প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরকে সংরক্ষণে যথাযথ পদক্ষেপ নিতে হবে

বেদখল হয়ে যাচ্ছে প্রত্নতাত্ত্বিক সম্পদ

শনিবার , ২৩ নভেম্বর, ২০১৯ at ৩:৫৮ পূর্বাহ্ণ
13

চট্টগ্রামে হাজী মোহাম্মদ মহসিন কলেজ সংলগ্ন এলাকার মাদ্রাসা পাহাড়ের চূড়ায় ক্ষতিগ্রস্ত একটি দ্বিতল ভবন। স্থানীয়ভাবে পরিচিত পতুর্গিজ ভবন নামে। আর ঐতিহাসিকদের কাছে ‘দারুল আদালত’। ২০১৪ সালেই ভবনটি সংরক্ষিত ঘোষণার উদ্যোগ নেয় প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর। কিন্তু চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) মালিকানা ছাড়তে রাজি না হওয়ায় ভবনটি এখনো সংরক্ষিত ঘোষণা করা সম্ভব হয় নি। দিনাজপুরের পার্বতীপুর উপজেলার ধাপের বাজার ঢিবিটির একাংশ দখল হয়ে গেছে। স্থানীয় ভূমিদস্যুরা সমবায় সমিতি ও অন্যান্য স্থাপনার মাধ্যমে দখল করে নিয়েছে পুরাকীর্তিটির একাংশ। ইতিহাস নির্মাণের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হিসেবে ধরা হয় প্রত্নসম্পদকে। পত্রিকান্তরে সম্প্রতি এ খবর প্রকাশিত হয়। প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন যে কোন জাতিরই অমূল্য সম্পদ। জাতির ইতিহাস ঐতিহ্য ও অস্তিত্বের সঙ্গে এ সম্পদ মিশে আছে। আমাদের বাঙালি জাতির ক্ষেত্রেও এটা সমানভাবে প্রযোজ্য। তাই এটা সংরক্ষণ করা হয়। দুঃখের বিষয়, আমাদের দেশে এ মূল্যবান সম্পদ যথাযথভাবে সংরক্ষণের এখনো কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয় নি। এরই ফলে ক্রমে হারিয়ে যাচ্ছে ঐতিহ্যের সাক্ষ্য মহা মূল্যবান প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন, প্রাচীন স্থাপত্য কাঠামো ও প্রত্ন নিদর্শন। সারাদেশে দুই হাজারের বেশি প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন চিহ্নিত করা হলেও মাত্র ৫০৯টি স্থাপনা সংরক্ষিত নিদর্শন হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। বাকি নিদর্শন সংরক্ষণের আওতায় না আসায় নষ্ট হচ্ছে। অথচ এগুলো ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার কাজটি করে আমাদের জাদুঘরগুলো। প্রত্নসম্পদ রক্ষায় প্রত্নতাত্ত্বিক অধিদপ্তরও গঠন করা হয়েছে। কিন্তু তারা এসব সম্পদ রক্ষায় ব্যর্থ হয়েছে। কোন কোন স্থানে প্রত্নসম্পদ বিনষ্ট হচ্ছে তাদের অবহেলা ও উদাসীনতায়। কোথাও কোথাও আবার প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহ্যের গায়ে কাঠের সিঁড়ি পর্যন্ত স্থাপন করা হয়েছে। এতে বিকৃত হয়ে গেছে প্রত্নতাত্ত্বিক সম্পদ। যদিও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন সংগ্রহ, সংরক্ষণ, প্রদর্শন ও গবেষণার জন্য যে জাদুঘর আমাদের আছে সেগুলো এখনো উনিশ শতকে পড়ে রয়েছে। এগুলোকে জাদুঘর না বলে উন্মুক্ত গুদাম বলা যায়। কারণ এগুলোয় কেবল সারিবদ্ধভাবে নিদর্শনগুলো প্রদর্শনের মাঝেই সীমাবদ্ধ রেখেছে তাদের কাজ। কিন্তু জাদুঘরকে আরো বেশি জনগণ সম্পৃক্ত করতে হবে। নতুন নতুন প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনকেন্দ্রিক শিক্ষা কার্যক্রম চালু করতে হবে। দেশের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন সুরক্ষায় প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ ও জাদুঘরগুলোকে একযোগে কাজ করতে হবে। তাহলে নতুন প্রজন্ম দেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্য সম্পর্কে জানতে পারবে। ভালোবাসতে পারবে দেশের মূল্যবান প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলোকে ও দেশের মানুষকে। দেশের সাংস্কৃতিক সম্পদ রক্ষায় সরকারের অগ্রণী ভূমিকা গ্রহণ করা জরুরি বলে মনে করেন প্রত্নতাত্ত্বিকরা। আইনের দ্বারা ঐতিহাসিক ইমারত ধ্বংস বন্ধ করতে