প্রাপ্তবয়স্ক প্রতি দুজনের একজন জানেন না তিনি আক্রান্ত

বিশ্ব ডায়াবেটিস দিবস আজ

রতন বড়ুয়া

বৃহস্পতিবার , ১৪ নভেম্বর, ২০১৯ at ২:৪৮ পূর্বাহ্ণ
476

ডায়াবেটিস এবং ডায়াবেটিস জনিত রোগে বিশ্বে প্রতি বছর ১০ লাখেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়। এছাড়া ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ রোগীর পা কেটে ফেলার অন্যতম কারণও ডায়াবেটিস। ফলে রোগটি চিহ্নিত হয়েছে একটি নীরব ঘাতক ব্যাধি হিসেবে। আর বিশ্বব্যাপী এই রোগের ভীতিকর প্রভাবকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে ডায়াবেটিসের বিরুদ্ধে মাঠে নেমেছে জাতিসংঘ।
যক্ষা ও এইচআইভি/ এইডস সহ নানা সংক্রামক রোগের পাশাপাশি কোন অসংক্রামক ব্যাধিকে প্রথমবারের মতো বিশ্বজনীন স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে মারাত্মক হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সেটি হলো ডায়াবেটিস। তবে আতংকের বিষয় যে, প্রাপ্তবয়স্ক প্রতি দুজন মানুষের একজন জানেনইনা তিনি ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। এর পিছনে সচেতনতার অভাবকেই দেখছেন চট্টগ্রাম ডায়াবেটিক হাসপাতালের সাবেক পরিচালক ডা. নওশাদ আহমেদ খান।
বিগত বেশ কয়বছর ধরে ডায়াবেটিস নিয়ে কাজ করছেন তিনি। দায়িত্ব পালন করছেন লায়ন্স ক্লাব ইন্টারন্যাশনালের ডায়াবেটিস অ্যাওয়ারনেস কমিটির সদস্য সচিব হিসেবেও। এই চিকিৎসকের প্রদত্ত তথ্য মতে- চট্টগ্রাম, কঙবাজার, রাঙ্গামাটি ও ফেনী জেলার প্রায় ১৮ হাজার মানুষের ডায়াবেটিস স্ক্রিনিং করেছেন তিনি। এর মধ্যে অপ্রাপ্ত বয়স্ক টাইপ-১ (১- ১৮ বছর বয়সী) ডায়াবেটিসে আক্রান্তের হার ৫-৭ শতাংশ। আর প্রাপ্ত বয়স্কদের প্রায় ৪০ শতাংশ জানেনই না তাঁরা ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। এটি খুবই ভয়ানক পরিস্থিতি বলে মনে করেন ডা. নওশাদ আহমেদ। এর কারণ হিসেবে তিনি বলছেন, প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করা সম্ভব হলে চিকিৎসায় ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ রাখা যায়। কিন্তু শনাক্তই যদি না হয়, তবে ডায়াবেটিসের কারণে শরীরের বিভিন্ন অংশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যার মধ্যে চোখ, কিডনি ও হার্ট অন্যতম। আর নিয়ন্ত্রণে রাখতে না পারলে এই ডায়াবেটিস মানুষকে ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে ধাবিত করে। তাই নীরব ঘাতক হিসেবে পরিচিত এই ডায়াবেটিস থেকে বাঁচতে হলে এখনই সচেতন হওয়া জরুরি বলছেন ডা. নওশাদ আহমেদ খান।
অন্যদিকে, প্রতি ৭জন গর্ভবতী নারীর ১ জনের শরীরে ডায়বেটিস ধরা পড়ছে বলে জানালেন চট্টগ্রাম ডায়াবেটিক হাসপাতালের প্রধান পুষ্টি কর্মকর্তা হাসিনা আক্তার লিপি। উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, এটি গভীর আতংকের বিষয়। কারণ, নারীর গর্ভধারণের আগে বা গর্ভকালীন সময়ে সচরাচর ডায়াবেটিস পরীক্ষা করানো হয় না। গর্ভবতী নারীর শরীরে ডায়াবেটিস থাকলে গর্ভের শিশুটিও ডায়াবেটিসে আক্রান্তের ঝুঁকি থাকে। অথচ, প্রাথমিক ভাবে ডায়াবেটিস ধরা পড়লে চিকিৎসার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণে আনা যায়। কিন্তু ধরা না পড়লে মায়ের পাশাপাশি শিশুর যথেষ্ট ক্ষতির আশঙ্কা থাকে। তাই সচেতন হওয়ার পাশাপাশি যত দ্রুত সম্ভব শরীরে ডায়বেটিস রয়েছে কিনা তা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। আর আগে বয়স্করা ডায়াবেটিসে বেশি আক্রান্ত হলেও বর্তমানে ৩০ থেকে ৪৫ বছর বয়সীদের শরীরে ডায়াবেটিস বেশি ধরা পড়ছে বলে জানান হাসিনা আক্তার লিপি। বেশি বেশি ধূমপান, ক্রুটিযুক্ত খাদ্যাভাস ও শারীরিক পরিশ্রম না করার কারণেই তরুণরা এ রোগে বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন বলে মনে করেন তিনি।