ফসল কাটা উৎসবের বর্ণিল আয়োজন

কেশব কুমার বড়ুয়া : হাটহাজারী

সোমবার , ২ ডিসেম্বর, ২০১৯ at ৮:৫৪ পূর্বাহ্ণ

বাংলার বর্ষপঞ্জিতে অগ্রহায়ণ মাস শুরু হলে গ্রামের কৃষক পরিবারের আনন্দের বান শুরু হয়। এক সময় অগ্রহায়ণ মাসে মাঠের পাকা ধান কাটা শুরু হলে গ্রামের প্রতি পরিবারে নবান্ন উৎসবের আয়োজন চলত। ঘরে ঘরে নতুন চালের পিঠা পুলি তৈরি করা হতো। যেসব পরিবার চাষাবাদ করত না, সে সব পরিবারের লোকজন কৃষক পরিবারকে কৃষি কাজে সহায়তা করতেন। বিশেষ করে ধান কাটা, মাড়াই, গৃহপালিত পশুর সাংবাৎসরিক খাদ্য চাহিদা যোগানের জন্য খড়ের গাদা বা কুইজ্যা করার জন্য। প্রত্যেক পরিবার কৃষক পরিবারে সাথে আনন্দে সামিল হতো। খেজুর রসের পিঠা দিয়ে লোকজনকে আপ্যায়নের ব্যবস্থা ছিল। গ্রামের অপেক্ষাকৃত সচল কিংবা বড় কৃষক পরিবারের বছরের ধান কাটার উৎসবকে স্মরণীয় করে রাখতে বিভিন্ন লোকজ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন চলত। যেদিন নতুন ধান থেকে চাল সংগ্রহ করে ভাত রান্না করা হতো সেদিন পাড়া প্রতিবেশিদের নিমন্ত্রণ করে শীতকালীন সব্জি গিয়ে আপ্যায়নের ব্যবস্থা ছিল। নতুন চালের ভাত খাওয়ার দিনকে নোয়া নইন্ন্যা নামে আখ্যায়িত করা ছিল গ্রামের মানুষের চিরাচরিত প্রথা। এখনও চট্টগ্রামের বৌদ্ধ পরিবারগুলো বৌদ্ধ মন্দিরে নতুন চালের ভাত দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে গৌতম বুদ্ধের প্রতিবিম্বকে পূজা দিয়ে থাকেন । এজন্য পূর্ব থেকে দিন তারিখ নির্ধারণ করা হয়। নির্ধারিত দিন ক্ষণের জন্য বৌদ্ধ মন্দিরে অবস্থানরত ভিক্ষু ও শ্রমন সংঘকে আনুষ্ঠানিকভাবে নিমন্ত্রণ করার রেওয়াজ সেই স্মরণাতীতকালের। সেদিন দেশের শান্তি ও সমৃদ্ধির জন্য বিশেষ প্রার্থনার ও আয়োজন করা হয়। জমি থেকে নতুন ধান কাটার জন্য সনাতন ও বৌদ্ধ সম্প্রদায় শুভ দিনক্ষণ দেখে ধান কাটার আনুষ্ঠানিকতা শুরু করেন। তাদের ধারণা শুভ দিনক্ষণ দেখে ধান কাটা শুরু করলে গৃহস্থ পরিবারের মঙ্গল হয়ে থাকে।
একসময় দেশে জনসংখ্যা কম থাকায় বছরে মাত্র একমৌসুমে জমিতে ধানের আবাদ করা হতো। এখন জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্ধিত জনসংখ্যার খাদ্যের যোগান দিতে কৃষি বিজ্ঞানিরা গবেষণা করে উন্নত প্রযুক্তি আবিষ্কার করেছেন। ফসলের নতুন জাত উদ্ভাবন করে অধিক ফসল ও জমিতে একাধিকবার ফসল ফলানোর ব্যবস্থা করেছেন। এতে করে ফলনের মাত্রা অনেকগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। আমন, আউশ ও বোরো ধান বছরে একাধিকবার জমিতে উৎপাদন হওয়ার কারণে ধান কাটা ও নবান্ন উৎসবে কিছুটা ভাটা পড়েছে। গ্রামে নবান্ন উৎসবে ভাটা পড়লেও এ উৎসব এখন গ্রাম ছেড়ে শহরে পৌঁছেছে। নানা সৃজনশীল সংগঠন দেশের বিভিন্ন শহরে এখন নবান্ন উৎসবকে ঘিরে নানা কর্মসূচির আয়োজন করে থাকেন। এ উৎসবে নৃত্যগীতি, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, আবৃত্তি গ্রামের আদলে অনুষ্ঠানস্থল সাজানো হয়ে থাকে। বছরের বিভিন্ন সময় ফসল কাটা হলেও গ্রামের চিরাচরিত