় দিনে দিপু চাকমা লালসবুজের পতাকাকে এনে দেয় প্রথম স্বর্ণ। এরপর তৃতীয় দিন আলআমিন, অন্তরা ও মারজানের হাত ধরে আসে আরও তিনটি স্বর্ণ। তৃতীয় দিনে বাংলাদেশের ঝুলিতে মোট স্বর্ণপদকের সংখ্যা দাঁড়ায় চারটিতে। তৃতীয় দিনে কারাতে থেকে বাংলাদেশকে দ্বিতীয় স্বর্ণের স্বাদ এনে দেন সেনাবাহিনীর আলআমিন। কারাতের কুমি ইভেন্টের অনূর্ধ্ব৬০ কেজি শ্রেণিতে পান তিনি। আর সেদিনই কারাতে থেকে আরও এক স্বর্ণ এনে দেন মারজান আক্তার পিয়া। দেশের তৃতীয় স্বর্ণ আসে এই নারী অ্যাথলেটের হাত ধরে। ৫৫ কেজি কুমিতে পাকিস্তানের প্রতিযোগীকে ৪৩ পয়েন্টের ব্যবধানে হারান তিনি। তৃতীয় দিনে হোমায়রা আক্তার অন্তরার হাত ধরে আসে দিনের তৃতীয় এবং সব মিলিয়ে চতুর্থ স্বর্ণ। এর আগে হোমায়রাই এবারের আসরে প্রথম পদক এনে দিয়েছিলেন বাংলাদেশকে। কারাতে নারী এককে কুমি অনূর্ধ্ব৬১ কেজি শ্রেণিতে বাংলাদেশের হয়ে ৪র্থ স্বর্ণপদক জয় করতে ফাইনালে স্বাগতিক নেপালের আনু গুরংকে ৫২ পয়েন্টে হারান তিনি। গেমসের ৭ম দিনে যুক্ত হয় আরও তিনটি স্বর্ণপদক।

ভারোত্তোলনে সেদিন প্রথম স্বর্ণপদক এনে দেন বাংলাদেশ আনসারের মাবিয়া আক্তার। দেশের পঞ্চম স্বর্ণপদক জয়ের পথে শ্রীলংকার প্রতিযোগী প্রিয়ান্তিকে হারিয়ে সেরা বনে যান মাবিয়া। সপ্তম দিন দ্বিতীয় স্বর্ণটি ভারোত্তোলন থেকে এনে দেন জিয়ারুল ইসলাম। পুরুষ ১০২ কেজি শ্রেণিতে বাংলাদেশকে ৬ষ্ঠ স্বর্ণ এনে দেন তিনি। এরপর সেদিনের শেষ স্বর্ণপদকটি জয় করেন ফাতেমা মুজিব। ফেন্সিংয়ের সেভার ইভেন্ট থেকে এই আর্চার বাংলাদেশকে এনে দিয়েছিলেন ৭ম স্বর্ণপদক। তবে নেপালে বাংলাদেশ ইতিহাস গড়ে গেমসের অষ্টম দিনে। অকল্পনীয় সাফল্য এনে দেন বাংলাদেশি তীরন্দাজরা। আর্চারদের এমন সাফল্যের কারণেই বাংলাদেশের স্বর্ণপদকের সংখ্যা চলে যায় কুড়ির কাছাকাছি । গেমসের অষ্টম দিনে আর্চারির ছয়টি ইভেন্টের সবকটিতেই স্বর্ণ জিতে নেন তীরন্দাজরা। একে একে স্বর্ণ আসে আর্চারির কম্পাউন্ড ইভেন্টের ছয়টি ইভেন্টে থেকেই। আর আর্চারদের এমন সাফল্যে নেতৃতে দেন রুমান সানা, মো. সোহেল রানা, অসীম কুমার দাস, মোহাম্মদ আশিকুজ্জামান, ইতি খাতুন, মেহনাজ আক্তার মনিরা এবং বিউটি রায়।