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে ডায়াবেটিস আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বর্তমানে ৪২৫ মিলিয়ন (৪২ কোটিরও বেশি)। ২০৩০ সালের মধ্যে ডায়াবেটিস আক্রান্ত মানুষের এ সংখ্যা দাঁড়াবে প্রায় ৫৫ কোটিতে। আর বাংলাদেশে বর্তমানে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা প্রায় ৯০ লাখ। প্রতিবছর এ সংখ্যা বাড়ছেই। তবে শঙ্কার বিষয় হলো প্রতি দু’জন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের মধ্যে একজন এখনও জানতে পারছেন না যে তার ডায়াবেটিস রয়েছে। রোগ শনাক্ত করা গুরুত্বপূর্ণ। শনাক্ত করা না থাকলে ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। বর্তমানে সারাবিশ্বে ডায়াবেটিস রোগীর সংখ্যা বিবেচনায় বাংলাদেশের অবস্থান ১০ম স্থানে। এরই মাঝে আজ (১৪ নভেম্বর) পালিত হচ্ছে বিশ্ব ডায়াবেটিস দিবস। এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য হচ্ছে ‘আসুন পরিবারকে ডায়াবেটিসমুক্ত রাখি।’
বিশ্বজুড়ে ডায়াবেটিস রোগ ব্যাপক হারে বেড়ে যাওয়ায়, বিশ্ব ডায়াবেটিস ফেডারেশন (আইডিএফ) ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ১৯৯১ সালে ১৪ নভেম্বরকে ডায়াবেটিস দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। এদিন বিজ্ঞানী ফ্রেডরিক বেনটিং জন্ম নিয়েছিলেন এবং তিনি বিজ্ঞানী চার্লস বেস্টের সঙ্গে একত্রে ইনসুলিন আবিষ্কার করেছিলেন। দিবসটি উপলক্ষে চট্টগ্রামেও নেয়া হয়েছে নানা কর্মসূচি। চট্টগ্রাম ডায়াবেটিক সমিতির উদ্যোগে নগরীর ডায়াবেটিক জেনারেল হাসপাতাল প্রাঙ্গণে দিনব্যাপী নানা কর্মসূচি পালন করা হবে। কর্মসূচির মধ্যে বর্ণাঢ্য র‌্যালি ও সেমিনারের পাশাপাশি রোগী ও ডাক্তারদের মাঝে থাকছে উন্মুক্ত প্রশ্নোত্তরের পর্ব। তাছাড়া বিভিন্ন ডায়াবেটিক সেন্টারে ফ্রি ডায়াবেটিক স্ক্রিনিং কর্মসূচিও রয়েছে দিবসটি উপলক্ষে।
ডায়াবেটিসের জন্য চট্টগ্রামের একমাত্র বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান চট্টগ্রাম ডায়াবেটিক হাসপাতাল দীর্ঘ দিন ধরে ডায়াবেটিস আক্রান্ত রোগীদের সেবা দিয়ে আসছে। হাপাতালে প্রাপ্ত বয়স্ক (টাইপ-২) নিবন্ধিত (নিয়মিত চিকিৎসা সেবাগ্রহনকারী) রোগীর সংখ্যা বর্তমানে দুই লাখ ছাড়িয়েছে বলে হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে। এছাড়া অপ্রাপ্ত বয়স্ক টাইপ-১ (১- ১৮বছর) রোগীর সংখ্যাও কয়েক হাজার। আক্রান্ত রোগীদের সেবা দিতে চট্টগ্রাম ডায়াবেটিক জেনারেল হাসপাতাল শহরের বিভিন্ন এলাকার পাশাপাশি গ্রামে-গঞ্জেও শাখা স্থাপন করছে। এছাড়া খুলশীস্থ হাসপাতালে আউটডোর এবং ইনডোর দুই বিভাগেই সেবা প্রদান তো রয়েছেই।
খুলশীস্থ ডায়াবেটিক হাসপাতাল ছাড়াও নগরীর এনায়েত বাজার, বন্দর টিলা, কর্ণেলহাট মোস্তফা হাকিম ও অঙিজেন এলাকায় (মোট চারটি পয়েন্টে) সাব সেন্টার চালু করেছে ডায়াবেটিক সমিতি। চারটি সাব সেন্টারসহ নগরীর মোট ৫টি চিকিৎসা কেন্দ্রে আড়াই লাখেরও বেশি ডায়াবেটিস রোগী নিয়মিত চিকিৎসা নেন বলে জানান ডায়াবেটিক হাসপাতালের প্রধান পুষ্টি কর্মকর্তা হাসিনা আক্তার লিপি।

x