নিয়মানুসারে বছরের অগ্রহায়ণ মাসে এ উৎসবের আয়োজন করা হয়। এক সময় গ্রামে প্রচুর লোকজন বসবাস করতো। এসব লোকজন শুধুমাত্র ধান লাগানো, প্রয়োজনে সেচ দেওয়া ও ধান কাটা মারইয়ের সময় কাজে লাগতো বাকী সময় বেকার জীবন যাপন করতো। সে সময় গ্রামে সস্তায় প্রচুর কৃষি শ্রমিক পাওয়া যেত। লোকজন সচেতন হওয়ায় শিক্ষার প্রতি মানুষের আগ্রহ বৃদ্ধি পেয়েছে। শিক্ষিত হয়ে তারা ব্যবসা বাণিজ্য করছে। চাকরি করছে, এমনকি মধ্য প্রাচ্য সহ উন্নত দেশে গিয়ে কর্মসংস্থানের উদ্যোগী হয়েছে। একসময়ের গ্রামের অভাবী মানুষগুলো এখন আর্থিকভাবে সচ্ছল হয়ে উঠেছে। সচ্ছলতার কারণে গ্রামে পাকা দালান নির্মাণের কাজ চলছে প্রতিযোগিতামূলকভাবে। আর্থিক সচ্ছলতা ও কৃষি শ্রমিক সংকটের কারণে গ্রামের লোকজন কৃষি কাজের প্রতি ক্রমে আগ্রহ হারাতে বসেছে। বিশেষ করে উৎপাদন খরচের চেয়ে উৎপাদিত পণ্যের বিক্রয়মূল্য কম হওয়ায় কৃষি কাজের প্রতি মানুষের আগ্রহ কিছুটা ভাটা পড়তে শুরু করেছে। কিন্তু বর্তমান কৃষি বান্ধব সরকার কৃষির উন্নয়নে আন্তরিকভাবে কাজ করছে। কৃষকদের উন্নত প্রযুক্তি বিষয়ে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হচ্ছে। সহজ শর্তে কৃষি ঋণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার মাধ্যমে তৃণমূল পর্যায়ে কৃষি ও কৃষকের উন্নয়নে নানাবিধ কর্মসূচি চালু করেছে। প্রাকৃতিক দূর্যোগ পরবর্তীতে কৃষি প্রণোদনা প্রদান করা হচ্ছে। যান্ত্রিক চাষাবাদের মাধ্যমে শ্রমিক সংকট দূরীভূত করে স্বল্প সময়ে জমিতে ফসল লাগানো, কাটা, মাড়াই এর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ভুর্তুকী মূল্যে উন্নত প্রযুক্তির কৃষি সরঞ্জাম প্রদান করছে সরকার। এতে করে কৃষকগণ প্রশিক্ষিত হয়ে আধুনিক কৃষিতে আগ্রহী হয়ে উঠেছে। কৃষকদের উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে সরকার সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে উৎপাদিত ফসল ক্রয় করছে। গ্রামে গ্রামে সিআইজি গ্রুপ (কমন ইন্টারেস্ট গ্রুপ) প্রতিষ্ঠা করে। সরকার প্রদত্ত সুযোগ সুবিধা প্রদান করা হচ্ছে। কৃষি বিভাগের কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা এলাকায় গিয়ে কৃষকদের সমস্যাদি চিহ্নিত করে সমাধানের ব্যবস্থা করছে। সরকার কর্তৃক কৃষকদের সহযোগিতার কারণে বর্তমানে বাংলাদেশ পৃথিবীতে মডেল কৃষি হিসাবে পরিচিতি লাভ করেছে। এজন্য সরকার প্রধান বিভিন্ন পুরস্কারে ভূষিত হয়েছে। তাছাড়া উন্নত ও প্রযুক্তি নির্ভর কৃষির কারণে বর্তমানে বাংলাদেশ পৃথিবীতে ধান উৎপাদনে চতুর্থ, সব্জি উৎপাদনে তৃতীয়, আম উৎপাদনে অষ্টম ও পেয়ারা উৎপাদনে সপ্তম স্থানে রয়েছে। সনাতনী কৃষি পদ্ধতি বাদ দিয়ে উন্নত আধুনিক প্রযুক্তি কৃষকদের সরাসরি প্রদর্শন করতে কৃষি বিভাগ ফসল কর্তন উৎসব ও মাঠ দিবসের আয়োজন করেছে। এছাড়াও গ্রামের হারানো প্রায় নবান্ন উৎসবকে পুনর্জাগরণের মাধ্যমে কৃষক/কৃষানীদের অনুপ্রাণিত করতে হাটহাজারী উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও