পুলিশ পিবিআই ও সিআইডি’র তদন্তে আত্মহত্যা, আদালত বললো হত্যা!

সবুর শুভ

সোমবার , ২০ আগস্ট, ২০১৮ at ৬:৩৬ পূর্বাহ্ণ
378

খুলশী থানা এলাকায় স্বামীর বাসায় সাড়ে ৪ বছর আগে অস্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছিল রোকসানা আক্তার রিতা নামে এক গহবধূর। এ নিয়ে আদালতে ৪ জনকে আসামি করে মামলা দায়ের করেছিলেন তার বড় ভাই জাহিদুর রহমান। মামলাটি প্রথমে তদন্ত করে খুলশী থানা পুলিশ। এরপর সিআইডি। সর্বশেষ তদন্ত করে পিবিআই এর কর্মকর্তা। প্রতি তদন্তেই রোকসানার মৃত্যুর ঘটনা ‘আত্মহত্যাজনিত’ হিসেবে উঠে আসে। তবে সর্বশেষ আদালতের আদেশে উঠে এসেছে রোকসানার মৃত্যুর ঘটনা আত্মহত্যাজনিত নয়। বরং তাকে হত্যাই করা হয়েছে। এ ধরনের আদেশ দেয়ার পাশাপাশি আদালতের বিচারক একমাত্র আসামি রোকসানার স্বামী নুরুল হক বাবুর বিরুদ্ধে গ্রেফতারী পরোয়ানাও জারি করেছেন সম্প্রতি।

মামলার এজাহার: ২০১৪ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারির ঘটনা। পলিটেকনিক এলাকাস্থ বাসা থেকে সকাল ১০ টার দিকে রোকসানার স্বামী নুরুল হক বাবু রোকসানার মা ও চাচাকে জানান যে, রোকসানা আক্তার রিতা মারা গেছেন। মৃত্যুর খবর শোনার সাথে সাথে রোকসানার পরিবার ঘটনাস্থলে পৌঁছেন। এসময় মামলার এজাহারের ৪ আসামির কেউই বাসা ছিলেন না। দেখা যায় রোকসানা বেডরুমে শোয়ার ঘরে ফ্যানের সাথে ঝুলছে। গলায় পেচানো একটি গিটবদ্ধ শাড়ি। পা দুইটি নীচের ফ্লোরের সাথে লাগানো। নাক দিয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে। এ অবস্থায় ভিকটিমের স্বামী নুরুল হক বাবুকে ফোন করলে তার মোবাইল বন্ধ পাওয়া যায় বলে জানান মামলার বাদী জাহিদুর রহমান।

এরপর খুলশী থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে আসে। বাদী জানান, ঘটনার পর খুলশী থানায় মামলা দায়ের করতে গেলেও থানা পুলিশ মামলা না নেয়ায় ২০১৪ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি আদালতে মামলা দায়ের করেন তিনি। মামলার এজাহারে আসামি করা হয় ভিকটিমের স্বামী নুরুল হক বাবু, তার আত্মীয় তন্নী, খোকন ও জামাত আলীকে।

মামলায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০ (সংশোধিত ২০০৩) এর ১১()/৩০ ধারায় আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়। অর্থাৎ অভিযোগ অনযায়ী যৌতুকের দাবিতে শারিরীক ও মানসিক নির্যাতনের মাধ্যমে মৃত্যু ঘটনো এবং সহযোগিতার অপরাধ করেছেন এজাহারেরর আসামিরা।

আদালত মামলাটি গ্রহণ করে খুলশী থানাকে সরাসরি এফআইআর হিসেবে রেকর্ড করতে আদেশ দেন। একইসাথে তদন্ত করে ব্যবস্থা গ্রহণের কথাও উল্লেখ করেন। মামলাটি আদালতে দাখিল করার পরদিন ২৬ ফেব্রুয়ারি খুলশী থানা কর্তৃপক্ষ গ্রহণ করে। আদেশের ১৩ দিন পর মামলাটি রেজিস্ট্রারভুক্ত করে তদন্তের দায়িত্ব দেয়া হয় ওসি তদন্তকে।

থানা পুলিশের তদন্ত: তদন্তভার গ্রহণ করে ওসি তদন্ত একই বছরের ১২ জুন আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করেন। প্রতিবেদন তিনি লেখেন, ভিকটিমের পোস্টমর্টেম রির্পোট পর্যালোচনায়, ঘটনার পূর্বাপর ঘটনাবলীর আলোকে এবং ঘটনার পারিপার্শ্বিকতায় এ মামলার ঘটনাটি তথ্যগত ভুল বলে প্রতীয়মান হয়েছে। এ কারণে মামলার আসামি মোহাম্মদ নুরুল হক বাবু, মোছাম্মৎ তন্নী প্রকাশ মিনা, মোহাম্মদ খোকন ও মোহাম্মদ জামাত আলীকে মামলার দায় থেকে অব্যাহতি দেয়ার সুপারিশ করে চুড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন তিনি। এ প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে আদালতে বাদী নারাজি আবেদন দাখিল করলে আদালতের বিচারক এ মামলা সিআইডিকে তদন্তের আদেশ দেন।

