পুত্রের স্মৃতিকথায় মা আয়েশা খাতুন

ফেরদৌস আরা আলীম

শনিবার , ২৩ নভেম্বর, ২০১৯ at ৫:২৩ পূর্বাহ্ণ
56

২০০৩ সালে লোকান্তরিত ডা.এ.বি.এম নুরল আলমের সদ্য প্রকাশিত ‘অতীত যখন মুখর সঙ্গী’ স্রোতোধারে প্রকাশিত শত হাজার গ্রন্থের ভিড়ে হারিয়ে যাবার মতো কোনো গ্রন্থ নয়। এ গ্রন্থের লেখক গত শতাব্দীর ষাটের দশকের চট্টগ্রামের কিংবদন্তী একজন চিকিৎসকই ছিলেন না ছিলেন চট্টগ্রামের এক যশস্বী অভিনেতা এবং নাট্যপরিচালক। সংস্কৃতির নেশা তিনি তাঁর রক্তে বহন করেছেন আমৃত্যু। ফটোগ্রাফির নেশাও বড় কম ছিল না তাঁর; এ গ্রন্থে মুদ্রিত কিছু দুর্লভ ছবি তাঁর স্মৃতিকথাকে ঐতিহাসিক আকরগ্রন্থের মর্যাদায় অভিষিক্ত হবার পথ সুগম করেছে।
প্রিয় পাঠক, আমরা কিন্তু এ গ্রন্থের দৃষ্টিনন্দন প্রচ্ছদ, ছাপা-বাঁধাই বা এর পাতায়-পাতায় সঞ্চিত প্রত্নসম্পদের কথা বলবো না। এর সাহিত্যমূল্য নিয়েও কিছু বলার নেই আমাদের। আমরা শুধু একজন আয়েশা খাতুনের গল্প শুনবো। আজ যে বয়সে মেয়েদের বিয়ের কথা আমরা ভাবতেও পারি না শুনবো সে বয়সে দু’সন্তানের জননী এক তরুণী বিধবার জীবন সংগ্রামের কথা। জীবনসায়াহ্নে নিভৃতে, একান্তে বসে এক পুত্রের স্মৃতিতে এক মা কতটা জীবন্ত, দেখবো তাঁকে।
একদা রাজভাষা ফার্সিতে কাব্যচর্চার অনুকূল এক পিতৃকুলে (রাউজান থানার সুলতানপুর গ্রামে) জন্ম-শিক্ষিত আয়েশা খাতুনের জন্ম। পিতা আবুল মাল আলী মোহাম্মদ হামিদ আলী ছিলেন ঢাকা কলেজিয়েট স্কুলের হেড মৌলবি। পেশাগত পরিচয় ছাড়িয়ে বড় ছিল তাঁর কবি-খ্যাতি। বিশেষ করে ‘কাসেম-বধ’ কাব্যগ্রন্থের জন্য কাব্য রসিক মহলে সমাদৃত ছিলেন তিনি। রাউজানের কৃতী সন্তান কবি নবীনচন্দ্র সেনের ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্য, উৎসাহ-অনুপ্রেরণা ও সাহায্য-পৃষ্ঠপোষকতাধন্য কবি হামিদ আলী সেকালের নিয়মে তাঁর অল্পবয়সী আদরের কন্যাটিকে রাঙ্গুনিয়ার মরিয়মনগরস্থ জেলা ও দায়রা জজ আদালতের পেশকার আব্দুর রসীদের হাতে তুলে দিয়েছিলেন। যথেষ্ট উদ্যমী আব্দুর রসীদ জীবনের শুরুতেই পিতৃপুরুষের ভিটেমাটি ছেড়ে শহরে এসে বসত গড়েছিলেন। তবে সে শহর এ শহর নয়।
সেকালের শহর চট্টগ্রামের একপ্রান্তে ঘাটফরহাদবেগের প্রান্তসীমায় ততোধিক গণ্ডগ্রাম বাকলিয়ার যেখানে শুরু সেখানে নিবিড় ঘন গাছ-গাছালির বিপুল প্রাচুর্যের মধ্যে শস্তা গন্ডায় জলের দরে জমি কিনে টিনের ছাউনির নিচে ছ্যাঁচা বেড়ার বাড়ি করে সংসার পেতেছিলেন আব্দুর রসীদ। সে-বাড়ি সংলগ্ন পায়ে চলা মেঠোপথটি একদিন পিচঢালা ফতেহ আলী মাতবর লেইন হবে বা তাঁর ঘরের টিনের ছাউনির বাড়িটি একদিন ত্রিতল দালানের রূপ নেবে আব্দুর রসীদের স্বপ্নের ত্রিসীমানাতেও হয়তো এমন ভাবনা কোনোদিন আসেনি। আসলে এমন সব স্বপ্ন দেখার সময় তিনি পাননি। মাত্র পঁয়ত্রিশ বছর বয়সে গ্যাংগ্রিনে আক্রান্ত আব্দুর রসীদ কোলকাতা মেডিকেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকাকালে এ পৃথিবীর মায়া কাটিয়েছেন এবং কলকাতার বাগমারী মুসলিম কবরস্থানে চিরনিদ্রায় শায়িত রয়েছেন।
