ফাগুন লেগেছে বনে বনে

শামীম আরা লুসি

শুক্রবার , ১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ at ৪:৫৭ পূর্বাহ্ণ
42

ওরে ভাই ফাগুন লেগেছে বনে বনে। আজ বসন্ত উৎসব। ফাগুনের উৎসবে ভাসার দিন আজ। রঙ লাগানো বনে বনে, ঢেউ জাগালো সমীরণে, আজ ভুবনের দুয়ার খোলা, দোল দিয়েছে বনের দোল, আগুন রাঙা বসন্ত আজ। লাল হলুদের বাসন্তি রঙে প্রকৃতির সঙ্গে নিজেদের সাজিয়ে আজ বসন্তে উচ্ছ্বলতা ও উন্মাদনায় ভাসবে প্রতিটি বাঙালি। প্রতি বছর ১৩ ফেব্রুয়ারি বসন্ত শুরু হলেও এবার তা হয়েছে একদিন পর। কারণ চলতি বছর থেকে চালু হওয়া নতুন বর্ষপঞ্জি অনুযায়ী এখন থেকে বাংলা বছরের প্রথম ছয় মাস ৩১ দিনে হবে। এর আগে বৈশাখ, জ্যৈষ্ঠ, আষাঢ়, শ্রাবণ, ভাদ্র-বছরের প্রথম এই পাঁচ মাস ৩১ দিন গণনা করা হত। এখন ফাল্গুন মাস ছাড়া অন্য পাঁচ মাস ৩০ দিনে পালন করা হবে। ফাল্গুন মাস হবে ২৯ দিনের, কেবল লিপইয়ারের বছর ফাল্গুন ৩০ দিনের মাস হবে। নতুন ক্যালেন্ডার অনুযায়ী প্রথমবারের মত ৩১ দিনের আশ্বিন মাস পালন করা হয়েছে বলে ফাল্গুন শুরু হচ্ছে একদিন পর।
সে হিসেবে আজ পহেলা ফাগুন। ঋতুরাজ বসন্তের প্রথম দিন। কবির সেই চিরায়ত বাণী ‘ফুল ফুটুক আর না ফুটুক আজ বসন্ত’। কবি সুভাষ মুখাপাধ্যায়ের এই বাণীটি ঋতুরাজ বসন্তকে আগমনের আহ্বান জানায়। শীতের হাওয়ায় নাচন থামতে না থামতেই ঋতুরাজ বসন্ত এসে হানা দেয় প্রকৃতিতে। প্রকৃতি আজ খুলে দেবে দখিনা দুয়ার। গাছে গাছে ছড়িয়ে পড়বে পলাশ আর শিমুলের মেলা। প্রকৃতি সাজবে আর নতুনরূপে। মৃদুমন্দ ভেসে আসা ফুলের গন্ধে বসন্ত জানিয়ে দিচ্ছে, সত্যিই সে ঋতুরাজ।
সারাবছর আমাদের জীবনে যত দুঃখ গ্লানি সব ছাপিয়ে নতুন করে যাত্রা শুরু হয় বসন্তেই। মানুষই প্রকৃতির মতো করে বসন্তকে ধারণ করে এগিয়ে যায়। আমাদের প্রকৃতিতে অনেকগুলো ঋতু আছে। একেক ঋতুর একেক বৈশিষ্ট্য। বসন্তে চারিদিকে ফুল ফোটে। পাতার আড়ালে লুকিয়ে থাকা বসন্তদূত কোকিলের কুহু কুহু ডাক আকুল ব্যাকুল করে তুলবে বিরহী অন্তর। লাল হলুদের বাসন্তি রঙে প্রকৃতির সঙ্গে নিজেদের সাজিয়ে আজ বসন্তের উচ্ছ্বলতা ও উন্মাদনায় ভাসবে প্রতিটি বাঙালি। বসন্ত এলেই মনে পড়ে যায় রবীন্দ্রনাথের সেই প্রিয় গান ‘আহা আজি এ বসন্তে এতো ফুল ফোটে, এতো বাঁশী বাজে, এতো পাখি গায়…।’ এই বসন্ত উৎসব বাঙালির অবিচ্ছেদ্য অংশ। বসন্ত বাঙালি সংস্কৃতিতে আসে সবার জীবনে। আমাদের ভাষা, সমাজ সংস্কৃতি ও সাহিত্যের বড় স্থান দখল করে আছে ঋতু রাজ বসন্ত।
