প্রভাবশালীদের সুদ মওকুফ বন্ধে সরকারকেও দৃঢ়তা দেখাতে হবে

বৃহস্পতিবার , ১৩ জুন, ২০১৯ at ৫:০৪ পূর্বাহ্ণ
49

‘বিপদগ্রস্ত’ গ্রাহকের সুদ মওকুফ্‌ ব্যাংকিং ব্যবস্থার সাধারণ নীতি। যদিও বাংলাদেশে এ নীতির অপব্যবহারের অভিযোগ বহুদিনের। গ্রাহকের সুদ মওকুফ্‌ না করে প্রভাবশালী ও ইচ্ছাকৃত ঋণ খেলাপিদের সুদ অনেক ব্যাংক মওকুফ করে দিচ্ছে। শুধু গত ১০ বছরেই ব্যাংকগুলো গ্রাহকদের ঋণের সুদ মওকুফ করেছে প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকা। যদিও মওকুফ না করা হলে এ টাকার পুরোটাই মুনাফায় যুক্ত হতো ব্যাংকগুলোর। সম্প্রতি প্রকাশিত বাংলাদেশ ব্যাংকের ফিন্যান্সিয়াল স্ট্যাবিলিটি রিপোর্টের তথ্য বলছে, শুধু ২০১৮ সালেই দেশের ব্যাংকগুলো ১ হাজার ১৯৪ কোটি টাকার সুদ মওকুফ করেছে। ২০১৭ সালেও রেকর্ড ১ হাজার ৭৫৩ কোটি টাকা সুদ মওকুফ করেছিল ব্যাংকগুলো। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, খেলাপি ঋণ বাড়ার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে প্রতি বছরই ব্যাংকগুলোর সুদ মওকুফের আবেদন বাড়ছে। পুনঃ তফসিল, পুনর্গঠন ও এক্সিট বা এককালীন ঋণ পরিশোধের সময় গ্রাহকরা সুদ মওকুফ সুবিধা নিচ্ছেন। তবে রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে প্রভাবশালীরা বছরের পর বছর ধরেই সুদ মওকুফ করে নিচ্ছেন। এক্ষেত্রে সামনের সারিতে আছে বেসরকারি ব্যাংক পরিচালকদের নামে-বেনামে নেয়া ঋণ। খেলাপী ঋণ কমিয়ে ব্যালেন্সশিট স্বচ্ছ দেখাতে ব্যাংকগুলো বাধ্য হয়েই সুদ মওকুফ করছে বলে মনে করেন ব্যাংক নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান ও ঢাকা ব্যাংকের পরিচালক (এমডি)। পত্রিকান্তরে সম্প্রতি এ খবর প্রকাশিত হয়।
উপরোক্ত খবরে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোয় ব্যাংক খাতে ঋণ অনিয়ম বাড়ার সাথে সাথে সুদ মওকুফও বেড়ে চলেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্যানুযায়ী, গত ১০ বছরে ব্যাংকগুলো গ্রাহকদের ঋণের সুদ মওকুফ করে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোয় যেমন সুদ মওকুফ ঘটছে, তেমনি বেসরকারি ব্যাংকগুলোও এক্ষেত্রে পিছিয়ে নেই। তবে পরিতাপের বিষয় হলো, এক্ষেত্রে ব্যাংকিংয়ের বিদ্যমান নিয়ম-নীতিগুলো যথাযথভাবে মেনে চলা হচ্ছে না। এটা ঠিক যে, ব্যাংকিং ব্যবস্থায় সুদ মওকুফ একটি নিয়মানুগ প্রক্রিয়া। ব্যাংককে বিভিন্ন খাতে অর্থায়ন করতে হয়। কিছু ভালো গ্রাহক অনেক সময় ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে লোকসান দিতে পারেন। বিভিন্ন ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণেও ব্যবসা-বাণিজ্যে খারাপ প্রভাব পড়তে পারে। সেসব ক্ষেত্রে ব্যাংকের টাকা পুনরুদ্ধারে বিশেষ পরিস্থিতিতে সুদ মওকুফের বিষয়টি চলে আসে। তবে এক্ষেত্রে অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা অবশ্যই পরিপালন করতেই