ফরাসী নাট্যকার ইউজিন আয়োনেস্কো

সৈয়দ খালেদুল আনোয়ার

শুক্রবার , ১২ জুলাই, ২০১৯ at ১০:৫১ পূর্বাহ্ণ
36

ফরাসী নাট্যধারা আঁভো গার্ডের অন্যতম প্রধান পুরুষের নাম ইউজিন আয়োনেস্কো। বিশ্বনাট্যাঙ্গনে তিনি এবসার্ড থিয়েটারের নাট্যকার হিসেবে শ্রদ্ধার সাথে স্বীকৃত। ফরাসী নাট্যপ্রেমীরা তাঁকে কতটুকু মূল্যায়ন করতেন তা তাঁর নাটকের প্রযোজনা থেকে বোঝা যায়। তাঁর দুটি সুপ্রসিদ্ধ নাটক দ্য লেসন ও দ্য বল্ড সোপরানো প্যারিসের মঞ্চে বহুল প্রদর্শিত হয়ে আসছে। নাটক দুটির বার হাজারের মত মঞ্চায়ন ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। আয়োনেস্কোর নাটকে এবসার্ডিটি এসে পড়ার নেপথ্যে ক্রিয়াশীল কারণটি ছিলো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের উত্তরকালে গণমানুষের ক্ষয়িষ্ণু অনুভূতি। বিশেষ করে সৃষ্টিশীল ব্যক্তিদের মধ্যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর বিধ্বস্ত পরিবেশ এবসার্ড আবহ সৃষ্টিতে যথেষ্ট কাজ করেছিলো। এই এবসার্ড অনুভূতি এক সৃষ্টিশীল মানুষ হিসেবে আয়োনেস্কোকেও জড়িয়েছিলো নিবিড়ভাবে এবং সেই অনুভূতিজাত তাঁর প্রথম সৃষ্টি কালজয়ী নাটক দ্য বল্ডসোপরানো। আয়োনেস্কো বলতেন,তিনি নাটকের মধ্যে কোনো আদর্শকে চিত্রিত করার পক্ষপাতী নন,তাঁর নাটক নির্মিত হবে কোনো বিশেষ মুডকে অবলম্বন করে। ১৯৪৮ সালে রচিত তাঁর প্রথম নাটক দ্য বল্ডসোপরানোতে প্রহসনের মধ্য দিয়ে দুই দম্পতির অর্থহীন মানব-অবস্থানকে উপস্থাপনার মধ্যে আমরা তাঁর নাট্য বিষয়ক মন্তব্যের স্পষ্ট প্রতিফলন দেখি।
ইউজিন আয়োনেস্কো জন্মেছিলেন রোমানিয়াতে। ফরাসী ভাষায় নাট্যচর্চা এবং ফ্রান্সে স্থায়ী ভাবে বসবাসের প্রেক্ষিতে বিশ্ববাসীর কাছে তিনি ফরাসী নাট্যকার হিসেবে স্বীকৃত। ১৯১২ সালের ২৬ নভেম্বর রোমানিয়ার এক দম্পতির ঘরে জন্ম নেয়ার কিছুকাল পরে মা বাবার সাথে শিশু আয়োনেস্কো চলে আসেন ফ্রান্সের প্যারিস নগরে। তের বৎসর বয়সে মূলতঃ শিক্ষার জন্যে আয়োনেস্কো স্বদেশ রোমানিয়াতে আসেন। সেখানে তিনি বুখারেস্ট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফরাসী ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতক ডিগ্রী গ্রহণ করেন। স্নাতক ডিগ্রী লাভের পর তিনি সেদেশে ফরাসী ভাষা ও সাহিত্যে শিক্ষকতায় নিয়োজিত হন এবং সৃজনশীল প্রতিভার অধিকারী হওয়ার কারণে শিক্ষকতার পাশাপাশি চালিয়ে যেতে লাগলেন সাহিত্য সমালোচনা এবং কাব্যচর্চা। ১৯৩৬ সালে আয়োনেস্কো রোডিকা বুরিলিয়ানো নামের এক রমণীর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। এবং বিবাহের দুবছর পর তিনি বৃত্তি নিয়ে আবার ফ্রান্সে ফিরে আসেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বিধ্বস্ত আবহ অন্তরে ধারণ করে প্যারিস নগরে বসে আয়োনেস্কো সৃষ্টি করতে লাগলেন তাঁর কালোত্তীর্ণ সব নাটক।
