ফাগুন হাওয়ায় কবিতার জয়গান

মোরশেদ তালুকদার

বৃহস্পতিবার , ১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ at ৫:৩৪ পূর্বাহ্ণ

মানব হৃদয়ের সঙ্গে কবিতার নিবিড় সম্পর্ক। কবিতায় প্রকাশ পায় হৃদয়ের অভিব্যক্তি। রবি ঠাকুরের ভাষায়, ‘অন্তর হ’তে আহরি বচন’। অন্তরের গহীনে লুকায়িত প্রেম-ভালোবাসা, বিরহ, দুঃখ-বেদনা কিংবা হাহকারের অনুভূতিগুলো নিয়ে শব্দ বুনেন কবি। এ শব্দের মায়াজালে আটকা পড়েন পাঠক। যে জাল ছিন্ন করা কঠিন। তাই বারবার কবিতার সন্ধান করেন তারা।
নগরীর এম এ আজিজ স্টেডিয়াম সংলগ্ন জিমনেশিয়াম মাঠে চলছে বইমেলা। গতকাল ছিল এ বইমেলার চতুর্থ দিন। মেলায় আসা অগণিত দর্শনার্থীর ভিড়ে ছিলেন কবিতার মায়াজালে আটকা পড়া সেইসব পাঠক। যারা স্টলে স্টলে খুঁজছিলেন কবিতার বই। অতঃপর, পছন্দের কবির প্রিয় বইটি পেলেই হাসছেন আনন্দে। ফাগুনের প্রথম হাওয়ায় সেই হাসির ঢেউ লেগেছে মেলাজুড়েই।
‘পৃথিবীর আলোয় ছন্দোবদ্ধ পদাবলীর যেদিন প্রথম জন্ম, সেদিন থেকেই সাহিত্যের এই মায়াবী সন্তানটির (কবিতা) দিকে মানুষের কৌতূহল এবং কৌতুক, স্নেহ এবং সন্দেহ, বৈরাগ্য এবং ব্যাকুলতার মাত্রা প্রায় সমান সমান।’ হয়তো এমন কৌতূহল নিয়ে কবি ভাগ্যধন বড়ুয়ার ‘লাভ লেইন’ নিয়ে মগ্ন ছিলেন মেলায় আসা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী নওরিন। জানতে চাইলে বললেন, ‘কবিতার প্রতি টান অনুভব করি। আছে কৌতূহল। লাভ লেইন এই শহরের পরিচিত স্থান। কবিতার বইয়ের নামও ‘লাভ লেইন’। তাই বাড়তি কৌতূহল।’ আসলেই তো, সড়কে লাভ লেইনের নির্দিষ্ট দূরত্ব পার হতে কৌতুহলী মনে প্রশ্ন জাগে, এই সরু রাস্তা দিয়ে বুঝি প্রেমের প্রবেশ কিংবা এখানেই চলে কি হৃদয়ের লেনাদেনা?
চট্টগ্রামের প্রকাশনা সংস্থা ‘খড়িমাটি’ থেকে বেরিয়েছে কাব্যগ্রন্থ ‘লাভ লেইন’। এর কবি পেশায় চিকিৎসক ভাগ্যধন বড়ুয়াও চট্টগ্রামের সন্তান। এটি তাঁর তৃতীয় গ্রন্থ। নিজের কবিতার বই সম্পর্কে জানতে চাইলে বললেন, ইংরেজি বানানে ‘লাভ লেন’ হওয়াটা যথাযথ হলেও একটি প্রতিষ্ঠিত সড়কের কথা মনে রেখেই ব্যবহারিক উচ্চারণের শব্দটিকে বেছে নিয়ে নামকরণ করেছি ‘লাভ লেইন’। তবে নামটিতে প্রেমের আমেজ আছে। আগের দুটি বইয়ের চেয়ে ‘লাভ লেইন’ আলাদা উল্লেখ করে বললেন, প্রতিটি কবিতা ছয় লাইনের। ছন্দ, অন্ত্যমিল আছে।’
চট্টগ্রামের পরিচিত কবি এবং পেশায় সাংবাদিক ওমর কায়সার। খড়িমাটি থেকে প্রকাশিত হয়েছে তাঁর ‘নির্বাচিত কবিতা’। ‘এই প্রথম এক মলাটের ভেতর পাওয়া গেছে কবি ওমর কায়সারকে। প্রেম, যৌনতা, দেশকাল, ইতিহাস, মিথ, গ্রাম-জীবন সবকিছুই এসেছে তাঁর কবিতায়।’ মেলায় আসা পাঠকদের খুঁজতে দেখা গেছে, কামরুল হাসান বাদলের ‘জিরাফের
মতো দুপুরগুলো’।
কবি ও সাংবাদিক শুকলাল দাশের ‘তোমার জন্য ভালোবাসা’ প্রকাশিত হয়েছে আবির প্রকাশন থেকে। দুয়েকদিনের মধ্যে একই প্রকাশনা সংস্থা থেকে বেরুবে ‘অবেলায় মন পোড়ে’। এ কবির কবিতায় রয়েছে মুগ্ধতার আবেশ, স্মৃতির অনুরণন, পাওয়া-না পাওয়ার গভীর ব্যঞ্জনা, স্বপ্নের এক সহযাত্রীর যাত্রাকথন। যা সহজেই পাঠককে মোহবিষ্ট করে দেয়। ভালো লাগার মূর্ছনা ছড়ায়।
