প্রথম নারী উপাচার্য পেল চবি

এই বিশ্ববিদ্যালয়কে বিশ্বমানের করাই আমার স্বপ্ন : ড. শিরীণ আখতার

চবি প্রতিনিধি

সোমবার , ৪ নভেম্বর, ২০১৯ at ৫:০২ পূর্বাহ্ণ
381

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম নারী উপাচার্য হিসেবে পূর্ণাঙ্গ নিয়োগ পেয়েছেন বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ড. শিরীণ আখতার। এ নিয়ে ১৭তম উপাচার্য হিসেবে তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হলেন তিনি।
গতকাল রোববার বিকেলে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের জ্যেষ্ঠ সহকারী সচিব নীলিমা আফরোজ স্বাক্ষরিত এত প্রজ্ঞাপনে তাঁকে উপাচার্য নিয়োগের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়।
দায়িত্ব পাওয়ার পর গতকাল দৈনিক আজাদীর সাথে একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘উপাচার্য হিসেবে আমার স্বপ্ন অনেক। আমি সাহিত্যের ছাত্রী, স্বপ্ন দেখি একদিন আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় বিশ্বমানের হবে। আমাদের অনেক মেধাবী শিক্ষক রয়েছেন। তারা গবেষণার মাধ্যমে অনেকগুলো পেপার গড়ে তুলেছেন। কিন্তু সেগুলো ভালোভাবে সাইটেশন হয় না। আমাদের আইসিটি সেন্টারকে বলেছি, যেন সাইটেশনের মাধ্যমে শিক্ষকদের গবেষণাগুলো সুন্দরভাবে সংরক্ষণ ও প্রকাশের ব্যবস্থা করা হয়। যাতে করে বিশ্বের মানসম্পন্ন বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সেগুলো যুক্ত করতে পারে।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিবাচক দিকগুলো তুলে ধরতে তিনি সাংবাদিকদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘একটু এই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতি খেয়াল রাখবেন। এখানে শুধুই খারাপ জিনিসই হয় না। ভালো জিনিস এর কয়েকশগুণ বেশি হয়। তবে সেগুলো তেমন মিডিয়ায় আসে না।’ তিনি বলেন, ‘আমাদের ভর্তি পরীক্ষার আগে আইসিটি সেন্টারে সিওর ক্যাশ চালু করা হয়েছে। সেখানে তারা একটি ক্যারিয়ার হান্টের জায়গা করেছিল। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের ৭৫ জন শিক্ষার্থীর সেখানে চাকরি হয়েছিল। আমি তাদেরকে বলেছি, আগামীতেও যেন শিক্ষার্থীদের ট্যালেন্ট খুঁজতে এসব আয়োজন অব্যাহত রাখে। এর আগে রাজশাহী ও জাহাঙ্গীর নগরে এমন আয়োজন করা হয়। তার মধ্যে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই সর্বোচ্চ শিক্ষার্থী চাকরি পেয়েছে।’
এডুকেশন ফেয়ারের আয়োজনের কথা জানিয়ে ড. শিরীণ বলেন, ‘আমি ব্যাংক, চেম্বার ও ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানকে বিশ্ববিদ্যালয়ে আমন্ত্রণ জানাব। ইচ্ছে আছে, আগামী জানুয়ারিতে একটি এডুকেশন ফেয়ারের আয়োজন করার। যেখানে মেধাবীদের যাছাই-বাছাই করে বিভিন্ন জায়গায় চাকরির সুযোগ করে দেয়া হবে। এছাড়া আমাদের বিভিন্ন ব্যাংকগুলোর সাথে এমইউ করা থাকে। এর মধ্যে যেসব ব্যাংক ভালো মুনাফা দেয় সেগুলোতে আমরা প্রমিভেন্ট ফান্ডগুলো সংরক্ষণ করি। তাই ওইসব স্থায়ী ব্যাংকগুলো সাথে আমরা শিক্ষার্থীদের ক্যারিয়ার গঠনের বিষয়ে কাজ করব।’
আবাসন সংকট নিরসনের চেষ্টা করা হবে জানিয়ে ড. শিরীণ বলেন, ‘আমাদের অনেক কাজ আছে। আমাদের আবাসিক হলগুলোর অবস্থা খুবই নাজুক। শিক্ষার্থীরা ঠিকমতো সিট পাচ্ছে না। মেয়েদের পাশাপাশি ছেলেদেরও পর্যাপ্ত হল নেই। তাই আমাদের মাস্টারপ্ল্যান করতে হবে। এরপর হলগুলোতে ব্যাপকভাবে সিট বর্ধিত করার চেষ্টা করব। আমাদের অনেকগুলো স্থাপনার কাজ বন্ধ হয়ে আছে। খুব দ্রুত সেগুলোর কাজ চালু করতে হবে। এছাড়া আরও কয়েকটি হল নির্মাণও করা জরুরি। শিক্ষকদেরও আবাসন সংকট রয়েছে। অনেক শিক্ষক বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে শহরে চলে এসেছে। বাড়ি ভাড়া বেশি হওয়ায়, ভালো স্কুল না থাকায় বাচ্চাদের ঠিকমতো স্কুলে পাঠাতে না পারা এবং নাজুক স্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য এমনটি হচ্ছে। আমি এই তিনটি বিষয়ে একটু নজর দেয়ার চেষ্টা করব।’
