বক্তৃতায় গানে নাটকে একটি স্মরণীয় স্মরণসন্ধ্যা

আনন্দন প্রতিবেদন

বৃহস্পতিবার , ১৬ জানুয়ারি, ২০২০ at ৫:৩৯ পূর্বাহ্ণ
12

“১৯৮০ সালে শিল্পকলা একাডেমির এই মঞ্চ ছেড়ে কাঁদতে কাঁদতে চলে গিয়েছিলাম। সাথে ছিলো আমার দুই শিশুকন্যা। অভিনয় ছাড়তে হবে, মঞ্চ ছাড়তে হবে বলে আমার উপর পরিবার ও সমাজ থেকে একটা চাপ ছিলো। সেই চাপের কাছে নতি স্বীকার করিনি বলে এখান থেকে আমার করুণ বিদায়। আজ সেই চট্টগ্রাম শিল্পকলা একাডেমির এই মঞ্চে আপনারা আমাকে এভাবে সম্মাননা জানালেন! আমার জন্য আপনারা এতো মায়া, এতো প্রেম, এতো ভালোবাস জমা করে রেখেছিলেন! আমি অভিভূত। ভাষা হারিয়ে ফেলেছি।”
কথাগুলো বিশিষ্ট অভিনেত্রী দিলারা জামানের। গত ৪ জানুয়ারি চট্টগ্রাম শিল্পকলা একাডেমি মিলনায়তনে ‘নাট্যমঞ্চ’ আয়োজিত ‘নাট্যকার চৌধুরী জহুরুল হক স্মরণসন্ধ্যা’য় নাট্যকার চৌধুরী জহুরুল হক সম্মাননা স্মারক প্রাপ্তি পরবর্তী অনুভূতি প্রকাশমূলক বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি উপরোক্ত কথাগুলো বলেন। সম্মাননাপ্রাপ্ত অপর নাট্যজন বিশিষ্ট অভিনেতা, নাট্যকার ও নির্দেশক অধ্যাপক সনজীব বড়ুয়া। ৩ জানুয়ারি ২০২০ ছিলো অধ্যাপক চৌধুরী জহুরুল হকের ১২তম মৃত্যুবার্ষিকী। সেই উপলক্ষে এই আয়োজন। গত বছর (২০১৯) ৩ জানুয়ারিতেও নাট্যমঞ্চ এই আয়োজন করেছিল। সেবার সম্মাননা প্রদান করা হয় চট্টগ্রামের প্রথম নারী নাট্য নির্দেশক তির্থক নাট্যগোষ্ঠীর খালেদা ফেরদৌস এবং নাট্যজন চট্টগ্রাম থিয়েটারের নাট্যকার নির্দেশক অভিনেতা দীপক চৌধুরীকে।
গত বারের মতো এবারের আয়োজনও তিন পর্বে সাজানো ছিলো। প্রথম পর্বে ছিলো নাট্যকার চৌধুরী জহুরুল হক স্মারকবক্তৃতা। এবার স্মারকবক্তৃতা প্রদান করেন বিশিষ্ট নাট্য গবেষক. ড. ইউসুফ ইকবাল। তাঁর বিষয় ছিলো, ‘মমতাজউদ্দিন আহমদের নাটক ; মুক্তিযুদ্ধের আবেগ উত্তাপ ও বেদনার বিশ্বস্ত নাট্যভাষ্য।’ স্মারকবক্তৃতার পর নাট্যমঞ্চ পঞ্চম সংখ্যার মোড়ক উন্মোচন করা হয়। নাট্যমঞ্চের এবারের সংখ্যায় প্রবন্ধ ও নাটক লিখেছেন রবিউল আলম, প্রদীপ দেওয়ানজী, ড. ইলু ইলিয়াস, ড. ইউসুফ ইকবাল, দীপক চৌধুরী, আসলাম হোসেন, সুমন টিংকু, মাজহারুল আলম তিতুমির, শাহরিয়ার হান্নান ও জাহেদুল আলম।