১৯৪৮ সালে রচিত হয় আয়োনেস্কোর প্রথম নাটক ‘দ্য বল্ডসোপরানো”। নাটকটি প্রথম মঞ্চায়িত হয় ১৯৫০ সালে। নাটকটির প্রথম মঞ্চায়ন আয়োনেস্কোকে আশাহত করেছিলো। অবশ্য তাঁর উদ্দীপনা ঝলসে উঠতেও খুব একটা কালক্ষয় ঘটে নি। তাঁর বল্ডসোপরানোর প্রথম মঞ্চায়ন শেষ হওয়ার অনেক আগেই হলভর্তি সব দর্শক প্রস্থান করেছিলো। হলে শেষ পর্যন্ত ছিলেন তিনজন। তাঁরা বিমোহিত হয়ে নাটক উপভোগ করছিলেন। এই তিনজনই ছিলেন ফ্রান্সের শিল্পকলা অঙ্গনে সুপ্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিত্ব। রত্নরা রত্ন তো চিনবেই। তবে সাধারণ দর্শক তাঁর সৃষ্টি রত্নকে চিনতে একটু বিলম্ব হলেও উত্তরকালে তারা তাঁর সৃষ্টিকর্মকে অন্তরের মণিকোঠায় স্থান দিয়েছিলো। তাঁর নাট্য মঞ্চায়নের পরিসংখ্যান থেকে এই সত্যটি প্রমাণিত। ফ্রান্সের বিভিন্ন স্থানে তাঁর মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত তাঁর চৌদ্দটি নাটক প্রযোজিত হয়। আয়োনেস্কো ফ্রান্সে দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। তাঁর এই জনপ্রিয়তা বহির্বিশ্বেও ছড়িয়ে পড়তে থাকে। আমাদের এই উপমহাদেশের ভারত ও বাংলাদেশে আয়োনেস্কোর অনেক নাটক প্রযোজিত হয়েছে। কলকাতার বিখ্যাত গ্রুপ থিয়েটার বহুরূপী আয়োনেস্কোর “রাইনোসেরাস” নাটকটিকে অন্যতম সার্থক অবদানের মর্যাদা দিয়ে থাকে। তাঁরা “গন্ডার” নামে এই নাটকটি পশ্চিম বঙ্গের বিভিন্ন স্থানে মঞ্চায়িত করে যথেষ্ট সুনাম কুড়িয়েছে। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ বেতার আয়োনেস্কোর ” এঙিট দ্য কিং” বাংলা রূপান্তরে প্রযোজনা করে। তাঁর “দ্য বল্ড সোপরানো”, “দ্য লেসন “, দ্য চেয়ার” নাটকগুলো বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশ টেলিভিশনে প্রযোজিত হয়।
ইউজিন আয়োনেস্কোর নাটক আলাদা কিছু বৈশিষ্ট্যে সমুজ্জ্বল। যেমন তিনি নাটকে বিযুক্তিকরণ টেকনিকের স্বার্থে নাটকের কেন্দ্রবিন্দুতে অর্থহীন উদ্ভট কিছু উপাদানের উপস্থিতি ঘটাতেন। আয়োনেস্কো তাঁর প্রথমদিককার “দ্য বল্ড সোপরানো”, “দ্য লেসন”, “দ্য সাবমিশন” এইসব নাটকে তাঁর সৃষ্ট ফাঁপা যান্ত্রিক চরিত্রগুলোর জীবনকে মূর্ত করার প্রয়াস দেখিয়েছেন বিভিন্ন উদ্ভট উপাদানের