প্রাথমিকের স্কুল কমিটিতে স্নাতক ছাড়া সভাপতি নয়

সন্তান না পড়লে বিদ্যোৎসাহী সদস্য হওয়া যাবে না, এডহক কমিটি ৬ মাস

রতন বড়ুয়া

শনিবার , ২৩ নভেম্বর, ২০১৯ at ৩:৫৪ পূর্বাহ্ণ
257

ন্যূনতম স্নাতক ডিগ্রিধারী ছাড়া এখন থেকে আর কেউ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা কমিটির (এসএমসি) সভাপতি হতে পারবেন না। পুরনো নীতিমালা বাতিল করে সংশোধিত নীতিমালায় এসএমসি কমিটির সভাপতি পদে ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতার এ বিধান বাধ্যতামূলক করেছে সরকার। নতুন এ বিধান সংযোজন করে সংশোধিত নীতিমালাটি গত ১১ নভেম্বর প্রজ্ঞাপন আকারে জারি করেছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়ের বিদ্যালয়-২ শাখার উপসচিব জাহানারা রহমানের স্বাক্ষরে এ প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। প্রজ্ঞাপনটি ৬ নভেম্বর স্বাক্ষরিত হলেও ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে ১১ নভেম্বর।
সংশোধিত নীতিমালা অনুযায়ী, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা কমিটির (এসএমসি) সভাপতি নির্বাচিত হওয়ার ক্ষেত্রে প্রাথমিক যোগ্যতা হিসেবে সভাপতি প্রার্থীর সন্তানকে অবশ্যই ওই বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হতে হবে। পাশাপাশি প্রার্থীকে (সভাপতি) অবশ্যই ন্যূনতম স্নাতক ডিগ্রিধারী হতে হবে। আগের নীতিমালায় সভাপতি পদের শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্ধারিত ছিল না।
সভাপতির পাশাপাশি বিদ্যোৎসাহী সদস্যদেরও শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে সংশোধিত নীতিমালায়। কমিটির
বিদ্যোৎসাহী সদস্য হতে হলে এখন থেকে ন্যূনতম এসএসসি পাস হতে হবে। তাছাড়া বিদ্যোৎসাহী সদস্য হতে হলে তাঁর সন্তানকেও সংশ্ল্লিষ্ট বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হতে হবে। অর্থাৎ সন্তান স্কুলের শিক্ষার্থী না হলে কোন ব্যক্তি ওই স্কুলের এসএমসি কমিটির বিদ্যোৎসাহী সদস্য এবং সভাপতি হতে পারবেন না।
নীতিমালায় এসএমসি কমিটির সভাপতি ও বিদ্যোৎসাহী সদস্যের শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্ধারণের বিষয়টি ইতিবাচক হিসেবেই দেখছেন শিক্ষাবিদ ও শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা। সকল পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি ও সদস্য নির্বাচনের ক্ষেত্রে ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্ধারণ করা উচিত বলে মনে করেন চট্টগ্রাম শিক্ষাবোর্ডের সদ্য বিদায়ী চেয়ারম্যান প্রফেসর শাহেদা ইসলাম। তিনি বলেন, বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো মূলত ম্যানেজিং কমিটির মাধ্যমেই পরিচালিত হয়ে থাকে। সেক্ষেত্রে ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি বা সদস্যরাই যদি শিক্ষিত না হন, তাহলে তারা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কিংবা শিক্ষার উন্নয়নে কতটা ভূমিকা রাখবেন, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। তাছাড়া বেসরকারি স্কুল-কলেজের প্রধানদের উপরও ম্যানেজিং কমিটিকে খবরদারি করতে দেখা যায়। অথচ, খবর নিলে দেখা যায়- প্রতিষ্ঠান প্রধানের উপর খবরদারি করা ম্যানেজিং কমিটির ওই সভাপতি এসএসসিও পাস করেন নি। যা কারো কাম্য হতে পারে না। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কমিটির সভাপতি ও বিদ্যোৎসাহী সদস্য পদে শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্ধারণের বিষয়টিকে অবশ্যই স্বাগত জানাতে হয় জানিয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটির ক্ষেত্রেও এ ধরণের বিধান সংযুক্ত করা প্রয়োজন বলে অভিমত প্রফেসর শাহেদা ইসলামের।
