পেঁয়াজসহ ১৬ ধরনের পণ্য ধ্বংসের প্রক্রিয়া শুরু

চসিকের সহযোগিতা চায় চট্টগ্রাম কাস্টমস

মোরশেদ তালুকদার

শনিবার , ২৩ নভেম্বর, ২০১৯ at ৩:৪৮ পূর্বাহ্ণ
5157

তিন মাসেরও বেশি সময় ধরে ‘অস্থির’ পেঁয়াজের বাজার। খুচরা বাজারে গতকালও প্রতি কেজি পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে ১৪০ টাকায়। ফলে আগের মত স্বাচ্ছন্দ্যে পেঁয়াজ কিনতে পারছেন না সাধারণ মানুষ। আর এ সময়ে প্রায় ৮৭ হাজার কেজি পেঁয়াজ ‘ডাম্পিং’ করার প্রক্রিয়া শুরু করেছে চট্টগ্রাম কাস্টমস কর্তৃপক্ষ! অবশ্য এসব পেঁয়াজ নষ্ট, পঁচা ও দুর্গন্ধযুক্ত। তা নাহলে পেঁয়াজ ধ্বংসের এ খবরে চারিদিকে নিশ্চয় হুলুস্থ্থূল পড়ে যেতে।
চট্টগ্রাম কাস্টমস সূত্রে জানা গেছে, ৪০ ফুটের তিনটি কন্টেইনারে করে পেঁয়াজগুলো একবছর আগে আমদানি করেছিলেন ব্যবসায়ীরা। খালাস না করায় সেগুলো এতদিন পড়েছিল চট্টগ্রাম বন্দরের ইয়ার্ডে। দীর্ঘদিন পড়ে থাকায় পেঁয়াজগুলো পঁেচ যায়। ফলে নিলামেও বিক্রি করা সম্ভব নয়। তাই এসব পেঁয়াজ ধ্বংস করার প্রক্রিয়া শুরু করে। শুধু পেঁয়াজ নয়, ডাম্পিং করার তালিকায় আছে আপেল, কমলা, আদা, স্যানিটারি ন্যাপকিন, সয়াবিন, এনার্জি ড্রিঙ্ক, ভুট্টোর বীজ, সানফ্লাওয়ার তেল এবং আমদানি নিষিদ্ধ ‘মিট এন্ড বনমিল’সহ ১৬ ধরনের পণ্য। বন্দরের বিভিন্ন ডিপো ও ইয়ার্ডে ধ্বংসযোগ্য এসব পণ্যের ২০৬টি কন্টেইনার রয়েছে। আমদানিকারকরা খালাস করেনি এসব পণ্য। সাধারণত, খালাস না করা পণ্যগুলোর নিলামে তোলে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ। এর আগে নমুনা পরীক্ষা করা হয়। এতে দেখা গেছে, ‘পণ্যগুলো রোগ জীবাণু দ্বারা সংক্রমিত’। তাই সেগুলো নিলামে না দিয়ে ধ্বংসের প্রক্রিয়া শুরু করা হয়।
কাস্টমস সূত্রে জানা গেছে, পণ্যগুলো ডাম্পিং করা হবে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের আর্বজনাগারে। ডাম্পিং এর ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য গত ১৯ নভেম্বর সিটি মেয়র আ.জ.ম নাছির উদ্দীনকে চট্টগ্রাম কাস্টমসের নিলাম শাখা থেকে দাপ্তরিক পত্র দেয়া হয়েছে।
পত্রে বলা হয়, ‘চট্টগ্রাম বন্দরের বিভিন্ন ইয়ার্ড এবং ডিপোতে রক্ষিত ২০৬টি কন্টেইনারে মেয়াদোত্তীর্ণ, ব্যবহার অনুপোযোগী পঁচা, নষ্ট, বিনষ্ট, দুর্গন্ধযুক্ত আপেল, কমলা, পেঁয়াজ, আদা, ন্যাপকিন, সয়াবিন এক্সট্রাকশন, মিট এন্ড বনমিল এর কায়িক পরীক্ষার কার্যক্রম সম্পন্ন করা হয়েছে। এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তর কর্তৃক পরীক্ষাপূর্বক সনদপত্র গ্রহণ করা হয়েছে।’ পত্রে কাস্টমস নিলাম শাখার কাজের গতিশীলতা বৃদ্ধি ও চট্টগ্রাম বন্দরের কন্টেইনার জট নিরসনকল্পে জরুরি বিবেচনায় রক্ষিত পণ্য ধ্বংসকরণে বিধি মোতাবেক সিটি কর্পোরেশনের আর্বজনাগারে ডাম্পিং এর ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ করা হয়।
