প্রতিরোধে চাই স্বাস্থ্যকর নগরায় ও খাদ্যাভ্যাসের ভারসাম্য

শিশু-কিশোরদেরও ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়ছে

সোমবার , ১৬ মার্চ, ২০২০ at ৭:৪৪ পূর্বাহ্ণ
54

দেশে শিশু-কিশোরদের অনেকেরই শরীরে নীরবে বাসা বাঁধছে ডায়াবেটিসের ঝুঁকি। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা বলছেন মানবদেহে তিন থেকে ছয় মাস বা অনেক ক্ষেত্রে তারও বেশি সময় লুকিয়ে থাকতে পারে প্রি-ডায়াবেটিস। এটি একজন সুস্থ মানুষকে সারা জীবনের জন্য ডায়াবেটিসের রোগীতে পরিণত করে। বর্তমানে গ্রাম শহর সবখানেই বড়দের পাশাপাশি শিশু-কিশোরদের মধ্যেও এই প্রি-ডায়াবেটিসের প্রবণতা বেড়েছে। উঠতি বয়সীদের ডায়াবেটিস প্রতিরোধের লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালিত গবেষণায় এই ভয়ংকর তথ্য মিলেছে বলে পত্রিকান্তরে সম্প্রতি এক সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে।
কিশোর বয়সটা দুরন্তপনার। খেলাধুলা হৈ হুল্লোড়ে কেটে যায় এই বয়স ফলে এই বয়সের প্রতিরোধ ক্ষমতাও বেশি। অথচ আমাদের দেশের ৮ থেকে ১২/১৩ বছরের শিশু-কিশোরদের অনেকেরই শরীরে নীরবে বাসা বাঁধছে এমন বেদনাদায়ক ঘটনা খুব কমই হয়। শিশু কিশোররাই তো দেশের ভবিষ্যত। তারাই যদি ডায়াবেটিসের শিকার হয়ে শক্ত হয়ে পড়ে তাহলে সমাজ কর্মক্ষম ও সম্ভাবনাময় এক তরুণ যুবা প্রজন্মকে হারাবে। আর এর সামাজিক ও অর্থনৈতিক মন্দ প্রভাব পুরো জাতিকে স্থবির করে দিতে পারে। আরো যোগ হবে অন্ধত্ব, স্নায়ুরোগ কিডনি ও হৃদযন্ত্র বিকল হওয়া পা কাটা যাওয়া ইত্যাদি। এতে হাজার হাজার রোগী নিজেদের কর্মক্ষমতা হারিয়ে পরিবার ও সমাজের ওপর অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করে পরিস্থিতি আরো জটিল করে তুলতে পারে। তাই এ রোগকে প্রতিহত করতে হবে এবং প্রতিরোধ করার যথোচিত ব্যবস্থা নিতে হবে। মনে রাখতে হবে যে, বাংলা-দেশসহ উন্নয়নশীল দেশে খুব দ্রুত নগরায়ন হচ্ছে। মানুষের ওজন বৃদ্ধি পাচ্ছে, কায়িকশ্রম ও ব্যায়াম কমে যাচ্ছে, মানসিক চাপ বাড়ছে, খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন হচ্ছে। এসব কারণে আনুপাতিক হারে ডায়াবেটিস রোগীর সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে। অধিক ক্যালরিসমৃদ্ধ এবং অধিক চর্বি ও শর্করা জাতীয় খাদ্য গ্রহণের অভ্যাস শিশু কিশোরদের স্থূলতা বাড়াচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে খেলার মাঠের অভাব, বিদ্যালয়ে শরীরচর্চা ও খেলাধুলার সংস্কৃতি বিলোপ, টেলিভিশন আর কম্পিউটার গেম ও ফেসবুক, শহুরে অলস জীবন, গাড়ি লিফট ও চলন্ত সিড়ি ব্যবহারের প্রবণতা। আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কিংবা আশপাশে খেলার মাঠ নেই। নগরে ইমারতের পর ইমারত উঠছে কিন্তু বসবাসের জায়গা কমেছে। ফলে শিশুরা শরীরচর্চার সুযোগ পাচ্ছে