প্রাচীন সভ্যতার সাক্ষী মিশরে আমরা

কাজী রুনু বিলকিস

মঙ্গলবার , ১৬ এপ্রিল, ২০১৯ at ১০:৩১ পূর্বাহ্ণ
76

এমন হাঁড়-কিপটে এয়ার লাইনস তো এ-জীবনে আর দেখিনি! মেন্যু ধরিয়ে দিয়ে বলে কিনা ংশু ংযড়ঢ় থেকে কিনে কিনে খাও! এয়ার এরাবিয়ার সুন্দরী গোলপী গালের মেয়েটি গটগট করে সামনে হেঁটে চলে গেল। মনে মনে বলি এমন সুন্দর মুখে এমন নিষ্ঠুর বাণী! দেশি-বিদেশি কত এয়ার লাইন্সে চড়েছি এমন অভিজ্ঞতা এই প্রথম। আমরা চট্টগ্রাম থেকে শারজা সেখান থেকে রাত বারটায় কায়রোর উদ্দেশ্যে রওনা হব। আমরা নয়জনের একটা ছোট্ট গ্রুপ। আমাদের গ্রুপে আছি আমরা দুই দম্পতি, বাকিরা সবাই বৌদের ফাঁকি দিয়ে ব্যাচেলার হয়ে এসেছে। আমার স্বামীর ঘনিষ্ঠ বন্ধু জানে আলম সাহেব। এনাম ভাই, মিটু ভাবি, আরশাদুর রহমান, মনোয়ার হোসেন ও অনুপদা। সময়টা চমৎকার শীত শেষ হয়ে আসার পথে। ডিসেম্বরের এক তারিখ ২০১৮ সাল। বেলা দুইটার দিকে আমরা শারজা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছালাম এখানেই অপেক্ষায় থাকতে হবে রাত বারটা পর্যন্ত। ভিআইপি লাউঞ্জে ঢুকে আমরা বুফে লাঞ্চের দাওয়াত পেলাম। বৈচিত্র্যময় খাওয়া দাওয়া বিশেষ করে লেবানিজ ও ইন্ডিয়ান খাবার দেখে এয়ার এরাবিয়ার কিপটামির কথা বেমালুম ভুলে গেলাম। এই নয়জনের মধ্যে আমি আর মিঠু ভাবি সংখ্যালঘু। দেশে সামনে নির্বাচন, দেশের পরিস্থিতি এসব নিয়ে তুমুল ঝড়ো সংলাপে লাউঞ্জ একেবারে মুখরিত। মনে হয় যেন সব সমস্যার সমাধান শারজার এই ভিআইপি লাউঞ্জে উনাদের হাতে। এক সময় বিরক্ত হয়ে আমি আর মিঠু ভাবি বেরিয়ে পড়লাম ওরা টেরই পেলো না। বিভিন্ন Tax free shop এ ঢুঁ মারতে মারতে এক সময় হঠাৎ চোখে পড়ল খড়ের তৈরি কুঁড়েঘরের আদলে একটা কর্ণার। ঐখানে দাঁড়িয়ে আছেন এরাবিয়ান এক ভদ্রলোক হাতে সুন্দর একটা পাত্র। মানুষকে কি যেন পরিবেশন করছে ঐ পাত্র থেকে। সামনে বসার সারিবদ্ধ সিটে বসে কেউ কেউ সে পানীয় আনন্দের সাথে পান করছে। আমাদের দেখে ইশারায় কাছে ডাকলো। আমরা ইতস্তত করে কাছে যেতে পিছনের টেবিলে রাখা কাপ নিয়ে সেই পানীয় ঢেলে দিল। পরে জানলাম এটার নাম ঘাওয়া। আরবদের খুব জনপ্রিয় পানীয়। খুব যে ভাল লেগেছে তা নয়। তবে ঠাণ্ডার মধ্যে গরম কিছু খেতে ভালই লাগলো। এর মধ্যে আমাদের খুঁজতে খুঁজতে সবাই হাজির। পতিদেব একটু রাগ করলেও ঘাওয়া খেয়ে ঠাণ্ডা হয়ে গেল। রাত বারটায় আবারো এয়ার এরাবিয়াতে করে কায়রোর উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। এশিয়া থেকে আফ্রিকা, কায়রোর বিশাল এয়ারপোর্টে যাবতীয় কাজ সারতে-সারতে আমাদের গাইড মোহাম্মদ ইসমাইল এসে হাজির। সুদর্শন স্মার্ট মিশরীয় যুবক। বাইরে এসে দেখলাম আমাদের নয়জনের জন্য অপেক্ষা করছে ষাটজনের বিশালাকার বাস। সেই সাথে বিশালদেহী ড্রাইভার আব্বাস।
প্রায় সাড়ে চার ঘণ্টা সময় লেগেছে। কায়রো শহর তখনো জাগেনি। ভোরের সূর্য আমাদের অভিবাদন জানাচ্ছে। যেতে যেতে দেখে নিচ্ছি তাদের রাস্তাঘাট, দোকানপাট, স্থাপত্যের ধরনে ইমারত, পুরনো শহর তেমন চাকচিক্যময় কিছু চোখে পড়ল না। নতুন কিছু আকাশচুম্বী বিল্ডিং তৈরি হচ্ছে। বেশিরভাগই অপরিচিত ডিজাইনে তৈরি ছোট জানালার বিল্ডিং চোখে পড়ল। আরো এগুতেই চোখে পড়ল নীল নদ, তাহেরি স্কোয়ার, মন্দির টাইপের কিছু স্থাপত্য। আমরা ছুটছি আমাদের জন্য নির্ধারিত