স্বামীর হাসপাতাল বাসের সময় থেকেই আয়েশা নিজেকে তৈরি করেছেন। ৫ বছরের শিশুপুত্র ও কোলের পুত্র সন্তানটিকে নিয়ে একার সাহসে একলাবাসে অভ্যস্ত হয়েছেন তিনি। স্বামীর সঙ্গে নিয়মিত পত্র যোগাযোগ ছিল তাঁর। পরিবারের সকলের এবং সবকিছুর (বিষয়সম্পত্তি, সংসার পরিচালনা ইত্যাদি) খোঁজখবর তিনি স্বামীকে জানাতেন এবং তাঁর পরামর্শ নিতেন। (এ গ্রন্থে মুদ্রিত স্ত্রীকে লেখা আব্দুর রসীদের দু’টি পত্রে সে প্রমাণ মেলে) একা এজাহারের (সম্ভবত নিয়োগপ্রাপ্ত কোনো সাহায্যকারী) ভরসায় দুটি শিশুপুত্র নিয়ে স্ত্রীর একাবাসের কথা তিনি নিজেও ভাবতে পারেন নি কিন্তু অসীম মনোবলের পরিচয় দিয়েছেন সেদিনের মাত্র পঁচিশ বছরের তরুণী আয়েশা খাতুন।
ধনবল-জনবলে যথেষ্ট সচ্ছল পিতা হামিদ আলী তাঁর সুশ্রী সুশিক্ষিতা কন্যাটির সামনে পড়ে থাকা দীর্ঘ জীবনের কথা ভেবেছেন। মা আমেনা খাতুন নাতিদের দায়িত্ব নিতে প্রস্তুত ছিলেন। কন্যার জন্য আগ্রহী এবং যোগ্য পানিপ্রার্থীরও অভাব ছিল না। কিন্তু স্বামীর স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে দু’টি পুত্র সন্তানকে বুকে আগলে রাখায় ও নিজের মনের মতো করে তাদের মানুষ করার দায়িত্বে অটল ছিলেন এই মা। তাঁর সার্বক্ষণিক যত্ন থেকে বঞ্চিত হবে তাঁর সন্তান- এ তিনি ভাবতেই পারেন নি। স্বামীর হাতে গড়া বাড়িতে তাঁর স্মৃতি আঁকড়ে, ব্যাংকে রেখে যাওয়া সামান্য সঞ্চয় এবং গ্রামের জমিজমা সূত্রে অল্পবিস্তর আয়ের উপর নির্ভর করে পুত্রদের মানুষ করেছেন। প্রয়োজনে পিতার সাহায্য পেয়েছেন বা নিয়েছেন।
স্মৃতিচারণে ডা. এ. বি.এম নুরল আলম বলেন ‘আমার মায়ের অদম্য ইচ্ছেশক্তির বলেই আমি ডাক্তার হতে পেরেছি।’ বস্তুত এই মায়ের সন্তান মানুষ করার ‘অদম্য ইচ্ছাশক্তি’র কাছে আমরা অবনত হই যখন দেখি বিপুল অর্থোপার্জনের জন্য নয়, মানবসেবার মহৎ তাগিদে পুত্রকে তিনি দীক্ষিত করতে পেরেছিলেন। মায়ের আদেশ শিরোধার্য করেই ১৯৪৪ সালে কলকাতা ক্যাম্পবেল মেডিকেল স্কুল থেকে এলএমএফ পাস করে প্রত্যন্ত জনপদে দুঃস্থ দরিদ্র রোগগ্রস্ত মানুষের সেবায় কাটিয়ে গেছেন সারাটা জীবন। জীবনসায়াহ্নে জোরগলায় তাঁর পুত্র একথা বলে গেছেন। প্রসঙ্গত আরও একটি বিষয় নিয়ে কথা বলতে হয়। নাটক পাগল তাঁর এই পুত্রটিকে তিনি ইচ্ছে করলে শৈশবেই ও পথ থেকে ফেরাতে পারতেন। কিন্তু পুত্রের এ আনন্দের পথে রক্ষণশীল মুসলমান পরিবারের এ মা কোনও দোষ দেখেননি। তাঁর কনিষ্ঠ পুত্রটিকেও নিজের পছন্দমতো বিষয়ে শিক্ষিত হবার পথে বাধা দেননি এই জননী।
