প্রেসক্রিপশন দেখার অধিকার তাদের দিল কে?

থাকছে না রোগীর ব্যক্তিগত গোপনীয়তা এমআরদের দৌরাত্ম্য ‘ওষুধ কোম্পানির চাপে’

রতন বড়ুয়া

শনিবার , ৯ নভেম্বর, ২০১৯ at ৩:৪৭ পূর্বাহ্ণ
206

মঙ্গলবার বেলা এগারটা। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের নীচ তলার ফিজিক্যাল মেডিসিন বিভাগের বহির্বিভাগ থেকে বের হয়ে আসছিলেন এক মহিলা। হাতে চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র (প্রেসক্রিপশন)। চিকিৎসকের কক্ষ থেকে বের হয়ে কয়েক কদম আসতেই মহিলাকে ঘিরে ধরলেন এক ঝাঁক যুবক। নিমিষেই টেনে নেন মহিলার হাতের প্রেসক্রিপশনটি। আচমকা কিছু বুঝে উঠতে না পেরে অনেকটা ভড়কে যান ওই মহিলা। তবে তাতে ভ্রুক্ষেপ নেই যুবকদের। প্রেসক্রিপশনটি নিয়ে ছবি তোলা শুরু হয় মোবাইল ক্যামেরায়। একজন একজন করে অন্তত ৭/৮ জন যুবকের ছবি তোলা শেষ হলে প্রেসক্রিপশনটি ফিরিয়ে দেয়া হয় মহিলাটিকে। একটু পর বের হয়ে আসেন আরেকজন রোগী। তাঁর বেলায়ও একই ঘটনা। ঘিরে ধরে রোগীর হাতের প্রেসক্রিপশনটি অনেকটা টেনেই নিয়ে নেয়া হয়। এরপরই ছবি তোলা শুরু। পরিপাটি পোশাকের এই যুবকগুলো ওষুধ কোম্পানির হয়ে কাজ করেন এখানে। কেউ বিক্রয় প্রতিনিধি (এমআর) আর কেউবা সার্ভেয়ার (প্রেসক্রিপশন জরিপের কাজে নিযুক্ত)। ফিজিক্যাল মেডিসিন বিভাগ ছাড়াও চর্ম ও যৌন রোগ বিভাগ, রেডিওথেরাপি বিভাগ, নতুন ভবনের ইউরোলজি বিভাগসহ হাসপাতালের অধিকাংশ বিভাগের বহির্বিভাগেই (আউটডোর) একই চিত্র। শুক্রবার ছাড়া সপ্তাহের বাকি ৬দিনই এই দৃশ্য যেন স্বাভাবিক আউটডোরগুলোতে। অথচ ওষুধ কোম্পানির বিক্রয় প্রতিনিধিদের জন্য ভিজিটিং আওয়ার নির্ধারণ করে দিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। হাসপাতাল প্রশাসনের নির্ধারিত সময় অনুযায়ী- সপ্তাহের প্রতি রোববার ও বুধবার দুপুর ১টা থেকে ২টা পর্যন্ত (এক ঘন্টা) হাসপাতালে প্রবেশের সুযোগ রয়েছে ওষুধ কোম্পানির বিক্রয় প্রতিনিধিদের। কিন্তু এ নিয়ম কেবল কাগজে-কলমেই। বাস্তবে সপ্তাহের প্রতিদিনই (শুক্রবার ছাড়া) হাসপাতালে ভিড় করেন বিক্রয় প্রতিনিধিরা।
ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিদের এভাবে ব্যবস্থাপত্র দেখা রোগীর ব্যক্তিগত গোপনীয়তা হরণের শামিল বলে মনে করেন জনস্বাস্থ্য অধিকার রক্ষা কমিটির আহবায়ক ও মুক্তিযোদ্ধা ডা. মাহফুজুর রহমান। তিনি বলেন, ডাক্তার একজন রোগীকে ব্যবস্থাপত্র দিলে রোগী সেটি নিয়ে ফার্মেসিতে গিয়ে ওষুধ কিনবেন। মাঝখানে তৃতীয় কোন ব্যক্তির এই ব্যবস্থাপত্র (প্রেসক্রিপশন) দেখার অধিকার নেই। আত্মীয়-স্বজন দেখলে সেটি ভিন্ন কথা। তবে ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিরা যা করছেন, তা সমর্থনযোগ্য নয়।
সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, দেশে নিবন্ধিত ওষুধ কোম্পানির সংখ্যা আড়াইশ’র কম নয়। এর বাইরে নিবন্ধনহীন কোম্পানির সংখ্যাও নেহাত কম নয়। সবমিলিয়ে আড়াই শতাধিক ওষুধ কোম্পানি তাদের প্রতিনিধি নিয়োজিত করেছেন চমেক হাসপাতালে। প্রতিটি কোম্পানির অন্তত ১০/১২ জন করে প্রতিনিধি কাজ করেন এখানে। তুলনামূলক বড় কোম্পানির ক্ষেত্রে প্রতিনিধির এ সংখ্যা আরো বেশি। হাসপাতালের বিভাগ ভিত্তিক দায়িত্ব ভাগ করে কাজ করেন এসব প্রতিনিধিরা।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আড়াই