সিআইডির তদন্ত: সিআইডির পরিদর্শক মোহাম্মদ আমান উল্লাহ তদন্ত শেষে এক বছর পর আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। এ প্রতিবেদনেও আসামিদেরকে অব্যাহতি দেয়ার সুপারিশ করা হয়। এ অভিযোপত্রের বিরুদ্ধেও আদালতে নারাজি পিটিশন দাখিল করেন বাদী। পরে শুনানি শেষে আদালতের বিচারক আলোচিত এ মামলা আবারো তদন্তের আদেশ দেন। এবার মামলা তদন্তের দায়িত্ব পড়ে পিবিআই এর কাছে।

পিবিআই এর তদন্ত: পিবিআই এর পরিদর্শক মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর মামলাটি তদন্ত করে আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করেন ২০১৬ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর। তিনি তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন ভিকটিম রোকসানা আক্তার রিতা মানসিকভাবে অসুস্থ থাকার কারণে আত্মহত্যা করেছেন। একইসাথে মামলার বাদীর অভিযোগ ও নারাজির প্রতিটি বিষয় তদন্তে মিথ্যা প্রমাণিত হওয়ায় সম্পূরক ‘চুড়ান্ত রিপোর্ট মিথ্যা’ দাখিল করেন তদন্ত কর্মকর্তা। মামলার এজাহারে আনা অভিযোগের দায় থেকে আসামিদেরকে অব্যাহতি দেয়ার সুপারিশ করা হয় তদন্ত কর্মকর্তার তরফে।

এরপর গত বছরের ১৯ জুলাই মামলার বাদী জাহিদুর রহমান উল্লেখিত প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে নারাজি আবেদন দাখিল করেন আদালতে।

আদালতের সামনে মামলার সাক্ষীরা: এরপর আইন অনুযায়ী আদালত বাদীর আনা অভিযোগ আমলে নেয়ার অংশ হিসেবে নিজেই সাক্ষীদের ডাকেন। ৫ সাক্ষীর সাক্ষ্য নেন আদালতে। বিচারিক তদন্তের অংশ হিসেবে এ সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয় বলে জানান ভিকটিমের আত্মীয় চট্টগ্রামের সাবেক মহানগর পিপি এডভোকেট আবদুস সাত্তার। এরপর আদালত একটি আদেশ দিয়ে আসামিদের মধ্যে একমাত্র নুরুল হক বাবুর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ আমলে নেন। বাকী আসামিদের মামলার দায় থেকে অব্যাহতি দিয়ে নুরুল হকের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির আদেশ দেন গত ৭ আগস্ট। তবে আসামি এখনও গ্রেফতার হননি বলে জানান মামলার বাদী জাহিদুর রহমান।

আদালতের আদেশ: এ বিষয়ে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল৬ এর বিচারক গত ৭ আগস্ট একটি যুগান্তকারী আদেশ দেন। বিচারক তার আদেশে বলেন, ‘রোকসানা আক্তার রিতার মৃত্যু আত্মহত্যাজনিত ছিল না। বরং হত্যাজনিত ছিল। যার তথ্য পুলিশী তদন্ত রিপোর্টে বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রতিফলিত হয়েছে। আসামি নুরুল হক বাবু রোকসানা আক্তার রিতাকে গলায় শাড়ি পেচিয়ে শ্বাসরোধ করে কিংবা মাথায় শক্ত কিছু দিয়ে ( ঘরের পাকা দেয়াল/মেঝের সাথে ধাক্কা) আঘাত করে মৃত্যু ঘটিয়েছেন। এরপর ফ্যানের সাথে ঝুলিয়ে আত্মহত্যার ঘটনা দেখানোর চেষ্টা করেছেন বলে আদালতের কাছে প্রতীয়মান হয়েছে।’ এ কারণে অন্য আসামিদেরকে মামলার দায় থেকে অব্যাহতি দিয়ে শুধু নুরুল হক বাবুর বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করার আদেশ দিয়েছেন উল্লেখিত আদালতের বিচারক।

এ বিষয়ে মামলায় বাদীর আইনজীবী এডভোকেট এস এম গোলাম হোসাইন, এডভোকেট আবদুস সাত্তার ও এডভোকেট মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন চৌধুরী জানান, এ মামলার দায়ের থেকে শুরু করে প্রতিটি তদন্তে অবহেলার ছাপ স্পষ্ট। বিষয়টি আমরা আদালতের নজরে এনেছি।

x