না। এ পরিস্থিতিতে এখনই সচেতনতা বাড়ানো না গেলে ডায়াবেটিস জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় ধরনের সংকট হিসেবে দেখা দিতে পারে। ডায়াবেটিস শুধু ব্যক্তি বা পরিবারের ওপর আর্থিক চাপ সৃষ্টি করছে না, একই সঙ্গে দেশের অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এ প্রসঙ্গে বলা দরকার, ডায়াবেটিসের চিকিৎসায় একজন রোগীর পেছনে বছরে গড়ে ১৭ হাজার টাকা ব্যয় হয়। এটা হতদরিদ্র বা স্বল্প আয়ের পরিবারগুলোর পক্ষে বহন করা কঠিন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন সচেতনতার মাধ্যমে এখনই কার্যকরভাবে ডায়াবেটিসের লাগাম টেনে ধরতে না পারলে আগামী ১৫-২০ বছরের মধ্যে এ ব্যয়ভার সব কিছুকে ছাপিয়ে উঠবে। মনে রাখতে হবে ডায়াবেটিস একদিকে যেমন নানা ধরনের রোগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তেমনি অন্যদিকে কর্মক্ষমতা কমিয়ে দেয় যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ে পরিবারে এবং জাতীয় অর্থনীতিতে। ডায়াবেটিসের ওপর পরিবেশ ও জলবায়ুরও প্রভাব আছে, খাদ্যাভ্যাসের প্রভাবও কম নেই। অপরিকল্পিত নগরায়ন জলবায়ু পরিবর্তনকে ত্বরান্বিত করছে। দ্রুত ও দুর্বল নগরায়নের ফলে বিশ্বের অর্ধেক জনসংখ্যা এখন শহরে বাস করছে। এখানে আছে যন্ত্রচালিত পরিবহন ব্যবস্থা চলছে বস্তির বিস্তার, শরীরচর্চাবিহীন যাপিত জীবনে বাড়ছে বয়োবৃদ্ধ জনসম্পদ, হচ্ছে বনজ প্রাকৃতিক সম্পদ উজাড়, প্রাণিজ ও সুষম খাদ্যের জায়গা দখল করছে কলকারখানায় প্রক্রিয়াজাত কৃত্রিম অস্বাস্থ্যকর খাবার, পরিবর্তন হচ্ছে আহার প্রক্রিয়া, বাড়ছে বিশ্ব খাদ্য কৃষি ব্যবসা ও বিপণনে প্রতিযোগিতা। এ ধরনের পরিবেশ ডায়াবেটিস বিস্তারের অনুকূল।
বিজ্ঞানীরা বায়ুদূষণের সঙ্গে ডায়াবেটিসের সম্পর্ক দেখতে পেয়েছেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘদিন বায়ু দূষণের মধ্যে থাকলে বা এরকম পরিবেশে কাজ করলে ফুসফুসে ক্যান্সার ও হৃদরোগ দেখা দিতে পারে। এমন কি সেটা মস্তিষ্ক লিভার বা কিডনির দীর্ঘ মেয়াদি সমস্যাও সৃষ্টি করতে পারে। আইন বা প্রতিরোধের কোন কার্যকর ব্যবস্থা না থাকায় শুধু বায়ুদূষণময়, বাংলাদেশ আজ পানি, মাটি, শব্দদূষণেও বিশ্বে সবদেশের শীর্ষে অবস্থান করছে। ২০৩০ সালের মধ্যে আট বিলিয়ন বিশ্বজনসংখ্যার মধ্যে পাঁচ বিলিয়ন বাস করবে শহরে। এদের মধ্যে আবার দুই বিলিয়নই বাস করবে বস্তিতে। ফলে জীবনযাত্রায় জটিলতা বাড়তেই থাকবে, উন্নয়নশীল দেশগুলোর সামাজিক নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থা নানা অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার কাছে নতি স্বীকার করতে বাধ্য হতে থাকবে। কাজেই এখন থেকে ডায়াবেটিসের লাগাম টেনে ধরা ছাড়া অন্যকোন বিকল্প নেই। আর সেটা করতে হলে স্বাস্থ্যকর নগরায়ন ও খাদ্যাভ্যাসে ভারসাম্য অত্যাবশ্যক।.