শতাধিক ওষুধ কোম্পানি গড়ে ১০ জন করে প্রতিনিধি নিয়োজিত করলে সবমিলিয়ে প্রায় আড়াই হাজার কর্মী (ওষুধ কোম্পানির এমআর) কাজ করেন এ হাসপাতালে। যা দৃশ্যমানও। প্রায় প্রতিদিনই ওষুধ কোম্পানির এমআরদের ভিড় চোখে পড়ে সবকয়টি বিভাগে। আউটডোরের বারান্দায়, কোথাওবা করিডোরে সদা প্রস্তুত থাকতে দেখা যায় তাদের। আর চিকিৎসকের কক্ষ থেকে বের হতেই সুযোগ বুঝে রোগীর প্রেসক্রিপশনে হামলে পড়েন তারা। এসব এমআরের সিংহ ভাগই হাসপাতালে আসেন মোটরসাইকেলযোগে। যার কারণে নির্ধারিত পার্কিং স্থান ছাড়াও মোটর সাইকেলের বহর চোখে পড়ে হাসপাতাল এলাকার সর্বত্র।
যে কারণে প্রেসক্রিপশনের ছবি তোলার প্রতিযোগিতা :
হাসপাতাল প্রশাসন, ডাক্তার, ওষুধ কোম্পানির সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্রে নিজেদের কোম্পানির ওষুধ লেখাতে এক প্রকার অসুস্থ প্রতিযোগিতায় নেমেছে ওষুধ কোম্পানিগুলো। এর জন্য নিয়ম-নীতি কোন কিছুরই তোয়াক্কা করতে রাজি নয় তারা।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এর জন্য চিকিৎসকরাও কম দায়ী নন। ওষুধ কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে আর্থিকসহ বিভিন্ন সুবিধা গ্রহন করেন চিকিৎসকরা। কেউ কেউ আবার কোম্পানির সৌজন্যে বিদেশ ট্যুরের পাশাপাশি বিভিন্ন গিফট নেন। তবে কিছু কিছু চিকিৎসককে ঘরের বাজারও করে দিতে হয় কোম্পানির প্রতিনিধিদের। এতদিন না থাকলেও অতি সমপ্রতি অনেক চিকিৎসক এই ধারা শুরু করেছেন বলে সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে জানা গেছে। কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে চিকিৎসকরা অনৈতিক সুবিধা নেন বলেই এমআররা ডাক্তারের প্রেসক্রিপশনের ছবি তুলে রাখেন বলে মনে করেন প্রবীন চিকিৎসক ও মুক্তিযোদ্ধা ডা. মাহফুজুর রহমান। জনস্বাস্থ্য অধিকার রক্ষা কমিটির এই আহবায়ক দাবি করেন, সুবিধা গ্রহনের বিনিময়ে ওই কোম্পানির ওষুধ লিখতে চিকিৎসকরা এক প্রকার বাধ্য হন। এটা এক ধরণের চুক্তি বলা চলে। ‘আমরা আপনাকে এই এই সুবিধা দিলাম। বিনিময়ে আপনি মাসে আমাদের এত সংখ্যক ওষুধ লিখবেন।’ এই কারণেই ওষুধ কোম্পানিগুলোর প্রতিনিধিরা চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্রের ছবি তুলেন এবং হিসেব করে দেখেন তাদের কোম্পানির কতটা ওষুধ লেখা হলো। কোম্পানিগুলোর সাথে লিংক না থাকলে তারা ছবি তুলবে কেন? চিকিৎসকরা অনৈতিক এসব সুবিধা গ্রহন না করলে কোম্পানিগুলো এমন সুযোগ পেতো না মন্তব্য করে এক্ষেত্রে চিকিৎসকের দায়ও কম নয় বলে মনে করেন প্রবীন এই চিকিৎসক।
ওষুধ কোম্পানি সংশ্লিষ্টরা যা বলছেন: হাসপাতালে দায়িত্ব পালনে নিয়ম না মানার বিষয়ে ওষুধ কোম্পানির একাধিক এমআরের সাথে কথা হয় এ প্রতিবেদকের। এ নিয়ে কথা বললেও তাঁরা কেউ নাম প্রকাশে রাজি নন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তারা বলেছেন- হাসপাতালের নিয়ম মানতে তারা ইচ্ছুক। কিন্তু নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের (ওষুধ কোম্পানি) চাপের কারণেই প্রায় প্রতিদিন হাসপাতালে কাজ করতে হয় তাদের। প্রতিটি কোম্পানি একটি নির্দিষ্ট টার্গেট নিয়ে কাজ করে। আর এই টার্গেট পূরণে নিয়ম ভঙ্গসহ বহু অনৈতিক কাজ করতে বাধ্য করা হচ্ছে এমআরদের। কোম্পানির পক্ষ থেকে চাপ না থাকলে হাসপাতালের নিয়ম মেনেই কাজ করতে পারতেন তারা।