বাতিঘরের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান কবিতাভবন থেকে বেরিয়েছে তরুণ কবি রিমঝিম আহমেদ এর ‘ময়ূরফুলের সন্ধ্যা’, আহমেদ মুনিরের ‘জেল রোডের প্রেমগীতি’, ইউসুফ মুহম্মদের ‘দোঁহা’ এবং আসমা বিথীর ‘এসো হে জন্ম’। নিজের বই সম্পর্কে আসমা বিথী তার পাঠকদের এভাবেই বললেন, ‘এবারের বইমেলায় আমারও একখানা আড়াই ফর্মার কবিতার বই প্রকাশিত হয়েছে। নিজের কাছে তা ছাইভস্ম মনে হয়। জীবনের পরতে-পরতে অভিজ্ঞতার তো শেষ নেই। ছাইভস্ম হলো অল্প কিছু শব্দ-বাক্যে অনুভূতির চূড়ান্ত রূপ।’
তরুণ কবি হাসনাত নাগাসাকি। চন্দবিন্দু প্রকাশনা থেকে এ কবির ‘সঙবিধিমুক্ত সতর্কী’ কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। চেতনা, প্রেম, প্রেমবর্হিভূত চেতনা নিয়ে লিখেছেন হাসনাত নাগাসাকি। দৈনিক আজাদীকে বললেন, ‘আমি কবিতা লিখি চেতনা থেকে। প্রেমের কবিতায়ও তাই প্রায়শই চেতনা ঢুকে যায়, দ্রোহ ঢুকে যায়। ফলে ‘সঙবিধিমুক্ত সতর্কী’ কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলো প্রেমের হয়েও নিতান্তই প্রেমের নয়। প্রেম, চেতনা ও দ্রোহের সমন্বয়।’
কবি রঞ্জন বণিকের ‘নোনাজলের কাব্য’ প্রকাশিত হয়েছে অক্ষরবৃত্ত থেকে। বিজ্ঞানের ছাত্র হলেও কবিতার প্রতি আগ্রহ শৈশব থেকেই এ কবির। ‘স্বভাবে কিছুটা খেয়ালী, অনেকটা প্রথাবিরোধী, স্রোতের বিপরীতে চলা যৌবনের উদ্যম সময়ের স্মৃতিময় রোমাঞ্চকর মুহূর্তগুলো স্থান পেয়েছে এ কাব্যগ্রন্থে।’
অনুবাদ কবিতার প্রতিও পাঠকের আগ্রহ ছিল লক্ষ্যণীয়। খড়িমাটি থেকে প্রকাশিত ‘হ্যাকুনিন ইস্‌শু, শত কবির শত কবিতা’ অনুবাদ করেছেন জ্যের্তিময় নন্দী। ধ্রুপদী ও সমকালীন সাহিত্যের অনুবাদে ইতোমধ্যেই খ্যাতি আছে তাঁর। ‘হ্যাকুনিন ইস্‌শু, শত কবির শত কবিতা’ সংকলন পাঠ করলে জাপানি কবিতার কয়েক শতাব্দীর কবিতা সম্পর্কে ধারণা মিলবে। ‘এ সঙকলনের প্রায় অর্ধেক সংখ্যক কবিতাই প্রেম বিষয়ক, কোমল, বিষণ্ন ভালোবাসার কথা বলা হয়েছে।’
এছাড়া বিভিন্ন প্রকাশকদের সঙ্গে আলাপকালে আখতারী ইসলামের ‘দূরাগত স্বপ্নের উদ্দেশে’, পতেঙ্গার ছেলে কামরুল রুমীর ‘ভ্যানিটি ব্যাগে জাফরান’, কানিজ ফতিমার ‘বিকেল হাসে প্রজাপতি রঙে’, তকিব তৌফিকের ‘অধ্যায়’, কামরুদ্দিন আহমেদের ‘বিলবোর্ড শব্দনূপুর’, অনিক চৌধুরীর ‘মনপ্রতীক্ষা’ এবং হাফিজ রশিদ খানের ‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’ও পাঠক প্রিয়তা পেয়েছে।
এদিকে গতকাল মেলায় এসেছিলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক মহীবুল আজিজ। তিনি বললেন, এবার মেলার জায়গা নির্বাচনটা চমৎকার হয়েছে। নতুন প্রজন্ম মেলায় আসছে। এতে তারা বইয়ের কাছাকাছি আসার সুযোগ পাচ্ছে। প্রথমদিন হয়তো বই কিনবে না। দ্বিতীয় দিন তো কিনবে। এবারের মেলায় ঢাকার প্রকাশকদের অংশগ্রহণকে ইতিবাচক উল্লেখ করে বলেন, এখন থেকে চট্টগ্রামের প্রকাশকরাও বই প্রকাশে আরো বেশি সচেতন হবেন।