পরিণত বয়সে মায়ের মৃত্যু নিয়ে তাঁর কোনো ক্ষোভ ছিল না। কিন্তু মৃত্যুর কয়েক বছর পরেও স্মৃতিকথায় তিনি লিখেছেন, ‘প্রতিদিন একটা সময়ে তাঁর কথা খুব বেশি মনে পড়ে।’ বিশেষ করে দিনের কাজ সেরে ঘরে ফেরার সময়টাতে মাকে দেখতে না পাওয়ার দুঃখটা ছিল অসহনীয়। কারণ তাঁর বাড়ি ফেরাটা চিরকাল ছিল ‘মায়ের কোলে ফিরে আসা।’ বলেছেন, বয়সের নিয়মে বয়স বেড়ে গেছে কিন্তু বাড়ি ফেরার মুহূর্তে আমি চিরকালের মাতৃক্রোড় পিয়াসী শিশু হয়ে যেতাম। শুধু নিজের কথা বলেননি, মায়ের হয়েও কথা বলেছেন তাঁর পুত্র। দিনের কাজ শেষ করে বৃদ্ধ পুত্রের ঘরে ফেরার জন্য অতিবৃদ্ধা মায়ের আমৃত্যু দৈনন্দিন প্রতীক্ষার পালায় কোনোদিন ছেদ পড়তে দেখেননি তাঁর পুত্র। আর ফেরার সময় হলে মা কেমন করে যেন তা টের পেতেন সে কথা বলতে গিয়ে তিনি লিখেছেন, ‘আমরা দুভাই, দুটো বাপমরা ছেলে যেন সত্যিকার অর্থেই ছিলাম তাঁর দুচোখের মণি যাদের চোখের ভিতরে অর্থাৎ দৃষ্টিসীমার মধ্যে ফিরে না পাওয়া পর্যন্ত তাঁর স্বস্তি নেই…. যেন চক্ষুষ্মতী হয়ে উঠতে পারতেন না তিনি।’
মোটামুটি পর্দা মেনে চলা মা, পারতপক্ষে বাড়ির বাইরে যিনি পা রাখতেন না কিন্তু সময় অতিক্রান্ত হলে স্কুলফেরত পুত্রদের জন্য ঘোমটাটা একটু বড় করে পায়ে পায়ে এগিয়ে যেতেন সামনের রাস্তা পর্যন্ত। পরবর্তী সময়ে চেম্বার থেকে ফিরতে রাত হলে লন্ঠন হাতে একই জায়গায় মাকে দেখেছেন নিয়মিত। কদাচিৎ কখনও ব্যতিক্রম হলে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছেন মায়ের বিশ্বস্ত কোনো ভৃত্য বা প্রতিনিধিকে।
নাটক অন্ত প্রাণ পুত্র তাঁর, রিহার্সেলে ঢের দেরিও প্রায় নিত্য-নৈমিত্তিক হয়ে উঠতো মাঝেমধ্যে। তখন রাস্তার মাথায় লন্ঠন হাতে ভৃত্য, বাড়ির বাইরের দরজায় উৎকন্ঠিত জননী। মা যখন আর নেই ‘ঘর, ঘরের দুয়ার, গলির মাথা বা মোড়ের জায়গাগুলোর খাঁ খাঁ শূন্যতা পূরণ করা উৎকন্ঠিত কোনো মাতৃমূর্তি বা মাতৃকন্ঠের উদ্বেগাকুল জিজ্ঞাসা, নুরু, বাবা, এলি?’ এমন সব স্মৃতিচারণধন্য এ গ্রন্থ অনেক অসংখ্য অগন্য মায়ের চোখ ভিজিয়ে দেবে।
তিনি লিখেছেন, ‘পাঁচশো কোটি মানুষের বাসভূমি পৃথিবী নামের এই গ্রহ আর তার কোলে আমার ক্ষুদ্র গৃহটি সমস্ত জগৎ-সংসার আর আমার নিজের সংসার-পরিবার সবকিছুই এক বিবিক্ত শূন্যতা ছেয়ে থাকে নিরন্তর, শুধু একজন মায়ের অভাবে এবং তিনি তো আমারই মা।’
শেষ পর্যন্ত পুত্রের স্মৃতিতে তাঁর মা প্রতিদিনকার একটি স্থিরচিত্র। তাঁর ভাষায় ‘পুত্রের ঘরে ফেরার উদগ্রীব প্রতীক্ষায় একাকিনী এক নারী, কখনও বেলাশেষের অস্তগামী সূর্যের লালাভ আলো গায়ে মেখে বা সূর্যাস্তশেষে ঘনায়মান আঁধারের সিল্যুয়েটে কিংবা কখনও রাত গভীরের ঘোর তমসায় প্রদীপ-হাতে ‘লেডি উইথ দ্য ল্যাম্প।’ … দিনের কাজ শেষ করে ঘরে ফেরার লগ্নে, রাতের অসীম আকাশে চোখ মেলে দিলে মনে হয়, একজন মা আজও ওখানে প্রতীক্ষমান, তারার দীপ-হাতে, পুত্রের ফিরে আসার পথ চেয়ে।’

x