হাটহাজারী কৃষি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন। অনুষ্ঠানের আয়োজক কর্তৃপক্ষ ব্যান্ড পার্টির মাধ্যমে অনুষ্ঠানে আগত দেশের প্রাণ হিসাবে খ্যাত কৃষক/কৃষাণী ও অতিথিদের অভ্যর্থনা জ্ঞাপন করেন। উপস্থিত কৃষক কৃষাণিদের সোনালী ধানের রঙের গেঞ্জি রোদের আলো নিবারণের জন্য মাথায় টুপি ও গামছা প্রদান করেন। সেই সাথে আমন্ত্রিত অতিথিদেরও একই আদলে পোশাক প্রদান করা হয়। যে অনুষ্ঠানে উপস্থিত সকলে গ্রামের কৃষক। অনুষ্ঠানস্থলে পিঠাপুলি তৈরির ব্যবস্থা করা হয়। ফসল কর্তন উৎসবে কৃষি যন্ত্র ও সরঞ্জাম প্রদর্শন করা হয়। ম্যানুয়াল ও ডিজিটাল সরঞ্জাম দিয়ে ফসল কর্তনের দৃশ্য দেখানো হয়। কৃষকদের বিনোদনের জন্য কৃষি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট এর শিক্ষার্থীরা মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন। ফসল কর্তন শেষে কৃষি কাজে সরকারে গৃহীত নানা উদ্যোগ উপস্থিতিদের মধ্যে জানান দিতে আলোচনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন। চট্টগ্রাম-হাটহাজারী মহাসড়কের ছড়ারকুল এলাকার উত্তর ফতেয়াবাদ ব্লকে জমকালো এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে কর্তৃপক্ষ। পরে এক এক করে অতিথিদের ফুলেল শুভেচ্ছা জানিয়ে বরণ করা হয়। স্থানীয় কৃষি মাঠে পাকা সোনালী ধান পরিবেষ্টিত স্থানে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন, চট্টগ্রাম অঞ্চলের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক কৃষিবিদ আলতাফ হোসেন। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন ঢাকার খামার বাড়ির কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর প্রশিক্ষণ উইং এর পরিচালক কৃষিবিদ ড. আলহাজ উদ্দীন আহম্মেদ। বিশেষ অতিথি ছিলেন হাটহাজারী কৃষি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের অধ্যক্ষ ড. এ.কে.এম ফরহাদ, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর চট্টগ্রামের উপপরিচালক কৃষিবিদ মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন, এনএস সিসি প্রকল্পের পরিচালক লুৎফুর রহমান, হাটহাজারী উপজেলা কেন্দ্রীয় সমবায় সমিতি লি: এর চেয়ারম্যান সাংবাধিক কেশব কুমার বড়ুয়া। শুরুতে স্বাগত বক্তব্য রাখেন হাটহাজারী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ শেখ আবদুল্লাহ ওয়াহেদ। অনুষ্ঠানে পবিত্র কোরআন থেকে তেলাওয়াত করেন হাফেজ মো: আল আমিন। অনুষ্ঠানে আঞ্চলিক কৃষি গবেষণা কেন্দ্রের কর্মকর্তা কৃষক কৃষাণী, উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা, কৃষি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট এর কর্মকর্তা ও শিক্ষার্থী ছাড়াও গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন। এ অনুষ্ঠানটি স্থানীয় এবং যারা প্রত্যক্ষ করেছেন তাদের কাছে স্মরণীয় থাকবে। তাছাড়াও অনুষ্ঠান থেকে উপস্থিত কৃষক / কৃষাণী কৃষি কাজে উৎসাহিত হবে বলে মনে করা হচ্ছে।

x