পোশাকখাতকে উজ্জীবিত করতে যথাযথ প্রণোদনা দেওয়া দরকার

বুধবার , ১১ ডিসেম্বর, ২০১৯ at ৪:৫৬ পূর্বাহ্ণ

শিল্পবিশ্লেষকদের মতে, আমাদের তৈরি পোশাক শিল্প মাথা তুলে দাঁড়ানোর পেছনে অন্যতম কারণ ছিল সহজে বাজার ধরতে পারা। বাজার ধরার ফলে প্রচুর বিনিয়োগ এসেছে। এখনো আমরা এ শিল্পে বিশ্বের দ্বিতীয় রফতানিকারক। যদিও বর্তমানে অনেক সংকট মোকাবেলা করতে হচ্ছে পোশাকশিল্পকে। গতকাল দৈনিক আজাদীতে ‘বহুমুখী সংকটে পোশাক শিল্প, টাকা পাঁচ মাস ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধি’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদনও প্রকাশিত হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ২০২১ সাল নাগাদ তৈরি পোশাক শিল্পের রপ্তানি আয় ৫০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা নিয়েছে সরকার। তবে গত কয়েক বছর ধরে পোশাক শিল্পের অস্থিরতার কারণে অনেকটা অনিশ্চয়তায় রয়েছে সেই লক্ষ্যমাত্রা। চলতি অর্থবছরের টানা প্রথম পাঁচমাস অর্থাৎ জুলাই থেকে নভেম্বর পর্যন্ত রপ্তানিতে ৭ দশমিক ৭৪ শতাংশ ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধি হয়েছে। পোশাক খাত সংশ্লিষ্টরা জানান, এভাবে টানা ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধি আর কখনো হয়নি। মূলত রপ্তানি আদেশ সংকটের কারণে এই পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। পোশাক শিল্পের অব্যাহত ব্যয় বৃদ্ধি ও ক্রেতারা ডজনপ্রতি মূল্য কমিয়ে দেয়ার কারণে প্রতিযোগিতায় টিকতে হিমশিম খাচ্ছেন গার্মেন্টস মালিকরা। এছাড়া প্রতিযোগী দেশগুলো ডলারের বিপরীতে নিজেদের মুদ্রার অবমূল্যায়ন করেছে। এতে অনেক অর্ডার তারা কম মূল্যে নিতে পারছে, ক্রেতারাও অর্ডারের পরিমাণ বাড়িয়ে দিচ্ছেন। পোশাক মালিকরা জানান, ইউরোপআমেরিকার ক্রেতাদের জোট অ্যাকর্ড ও অ্যালায়েন্সের চাপাচাপির কারণে অনেক পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। আবার তাদের শর্ত মেনে অবশ্য কিছু কারখানা সংস্কারও করেছে। কিন্তু রপ্তানি আদেশের সংকটের কারণে পরবর্তীতে তারাও বিপাকে পড়ে যাচ্ছেন। এছাড়া আনুষঙ্গিক ব্যয়ও বেড়েছে। তবে সবচেয়ে বড় বিষয় হচ্ছে, এখনো ডলারের বিপরীতে টাকার অবস্থান শক্তিশালী। প্রতিবেশী দেশ ভারত, পাকিস্তান ও ভিয়েতনামে ডলারের বিপরীতে তাদের মুদ্রার অবমূল্যায়ন করেছে। ফলে রপ্তানিতে তাদের প্রবৃদ্ধি বাড়ছে। পাকিস্তানে এক সময় ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধি হতো, কিন্তু তারা এখন ঘুরে দাঁড়িয়েছে। একই কথা প্রযোজ্য ভিয়েতনামের ক্ষেত্রেও।