মন্ত্রণালয় কর্তৃক জারিকৃত নীতিমালা অনুযায়ী- বিদ্যোৎসাহী সদস্য হিসেবে একজন পুরুষ এবং একজন মহিলা সদস্যকে মনোনীত করতে হবে। স্থানীয় সংসদ সদস্যের পরামর্শক্রমে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক এই দু’জন বিদ্যোৎসাহী সদস্য মনোনীত করবেন। ১১ সদস্যের কমিটিতে স্কুলের প্রধান শিক্ষক সদস্য-সচিবের দায়িত্ব পালন করবেন। কমিটির অন্যান্য সদস্যের মধ্যে বিদ্যালয়ের একজন জমিদাতা বা জমিদাতার উত্তরাধিকারী, সংশ্ল্লিষ্ট প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নিকটবর্তী যে কোন সরকারি/বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক/শিক্ষিকা (মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক কর্তৃক মনোনীত), সংশ্ল্লিষ্ট প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক/শিক্ষিকাদের মধ্য থেকে নির্বাচিত একজন শিক্ষক প্রতিনিধি, সংশ্ল্লিষ্ট বিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত ছাত্র-ছাত্রীদের অভিভাবকদের মধ্য থেকে নির্বাচিত দু’জন মহিলা অভিভাবক এবং দুজন পুরুষ অভিভাবক এবং ইউনিয়ন পরিষদের সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের সদস্য/পৌর এলাকার সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ড কমিশনার/সিটি কর্পোরেশনের কাউন্সিলর সদস্য হিসেবে থাকবেন। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক এবং শিক্ষক প্রতিনিধি ব্যতীত অন্য সদস্যদের মধ্য থেকে একজন সভাপতি এবং একজন সহ-সভাপতি নির্বাচিত হবেন। একই ব্যক্তি একাধিক্রমে দুইবারের অধিক একই বিদ্যালয়ের কমিটির সভাপতি হতে পারবেন না বলেও উল্লেখ করা হয়েছে নীতিমালায়।
বিদ্যালয়ের এডহক কমিটির মেয়াদও নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে সংশোধিত নীতিমালায়। এডহক কমিটির বিষয়ে নীতিমালায় বলা হয়েছে, ‘কোন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কোন যুক্তিসঙ্গত কারণে ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠন করা সম্ভব না হলে সাময়িকভাবে সর্বোচ্চ ৬ মাসের জন্য এডহক কমিটি গঠন করা যেতে পারে। এই সময়ের (৬ মাসের) মধ্যে এডহক কমিটিকে নিয়মিত কমিটি গঠনের কার্যক্রম সমপন্ন করতে হবে। অন্যথায় সংশ্ল্লিষ্ট প্রধান শিক্ষক এবং সহকারী উপজেলা/থানা শিক্ষা কর্মকর্তা সরকারি কর্মচারী (শৃক্সখলা ও আপিল) বিধিমালা ২০১৮ এর আওতায় অসদাচরণের দায়ে দায়ী হবেন বলেও নীতিমালায় বলা হয়েছে।
মন্ত্রণালয় কর্তৃক নতুন নীতিমালা জারির বিষয়টি নিশ্চিত করে চট্টগ্রামের জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. শহীদুল ইসলাম বলেন, নতুন নীতিমালার বিষয়ে আমরা অবগত হয়েছি। ইতোমধ্যে এসএমসি কমিটির মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়া সংশ্ল্লিষ্ট প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকদের নতুন নীতিমালা অনুযায়ী কমিটি গঠনের নির্দেশনা দেয়া হবে বলেও জানান তিনি।
প্রসঙ্গত, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন স্নাতক (পাস) ও অনার্স-মাস্টার্স কলেজের পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান হতে ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা ডিগ্রি পাস নির্ধারণ করা আছে। ২০১৫ সালে এই শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্ধারণ করা হয়। তবে বেসরকারি স্কুল, উচ্চ মাধ্যমিক কলেজ ও মাদ্রাসার ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি বা সদস্য হতে শিক্ষাগত যোগ্যতা এখনো নির্ধারণ করা হয়নি। এ নিয়ে আলোচনা হলেও পক্ষে-বিপক্ষের মতামত আসায় বিষয়টি থমকে আছে। যদিও মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি ও সদস্য হতেও ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্ধারণ করা প্রয়োজন বলে মনে করেন শিক্ষাবিদসহ শিক্ষা সংশ্ল্লিষ্টরা।

x