বইমেলায় বসন্তের হাওয়া ভালোবাসার আবেশ

বিক্রি বাড়ায় খুশি প্রকাশকরা

মোরশেদ তালুকদার

শনিবার , ১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ at ৪:৫৭ পূর্বাহ্ণ
72

প্রথম দিন থেকেই আসছিলেন উৎসুক পাঠক। স্টলে স্টলে ঘুরে খোঁজ নিয়েছেন পছন্দের বইয়ের। কিনেছেনও কেউ কেউ। তবে এতে পুরোপুরি সন্তুষ্ট হতে পারছিলেন না প্রকাশকগণ। প্রত্যাশা অনুযায়ী বিক্রি না হওয়ায় ছিল এর কারণ। অবশ্য কিছুটা হতাশ হলেও পুরোপুরি আশা ছেড়ে দেননি বিক্রেতারা। বরং ধৈর্য্য ধরে অপেক্ষায় ছিলেন। অবশেষে, চট্টগ্রামের পাঠকগণ খুশির উপলক্ষ এনে দিয়েছেন প্রকাশকদের। গতকাল ছুটির দিনে যারা বইমেলায় এসেছেন তাদের বেশিরভাগই বই কিনে বাড়ি ফিরেছেন। এতে ঠোঁটের কোণে তৃপ্তির হাসির ঝিলিক দেখা দেয় বিক্রেতাদের। যা স্পর্শ করে লেখকদেরও।