মৌলবাদ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়কে মুক্ত রাখার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে মৌলবাদের ইতিহাস ছিল। তবে গত কয়েকবছর ধরে মৌলবাদের উত্থান আমরা দেখছি না। ১০ বছর ধরে মৌলবাদ একটু অন্তরালে চলে গেছে। আমাদের বর্তমানে প্রগতিবাদী ছাত্রসংগঠনগুলো রয়েছে। তাদের মধ্যে মাঝে মাঝে কিছু ঝামেলা হয়, পরে সেটি আবার মিটমাট হয়ে যায়।’
তিনি বলেন, ‘ছাত্র সংগঠনগুলোকেও আমাদের একটু নজরদারিতে রাখতে হবে। যেন এই প্রগতিবাদী ছাত্রসংগঠনের মধ্যে কোনো মৌলবাদ ঢুকে না পড়ে। পাশাপাশি আমাদেরকে মাদক ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি অব্যাহত রাখতে হবে।’
নারী-পুরুষ সবার জন্য সমানভাবে কাজ করার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এখানে নারী বলে কোনো কথা নেই। এখন আমি উপাচার্য হয়েছি, তাই নারী এবং পুরুষ আমাকে সমানভাবে দেখতে হবে। সর্বপ্রথম কোনো রকমের দুর্নীতি, অন্যায় ও অসত্যের মধ্যে যেন কিছু না ঘটে তা আমাকে দেখতে হবে।’
নারীদের সহযোগিতায় কাজ করার আশ্বাস জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমি রুটিন দায়িত্ব পাওয়ার পর পরই একজন মহিলাকে সহকারী প্রক্টরের দায়িত্ব দিয়েছি। আমাদের এখানে মহিলাদের আরও কাজে লাগাতে চেষ্টা করব। বিশ্ববিদ্যালয়ে মহিলাদের অনেক দিন ধরে দাবি আছে, একটি ডে-কেয়ার সেন্টার চালু করার। আমি সেটি চালু করার চেষ্টা করব। মহিলাদের পরিচালিত স্কুলটিকেও আরও ভালো পর্যায়ে নিয়ে যেতে চেষ্টা করব। আর আমি মহিলাদের বলব, মহিলা বলে আপনারা পিছিয়ে থাকবেন না। শিক্ষা-দীক্ষা ও কর্মক্ষমতায় সব ক্ষেত্রে এগিয়ে যেতে হবে। সেজন্য আমিও তাদেরকে নিয়ে কাজ করব।’
তবে চাকসু নির্বাচন নিয়ে এখনই চিন্তা করছেন না জানিয়ে ড. শিরীণ বলেন, ‘এখনো পর্যন্ত চাকসু নির্বাচনের চিন্তা করি নাই। এজন্য আরও একটু সময় নিতে চাই। আমি শিক্ষার্থী ও ছাত্রসংগঠনগুলোর সাথে এ বিষয়ে আলাপ-আলোচনা চালাব। তবে আমার ইচ্ছে আছে চাকসু নির্বাচন দেয়ার। তবে বেশ কিছু সমস্যা থাকায় সেটি করতে সময় লাগবে। সেজন্য ছাত্রসংগঠনগুলো সহাবস্থান ও একতা জরুরি।’
একপর্যায়ে দৈনিক আজাদী সম্পর্কে অনুভূতি ব্যক্ত করতে গিয়ে শিরীণ আখতার বলেন, ‘দৈনিক আজাদী আমাদের খুব প্রিয় পত্রিকা। প্রতিদিন চা আর বেলা বিসু্কটের সাথে দৈনিক আজাদী না হলে আমাদের চলে না। আমাদের পুরো পরিবারেই এমন।’ এসময় তিনি আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করে মহামান্য রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, শিক্ষামন্ত্রী ও শিক্ষা উপ-মন্ত্রীসহ সকলকে আন্তরিক শুভেচ্ছা ও ধন্যবাদ জানান।
এর আগে তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরীর মেয়াদ শেষ হওয়ার দু’দিন আগে গত ১৩ জুন প্রজ্ঞাপন জারি করে উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. শিরীণ আখতারকে রুটিন দায়িত্ব পালন করতে বলা হয়। ওই প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছিল, ‘চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ও প্রশাসনিক কাজের ধারাবাহিকতার স্বার্থে উপাচার্য পদে নিয়োগ না হওয়ায় পর্যন্ত উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. শিরীণ আখতার উপাচার্যের রুটিন দায়িত্ব পালন করবেন।’ অবশেষে চারমাস পর তাঁকে পূর্ণাঙ্গ উপাচার্যের পদে বহাল করা হয়।
উল্লেখ্য, শিক্ষা জীবনে শিরীণ আখতার ১৯৭৩ সালে কঙবাজার সরকারি গার্লস স্কুল থেকে এসএসসি, ১৯৭৫ সালে চট্টগ্রাম সরকারি গার্লস কলেজ থেকে এইচএসসি, ১৯৭৮ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ থেকে বিএ (অনার্স) ও ১৯৮১ সালে একই বিভাগ থেকে এমএ সম্পন্ন করে শুরুতে চট্টগ্রাম এনায়েত বাজার মহিলা কলেজে প্রভাষক হিসেবে যোগদান করেন। এরপর ১৯৯১ সালে ‘বাংলাদেশের তিনজন ঔপন্যাসিক শওকত ওসমান, ওয়ালিউল্লাহ ও আবু ইসহাক’ অভিসন্দর্ভের ওপর ভারতের যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৯৬ সালে তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে প্রভাষক পদে যোগদান করেন। এরপর ১৯৯৭ সালে সহকারী অধ্যাপক, ২০০২ সালে সহযোগী অধ্যাপক এবং ২০০৬ সালে অধ্যাপক পদে পদোন্নতি লাভ করেন। তার বাবা মৃত আফসার কামাল চৌধুরী কঙবাজার আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন।

x