ব্যবহারের মাধ্যমে। ১৯৫১ থেকে ১৯৫৩ সালের মধ্যে রচিত আয়োনেস্কোর সবকটি নাটকে আমরা অর্থহীন কিছু উপাদানকে নাটকের কেন্দ্রে উপস্থিত হতে দেখি। যেমন, “দ্য ফিউচার ইজ ইন এগস্‌”, “ইট টেকস্‌ অল সর্টস টু মেক এ ওয়ার্ল্ড”, নাটকে ডিম,”ভিকটিমস অব ডিউটি” নাটকে কপি কাপ, “দ্য চেয়ারস” নাটকে চেয়ার, “অ্যামিদি” নাটকে ব্যাঙের ছাতা, “দ্য নিউটেনান্ট নাটকে আসবাবপত্র।
সুপ্রাবন্ধিক আতাউর রহমানের ভাষায়,এইসব অতিব্যবহৃত পদসমষ্টি নিয়ে যথেচ্ছ খেলায় মেতে ওঠার ক্ষমতা আয়োনেস্কোর মত অন্য কোন নাট্যকার ধারণ করতেন বলে জানা যায় না। উনি এইসব পদসমষ্টিকে ব্যবহার করে সুস্পষ্ট স্ববিরোধিতায় পর্যবসিত করতেন। সৃষ্টি করতেন অসঙ্গতিপূর্ণ শব্দ প্রপাত ও কৃত্রিম সাদৃশ্য,এসবকিছুই জগত সম্পর্কে অতি তুষ্ট মনোভাবকে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য ও ব্যঙ্গ বিদ্‌রূপ করার উদ্দেশে হতো নিক্ষেপিত।
গতানুগতিক নাট্যধারার বাইরের নাট্যকার আয়োনেস্কো একাই মানবিক প্রতিনিধিকে তাঁর বিভিন্ন নাটকে উপস্থাপিত করতেন। তাঁর এই ধরনের একটি চরিত্র হচ্ছে “বেরেঞ্জার”। এই চরিত্র তাঁর বিভিন্ন নাটকে ভিন্ন মাত্রার গুরুত্বে উপস্থাপিত হয়। আয়োনেস্কো তাঁর দ্য কিলার, রাইনোসেরোস্‌, এঙিট দ্য কিং, এবং এ্যা স্ট্রল ইন দ্য এয়ার নাটকে বেরেঞ্জারকে মূখ্য চরিত্রের মর্যাদা দিয়েছেন। দ্য কিলার, রাইনোসেরোস নাটকে বেরেঞ্জার এসেছে সাধাসিধে মধ্যবিত্ত সাধারণ মানুষ হিসেবে। আবার এই বেরেঞ্জার চরিত্র স্ট্রলার ইন দ্য এয়ার এবং এঙিট দ্য কিং নাটকে এসেছে যথাক্রমে সফল নাট্যকার এবং সম্রাটের ভূমিকায়।ইউজিন আয়োনেস্কো চলচ্চিত্রেও অভিনয় করেছিলেন তবে একটি ছবিতে তা সীমাবদ্ধ ছিলো। ছবিটির নাম “দিউজ”। আয়োনেস্কো জার্মান টেলিভিশনের জন্যে এই ছবিটির স্ক্রিপ্ট লিখেছিলেন। এই ছবিতে মাত্র একটি চরিত্র ছিলো। টেলিভিশন কর্তৃপক্ষ এই চরিত্রের জন্যে কাউকে মনোনীত করতে না পারায় আয়োনেস্কোকেই অনুরোধ করে ছবিতে অভিনয়টাও যেনো করে দেন। আয়োনেস্কো তাঁদের অনুরোধ রাখেন এবং ছবিতে অভিনয় করে দর্শক নন্দিত হন।
ইউজিন আয়োনেস্কো আজ প্রয়াত। ১৯৯৪ সালে ৮১ বৎসর বয়সে তিনি মারা যান। একটি নতুন নাট্যধারা সৃষ্টি করে তিনি বিশ্ব নাট্যাঙ্গনে উজ্জ্বল ব্যক্তিত্ব হিসেবে সদা বর্তমান। বোধের দিগন্তকে প্রসারিত করতে না পারলে কিছুতেই আয়োনেস্কোর সৃষ্টির মর্ম উপলব্ধি করা যাবে না। যারা তাঁর সৃষ্টি আস্বাদন করতে পেরেছেন একমাত্র তাঁরাই স্বীকার করবেন, ইউজিন আয়োনেস্কো ছিলেন বিশ্বনাটকের এক মহীরুহ।

x