প্রসঙ্গত, নগরীর এম এ আজিজ স্টেডিয়াম সংলগ্ন জিমনেশিয়াম মাঠে এ বইমেলার আয়োজন করেছে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন। তবে চট্টগ্রামের বিভিন্ন প্রকাশনী সংস্থা, সাহিত্যিক, লেখক, বুদ্ধিজীবী এবং অন্যান্য শিল্প-সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতরাই সম্মিলিতভাবে এ মেলা বাস্তবায়ন করছেন। বইমেলা চলবে আগামী ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। প্রতিদিন বিকেল ৩ টা থেকে রাত ৯ টা পর্যন্ত মেলা উন্মুক্ত থাকবে। তবে ছুটির দিন সকাল ১০ টা থেকে রাত ৯ টা পর্যন্ত উন্মুক্ত থাকবে। এবারের মেলার আয়তন প্রায় ৮০ হাজার ৩০০ বর্গফুট। স্টল আছে ১১০ টি। এর মধ্যে ঢাকার প্রকাশকদের জন্য ৬০টি এবং চট্টগ্রামের প্রকাশকদের স্টল ৫০টি।
তপন চৌধুরীর আড্ডা :
প্রকৃতির বুকে রঙ ছড়াচ্ছে বসন্ত। বসন্ত আবাহনের বর্ণিল আয়োজনে গতকাল ব্যস্ত ছিল নগরবাসী। বাদ পড়েনি বইমেলা প্রাঙ্গণও। বিভন্ন স্টলগুলো সাজানো হয়েছে বর্ণিল সাজে। তবে বাড়তি আকর্ষণ ছিল সংগীত শিল্পী তপন চৌধুরী। তার শ্রোতাদের সঙ্গে আড্ডা দিয়েছিলেন তিনি। একইসঙ্গে দর্শকের অনুরোধে গেয়ে শুনান বেশ কিছু জনপ্রিয় গান। গেয়েছেন আঞ্চলিক গানও।
আড্ডার শুরুতে তপন চৌধুরী বললেন, ‘চট্টগ্রাম আমার প্রিয় শহর। এমন সুন্দর জায়গা পৃথিবীর আর কোথাও নেই। সাগর, সমুদ্র, নদী মিলিয়ে প্রকৃতির শ্রেষ্ঠ উপহার চট্টগ্রাম। আমার কাছে মনে হয়, চট্টগ্রাম সারা পৃথিবীর রাজধানী। তিনি বলেন, আমি চাই, মৃত্যুর পর আমার মরদেহ চট্টগ্রামে নিয়ে আসা হোক।’
স্মৃতিচারণ করে এ সংগীত শিল্পী বললেন, ‘ছোটবেলায় এই মাঠে (মেলাস্থল) ফুটবল খেলতাম। প্র্যাক্টিস করতাম। ক্রিকেটার তামিম ইকবালের বাবা ইকবাল খান আমাদের প্র্যাক্টিস করাতেন। তাঁর হাত ধরেই স্টেডিয়ামে খেলতাম।’
তপন চৌধুরী বলেন, সংগীত শিল্পী হবো ভাবিনি। সোলসের গানের অনুষ্ঠানের জন্য একবার কাপ্তাই গিয়েছিলাম। তখনো ম্যাট্রিক দিই নাই। সেখানে দুইদিন ছিলাম। ফিরে আসার পর খেলার মাঠে এলে, ইকবাল খান রাগ করলেন। বললেন, ‘আগে ঠিক কর, গান করিব নাকি ফুটবল খেলবি’? এমন প্রশ্নে রাগ করে ফুটবল ছেড়ে দিয়েছেন উল্লেখ করে তপন চৌধুরী বললেন, দশ বছর পর ওনার সঙ্গে দেখা হয়েছিল। সেদিন তিনি বলেছিলেন, ‘তোর জায়গায় তুই সঠিক ছিলি। আমার জায়গায় আমি। ফুটবল চালিয়ে গেলে আশিস ভদ্র (একসময়ের জনপ্রিয় ফুটবলার) এর মত আরেকজন ফুটবলার পেতাম।’
বিভিন্ন বিষয়ে বলতে গিয়ে তপন চৌধুরী বলেন, যে কোন গুণীজনকে জীবিত অবস্থায় সম্মান জানানো উচিত। মৃত্যুর পরে সম্মান দিয়ে কি হবে? তিনি বলেন, আইয়ুব বাচ্চুকে এখন চারতলা বাড়ি দিলেও কিছু হবে না। জীবিত থাকাকালে ছোট উপহার দিয়ে যদি বলা হতো, এটা চট্টগ্রামবাসীর উপহার তাহলে সেটাই অনেক বড় পাওয়া হতো তার জন্য। আড্ডায় আরো অংশ নেন দৈনিক সুপ্রভাত বাংলাদেশের সম্পাদক রুশো মাহমুদ।

x