মোড়ক উন্মোচনের পরপরই নাট্যকার চৌধুরী জহুরুল হক সম্মাননা-স্মারক প্রদান করা হয়। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি দৈনিক আজাদী সম্পাদক এম. এ মালেক বলেন, ‘চৌধুরী মানে যিনি চৌদিক ধারণ করেন। চৌধুরী জহুরুল হক যথার্থ অর্থে চৌধুরী ছিলেন। সাহিত্যের সবদিকেই তাঁর বিচরণ ছিলো। অর্থ-বিত্তে নয়, তিনি জমিদারি করতেন নিজের সৃষ্টিকর্মে, গল্পে, গানে, নাটকে ও গবেষণায়।’
বক্তব্য প্রদান করেন কবি ফাইজুল করি, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব কাবেরী সেনগুপ্তা, প্রবীন নাট্যকার ও নির্দেশক রবিউল আলম, নাট্যজন মুনির হেলাল ও সনজীব বড়ুয়া। নাট্যমঞ্চ সম্পাদক জাহেদুল আলমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠান সঞ্চালনায় ছিলেন বিশিষ্ট গবেষক ড. ইলু ইলিয়াস। বক্তারা বলেন, ‘চৌধুরী জহুরুল হক ছিলেন সব্যসাচী লেখক। যখন যেখানে হাত দিয়েছেন, সোনা ফলিয়েছেন। তবে স্থায়ী হননি কোথাও। বহুমাত্রিক পরিচয় তাঁর। তিনি কবি, সাহিত্যিক, রম্য রচয়িতা, নাট্যকার, ছোট গল্পকার, গবেষক, সাহিত্য পত্রিকা সম্পাদক ইত্যাদি। সবকিছু মিলে তিনি মানবতাবাদের এক অবিস্মরণীয় ধারক। তিনি একজন অসাধারণ সাধারণ মানুষ ছিলেন।”
বাংলাদেশের নাট্যচর্চায় এক অনন্যসাধারণ নাম অধ্যাপক সনজীব বড়ুয়া। আঙ্গিক ও বাচিক অভিনয়ে আদর্শ ব্যক্তি তিনি। সনজীব বড়ুয়া প্রধানত অভিনেতা। তবে নাট্যকার ও নির্দেশক হিসেবেও তাঁর সুখ্যাতি রয়েছে। তাঁর দল অঙ্গন থিয়েটার ইউনিট। একসময় গণায়ন নাট্য সম্প্রদায়ে চর্চা করতেন তিনি। গণায়নের প্রথম নাটকের প্রথম প্রদর্শনির অভিনেতা ছিলেন তিনি। তিনি একজন সুসংগঠক ও সুবক্তা। ছড়াকার হিসেবেও তাঁর বিশিষ্টতা রয়েছে। সাহিত্যের অধ্যাপক সনজীব বড়ুয়া সম্মাননা প্রাপ্তির অনুভূতিতে বলেন, ‘আমার শিক্ষক চৌধুরী জহুরুল হকের আশ্রয় প্রশ্রয়ে আমার নাট্যচর্চায় বেড়ে উঠা। সেই শিক্ষকের স্মরণসন্ধ্যায় তারঁও নামে প্রদত্ত সম্মাননাপ্রাপ্তি একজন ছাত্রের জন্য কত বড় স্বীকৃতি তা বলা দুষ্কর।’
অভিনেত্রী দিলারা জামানের জন্ম। বর্তমান ভারতের বর্ধমান জেলার এক গ্রামীণ পল্লীতে। পিতার সরকারী চাকুরির সূত্রে জেলায় জেলায় ভ্রমণ। ষাটের দশকের শুরুতে বর্ধমান থেকে বর্তমান যশোরে চলে আসেন। তারপর ঢাকায় সংগীত ও নৃত্যের প্রশিক্ষণে মনসংযোগ ঘটাতে না পরাতে নাট্যব্যক্তিত্ব অধ্যাপক মুনির চৌধুরীর অনুপ্রেরণায় নাট্যচর্চা শুরু করেন। অভিনীত প্রথম মঞ্চ নাটক মুনির চৌধুরীর ‘পাঠশালা’। সেটা ১৯৬৫ সালের কথা। সেই সময়ে, প্রেম করে বিয়ে করেন ফখরুজ্জামান চৌধুরীকে। ফখরুজ্জামান চৌধুরী অনুবাদক, সংগঠক ও সাহিত্যিক। তাঁর ছোট ভাই বাংলাদেশের চলচ্চিত্র