পত্রিকান্তরে প্রকাশিত তথ্যে জানা যায়, রপ্তানি পণ্য হিসেবে তৈরি পোশাকের শুরুটা হয়েছিল ১৯৭৭ সালে চট্টগ্রামের কালুরঘাট শিল্প এলাকায় দেশ গার্মেন্টস স্থাপনের মধ্য দিয়ে। ৩৪ বিলিয়ন ডলারের পোশাক রপ্তানি করে গত অর্থবছরেও দেশের মোট জাতীয় রপ্তানির ৮২ শতাংশ দখল করে রেখেছিল এই তৈরি পোশাক। অথচ রপ্তানিমুখী গার্মেন্ট ব্যবসার সুতিকাগার চট্টগ্রামে এই ব্যবসাকে টিকিয়ে রাখতে আকুতি ঝরছে ব্যবসায়ীদের মুখে। একসময় যেখানে মোট পোশাক রপ্তানির ৪০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করত চট্টগ্রাম এখন সেই রপ্তানিতে চট্টগ্রামের অংশীদারিত্ব মাত্র ১১ শতাংশ।

এ কথা অনস্বীকার্য যে তৈরি পোশাক খাত ঘিরে আবারো অস্থিরতা লক্ষ করা যাচ্ছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের উপায় হিসেবে বিশেষজ্ঞরা নানা মতামত দিয়েছেন। বলেছেন, আমরা ১০০ ইকোনমিক জোন করছি। এটাকে বিভিন্ন খাতে ভাগ করে আলাদা পল্লী হিসেবে গড়ে তুলতে পারি। তাতে সব ধরনের শিল্প রক্ষা পাবে। অপরিকল্পিত কোনো উন্নয়ন যেন না হয়। এছাড়া আমাদের বন্দরে পণ্য খালাসে মাত্রাতিরিক্ত সময় নেয়াটা বড় ধরনের সমস্যা। এতে তৈরি পোশাক খাতে পণ্য রফতানিতে সময়ক্ষেপণ হচ্ছে এবং খরচ বেড়ে গিয়ে শিল্পের ওপর প্রভাব পড়ছে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এ ধরনের সংকট ভবিষ্যতে অর্থনীতির জন্য অশনি সংকেত। তৈরি পোশাক শিল্প বা আরএমজি বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি। তাঁরা বলেন, তিনটি রপ্তানিমুখী খাতের মধ্যে পোশাক শিল্পই অন্যতম। দেশের অর্থনীতিকে বেগবান করতে পোশাক শিল্পের কোনো বিকল্প নেই। যে কোনো দেশের সার্বিক উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রা নিঃসন্দেহে সে দেশের শিল্পের ওপর নির্ভরশীল। স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তিতে পোশাক রপ্তানি থেকে ৫০ বিলিয়ন ডলার আয়ের বিজিএমইএ যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে, তাকে অনেকে উচ্চাভিলাষী বললেও লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সম্ভব। এর জন্য বিদ্যমান সমস্যাগুলো কেবল দূর করতে হবে। এক্ষেত্রে সরকারকেও এগিয়ে আসতে হবে। যদিও আমরা প্রত্যক্ষ করছি, এ শিল্পের জন্য সরকার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির জন্য কাজ করে যাচ্ছে। বাজারের চাহিদার সঙ্গে সেটা সবসময় যথেষ্ট না হলেও আমাদের চেষ্টার কমতি নেই। সরকার এ শিল্পের বিকাশ ও রক্ষায় প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন থেকে শুরু করে যাবতীয় ব্যাপারে আন্তরিক। বর্তমান সময়ে বেতন, জ্বালানি ও পরিবহন খরচ বেড়েছে, উৎপাদনের সক্ষমতাও আছে, কিন্তু কাঁচামাল নেই। এগুলোসহ নানামুখী সংকটের পরিপ্রেক্ষিতে কয়েক বছরের জন্য হলেও যথাযথ প্রণোদনা দেওয়া দরকার। তাহলেই শিল্পটিকে টিকিয়ে রাখা সম্ভব হবে।

x