হয়। চাইলেই যে কোনো সুদ মওকুফ করা যায় না। সুদ মওকুফের ক্ষেত্রে ব্যাংকের যাতে কোন ধরনের ক্ষতি না হয়, সে দিকটিও আমলে নিতে হয়। কিন্তু দেশে এখন ঐসব কিছুর বালাই নেই। এখন দেশে গণহারে সুদ মওকুফের ঘটনা ঘটছে। অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে, মূলত প্রভাবশালী ও ইচ্ছাকৃত ঋণ খেলাপিদের চাপে অনেক ব্যাংক সুদ মওকুফ করে দিচ্ছে। এরই মধ্যে মওকুফ করা উল্লিখিত অর্থের বেশির ভাগ সুদই নাকি এভাবে মাফ করে দেওয়া হয়েছে। এটা ব্যাংকিং স্বাস্থ্য ও সুশাসনের পরিপন্থী। কাজেই ব্যাংক ব্যবস্থার সাধারণ নীতির অপব্যবহার বন্ধ করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নজরদারি ও সক্রিয়তা প্রয়োজন।
সাধারণত দুটি ক্ষেত্রে সুদ মওকুফ করা হয়ে থাকে। একটি হলো, দীর্ঘদিন ধরে যেসব ঋণ পরিশোধ করা হয় না। এককালীন পরিশোধের শর্তে ওইসব ঋণের কিছু সুদ মওকুফ করা হয়। তবে এক্ষেত্রে ব্যাংক যেন লোকসানের সম্মুখীন না হয়, অর্থাৎ মুল বিনিয়োগ ও ব্যয় যেন উঠে আসে সেদিকে লক্ষ্য রাখা হয়। দ্বিতীয়টি হলো, ঋণ পুনঃ তফসিলের সময় কিছু সুদ মওকুফ করা হয়। এটা করার ফলে ব্যাংকের দীর্ঘদিনের খেলাপি ঋণ আদায় হয়। এতে ওই ব্যাংকের বিনিয়োগ সক্ষমতা বেড়ে যায়, আবার আয়ও বাড়ে। সুনির্দিষ্টভাবে বলতে গেলে সুদ মওকুফের ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোর তহবিল ব্যয় আদায় সর্বাগ্রে নিশ্চিত করা হয়। অথচ বর্তমানে যেভাবে সুদ মওকুফ করা হচ্ছে, তাতে এসব বিষয় আমলে নেওয়া হচ্ছে না বলে খবর পাওয়া যাচ্ছে। মূলত খেলাপী ঋণ কমিয়ে ব্যালেন্সশিট স্বচ্ছ দেখাতে ব্যাংকগুলো এটা করছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। এ ধরনের পরিস্থিতি চলতে থাকলে ব্যাংকিং সুশাসন আরো তলানিতে গিয়ে ঠেকবে। বলা বাহুল্য, সুদ মওকুফ ব্যাংক-গ্রাহক সম্পর্কের ভিত্তিতেই হওয়া বিধেয়। কিন্তু বর্তমানে সেটা হচ্ছে না। বরং এক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাব ও সামাজিক প্রতিপত্তি কাজ করছে। যেখানে শুধু প্রকৃত ‘বিপদগ্রস্ত’ গ্রাহকের সুদ মওকুফের কথা, সেখানে রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে প্রভাব-শালীরা বছরের পর বছর ধরেই সুদ মওকুফ করিয়ে নিচ্ছেন। আবার এক্ষেত্রেও সামনের সারিতে রয়েছে বেসরকারি ব্যাংক পরিচালকদের নামে-বেনামে নেওয়া ঋণ। এটা স্পষ্টত ব্যাংকিং খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠার বিরাট বাধাস্বরূপ। সাম্প্রতিক সময়ে দেখা যাচ্ছে, ঋণ খেলাপিরা অনৈতিক সুযোগ-সুবিধা নেওয়ার জন্য সরাসরি বাংলাদেশ ব্যাংকের ওপর প্রচণ্ড চাপ প্রয়োগ করছে। দিন দিন পরিস্থিতি ক্রমেই খারাপ হচ্ছে। এটি দীর্ঘমেয়াদি ব্যাংকিং অনুশাসনের অন্তরায়। ব্যাংকিং খাত সঠিক ধারায় পরিচালিত করতে হলে এ ধরনের প্রবণতা বন্ধের বিকল্প নেই। এক্ষেত্রে শুধু কেন্দ্রীয় ব্যাংক নয়, সরকারকেও দৃঢ়তা দেখাতে হবে।

x