প্রকৃতির সময়কে ধারন করে বিভিন্ন উৎসব পালন বাঙালির ঐতিহ্য, চিরায়ত রীতি। বসন্ত বরণ উৎসবে তারুণ্যের মেলা যেন আজ নতুন প্রাণ চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করবে। বসন্ত উৎসবকে কেন্দ্র করে বাসন্তী রঙে সাজবে তরুণ-তরুণীরা। বসন্ত উৎসব প্রাণের উৎসবে পরিণত হলেও এর শুরুর একটা ইতিহাস রয়েছে। মোগল সম্রাট আকবর প্রথম বসন্ত উৎসব শুরু করেন ১৫৮৫ সালে। নতুন বছরকে কেন্দ্র করে ১৪টি উৎসবের প্রবর্তন করেন তিনি। এরই মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল বসন্ত উৎসব।
প্রতি বছরের মতো বসন্ত বরণে নগরীতে রয়েছে বর্ণিল আয়োজন। ঋতুরাজ বসন্তকে বরণ করতে বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানমালা সাজিয়েছে বিভিন্ন সংগঠন। নাচ, গান, আবৃত্তির মাধ্যমে আজ ঋতুরাজ বসন্তকে বরণ করা হবে। নগরীতে এ উপলক্ষে বিভিন্ন সংগঠন বিভিন্ন অনুষ্ঠানমালার আয়োজন করেছে।
প্রমা : সিআরবি শিরীষতলার মুক্তমঞ্চে প্রমা আবৃত্তি সংগঠন আজ দিনব্যাপী নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে বসন্ত উৎসবের আয়োজন করা হয়েছে। আজ সকাল ৮ টায় প্রধান অতিথি হিসেবে উৎসবের উদ্বোধন করবেন-শিক্ষা উপমন্ত্রী ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল। বিশেষ অতিথি থাকবেন-বিভাগীয় কমিশনার এ বি এম আজাদ, ভাষাবিজ্ঞানী ড. মাহবুবুল হক, সিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার শ্যামল কুমার নাথ, বাংলাদেশ টেলিভিশন, চট্টগ্রাম কেন্দ্রের জেনারেল ম্যানেজার নিতাই কুমার ভট্টাচার্য। কর্মসূচিতে রয়েছে- ঢোলবাদন, আবৃত্তি, সংগীত, নৃত্য, কবিতাপাঠ, যন্ত্রসংগীত। উৎসবের সহযোগিতায় রয়েছে ভারতীয় সহকারী হাই কমিশন, চট্টগ্রাম। মিডিয়া পার্টনার-দৈনিক আজাদী।
সম্মিলিত বসন্ত উৎসব উদ্‌যাপন পরিষদ : সম্মিলিত বসন্ত উৎসব উদ্‌যাপন পরিষদের আয়োজনে ডা. খাস্তগীর স্কুল সংলগ্ন, জামালখান চত্বরে আজ দিনব্যাপী বসন্ত উৎসব উদ্‌যাপিত হবে। সকাল ৮টায় মোহন বীণার বাদনের মধ্য দিয়ে শুরু হবে এই উৎসব। উৎসবের উদ্বোধন করবেন সমাজবিজ্ঞানী প্রফেসর ড. অনুপম সেন। বক্তব্য দেন, আওয়ামী লীগের উপ-প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক আমিনুল ইসলাম। দিনব্যাপী আয়োজনের মধ্যে রয়েছে সঙ্গীত, নৃত্য, যন্ত্র সঙ্গীত, আবৃত্তি ও ফ্যাশন শো। লোকসংগীত পরিবেশন করবেন ফকির সাহাবুদ্দিন। একক নৃত্য পরিবেশন করবেন অভিনেত্রী ও নৃত্যশিল্পী তারিন। বাঙালিয়ানা পরিবেশন করবে ফ্যাশন শো। এছাড়াও রয়েছে চট্টগ্রামের খ্যাতিমান সংগীত