হোটেলে। এর মধ্যে আমাদের গাইড জানিয়ে দিল আজকের প্রোগ্রাম। সকাল দশটায় আবার বের হতে হবে। অবশেষে পৌঁছলাম পিরামিড পার্কে। বিশাল এলাকা জুড়ে এই পাঁচতারকা হোটেল। রুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে সরাসরি ডাইনিং-এ। মিশরীয় ঐতিহ্যবাহী নানা পদের খাবার সাজানো। সবচেয়ে তৃপ্তির সাথে খেলাম কাঁচা খেজুর। এত মজার খেজুর আর কখনো পাইনি। খেলাম ও হাত ভরে নিয়েও নিলাম। সবাই একই কাজ করলেন। এরপর কায়রোর দর্শনীয় স্থানের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়লাম। প্রথমেই পিরামিড। পাঁচ হাজার বছরের ইতিহাস বুকে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে চতুর্থ রাজবংশীয় ফারাও খুফুর বিশাল পিরামিড। নীল নদের পশ্চিম তীরে মিশরের রাজধানী কায়রো। শহরের দক্ষিণে গড়ে উঠেছে মৃতের নগরী। দ্যা নেক্রোপলিশ আর মেমদিস। সেই মৃত্যু নগরীর সেরা আকর্ষণ গির্জার পিরামিডত্রয়ী। এছাড়াও রয়েছে রাণীদের আলাদা পিরামিড। কায়রোর দক্ষিণ প্রান্ত জুড়ে নীল নদের পশ্চিম তীর পর্যন্ত বিশাল এলাকা জুড়ে মিশরের বিশ্বখ্যাত মিরানিম প্রান্তর প্রায় চার হাজার বছরের পুরানো। প্রাচীন এই সমাধির শ্রেষ্ঠ আকর্ষণ গির্জার তিনটি পিরামিড। সবচেয়ে বড়টি চতুর্থ রাজবংশীয় ফারাও খুয়ারুর। অন্য দুটি খুফু ও মেনফুরার পিরামিড। মিশরের স্থাপত্য প্রধানত এক ছকে বাঁধা। পিরামিডের অন্দরমহল মূলত তিনটি ভাগে বিভক্ত। সর্বনিম্ন স্তরে অর্থাৎ পিরামিডের ভিতের উপর পাথর কেটে তৈরি ফারাওদের সমাধি। নীচে গহ্বরের ভেতর যাওয়া খুবই কঠিন। যাওয়ার বৃথা চেষ্টা করে আমরা ফেরত আসি। পিরামিডের আশেপাশে মিশরীয়রা ভাল বাণিজ্যের ফাঁদ পেতে রেখেছে। এদের দেখে বোঝা যায় এদেশের অর্থনীতির অবস্থা। পর্যটকদের আকর্ষণ করার জন্য মহিলাদের বিভিন্ন ধরনের অলংকার, মিশরীয় ঐতিহ্যবাহী নানারকম স্যুভেনির। এছাড়াও লম্বা লম্বা লোকগুলো উটকে রঙ্গীন চাদর পরিয়ে ঘুরঘুর করছে পিছন-পিছন। উটের পিঠে তোলার জন্য। একপাক ঘুরিয়ে পর্যটকদের কাছ থেকে কিছু টাকা আদায় করে নিচ্ছে। টাকা মানে ইজিপসিয়ান পাউন্ড। এর পরেই প্যাপিরাস ইনস্টিটিউট। আশেপাশে রয়েছে আরও অনেক প্যাপিরাসের দোকান। এখানে গেলে দেখা যাবে বিশেষ একটি ঘাস থেকে কেমন করে তৈরি হয় এই কাগজ। তার উপর বিভিন্ন রং দিয়ে তৈরি হয় মিশরে ফারাওদের ছবি। দুপুরে একটা হোটেলে খেয়ে নিলাম। ওদের ভাতটা অসাধারণ। শুধু খাওয়া যায়। আমাদের দেশের বিনি ভাতের মতো না হলেও কিছুটা কাছাকাছি। মাংসটা একটু অন্যরকম। কাবাব বলব না কি বলব বুঝতে পারছি না। এছাড়া রয়েছে খবুজ ও গ্রীল চিকেন। খাওয়া শেষে বিরাট থালে করে নানারকম ফল বিনা পয়সায় দেওয়া হয়। খাওয়াদাওয়া শেষে ছুটলাম কায়রো মিউজিয়ামের দিকে। এই জাদুঘরের মূল আকর্ষণ মমি। একটি নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় এই সারি সারি মমিগুলো রাখা হয়। এখানে রয়েছে ফারাও এবং তাদের রাণীদের মমি। রয়েছে সবচেয়ে কম বয়সী ফারাও টুতানখামেনের মমির কাসকেট ও গয়না। সুন্দর কারুকার্যময় গহনাগুলো পর্যটকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। এছাড়া রয়েছে বেহেশতে যাওয়ার যান নৌকা। ফারাও অন্যান্য নিত্য ব্যবহার্য জিনিসপত্রের সাথে নৌকা ও সমাধিতে রাখতেন যেন বেহেশতে যেতে কোনো অসুবিধা না হয়।