জগতের ব্যক্তিত্ব আজাচৌ খ্যাত চিত্রালী সম্পাদক আহমেদ জামান চৌধুরী। ফখরুজ্জামান চৌধুরী চট্টগ্রামে সরকারি চাকরি করতেন। অগত্যা স্বামীর সাথে দিলারা জামানের চট্টগ্রামে আগমন। তিনি চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুলের শিক্ষক ও চট্টগ্রাম শিশু একাডেমির ইনচার্জ ছিলেন। সত্তরের দশকের মাঝামাঝিতে যুক্ত হন চট্টগ্রামের অরিন্দম নাট্য সম্প্রদায়ে। নিয়মিত অভিনেত্রী ছিলেন। অবিন্দম থেকে নির্দেশনা প্রদান করেন হাসনাত আবদুল হাই এর গল্প অবলম্বনে ‘সম্মুখে যাই থাক ট্রেন চলবে’ নাটকটি। কেন মঞ্চ ছেড়ে চট্টগ্রাম ছেড়ে চলে যেতে হয়েছে, সেটা তো এই লেখার শুরুতে বলা হয়েছে। তাই তো বক্তারা বলেছেন, নাটকের সংকটময় মুহূর্তে দিলারা জামান চট্টগ্রাম থেকে নাট্যচর্চা করে চট্টগ্রামের নাট্যচর্চাকে সমৃদ্ধ করেছেন।
দিলারা জামান আরো বলেন, ‘মঞ্চ ছেড়ে চলে গিয়েছি সত্য, অভিনয় কখনো ছাড়িনি। অনেক যুদ্ধ করতে হয়েছে আমাকে অভিনয়ে টিকে থাকতে। এখনো এই সাতাত্তর বছর বয়সে আপনাদের আশির্বাদে অভিনয় চালিয়ে যাচ্ছি নিয়মিত।’ এরপর তিনি সামরিক কায়দায় হাত কপালের কাছে নিয়ে গিয়ে বলেন, ’চট্টগ্রামকে স্যালুট জানাই। এভাবে মঞ্চের লোকদের খুঁজে খুঁজে সম্মাননা জানানোর জন্য।’
এক্ষেত্রে প্রধান অতিথি এম এ মালেকের বক্তব্য থেকে উদ্ধৃত করা যুক্তিসংগত হবে। তিনি বলেছেন, ‘উইলিয়াম শেঙপিয়ার বলেছেন পৃথিবীটাই একটা নাট্যমঞ্চ। আমরা যে যার মতো অভিনয় করে চলেছি। আর নাট্যাভিনেতারা আমাদের বাস্তব জীবনের সেই অধ্যায় মঞ্চে ফুটিয়ে তোলেন নটকের ভাষায়।’ নাট্যকার চৌধুরী জহুরুল হক সম্মাননা-স্মারক ২০২০ প্রাপ্ত নাট্যব্যক্তিত্ব দিলারা জামান ও সনজীব বড়ুয়ার প্রতি আমি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও মঞ্চ নাটককে আঁকড়ে ধরে আপনারা এতোদূর নিয়ে এসেছেন। তাই তো মঞ্চ নাটক একটা গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে আজ স্বীকৃত।”
নাট্যমঞ্চ আয়োজিত নাট্যকার চৌধুরী জহুরুল হক স্মরণসন্ধ্যা ২০২০ এর দ্বিতীয় পর্বে ছিলো চৌধুরী জহুরুল হক রচিত গান। গানগুলোতে সূরারোপ করেন কাবেরী সেনগুপ্তা ও তুলিপ সেনগুপ্ত। কাবেরী সেনগুপ্তা ও বিভাষ সেনগুপ্তের সংগীত পরিচালনায় গানগুলো পরিবেশন করেন সঙ্গীত ভবনের শিল্পীবৃন্দ।
তৃতীয় পর্বে ছিলো নাট্যকার চৌধুরী জহুরুল হক রচিত নাটক ‘চিঠি’। সুচরিত চৌধুরী টিংকু সম্পাদিত ও নির্দেশিত নাটকটি মঞ্চায়ন করে অনন্য থিয়েটার।