নগরীর এম এ আজিজ স্টেডিয়াম সংলগ্ন জিমনেশিয়াম মাঠে চলছে বইমেলা। গতকাল মেলার পঞ্চম দিনটি ছিল বিশেষ কারণে অর্থবহ। প্রথমত সাপ্তাহিক ছুটির দিন শুক্রবার। দ্বিতীয়ত এটি ছিল ভালোবাসার দিন তথা ‘ভ্যালেন্টাইন ডে’। তৃতীয়ত ঋতুরাজ বসন্তের প্রথমদিন বা পহেলা ফাল্গুন। সবমিলিয়ে সকাল থেকেই নগরজুড়ে ছিল উৎসবের আমেজ। একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী শুভমিতা। মেলায় এসেছেন তার ভালোবাসার মানুষ প্রিয়মের হাত ধরে। দুজনেরই পছন্দ কবিতা। ম্যাসেঞ্জারে কবিতা নিয়ে আলাপ করতে করতেই প্রেমে পড়েন পরস্পরের। তাই কবিতার কাছে ঋণী উভয়ই। ভালোবাসার দিনে মেলায় এসেছেন কবিতার বই কিনতে। উপহার দিয়েছেন পরষ্পরকে। কিনেছেন প্রথমা প্রকাশনা থেকে প্রকাশিত কবি ওমর কায়সারের ‘আমিহীন আমার ছায়াগুলো’ এবং জাভেদ হোসেনের অনুদিত ‘মির্জা গালিবের গজল’।
কথা হয় ‘প্রথমা প্রকাশন’ এর প্রতিনিধি শিহাব জিসানের সঙ্গে। বললেন, এতদিন তো হাহাকার ছিল। আজকে জমজমাট। বিকিও প্রত্যাশা পূরণ করছে। ‘বাতিঘর’ এর বিক্রয় প্রতিনিধি মো. জাহিদ বললেন, ‘বিক্রি অনেক ভাল। প্রথম চারদিন যা বিক্রি হয়নি তারচেয়ে বেশি হচ্ছে আজকে (গতকাল)। সকাল থেকে মেলা উন্মুক্ত ছিল, তবে লোকজন আসতে শুরু করেছেন বিকেল তিনটার পর।’ অবশ্য ‘আগামী প্রকাশনী’র বিক্রয় প্রতিনিধি অপূর্ব বললেন, ‘অন্যদিনের চেয়ে মেলায় লোকসমাগম বেশি। এটা ভাল দিক। তবে এর মধ্যে সত্যিকারের পাঠকের সংখ্যা কম। তাই বিকিকিনিও কম।’
সন্তুষ্টির কথা জানিয়েছেন ‘আদিগন্ত প্রকাশন’ এর আরিফ রায়হানও। তিনি বললেন, প্রথম কয়েকদিন বিক্রি নিয়ে সন্তুষ্ট হতে পারিনি। আজ বেশ ভালই হচ্ছে বিকিকিনি। সন্তুষ্ট আমরা। আশা করছি, বাকি দিনগুলোতেও বিক্রি হবে প্রত্যাশা অনুযায়ী।’ তিনি জানান, এবার আদিগন্ত প্রকাশন এর ৮০টি বই বেরিয়েছে। এরমধ্যে মুক্তিযোদ্ধা সিরু বাঙালির ‘গল্পে গল্পে স্বাধীনতা ও ‘দুনিয়া কাঁপানো মহামানব’র বিক্রি হচ্ছে বেশি। এছাড়া একই প্রকাশন এর শিবু কান্দি দাশের ‘আমার বঙ্গবন্ধু আমার স্বাধীনতা’, ইমদাদুল হক মিলনের ‘ছোটদের মুক্তিযুদ্ধ, ‘ছোটদের নানা রকম গল্প’, লিটন মহন্তের ‘বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট ১ ও বিজ্ঞান কথা’, হাসান শহীদ এর সায়েন্স ফিকশন ‘দি ‘পু’ নাম্বার টুয়েন্টি’ পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছে বলে জানান আরিফ রায়হান।
‘সিরু বাঙালি একজন যুদ্ধকালীন গেরিলা কমান্ডার। তিনি যখন কলম হাতে যুদ্ধের দিনগুলোর ভয়াবহ, লোমহর্ষক ও চরম রোমাঞ্চকর কাহিনিগুলো গল্পাকারে পরিবেশন করেন, তখন তা হয়ে উঠে পরম বিস্ময়কর, বাস্তবিক এবং হৃদয়গ্রাহী। তাঁর ‘গল্পে গল্পে স্বাধীনতা’ গল্পগ্রন্থভুক্ত ৩২টি গল্পই সত্যিকার মুক্তিযুদ্ধের গল্প। কোনো বানোয়াট বা কল্পকাহিনি সাজানো মুক্তিযুদ্ধের গল্প নয়। এসব গল্প পড়ে মুক্তিযুদ্ধপ্রেমী সব বয়সের পাঠকের ভালো লাগবে নি:সন্দেহে।’
উল্লেখ্য, বইমেলার আয়োজক চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন। অবশ্য মেয়রের উদ্যোগের ফলে চট্টগ্রামের সৃজনশীল প্রকাশক পরিষদ, সাহিত্যিক, লেখক, বুদ্ধিজীবী এবং অন্যান্য শিল্প-সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতরাই সম্মিলিতভাবে এ মেলা বাস্তবায়ন করছেন। মেলা চলবে ২৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। প্রতিদিন বিকেল ৩ টা থেকে রাত ৯ টা ও ছুটির দিন সকাল ১০ টা থেকে রাত ৯ টা পর্যন্ত সর্ব সাধারণের জন্য মেলা উন্মুক্ত থাকবে। মুজিবর্ষ উপলক্ষে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিবেদন করা হয়েছে এবারের মেলা। মেলায় ১৫৮ প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের ২০৫টি স্টল আছে।
এদিকে গতকাল বইমেলার আলোচনা মঞ্চে অতিথি ছিলেন চলচ্চিত্র নির্মাতা অরুণ চৌধুরী ও নাট্যনির্মাতা চয়নিকা চৌধুরী। এছাড়া ‘ফাগুন হল ভালোবাসার আগুন’ শিরোনামে রম্য বির্তক হয়েছে। এতে অংশ নেন কবি ও সাংবাদিক ওমর কায়সার, কবি ও সাংবাদিক কামরুল হাসান বাদল, আবৃত্তি শিল্পী মিলি চৌধুরী, সাংবাদিক ও বির্তাকিক তাজুল ইসলাম, দৃষ্টি চট্টগ্রামের সাধারণ সম্পাদক সাবের শাহ্‌, চবি অধ্যাপক ড. আদনান মান্নান। পুরস্কার বিতরণ করেন, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের প্রধান শিক্ষা কর্মকর্তা অমর একুশে বই মেলা চট্টগ্রামের সদস্য সচিব অধ্যাপক সুমন বড়ুয়া, এনায়েত বাজার মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ সাহিত্যিক তহুরীন সবুর ডালিয়া।