পুরানো সেই দিনের কথায় প্রাণ জুড়ানো উৎসব

চবি অ্যালামনাই এসোসিয়েশনের ১ম পুনর্মিলনী

চবি প্রতিনিধি

শনিবার , ২৩ নভেম্বর, ২০১৯ at ৩:৪৮ পূর্বাহ্ণ
78

১ম ও ২য় বর্ষে থাকাকালীন ট্রেনে গলা ছেড়ে আমিও গান গাইতাম। আমি চট্টগ্রাম শহরেই থাকতাম। পরীক্ষার সময় হলে কয়েক মাস হলে থাকতাম। তাই প্রতিদিন বন্ধুদের সাথে ট্রেনে করেই ক্যাম্পাসে যেতাম। আমার সেই বন্ধুরা আজ এখানে আছেন। আজ তারা সরকারের অনেক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। সমাজেও প্রতিষ্ঠিত। গতকাল শুক্রবার নগরীর জিইসি কনভেনশন সেন্টারে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় অ্যালামনাই এসোসিয়েশনের প্রথম পুনর্মিলনী উৎসবের দ্বিতীয় দিন প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের স্মৃতিচারণের সময় এসব অনুভূতি ব্যক্ত করেন আওয়ামী লীগের প্রচার, প্রকাশনা সম্পাদক ও তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ।
রসায়ন বিভাগের এ প্রাক্তন শিক্ষার্থী বলেন, অনেক দিন পর চেনা মুখগুলো দেখছি। আবারও সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবনে ফিরে যেতে ইচ্ছে করছে। যদি সেই বন্ধুদের নিয়ে আবারও ট্রেনে করে গান গাইতে গাইতে বিশ্ববিদ্যালয়ের যেতে পারতাম তাহলে অনেক ভালো লাগতো। কিন্তু এখন সময় এবং পরিস্থিতির কারণে সেটি সম্ভব হবে কিনা তা বলতে পারছিনা।
তিনি বলেন, প্রকৃতি অপরূপ সাজে এ বিশ্ববিদ্যালয়কে সাজিয়েছে। পৃথিবীর বহু বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার যাওয়ার সুযোগ হয়েছে। কিন্তু এমন সুন্দর প্রকৃতির শোভা পৃথিবীর খুব কম বিশ্ববিদ্যালয়ে আছে। প্রকৃতি নিজের কোলেই এ বিশ্ববিদ্যালয়কে লালন করছে। এমন আয়োজনের জন্য আয়োজকদের ধন্যবাদ জানিয়ে মন্ত্রী আরও বলেন, আমি আশা করব আঁজকে মতো এমন মিলনমেলা ভবিষ্যতে বিশ্ববিদ্যালয়ের চত্বরেই আয়োজন হবে। এতে করে আমরা যেখানে সময় কাটিয়েছি, সেখানে গিয়ে স্মৃতিগুলোকে আকড়ে ধরতে পারব। এর আগে অনুষ্ঠানের শুরুতে সকাল ১০টায় জাতীয় পতাকার পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয় ও অ্যালামনাই এসোসিয়েশনের পতাকা উত্তোলন করেন উপাচার্য অধ্যাপক ড. শিরীণ আখতার। পরে বেলুন উড়িয়ে তিনি অনুষ্ঠানের উদ্বোধন ঘোষণা করেন। পরে মূল অনুষ্ঠান স্থলে এসে জাতীয় সংগীতের মূর্ছনায় মূল আয়োজন শুরু হয়। এসময় বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক প্রয়াত শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের স্মরণে শোকপ্রস্তাব উত্থাপন করেন অ্যালামনাই এসোসিয়েশনের যুগ্ম সম্পাদক কামরুল হাসান হারুন। পরে নিহতদের স্মরণে দাঁড়িয়ে এক মিনিট নিরবতা পালন করা হয়।
এদিকে অনুষ্ঠানে বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমানসহ প্রাক্তন চার উপাচার্যকে সম্মাননা প্রদান করা হয়। তাঁরা হলেন-অধ্যাপক আব্দুল মান্নান, অধ্যাপক বদিউল আলম, অধ্যাপক ড. আলাউদ্দিন, অধ্যাপক আনোয়ারুল আজিম আরিফ, অধ্যাপক ড. শিরীণ আখতার।
‘আকাশভরা সূর্য, তারা বিশ্বভরা প্রাণ। পাহাড়ের মাঝে আমি পেয়েছি, পেয়েছি মোর স্থান, বিস্ময়ে তাই জাগে, জাগে আমার প্রাণ’ রবীন্দ্র সঙ্গীতের চরণগুলো গেয়ে উঠে আবেগী অনুভূতি প্রকাশ করেন ড. শিরীণ আখতার। তিনি বলেন, আমি খুব গর্বিত এমন বিরল সম্মানের জন্য। এতো প্রতিথযশা মানুষের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছি, আল্লাহ আমাকে অনেক বড় সম্মানে ভূষিত করেছেন। আমি অতি ক্ষুদ্র অধম, তাই বলি অত করে কমকিছু হতে দাওনি, যা দিয়েছ তাও অযোগ্য বলিয়া…।’
