পুলিশের ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারে কাজ করতে হবে

সোমবার , ২১ অক্টোবর, ২০১৯ at ৩:৪১ পূর্বাহ্ণ
41

‘অপরাধে মিলছে শাস্তি তবুও বেপরোয়া পুলিশ’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে দৈনিক আজাদীতে গত ১৭ই অক্টোবর। এতে বলা হয়েছে, প্রায় প্রতিদিনই নানা অভিযোগ উঠছে পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে। অপরাধ প্রমাণে শাস্তিও হচ্ছে। কিন্তু তবুও কমছে না অপরাধ। বেপরোয়া হচ্ছে কতিপয় পুলিশ সদস্য। পুলিশ সদর দফতরের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তার উদ্ধৃতিও প্রতিবেদনে যুক্ত করা হয়েছে। তিনি বলেন, অভিযোগ ওঠার পর প্রমাণের ভিত্তিতে শাস্তি নিশ্চিত করা হচ্ছে। আইনানুগ ব্যবস্থার পাশাপাশি অপরাধ প্রমাণিত হলে বিভাগীয় ব্যবস্থাও নেয়া হচ্ছে। বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি প্রতিনিয়ত কাউন্সেলিং করা হচ্ছে। শাস্তির কারণে আগের তুলনায় সদস্যদের মধ্যে অপরাধ প্রবণতা কমছে বলেও দাবি তাঁর। নৈতিক স্খলনরোধে ১৪ নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
আইন-শৃংখলা সুরক্ষা ও নাগরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই পুলিশের প্রধান কাজ। মানুষ প্রয়োজনে ও বিপদ-আপদে পুলিশের শরণাপন্ন হয়। নিরাপত্তা, প্রতিকার ও সহায়তা চায়। এক্ষেত্রে পুলিশের আচরণ ও ব্যবহার হওয়া উচিত বন্ধুসুলভ ও সহযোগিতামূলক। কিন্তু বিভিন্ন অভিযোগ ও ঘটনাপ্রবাহ থেকে দেখা যায়, পুলিশের কাছ থেকে সদাচার ও সহযোগিতা কদাচিত পাওয়া যায়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে পুলিশের আচার-ব্যবহার বন্ধুসুলভ নয়, ভোগান্তিকর ও হয়রানিমূলক। সবচেয়ে উদ্বেগজনক হলো, পুলিশের কিছু সদস্যের আচরণ শুধু অবন্ধুসুলভ নয়, সন্ত্রাসীসুলভ। চাঁদাবাজি, গ্রেফতার বাণিজ্য, ভয়ভীতি প্রদর্শন করে অর্থআদায় ইত্যাদি দিনকে দিন বাড়ছে। যার কাছে নিরাপত্তার জন্য, আশ্রয়ের জন্য মানুষ ছুটে যায়, সেই পুলিশের আচরণ যদি সন্ত্রাসী-অপরাধীর মতো হয়, তাহলে তারা কোথায় যাবে! অপরাধে পুলিশের জড়িয়ে পড়ার ঘটনা ক্রমাগত বাড়ছে। মামলায় ফাঁসিয়ে দেয়ার ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায়, তদন্তে ঘুষ গ্রহণ, গ্রেফতার বা ক্রসফায়ারের ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় ইত্যাদির পাশাপাশি ছিনতাই, রাহাজানি, ডাকাতি, মাদক ব্যবসাসহ এমন কোনো অপরাধ নেই যার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ পুলিশের বিরুদ্ধে নেই। পুলিশ সদর দফতরের সূত্রমতে, বিভিন্ন অপরাধের সঙ্গে জড়িত থাকার অপরাধে অনেক পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। পুলিশের মধ্যে অপরাধ প্রবণতা বাড়ার কারণে প্রতিষ্ঠান হিসেবে পুলিশের ভাবমর্যাদাই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে না, একই সঙ্গে পুলিশের প্রতি, আইনের শাসনের প্রতি গণমানুষের আস্থা ও বিশ্বাস হ্রাস পাচ্ছে। আইন হাতে তুলে নেয়ার প্রবণতা বাড়ছে। এ অবস্থাকে ভয়ংকর বললেও কম বলা হয়।
এ কথা অস্বীকার করা যাবে না যে, খুন, অপহরণ, ছিনতাই, ডাকাতি, চাঁদাবাজি, ঘুষ, দুর্নীতি, মাদক ব্যবসা, নারী কেলেঙ্কারির মতো ভয়ঙ্কর সব অপরাধে জড়িয়ে পড়ার কারণে পুলিশের ভাবমূর্তি নষ্ট হচ্ছে। পত্রিকার মাধ্যমে জানা যায়, পুলিশের মাঠপর্যায়ে অসাধু পুলিশ কর্মকর্তারা মাদক ব্যবসা, ধর্ষণ, লুট ও ছিনতাই, চাঁদাবাজিসহ নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়েছে। প্রতিদিন পুলিশের বিভিন্ন দফতরের একের পর এক অভিযোগ জমা হচ্ছে। গড়ে প্রতিদিন কমপক্ষে ১০ থেকে ১২টি অভিযোগ শুধু পুলিশ সদর দফতরেই জমা পড়ে। প্রতিমাসে সাড়ে ৩শ’ থেকে ৪শ’ অভিযোগ জমা হচ্ছে। রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে অনেকেই নানাভাবে দ্রুত আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ার চেষ্টা করছে, আবার অনেকেই রাজনৈতিক অস্থিরতার সুযোগে বেপরোয়া হয়ে নানা অপরাধ করছে। রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগ, পোস্টিং ও পদোন্নতির কারণে মাঠপর্যায়ের পুলিশ কর্মকর্তারা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। পুলিশ সদর দফতরের একজন উর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, পুলিশের কোনো সদস্যের অপরাধের দায় প্রতিষ্ঠান বা বাহিনী নেবে না। একটি সুশৃঙ্খল বাহিনীতে অপরাধ করে কেউ পার পাবে না। দোষী যেই হোক, তাকে আইনের আওতায় আনা হবে। অতীতে বিভিন্ন অপকর্মের দায়ে পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। এর ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকবে। কোনো পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ এলে সঙ্গে সঙ্গে তা তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। পাশাপাশি পুলিশ সদস্যরা যেন কোন অপকর্মে লিপ্ত হতে না পারে, সেজন্য নিয়মিত মনিটরিং করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে পুলিশ সদস্যরা যেন কোন অপকর্মের সঙ্গে জড়িত হতে না পারে, সেজন্য বেশ কিছু পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে বলে জানান পুলিশ কর্মকর্তা।
আমরা দ্বিধাহীন চিত্তে মনে রাখি যে, পুলিশ ছাড়া কোনো দেশ চলতে পারে না। দেশের আইন-শৃংখলা রক্ষা ও নাগরিক নিরাপত্তা প্রদানের সঙ্গে সঙ্গে পুলিশ সরকারের ক্ষমতার প্রতিনিধি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করে। জনবান্ধব পুলিশের পক্ষেই কেবল এসব দায়িত্ব সুচারুরূপে পালন করা সম্ভব। বন্ধু যখন ভয়ের কারণ হয়, তখন আর কোনো কিছুই ঠিক থাকে না; মানুষ সেবা থেকে বঞ্চিত হয়, পুলিশ ও সরকারের ভাবমর্যাদা ক্ষুণ্ন হয়। এমতাবস্থায় পুলিশকে জনবান্ধব, হিতৈষী, দুর্নীতি ও অপরাধমুক্ত করার কোনো বিকল্প থাকতে পারে না।

x