প্রতি নন্দিনী

শনিবার , ১৩ জুলাই, ২০১৯ at ৬:০৭ পূর্বাহ্ণ
20

আমার প্রথম তারুণ্যের সে বীর, প্যারাসিট্যামল জ্বরকে যে তীব্র ঘৃণা করে, প্রলাপ বকা জ্বর, জ্ঞান হারিয়ে ফেলা ব্ল্যাক ফিভার না হলে যার চলে না। কোনো অসুখ, ব্যথা যাকে দীর্ঘ জীবনে ছুঁতে পারেনি সে এখন চেন্নাইয়ের এক হাসপাতালে মৃত্যুর সাথে লড়ছে। তার যন্ত্রণায় চেন্নাইয়ের বাতাসও বোধ হয় ভারি হয়ে উঠেছে। তাতে কী! এতে কিন্তু দমে যায় নি তার প্রবল মানসিক শক্তি। থেমে যায়নি জীবন নিয়ে রসিকতার অভ্যেসও। খানিক আগে সে ম্যাসেজ পাঠাল, ‘অপারেশন টেবিল থেকে ফিরতে পারলে তোমার সাথে ১০ কিলোমিটার দৌড়াতে চাই। যদি মরার সম্ভাবনা বুঝতে পারি, তোমাকে ভিডিও কল করে মরব।’
জীবন-মৃত্যুর মাঝে দাঁড়িয়ে থাকা এই যুবকের জন্য আমি শোক করি না। সে নিজেও করে না। শোক, কান্না এ-সমস্ত শব্দ ভীষণ অপছন্দ তার। ওই যে তুরস্কের কবি নাজিম হিকমত যেমন বলেন ‘বিংশ শতাব্দীতে মানুষের শোকের আয়ু বড়জোর একবছর’। ঋদ্ধ বলে, তারো কম। শোক না করে বরং যে শিশুরা রাষ্ট্রের অবহেলায় রেললাইনের ধারে ভাত-কাপড়ের অভাবে ঘুরে বেড়ায় তাদের নিয়ে ভাবো। বছরের পর বছর ওয়াসা, সিডিএ, করপোরেশনের সমন্বয়হীন রাস্তা খোঁড়াখুঁড়িতে যেসব শিশুর ফুসফুস ভর্তি হচ্ছে ধুলোবালিতে, হাঁপানি, অ্যাজমার মতো দীর্ঘমেয়াদী রোগে ভুগে আজীবন পঙ্গু হচ্ছে যেখানে ভবিষ্যত প্রজন্ম সেসব নিয়ে ভাবো। প্রয়োজনে রাস্তায় নেমে পড়ো। কুঁড়ো হয়ে কিংবা গ্যালারিতে হাততালি দিতে দর্শক হয়ে বসে থেকে জীবন কাটিয়ো না।
‘পৃথিবীতে একমাত্র তুমিই আমাকে বারবার পরাজিত করার শক্তি রাখো!’ আমার প্রতি তার এই নিবেদন আমার পৃথিবীজুড়ে চির বসন্তের জোয়ার আনে। এই প্রবল বৈরী সময়ে মানুষের বেঁচে থাকতে কতটা দম লাগে সেটা তুই নিশ্চয় ভালো করেই বুঝিস নন্দিনী। ঋদ্ধ আমার বেঁচে থাকার, সজীব থাকার সে প্রবল স্পিরিট। একদিন আমরা একসাথে পথচলার স্বপ্ন নিয়ে পৃথিবীর পথে হেঁটেছিলাম। সময় আমাদের গতিপথ আলাদা করলেও আমরা এখনো স্বপ্নতাড়িতের মতো দুজন দুজনের ছায়ায় বাঁচি। পিতৃতন্ত্রের প্রবল দম্ভে টিকে থাকা এই সমাজব্যবস্থার যাবতীয় রীতিনীতি অগ্রাহ্য করে আমাকে মানুষ-জীবন যাপনের সাহস দেয় ঋদ্ধ। আমি উপেক্ষার শক্তি পাই এ সমাজের চোরাগলিতে টিকে থাকা যাবতীয় কুপ্রথা।
মানুষের পূর্ণ অধিকার নিয়ে এখনো সহজ জীবন যাপনের অধিকার পায়নি কোনো নারী। এই সমাজে এমনকি পুরো বিশ্বে, বিশ্ব রাজনীতিতে নারী এখনো ঊনমানুষ। যেসব দলছুট নারী, সমাজের ভ্রূকুটি উপেক্ষা করে মানুষের জীবন বেছে নিয়েছে তারা সমাজের চোখে হয় শয়তান নয় চরিত্রহীন। এই আধুনিক সমাজব্যবস্থায় এসেও নারীকে এখনো দেখা হয় কেবল সেঙুয়াল সাবজেক্ট হিসেবে। একটু বোধ হয় ভুল হলো, ঠিক সাবজেক্টও নয়। যৌনতায়ও পুরুষের কাছে নারী স্রেফ অবজেক্ট। নারীর কোথাও কোনো স্বকীয় বৈশিষ্ট্য কিংবা ভূমিকা দেখতে এ সমাজ এখনো ঠিক মানসিক পক্কতা অর্জন করেনি। একদিন নিশ্চয়ই করবে। শয়তান বা চরিত্রহীন ট্যাগ খাওয়ার ভয় এড়িয়ে আমি মানুষের জীবন যাপনকেই বেছে নিয়েছি নন্দিনী।
