প্রকৃত শিক্ষা : দুর্লভ হিরার চেয়েও মূল্যবান

ফেরদৌস আরা রীনু

বৃহস্পতিবার , ১২ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ at ৫:৪৪ পূর্বাহ্ণ
75

বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন, ‘আনন্দহীন শিক্ষা, শিক্ষা নহে। যে শিক্ষায় আনন্দ নাই, সেই শিক্ষা প্রকৃত শিক্ষা হতে পারে না।’ পূর্বে শিক্ষা বলতে বোঝানো হতো শিশুকে নিয়ন্ত্রণ করা বা শাসন করা। শিশুকে চার দেয়ালের মধ্যে বন্দী করে বিদ্যা দান করার যে পদ্ধতি তাকেই আমাদের এই অঞ্চলে শিক্ষা হিসেবে বিবেচনা করা হতো। কিন্তু এই বিদ্যা চাপিয়ে দেওয়া কিংবা পরীক্ষা ভালো ফলাফল লাভ করার নাম শিক্ষা হতে পারে না। এই পদ্ধতি একজন মানুষের জন্য সংকীর্ণ শিক্ষা। একজন মানব শিশুর গ্রহণ উপযোগী আনন্দঘন পরিবেশে শিক্ষাদানই হলো প্রকৃত শিক্ষা।
শিশুরা জাতির শ্রেষ্ঠ সম্পদ। আজ যে শিশু আগামীতে সে বড় হলে সমাজ তথা দেশ কিংবা গোটা বিশ্ব পরিচালনার দায়িত্ব নিয়ে গৌরবময় অধ্যায়ের সূচনা করবে। তাই শিশুর বেড়ে ওঠার জন্য প্রয়োজন উপযুক্ত পরিবেশ। শিশুমন হলো পাখির মতো মুক্ত। তার চোখে থাকে সাগরের বিশালতা। সে বাস করতে চায় অবাধ আকাশে। তাই সুশিক্ষার মাধ্যমে শিশুদের সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ে তোলা আমাদের নৈতিক এবং একান্ত দায়িত্বের মধ্যে পড়ে।
প্রকৃত শিক্ষার উদ্দেশ্য হলো জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে প্রকৃত মানুষ হয়ে ওঠা। কিন্তু আমাদের শিক্ষা পদ্ধতি এমনই যে এটি এখন হয়ে উঠেছে কেবল অর্থ লাভের উপায়। আমাদের আর্থ-সামাজিক অবস্থায় আমাদেরকে এমনটি করার প্রলোভন দিচ্ছে। অথচ মানুষের ভেতরে যে ‘মানুষ’ বাস করে সেই ভেতরের মানুষটিকে বের করে আনতে পারে কেবল সুশিক্ষা এবং স্বশিক্ষা।আমরা মনে করি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে গিয়ে পড়াশোনার সুযোগ যে মানুষ পায় না, সে শিক্ষিত নয়। এই ধারণা থেকে আমরা জগতে সকল পুঁথিগতহীন সৃজনশীল মানুষগুলোকে অশিক্ষিতের কাতারে সামিল করি এবং তাদের সাথে এমন আচরণ করি কেবল আমরাই পুঁথিগত বিদ্যাধর শিক্ষিত। অথচ আমাদের বুঝতে হবে আসলে প্রকৃত শিক্ষিত কারা এবং আমাদের শিক্ষার্থীদেরও ছোটবেলা থেকে এই শিক্ষা দিতে হবে যে পুঁথিগত বিদ্যা অর্জনকারী কেবল শিক্ষিত নন। শিক্ষা সভ্যতার বিকাশ ঘটায় শিক্ষায় মানুষকে অন্ধকার জীবন থেকে আলোতে নিয়ে আসে। সমাজে ঘাড় উঁচু করে, মেরুদণ্ড সোজা করে সবাই বাঁচতে চায়। মেরুদণ্ডহীন ভাবে বাঁচার মধ্যে কোন মর্যাদা নেই। আমরা অনেকেই নিজেকে শিক্ষিত বলে গর্ব করি। কিন্তু শিক্ষার আসল রূপ কী হওয়া উচিত সেই সম্বন্ধে অবগত নই। আমরা জানি শিক্ষা একটি জীবনব্যাপী প্রক্রিয়া। আর এই জীবনব্যাপী শিক্ষার বাস্তবায়নে চাই স্বশিক্ষা। লেখক প্রমথ চৌধুরী তার ‘বই পড়া’ প্রবন্ধে লিখেছেন, ‘সুশিক্ষিত লোক মাত্রই স্বশিক্ষিত।’ এই উক্তিতেই আমরা বুঝতে পারি কোন মানুষকে শেখানো যায় না, যদি না নিজে না শেখে। যে স্বশিক্ষিত সে নিজের অভিমত বিদ্যা নিজেই অর্জন করতে পারবে। যে মানুষ নিজের হৃদয় বৃত্তির প্রকাশ ঘটাতে পারে সেই স্বশিক্ষিত। আত্মিক উন্নয়ন মূলক শিক্ষা নিজেকেই অর্জন করতে হয়। শিক্ষাগ্রহণ শিক্ষার্থীর চাহিদা এবং ইচ্ছার উপর নির্ভরশীল হওয়া উচিত, বাবা-মায়ের ইচ্ছার উপর নয়। কিন্তু আমাদের সমাজব্যবস্থায় শিক্ষার্থীর স্বশিক্ষণ লাভ করার কোনো উপায় নাই। কেননা আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা হলো বিদ্যা চাপিয়ে দেওয়ার, শিখন প্রক্রিয়ার নয়।
প্রতিটি স্বাভাবিক শিশুই সৃজনশীল। সৃজনশীলতা হলো নিজের মতো করে কিছু করা, সবার চেয়ে আলাদা কিছু করা। প্রতিটি শিশুর মধ্যে এই সৃজনশীলতা সুপ্ত অবস্থায় বিদ্যমান থাকে। পুঁথিগত শিক্ষাকে গুরুত্ব না দিয়ে বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় জ্ঞান লাভের মাধ্যমে এই সুপ্ত অবস্থায় বিদ্যমান সৃজনশীলতাকে বাস্তবায়ন করতে পারাই প্রকৃত শিক্ষা অর্জন। প্রতিটি শিশু নিষ্পাপ, ফুলের মতো। সব শিশুর রুচি এবং চাহিদা এক রকম নয়। শিশুর রুচি ও চাহিদা অনুযায়ী তার মনের ভীতি দূর করে তাকে সৃজনশীল কাজে সহায়তা করা শিশুর বাবা-মা এবং প্রত্যেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কর্তব্য। শিশুর মাঝে মুক্ত চিন্তার বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়ে তাকে সঠিক পথে পরিচালিত করতে হয়। যেমন কোন শিশু হয়তো বইয়ের পড়া ভালো শিখতে বা লিখতে পারে না। কিন্তু সে সুন্দর করে কবিতা আবৃতি করতে পারে। আবার কোন শিশু গল্প লিখতে পারে।আবার অনেকে ভালো অভিনয় করতে পারে। কেউ কেউ ভালো ছবি আঁকতে পারে। কিন্তু আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কিংবা পরিবার শিশুদের এইসব প্রতিভা বিকাশে নিরুৎসাহিত করে। তাদের উপর পরীক্ষা ভালো করার চেষ্টা চাপিয়ে দেওয়া হয়।
ফলে এইসব শিশুর সহজাত প্রতিভা নষ্ট হয়ে যায় এবং তারা সৃজনশীল মানুষ হিসেবে গড়ে উঠতে পারে না। যদি তাদের প্রতিভাগুলো শিখন প্রক্রিয়ার মধ্যে নিয়ে আসতে পারি আমরা তাহলে এক একজন শিশু প্রকৃত শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে সৃজনশীল ও মানবিক মানুষে পরিণত হবে। চার দেয়ালের ভিতর শিশু যে শিক্ষা গ্রহণ করে স্বশিক্ষণ প্রক্রিয়ায় সে নিজে নিজে তার চেয়ে হাজারো গুণ ভালো শিক্ষা শিখে নিতে পারবে। একজন শিক্ষার্থী একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত আর্থিক উন্নয়নের জন্য পড়বে এবং প্রাপ্তি যোগ হলে পড়া ছেড়ে দিবে—-এই পদ্ধতি চিরস্থায়ী কিছু নয়, এটি মানুষকে লক্ষ্যহীন ও মূল্যবোধহীন করে দেয়। যে শিক্ষা আলো ছড়ায় না। সে শিক্ষা আত্মনির্ভর ও আত্মমর্যাদা সম্পন্ন হতে শেখায় না— জীবনের চালার পথকে মসৃণ করে না।