হবে। পুরাকীর্তির গুপ্তভাণ্ডার প্রত্নপীঠগুলো সংরক্ষণ করতে হবে। একই সঙ্গে ‘রিটার্ন অ্যান্ড রেস্টিটিউশন অব কালচারাল প্রপার্টি আইনের মাধ্যমে বিদেশে পাচার হয়ে যাওয়া পুরাকীর্তিগুলো দেশে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিতে হবে। দেশে পুরাকীর্তি বিষয়ে তিনটি আইন বিদ্যমান: ‘ট্রেজারস ট্রুভ অ্যাক্ট ১৮৭৮’, ‘অ্যানশিয়েন্ট মনুমেন্টস প্রিজারভেশন অ্যাক্ট ১৯০৪’ ও ‘অ্যান্টিকুইটিজ অ্যাক্ট ১৯৪৭’। এই তিনটি আইনই ব্রিটিশ শাসনামলেই প্রণীত। আইনগুলো পাকিস্তান আমলে হুবহু আত্মীকৃত হয়েছিল। বাংলাদেশ সৃষ্টির পর একই অবস্থায় আইনগুলো কার্যকর করা হয়েছে। ‘ট্রেজারস ট্রুভ’ আইনের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, প্রাপ্ত সময় থেকে ১০০ বছরের পুরনো (১০ টাকা মূল্যের হলেও) মাটির নিচে থাকা যে কোন বস্তু পাওয়া মাত্র নিকটতম ট্রেজারিতে জমা করতে প্রাপক বাধ্য থাকবে। আইনটি ১৮৯১ ও ১৯০৭ সালে কিছু সংশোধন করা হয়। নানা কৌণিক ব্যাখ্যা করে আইনটির সংস্কার খুবই প্রয়োজন। ‘অ্যানশিয়েন্ট মনুমেন্টস প্রিজারভেশন অ্যাক্ট’ পুরাকীর্তির পাচার রোধ এবং ঐতিহাসিক ইমারত রক্ষা, প্রত্নতাত্ত্বিক, ঐতিহাসিক ও শিল্পকলার নিদর্শন সংগ্রহণ ও সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে প্রণীত হয়েছিল। পুরাকীর্তি পাচারের ক্ষেত্রে মৃত্যুদণ্ডের মতো কঠোর শাস্তির বিধান রেখে আইনটির সংশোধনী আশু প্রয়োজন। অ্যান্টিকুইটিজ (এক্সপোর্ট কন্ট্রোল) অ্যাক্ট আইন বলে সরকারি অনুমোদনক্রমে বিদেশে পুরাকীর্তি রফতানি করা যায়। এ আইনেও বিরাট ফাঁক রয়ে গেছে। যে কেউ কৌশল অবলম্বন করে দেশের মহামূল্য ওই জাতীয় সম্পদ সরকারের কাছ থেকে অনুমতি সংগ্রহ করতে পারে। সরকারের পক্ষ থেকে উচ্চ পর্যায়ের বিশেষজ্ঞ কমিটির দ্বারা প্রত্যায়নের বিধান এ আইনে অবশ্যই অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। বাংলাদেশের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে সংস্কৃতিকে ব্যবহার করতে হলে প্রয়োজন একটি কমিশন তৈরি করে ‘সাংস্কৃতিক নীতিমালা’ প্রণয়ন। প্রণীতব্য নীতিমালার মাধ্যমেই দেশের সাংস্কৃতিক সম্পদ রক্ষায় আইনগুলো সংস্কার করে হালনাগাদ করা সম্ভব। তাদের ভাষ্য, এসব কাজ যত দ্রুত সম্পন্ন করা যাবে ততই মঙ্গল। প্রত্নসম্পদ রক্ষায় সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সংস্থাগুলো বরাবরই উদাসীন। দীর্ঘদিন ধরে তাদের এই উদাসীনতার জন্য আমরা নিজস্ব অনেক ঐতিহ্য হারাতে বসেছি। রক্ষণাবেক্ষণে প্রয়োজনীয় অর্থ যেমন থাকে না, তেমনি পর্যাপ্ত জনবলও নেই। আর একটা বিষয় আমাদের এখানে ঘটে, তা হলো, প্রত্নসম্পদ সম্পর্কে গবেষণার জন্য তেমন সুযোগ না দেওয়া। দেশের প্রত্নসম্পদ রক্ষা করতে হলে সরকারকে এখনই বিষয়টিতে মনোযোগ দিতে হবে।
প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলোর যথাযথভাবে সংরক্ষণ ব্যবস্থা ও রক্ষণাবেক্ষণ করা না গেলে আমাদের ঐতিহ্যের ধারক ও বাহক এসব অমূল্য নিদর্শন অচিরেই বিস্মৃতির অতল গর্ভে হারিয়ে যাবে। এজন্য এ বিষয়ে সঠিক উদ্যোগ এখনই নিতে হবে। সেজন্য জনসাধারণকে সচেতন ও সম্পৃক্তকরণ, প্রত্নবস্তু সংরক্ষণে সংশ্লিষ্ট আইনকে যুগোপযোগী করা, পেশাজীবী দক্ষ জনবল তৈরি করা সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে জনগণের সম্পৃক্ততা বাড়িয়ে প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন সংরক্ষণে কাজ করা দরকার। সর্বোপরি গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের সচেতন ভূমিকা পালনের মধ্যে দিয়ে প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন সুরক্ষায় ও সংরক্ষণে জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা যেতে পারে।

x