তিনি আরও বলেন, আমি এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী ছিলাম, তারপর শিক্ষক ও বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের দায়িত্ব পালন করছি। এই অঙ্গনের জন্য দোয়া করবেন। জ্ঞান সৃজন, জ্ঞান উৎপাদন ও গবেষণার মাধ্যমে যেন এগিয়ে যেতে পারি, এজন্য অ্যালামনাই এসোসিয়েশনের সহযোগিতা চাই। আমরা যেন পৃথিবীর মানচিত্রে নাম লেখাতে পারি।
সরকারের সাবেক মুখ্য সচিব ও বিশ্ববিদ্যালয় অ্যালামনাই এসোসিয়েশনের সভাপতি মো. আব্দুল করিমের সভাপতিত্বে এবং পুনর্মিলনী উদযাপন পরিষদের সদস্য সচিব মোহাম্মদ গিয়াস উদ্দিনের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের মধ্যে আরও স্মৃতিচারণ করে বক্তব্য দেন, সিএজি মুসলিম চৌধুরী, বিদ্যুৎ সচিব আহমেদ কায়কাউজ রানা, জাতীয় সংসদের সাবেক চিফ হুইপ উপাধ্যক্ষ আব্দুস শহীদ, চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মোছলেম উদ্দিন আহমেদ, চাকসুর সাবেক ভিপি ও সাবেক সাংসদ মজহারুল হক শাহ চৌধুরী, সাবেক ভিপি নাজিম উদ্দিন, সাবেক সচিব ও অ্যাসোসিয়েশনের সহ-সভাপতি মোরশেদুল আলম।
স্বাগত বক্তব্য দেন, অ্যালামনাই এসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ও চট্টগ্রাম চেম্বার সভাপতি মাহবুবুল আলম, ও প্রধানমন্ত্রীর সাবেক প্রটোকল কর্মকর্তা আলাউদ্দিন আহম্মদ চৌধুরী নাসিম।
সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে তাঁরা বলেন, প্রথম পুনর্মিলনী উদ্যোগের শুরুতে আমরা আশা করেছিলাম, হয়তো দুই-তিন হাজার প্রাক্তনী অংশ নেবেন। কিন্তু আপনাদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে আট হাজারের বেশি রেজিস্ট্রেশন হয়েছে। সংগঠনটি গঠনের উদ্দেশ্যে হচ্ছে- বিশ্ববিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন-বর্তমান শিক্ষার্থীদের কল্যাণে কাজ করা এবং মানবতার কল্যাণে কাজ করা। তাঁরা আরও বলেন, আমরা শুধু পুনর্মিলনী নয়, নিয়মিত সেমিনার, সিম্পোজিয়াম, জব ফেয়ার আয়োজনের পাশাপাশি বুলেটিন প্রকাশ করব। ইতোমধ্যে সংগঠনের স্থায়ী তহবিল গঠনের পাশাপাশি অসচ্ছল ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের শিক্ষাবৃত্তির জন্যও তহবিল গঠন করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়কেও সহযোগিতায় এগিয়ে আসবো। এছাড়াও অ্যালামনাই এসোসিয়েশনের স্থায়ী ভবন নির্মাণের জন্য সরকারের কাছে আবেদন জানানো হবে।
এদিকে পুনর্মিলনী উৎসবটির দ্বিতীয় দিনের মধ্যাহ্নভোজের পর শুরু হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের পরিবেশনায় মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, স্মৃতিচারণ, র‌্যাফেল ড্রসহ নানা আয়োজন। শুরুতেই প্রমা অবন্তীর পরিচালনায় চাকমা, মারমা ও ত্রিপুরা এ তিন ভাষার আদিবাসী নৃত্য পরিবেশন করা হয়। আবৃত্তি করেন জিন্নাহ চৌধুরী। পরে মঞ্চ মাতিয়ে তোলেন লাকী দাশ, হায়দরী আন্দালুসিয়া, বিশ্ববিদ্যালয় শাটল ট্রেন যাত্রাকালীন প্রথম সাংস্কৃতিক বগি ককপিটের মনোমুগ্ধকর পুঁথি আর জারি-সারি পরিবেশনা। এর আগে অ্যালামনাই এসোিিসয়েশনের কার্যকরী কমিটির পরিচিতি সভা অনুষ্ঠিত হয়। তারপরই মঞ্চে আসেন শিল্পী ইকবাল হায়দার। তাঁর পরিবেশনা ছিল দর্শক মাতানো। অনুপম মুন্সি ও নকীব খানের পরিবেশনায় সকলকে আনন্দ দেয়। প্রাণের উৎসবে চবিয়ানরা সকাল থেকে রাত অব্দি মেতেছিল হৈ-হুলোড়ের মাঝে। শেষ যেন হয় বিষাদের সুরে।

x