প্রতিবন্ধীদের অধিকার আদায়ের পথ আরো প্রশস্ত করতে হবে

মঙ্গলবার , ৩ ডিসেম্বর, ২০১৯ at ৫:০৮ পূর্বাহ্ণ
27

আজ আন্তর্জাতিক প্রতিবন্ধী দিবস। ১৯৯২ সাল থেকে প্রতি বছর এই দিনটি বিশ্বব্যাপী ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর মর্যাদা সমুন্নতকরণ, অধিকার সুরক্ষা এবং উন্নয়ন সাধনের প্রতিশ্রুতি নিয়ে পালন করা হচ্ছে। দেশের রাষ্ট্রনায়ক থেকে সুশীল সমাজ সব পর্যায়ে সমভাবে উচ্চারিত হয় প্রতিবন্ধী ব্যক্তির ক্ষমতায়নের কথা; যার ব্যতিক্রম নয় বাংলাদেশও। রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, ক্রীড়া, সাংস্কৃতিকসহ জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধীদের সম্পৃক্ত করার সুফল সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করাও এই দিবসের লক্ষ্য।
দেশে বর্তমানে কত সংখ্যক প্রতিবন্ধী রয়েছে তার সঠিক কোনো পরিসংখ্যান নেই। প্রতিবন্ধীদের সংখ্যা নিয়ে সরকারি-বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলোর দেওয়া তথ্যে যথেষ্ট গরমিল রয়েছে। কোথাও বলা হচ্ছে, বর্তমানে ১৪ লাখেরও বেশি প্রতিবন্ধী রয়েছে। আবার বেসরকারি উন্নয়ন সংগঠনগুলো বলছে, দেশে প্রায় দেড় কোটি প্রতিবন্ধী আছে।
আবার এই বাংলাদেশে ১৬ কোটি মানুষের মধ্যে প্রায় ১০ শতাংশ জনগোষ্ঠী অর্থাৎ প্রায় এক কোটি ৬০ লাখ মানুষ কোনো না কোনো ধরনের প্রতিবন্ধীতার শিকার বলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক পরিসংখ্যানে উল্লেখ করা হয়েছে। এই বিশাল জনগোষ্ঠীর ২৮ শতাংশ শারীরিক, ৩২ শতাংশ দৃষ্টি, ২২ শতাংশ শ্রবণ ও বাক, ৭ শতাংশ বুদ্ধি, ১১ শতাংশ একাধিক বা বহুমাত্রিক প্রতিবন্ধীতার শিকার। ভিএইচএসএস-কান্ট্রি প্রোফাইল স্টাডি-২০০০ মতে, দেশে মোট প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর ১৩ শতাংশ দুর্ঘটনা, অসুস্থতায় ৪৪ শতাংশ, জন্মগতভাবে ২০ শতাংশ এবং অজানা কারণে হয় ১৪ শতাংশ মানুষ প্রতিবন্ধী। দেশে বর্তমানে ২৫.৬ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করে; যার ১৩ শতাংশ অতিদরিদ্র শ্রেণির। তথ্য মতে, প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর অর্ধেকেরও বেশির অবস্থান দারিদ্র্যসীমার নিচে। তাহলে সহজেই অনুমেয় দেশের মোট দরিদ্র জনগোষ্ঠীর একটি বৃহৎ অংশ প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠী। এই পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে উন্নয়নের মূল স্রোতধারায় সম্পৃক্তকরণে সরকারের এ মুহূর্তে প্রয়োজন প্রতিবন্ধীতাকেন্দ্রিক বিশেষ উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ। কারণ শুধু সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতায় কিছু ছোট প্রকল্প কিংবা বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের আওতায় ক্রস কাটিং ইস্যু হিসেবে অল্পসংখ্যক আর্থিক বরাদ্দ দিয়ে প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীকে ভিশন-২১ অর্থাৎ মধ্য আয়ের স্বাপ্নিক ইলেকট্রনিক ট্রেনের যাত্রী করা সম্ভব নয়। প্রতিবনন্ধীতার ধরন, মাত্রা আর সামাজিক অবস্থান এর জন্য মূলত দায়ী। অন্যদিকে, বিশ্বব্যাংক জরিপ-২০০৩ অনুযায়ী দেশে প্রতিবন্ধী শিশুর সংখ্যা ৩৫ লাখ থাকলেও স্কুলগামী প্রতিবন্ধী শিশুর সংখ্যা ছিল মাত্র ১৪ শতাংশ। ধরে নেওয়া হয়, বর্তমানে এ সংখ্যা প্রায় ২০ শতাংশের অধিক। এর মূল কারণ সামাজিক অসচেতনতা, প্রতিবন্ধী শিশুশিক্ষা বিষয়ে নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি, একীভূত শিক্ষার কার্যকর বাস্তবায়ন না হওয়া এবং প্রতি উপজেলায় কমপক্ষে একটি, বিশেষ করে এনডিডি (ডাউন্স, অটিস্টিক, সেরিব্রাল পালসি ও বুদ্ধি) শিশুদের জন্য বিশেষায়িত বিদ্যালয় না থাকা। এক প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রতিবন্ধী শিশুর অংশগ্রহণ পরিস্থিতি বিশ্নেষণ বিষয়ক সামপ্রতিক গবেষণায় দেখা যায়, অধিকাংশ প্রতিবন্ধী শিশু স্কুলে যায় না তাদের সহপাঠীর নেতিবাচক আচরণের কারণে। স্কুলগামী প্রতিবন্ধী শিশুর মধ্যে বেশিরভাগ নন-এনডিডি (শারীরিক, বাক, শ্রবণ ও দৃষ্টি) শিশু। এনডিডি শিশুদের মধ্যে মৃদুমাত্রার অতি-নগণ্য সংখ্যক শিশু স্কুলগামী। স্কুলগামী ছিল কিন্তু বর্তমানে স্কুলে যায় না, এ রকম প্রতিবন্ধী শিশুদের অধিকাংশ অভিভাবক মনে করেন, তাদের শিশুরা পড়াশোনা করতে পারবে না। একই চিত্র উঠে আসে শিক্ষকদের অভিমত থেকেও। এ রকম পরিস্থিতিতে এ কথা সত্য যে, একীভূত শিক্ষার কার্যকর বাস্তবায়ন এখনও সুদূরপরাভূত।
প্রতিবন্ধী বিষয়ক গবেষক ম. মাহবুবুর রহমান ভূঁইয়া তাঁর এক লেখায় বলেন, প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর ক্ষমতায়নের আরেকটি চালিকাশক্তি হলো কর্মসংস্থান। ইমপ্যাক্ট ফাউন্ডেশন কর্তৃক পরিচালিত জরিপ মোতাবেক দেশে মাত্র ৩৫ শতাংশ কর্মক্ষম প্রতিবন্ধী ব্যক্তি কর্মের সঙ্গে সম্পৃক্ত আছে। তথ্য মতে, ৮৭ শতাংশ প্রতিবন্ধী ব্যক্তি কর্ম পাওয়া সত্ত্বেও শুধু প্রতিবন্ধীবান্ধব কর্মপরিবেশ না থাকায় চাকরি ছেড়ে চলে যায়। বর্তমান সরকার প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে কর্মমুখী প্রশিক্ষণ, স্বল্প সুদে ঋণ প্রদান, ব্যবসার ক্ষেত্রে কিছু ছাড় এবং চাকরিক্ষেত্রে কোটার ব্যবস্থা। কিন্তু অপ্রিয় হলেও সত্য, প্রতিবন্ধী কোটা সরকারি, আধাসরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত কোনো প্রতিষ্ঠানে সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে না। যেমন সরকারি কর্মকমিশনেও প্রতিবন্ধী কোটা অনুসরণের দৃষ্টান্ত বিরল। এর পেছনে মূলত দায়ী নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি আর সিদ্ধান্ত গ্রহণপ্রক্রিয়ায় প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অংশগ্রহণ ও প্রতিনিধিত্বের অনুপস্থিতি। স্থানীয় পর্যায় থেকে জাতীয় পর্যায়ের সব স্তরে সিদ্ধান্ত গ্রহণপ্রক্রিয়ায় এ বিশাল জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ ও প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা আজ এক ন্যায্য দাবি। এই প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত হতে পারলেই প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর ক্ষমতায়ন সুনিশ্চিত হবে। শুধু আইনে অধিকার জিইয়ে রাখলেই হবে না, সেই অধিকার আদায়ের সক্ষমতার পথও প্রশস্ত করতে হবে।

x