আনন্দময় ও শিশুবান্ধব শিক্ষার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো শ্রেণি কক্ষের পরিবেশ। শিখন-শেখানো কার্যাবলী অবশ্যই হতে হবে শিশু কেন্দ্রিক। বিদ্যালয়ে থাকতে হবে খেলার মাঠ ও পর্যাপ্ত খেলাধুলার সামগ্রী। শিশুর জন্য খেলাধুলার মাঠ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। স্বাভাবিকভাবে খেলাধুলা করতে না পারলে তাদের মনোজগতের বিকাশ ঘটে না। বিদ্যালয়ে থাকতে হবে শিশুর চাহিদা মতো শিক্ষা উপকরণ, শিশুতোষ সাহিত্য ও লাইব্রেরি। বিদ্যালয় আঙ্গিনা হবে নান্দনিক, মনোরম ও শিশু উপযোগী। চারু-কারু, সংগীতের মতো সৃজনশীল কাজেও তাদের উৎসাহিত করতে হবে। স্কুল যেনো হয় শিশুর স্বপ্নের ঠিকানা —উড়ার আকাশ, যেখানে শিশু অনায়াসে স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে বিচরণ করতে পারবে জ্ঞানের রাজ্যে। তার ভিতরে যে “আমিত্ব” বাস করে তাকে নির্মূল করতে হবে। তাকে সহমর্মী হতে শিখাতে হবে। তার চিন্তন দক্ষতা বাড়াতে সাহায্য করতে হবে। তাকে আত্মসচেতন একজন মানুষ রূপে গড়ে তুলতে হবে। সামান্য ভুলের জন্য তাকে কঠোর শাস্তি দেয়া যাবে না।
শিশুকে প্রকৃত শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলতে এবং তার প্রতিভা বিকাশে সামাজিক পরিবেশও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সুস্থ-সুন্দর সামাজিক পরিবেশ শিশুর মেধা ও মননশীলতা বিকাশে অত্যাবশ্যকীয় নিয়ামক হিসেবে কাজ করে। পরিবার এবং সমাজকে হতে হবে শিশুবান্ধব ও শিশু শিক্ষার উপযোগী। শিশুর চিত্তবিনোদনের জন্য খেলার মাঠ, ক্লাব,পাঠাগার প্রতিষ্ঠা করে তাদের স্বশিক্ষিত হবার সুযোগ করে দিতে হবে এবং সুন্দর সমাজ ও সুন্দর জীবন গড়ে তোলার প্রেরণা দিতে হবে।
মানুষের জ্ঞান ও চিত্তের উৎকর্ষের জন্য, মানব সভ্যতা ও সংস্কৃতির বিকাশের জন্য, চরিত্র গঠন ও মানবীয় মূল্যবোধের জন্য এবং মানব সম্পদ উন্নয়নের জন্য শিক্ষা হচ্ছে প্রধান নিয়ামক। নেতিবাচক শিক্ষা বা আর্থিক উন্নতি লাভের জন্য শিক্ষা কখনো প্রকৃত শিক্ষা হতে পারে না। শুধু বড় বড় ডিগ্রি পেলেই শিক্ষিত হওয়া যায় না। শিক্ষার সঙ্গে থাকতে হবে সংস্কৃতি, রুচিবোধ, মানবতাবোধ। তবেই শিক্ষা হয়ে উঠবে প্রকৃত শিক্ষা। শিক্ষার আলো সমাজ ও দেশের মঙ্গল ঘটায়। মানুষের মঙ্গল করে। মানুষের কল্যাণ সাধন করে। দুর্লভ হিরার চেয়েও মূল্যবান সুশিক্ষা। শিক্ষার প্রাথমিক পর্যায় যে শিশুকাল তা বলার অবকাশ রাখে না। শিশুরা তাদের চারপাশ থেকে প্রচুর জ্ঞান অর্জন করে। তারা শেখে তাদের পরিবার, সমাজ, শিক্ষাঙ্গন ও পরিবেশ থেকে।
মানুষের মনের মণিকোঠায় তারাই চিরস্মরণীয় থাকে যারা নিজেদের জ্ঞানের আলোয় উদ্ভাসিত। আর তারা এই জ্ঞানের আলোয় আলোকিত হয়েছেন প্রধান উপকরণ সুশিক্ষা দ্বারা। তাদের কাছে শিক্ষা বাইরের ব্যাপার নয় অন্তরের ব্যাপার। প্রকৃত শিক্ষায় শিক্ষিত মানুষ উপলব্ধি করতে পারে জীবন মূল্য।
লেখক : প্রাবন্ধিক ও শিক্ষক

x