যদিও সবাই নিয়ম মানছে না আবার শতভাগ নিয়ম মানেন, কোনটাই ঠিকনা বলে মনে করেন ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান বিকনের চট্টগ্রাম রিজিওনাল সেলস ম্যানেজার নাহিদুর রহমান। তার প্রতিষ্ঠান থেকে কর্মীদের ততটা চাপ দেয়া হয়না বলেও দাবি করেন তিনি।
অন্যদিকে, নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওষুধ কোম্পানির একাধিক কর্মকর্তা আজাদীকে বলেন, প্রতিনিধিদের চাপ দেয়ার বিষয়টি অসত্য নয়। বিশেষ করে বড় কোম্পানিগুলো এক্ষেত্রে এগ্রেসিভ মার্কেটিং পলিসি নিয়ে কাজ করে। তাদের টার্গেট বেশি থাকে বলে কর্মীদের উপরও বেশি চাপ দেয়া হয়। আবার অনেক প্রতিষ্ঠান নিয়ম মেনে হাসপাতাল ভিজিট করতে চাইলেও অন্যরা তো ঠিকই ভিজিট করছে, এমন প্রবনতাও নিয়ম মানার পেছনে প্রতিবন্ধকতা হিসেবে কাজ করে বলে মনে করেন ওষুধ কোম্পানির কর্মকর্তারা।
হাসপাতাল প্রশাসনের বক্তব্য : দফায় দফায় চেষ্টা করেও এমআরদের এই দৌরাত্ম্য বন্ধ করতে পারছেন না বলে দাবি করেছেন হাসপাতাল পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহসেন উদ্দিন আহম্মদ। তিনি দাবি করেন, ওষুধ কোম্পানির কর্মকর্তাদের সাথে আলাপ করেই কিন্তু আমরা তাদের জন্য সপ্তাহে দুদিন সময় নির্ধারণ করেছি। কিন্তু এমআররা সে নিয়ম মানেন না। অনেক সময় দায়িত্বরত আনসার সদস্যদের দিয়ে এমআরদের ব্যাগ জব্দ করে নিয়ে আসা হয়। যত্রতত্র মোটরসাইকেল পার্কিংয়ের কারণে তাদের হেলমেট জব্দ করা হয়। কিন্তু এরপরও তাদের দৌরাত্ম্য কমছেনা।
এমআরদের এই নিয়ম না মানার পেছনে ওষুধ কোম্পানির চাপের বিষয়টিও উল্লেখ করেন হাসপাতাল পরিচালক। এ বিষয়ে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহসেন উদ্দিন আহম্মদ বলেন, ওষুধ কোম্পানিগুলোর চাপেই এমআররা নিয়ম মানছেন না। বিষয়টি নিয়ে আমরা কোম্পানিগুলোর উর্ধ্বতন কর্মকতাদের ই-মেইল করে চিঠিও দিয়েছি। কিন্তু পরিবর্তন আসছে না। এখন বিষয়টি নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে বলেও মন্তব্য করেন হাসপাতাল পরিচালক।
তবে নির্ধারিত সময়ের বাইরে এমআরদের হাসপাতালে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা কঠোরভাবে পালন করতে হাসপাতাল প্রশাসনের প্রতি পরামর্শ দিয়েছেন জনস্বাস্থ্য অধিকার রক্ষা কমিটির আহবায়ক ডা. মাহফুজুর রহমান। তিনি বলছেন, তারা যদি নির্ধারিত সময়ের বাইরে হাসপাতালে প্রবেশ করতে না পারে, তাহলে তো প্রেসক্রিপশনের ছবি তোলার সুযোগ পায়না। তাই যেভাবেই হোক নিয়ম মানাতে হবে। নির্ধারিত সময়ের বাইরে তাদের কোনভাবেই হাসপাতালে প্রবেশ করতে দেয়া যাবে না। আর এই নিষেধাজ্ঞা হাসপাতাল প্রশাসনকেই কার্যকর করতে হবে। প্রয়োজনে নির্ধারিত সময়ের বাইরে হাসপাতালে প্রবেশকারী এমআরদের নিয়ে গিয়ে পরিচালকের কক্ষের সামনে বসিয়ে রাখতে হবে। তাতে করে ওষুধ কোম্পানিগুলোও নিয়ম মানতে বাধ্য হবে। মোটকথা হাসপাতাল প্রশাসনকে কঠোর হতে হবে।

x