মিশরীয় সভ্যতা পাঁচ বছরের পুরনো। সেই ছোটবেলা থেকে শুনে আসছি পিরামিডের গল্প। আর দাদী নানীদের কাছ থেকে ফেরাউনের গল্প। তারা ফেরাউনের নিষ্ঠুরতার গল্প বলতে বলতে কান্নাকাটিও করতেন। সেই তিন হাজার বছরের পুরানো ফেরাউনের মমিও কিন্তু রাখা আছে এই মিউজিয়ামে। আমাদের হাতে সময় খুব কম আগামীকাল সকালে যাব আর এক রহস্যময় নগরী আলেকজান্দ্রেরিয়ায় অষধীধহফবৎ ঃযব মৎবধঃ-এর নামে রাখা হয় এই বন্দর নগরীর নাম। ভূমধ্যসাগরের তীরে দাঁড়িয়ে আছে প্রাচীন ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে। আলেকজান্ডারের বীরত্বের কাহিনী যেমন আছে তেমনি আছে রাণী ক্লিওপেট্রার প্রেমের ও তার অসাধারণ রুপ আর বুদ্ধিমত্তার কাহিনী। অসাধারণ সুন্দর এই নগরীতে রয়েছে প্রাচীন সপ্তম আশ্চর্যের বাতিঘর, লাইব্রেরি ও আরও দর্শনীয় অনেককিছু। এসব নিয়ে আগামী সংখ্যায় লেখার ইচ্ছে রইল।

x