আর্চারি ডিসিপ্লিনের তৃতীয় দিনে রিকার্ভ পুরুষ দলগত ইভেন্টে বাংলাদেশকে ইভেন্টের প্রথম স্বর্ণ এনে দেন রুমান সানা, তামিমুল ইসলাম এবং মোহাম্মদ হাকিম আহমেদ রুবেল। শ্রীলংকাকে ৫৩ সেটে হারিয়ে স্বর্ণ বাগিয়ে নেন এই আর্চাররা। এরপর রিকার্ভ নারী দলগত ইভেন্টে আবারও সেই শ্রীলংকার প্রতিযোগীদের হারিয়েই স্বর্ণ ছিনিয়ে আনেন বাংলাদেশের মোসাম্মৎ ইতি খাতুন, মেহনাজ আক্তার মনিরা এবং বিউটি রায়। আর্চারি থেকে বাংলাদেশকে ৫ম স্বর্ণ এনে দেন সুস্মিতা বনিক, সুমা বিশ্বাস এবং শ্যামলি রায়। কম্পাউন্ড মহিলা দলগত ইভেন্টে শ্রীলংকাকে ২২৬২১৫ পয়েন্টে হারিয়ে বাংলাদেশের হয়ে ১০ম স্বর্ণ ছিনিয়ে আনেন এই নারী আর্চারেরা। দিনের শেষ স্বর্ণ আসে কম্পাউন্ড মিশ্র দলগত ইভেন্টে। বাংলাদেশের আর্চার মো. সোহেল রানা এবং সুস্মিতা বনিক ৮ পয়েন্ট ব্যবধানে শ্রীলংকার আর্চারদের হারিয়ে ইভেন্টের ৬ষ্ঠ স্বর্ণ নিজেদের ঝুলিতে ভরেন।

আর্চারির সাফল্যের দিনে বাংলাদেশ নারী ক্রিকেট দলও শ্রীলংকা বধ করে এনে দেন ১১তম স্বর্ণপদক। জাহানারাসালমারা শ্বাসরুদ্ধকর ম্যাচ থেকে শেষ পর্যন্ত স্বর্ণ ছিনিয়ে আনতে সফল হয়। এসএ গেমসের নবম দিন ছিল বাংলাদেশের ইতিহাস গড়ার দিন। আগের দিন আর্চারিতে ৬টি স্বর্ণ বাগিয়ে নেয়ার পর বাংলাদেশ আর্চারি থেকে ছিনিয়ে নেয় আরও চারটি স্বর্ণ। এতে করেই আর্চারির ১০ ইভেন্টের ১০টি থেকেই স্বর্ণজয় করে বাংলাদেশের আর্চাররা। আর এর মাধ্যমেই বাংলাদেশ দেখতে থাকে ২০১০ সালের ১৮ স্বর্ণজয়ের রেকর্ড ভাঙার স্বপ্ন। ছেলেদের ক্রিকেটের ফাইনাল জয় করতে পারলেই ইতিহাস নতুন করে গড়বে বাংলাদেশ। তেমন লক্ষ্য নিয়ে খেলতে নামা সৌম্যআফিফরা হতাশ করেনি বাংলাদেশকে। রেকর্ড ভাঙার কাজটা বেশ সহজেই করেছেন সৌম্যশান্তসাইফরা। শ্রীলংকাকে ৭ উইকেটে হারিয়ে বাংলাদেশের ১৯ তম স্বর্ণপদক নিশ্চিত করেন লাল সবুজ জার্সিধারিরা। শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ থামে নিজেদের ইতিহাসের রেকর্ড ১৯টি স্বর্ণপদক জয় করেই। আর সব মিলিয়ে ১৩তম এসএ গেমসে বাংলাদেশের মোট পদক সংখ্যা দাঁড়ায় ১৩৭ টি। যেখানে ১৯টি স্বর্ণের পাশাপাশি আছে ৩২ টি রৌপ্য এবং ৮৬ টি ব্রোঞ্জ ।

x