শিল্পী ও আবৃত্তিশিল্পীদের একক সঙ্গীত এবং আবৃত্তি পরিবেশনা। দলীয় সংগীত পরিবেশন করবে রক্ত করবী, সঙ্গীত ভবন, আনন্দ ধ্বনি, স্বরলিপি, চট্টগ্রাম সঙ্গীত পরিষদ, অদিতি সঙ্গীত নিকেতন, চট্টগ্রাম শিল্পী সংসদ, নটরাজ সংগীত একাডেমি। দলীয় নৃত্যে অংশগ্রহণ করবে স্কুল অব ওরিয়েন্টাল ডান্স, ঘুঙুর নৃত্যকলা একাডেমি, ওড়িশী অ্যান্ড টেগোর ডান্স মুভমেন্ট সেন্টার, নটরাজ, সুরাঙ্গন বিদ্যাপীঠ এবং সঞ্চারী নৃত্যকলা একাডেমি। রাত ৮টা পর্যন্ত সম্মিলিত বসন্ত উৎসব উদ্‌যাপন পরিষদের আয়োজনে এ উৎসব চলবে।
বোধন : নগরীর পাহাড়তলী শেখ রাসেল পার্কে আজ বসন্ত উৎসবের আয়োজন করেছে বোধন আবৃত্তি পরিষদ চট্টগ্রাম। প্রতিবারের মতো এবারো ‘নিবিড় অন্তরতর বসন্ত এল প্রাণে’ শিরোনামে বাঙালির চিরায়ত এ উৎসব সকাল ৮টা থেকে শুরু হয়ে চলবে রাত ৮টা পর্যন্ত। আয়োজনে থাকছে আবৃত্তি, সংগীত, নৃত্য, কথামালা, ঢোলবাদন ও যন্ত্রসঙ্গীত। এছাড়া বিকাল ৩ টায় উৎসব অঙ্গন থেকে বের হবে বসন্ত বরণ শোভাযাত্রা। এছাড়া থাকবে রকমারি পিঠাপুলির আয়োজন। এ আয়োজনে চট্টগ্রামের সাংস্কৃতিক সংগঠনসমূহ এবং সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বরা অংশগ্রহণ করবেন। এ উৎসবে উপস্থিত থাকার জন্য বোধন আবৃত্তি পরিষদ চট্টগ্রামের সভাপতি সোহেল আনোয়ার ও সাধারণ সম্পাদক এস এম আবদুল আজিজ অনুরোধ জানিয়েছেন।
চসিক নগর ভবন উন্মুক্ত প্রাঙ্গণ : মুজিব বর্ষকে নিবেদন করে আজ সকাল ৮ টা থেকে রাত ৯ টা পর্যন্ত আন্দরকিল্লা চসিক নগর ভবন উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে ‘নিবিড় অন্তরতর বসন্ত এলো প্রাণে’ এই স্লোগানে বোধন বসন্ত উৎসব অনুষ্ঠিত হবে। এর মধ্যে রয়েছে বসন্ত বরণ শোভাযাত্রা, আবৃত্তি, কথামালা, সঙ্গীত, নৃত্য, যন্ত্র সঙ্গীত, ঢোল বাদন ও পিঠাপুলির সমারোহ। উৎসব উদ্বোধন করবেন সঙ্গীতজ্ঞ ওস্তাদ মিহির লালা। প্রধান অতিথি থাকবেন মহানগর আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মাহতাব উদ্দিন চৌধুরী। কথামালায় অংশ নেবেন-অ্যাডভোকেট স্বভু প্রসাদ বিশ্বাস, লায়ন রফিক আহামদ, লিয়াকত হোসেন খোকন, মফিজুর রহমান, চৌধুরী হাসান মাহমুদ হাসনী, সাইফুল আলম বাবু, সুমন বড়ুয়া, হাসান মুরাদ বিপ্লব, শৈবাল দাশ সুমন, আবুল হাসনাত বেলাল। দোলন কানুনগোর পরিচালনায় দলীয় গিটার বাদন, সুদীপ সেনগুপ্তের পরিচালনায় তবলার লহড়া এবং বিজয় জলদাসের পরিচালনায় সম্মেলক ঢোল বাদন পরিবেশিত হবে। উৎসবে আবৃত্তি, নৃত্য ও গানে অংশ নেবে চট্টগ্রামের শিল্পী এবং সংগঠন।