আজ জীবন তোকে খাদের কিনারে এনে দাঁড় করিয়েছে। অথচ দেখ, নারী-পুরুষের জটিল সমীকরণের বাইরে গিয়ে মুক্ত আকাশে ঘুড়ি হয়ে উড়তে চেয়েছি তুই, আমি আশৈশব। সেসব স্বপ্ন হারিয়ে ফেলিসনে নন্দিনী। তোকে গ্রাস করতে চাওয়া সব শেকল এক ঝটকায় ছিঁড়ে ফেলে নিজের জন্য কল্যাণময় পথ বেছে নে। প্রবলভাবে বেঁচে থাক তুই, মৃতের মত নয়। হেসে খলখল করে জীবনের গান গা। একদিন যে প্রিয় ছিল, কাছের ছিল, সবচেয়ে বিশ্বস্ত ছিল সবসময়ের জন্য সে তা-নাও থাকতে পারে। মানুষের এই বদল, তোকে মেনে নিতে শিখতে হবে নন্দিনী। তাই সব শোক ভুলে যে জড়জীবন যাপন করছিস তার মুখে ছাই মেখে নিজের পথ বেছে নে। এ জীবন একান্তই তোর, একে যাপন করবি শুধুমাত্র তোর ইচ্ছেয়। হতাশার বলয় থেকে বের হওয়া কঠিন হলেও অসম্ভব নয়। কিন্তু তার জন্য নিজেকেই সমাধানের কৌশল আবিষ্কার করতে হবে।
বহুদিন পর একমাত্র অনুজের চিঠি পেলাম। বুঝতেই পারিনি মাঝরাতে দুঃস্বপ্নের ঘোরে কেঁদে ওঠা সে দিনের সে ছোট্ট মেয়েটি কবে এত বড় হয়ে গেছে। আমার প্রতি তার কোনো অনুযোগ নেই। তাও নিজেকে অপরাধী মনে হল খানিক। নিজের ব্যস্ত নাগরিক জীবনের ফাঁকে তার কথা সত্যিই বুঝি আলাদা করে ভাবার সময় পাইনি! তার চিঠিতেই টের পেলাম তার ব্যক্তি জীবন, চাকরি সব মিলে এক কঠিন ডিপ্রেশনের ফাঁদে আটকে গেছে তার সময়। হতাশা কাটাতে সে বাসাবদল করে তার এক বান্ধবীর সাথে সাবলেট উঠল। বহু লড়াই করে, পরিবারের মতের বাইরে গিয়ে, নিজের ইচ্ছের মূল্য দিয়ে প্রেমিক পুরুষের সাথে জীবন কাটানোর সিদ্ধান্ত নিতে সমর্থ হলো। তিলোত্তমা মজুমদারের ‘একতারা’ উপন্যাস পড়ে কাঁদতে কাঁদতে সে আমাকে চিঠি লিখল। ‘ভবিষ্যতের কথা কেইবা জানে! আজকের কথা বলি, আমরা একসাথে পথচলার সিদ্ধান্ত নিলাম।’ একতারা’র নায়িকা দেবারতির মাঝে সে কখনো নিজেকে, কখনো আমাকে খুঁজে পেয়েছে। দেবারতির সাহস, জীবনবোধ তাকে তাড়িত করেছে আমি উপলব্ধি করতে পারি। এই যে নিজেকে অতিক্রম করার চেষ্টা, ব্যক্তিউদ্যোগ, নিজের ক্ষমতার উপর বিশ্বাস সেসব হারালে চলবে না নন্দিনী।
একবার ইয়াবা সেবন করলে নাকি ৩৬ ঘন্টা চাঙ্গা থাকে মানুষ। আর স্রেফ ওই ৩৬ ঘন্টাই জীবন একজন ইয়াবাসেবীর কাছে। কিন্তু মানুষের জীবনের পরিধি অনেক বিস্তৃত, কত কাজ বাকি আমাদের! এত সহজে মুষড়ে পড়লে চলবে কেন? সামনের দিকে তাকিয়ে দেখ নন্দিনী। সময় দুইবাহু বাড়িয়ে আছে প্রাণচঞ্চল, উদ্দমী তোকে গ্রহণ করবে বলে।

x