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম কাস্টমসের নিলাম শাখার ডেপুটি কমিশনার মো. মাজেদুল হক গতকাল দৈনিক আজাদীকে বলেন, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনে আমরা চিঠি পাঠিয়েছি। তাদের পক্ষ থেকে এখনো কোন অনুমতি বা চিঠির উত্তর পাই নি। পেলে পণ্যগুলো ডাম্পিং করার তারিখ ঠিক করবো।’
এ বিষয়ে সিটি মেয়র আ.জ.ম নাছির উদ্দীন দৈনিক আজাদীকে বলেন, ‘আমাদের আর্বজনাগারে ডাম্পিং করার জন্য কাস্টমস থেকে চিঠি পেয়েছি। নষ্ট হওয়া পণ্যগুলো ডাম্পিং করার জন্য যতধরনের সহযোগিতা দরকার তা বিধি অনুযায়ী আমরা করবো।’
আরো যেসব পণ্য ধ্বংস করা হবে :
সিটি মেয়রের কাছে কাস্টমসের নিলাম শাখার পাঠানো পত্রে ধ্বংসযোগ্য পণ্যগুলোর একটি তালিকাও পাঠানো হয়। এতে দেখা গেছে, এক বছর পাঁচ মাস ধরে পড়ে থাকা তিন কন্টেইনার আপেল রয়েছে। এছাড়া দুই বছর আগে আমদানি হওয়ায় এক কন্টেইনার ‘শার্ক কার্বনেটেড এনার্জি ড্রিংক’ এবং তিন বছর আগে আমদানিকৃত ‘শার্ক নন-কার্বনেটেড এনার্জি ড্রিংক’ রয়েছে। ২০১৮ সালের ৩০ মে এসব এনার্জি ড্রিংকের মেয়াদও চলে গেছে। ছয় বছর আগে আমদানি করা এক কন্টেইনার হাইব্রিড ভুট্টোর বীজও আছে ধ্বংসের তালিকা।
এছাড়া ধ্বংসযোগ্য এক কন্টেনার সানফ্লাওয়ার তেল আমদানি করা হয়েছে তিন বছর আগে। ম্যান্ডারিন রয়েছে নয় কন্টেনার। এর মধ্যে দুই কন্টেইনার দুই বছর ছয় মাস, ছয় কন্টেইনার এক বছর এবং এক কন্টেইনার ছয় মাস ধরে বন্দর ইয়ার্ডে পড়ে আছে। পাঁচ বছর আগে আমদানিকৃত এক কন্টেইনার কসমেটিকস পণ্য এবং ছয় বছর আগে আমদানিকৃত এক কন্টেইনার ফ্রুট জুসও আছে। এর মধ্যে কসমেটিকস পণ্যগুলোর ২০১৬ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর এবং ফ্রুট জুসগুলো ২০১৪ সালের ২৮ মার্চ মেয়াদ চলে গেছে।
ডাম্পিংয়ের তালিকায় আছে আমদানি নিষিদ্ধ দুই কন্টেইনার চিংড়ি। এর মধ্যে একটি কন্টেইনার এক বছর এবং অপরটি ছয়মাস ধরে বন্দরে পড়ে আছে। আছে ৪০ ফুটের দুই কন্টেইনার স্যানিটারি ন্যাপকিন। একযুগ আগে আমদানি হওয়া এসব স্যানিটারি ন্যাপকিনের মেয়াদ চলে গেছে ২০১০ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর। ধ্বংস করা হবে নয় কন্টেইনার কমলা। এর মধ্যে তিন বছর আগে দুই কন্টেইনার এবং এক বছর আগে আমদানি করা হয়েছে বাকি সাত কন্টেইনার। এছাড়া ২০ কন্টেইনার ‘সোডিয়াম সালফেট’ রয়েছে। তিন বছর ধরে বন্দর ইয়ার্ডে এসব ‘সোডিয়াম সালফেট’ পড়ে থাকলেও সেগুলোর মেয়াদ চলে গেছে ২০১৮ সালের ১০ জানুয়ারি।
ধ্বংসযোগ্য পণ্যের মধ্যে সর্বোচ্চ ১২৭ কন্টেইনার ‘সয়াবিন এক্সট্রাকশন’ বা নিষ্কাশনকৃত সয়াবিন আছে। এরমধ্যে ১০২ কন্টেইনার তিন বছর ধরে এবং ২৫ কন্টেইনার দুই বছর ধরে বন্দর ইয়ার্ডে পড়ে আছে।
এছাড়া ধ্বংস করার তালিকায় আছে আট বছর আগে আমদানিকৃত ২১ কন্টেইনার ‘মিট এন্ড বনমিল’। এগুলো পশু খাদ্যপণ্য। ফার্মের মুরগির খাবার হিসেবে এর ব্যবহার বেশি হয়। মাংস ও হাড়ের তৈরি এক ধরনের পশুখাদ্য। তবে বিভিন্ন দেশ থেকে আসা ‘মিট এন্ড বনমিলে’ ট্যানারির বর্জ্য এবং শুয়োরের মাংসও ব্যবহার করা হয়। যা স্বাস্থ্যের জন্যও ক্ষতিকর। নিরাপদ খাদ্য অধিদপ্তর কর্তৃপক্ষ ‘মিট এন্ড বনমিল’ আমদানি, মজুদ ও বিক্রি নিষিদ্ধ করেছে।

x