পুকুর ভরাটকারীর বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে

বৃহস্পতিবার , ১২ ডিসেম্বর, ২০১৯ at ৫:১৪ পূর্বাহ্ণ

বাংলাদেশে বিদ্যমান পুকুর ও জলাশয়গুলোর সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার প্রয়োজন। সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই দেশে প্রতিদিন প্রায় ২১২ হেক্টর কৃষিজমি নানা কারণে ধ্বংস হচ্ছে। আর জলা ও বনভূমি কমে যাওয়ার হার আরও বেশি। জলাভূমি মৎস্য উৎপাদন ও কৃষির সেচ কাজের প্রধান উৎস হতে পারে। অন্যদিকে বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের কারণেও বাংলাদেশের কৃষি ক্ষেত্রে কতগুলো চ্যালেঞ্জ দেখা দিয়েছে। এর কারণে একদিকে খরা ও মরুময়তা বাড়ছে, অন্যদিকে বাড়ছে অতিবৃষ্টি ও বন্যার প্রকোপ। এতে দুভাবেই ফসল উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। তাই এই বিরূপ পরিস্থিতি মোকাবিলায় নতুন করে পুকুর খনন ও পুরাতন পুকুরগুলো সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। এতে খরার হাত হতে যেমন রক্ষা পাওয়া যাবে, তেমনি বৃষ্টি ও বন্যার পানি ধরে রাখবারও সুব্যবস্থা হবে।
বিদ্যমান পুকুরগুলো যেখানে রক্ষার পদক্ষেপের কথা সচেতন মহল ভাবছেন, এমন সময় জানা গেলো, শববর্ষী একটি পুকুর উধাও হয়ে গেলো। গতকাল দৈনিক আজাদীতে ‘মুছে গেল ১০৩ বছরের স্মৃতি’ শীর্ষক প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘ফতেয়াবাদ রামকৃষ্ণ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বয়স ১০৩ বছর। বিদ্যালয়ের সামনের পুকুরের বয়সও প্রায় সমান। তালতইল্যা পুকুর নামে পরিচিত এটি। ভরাটে বিলীন হয়েছে শতবর্ষী পুকুরটি। উঁচু বাউন্ডারি দেয়ালের ভেতরে থাকা এ পুকুরের ভরাট জায়গায় একটি গার্মেন্টস কারখানা গড়ে তোলা হবে বলে জানা গেছে।’
পুকুর ভরাট আইনত অপরাধ। প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় জলাশয়ের গুরুত্ব অপরিসীম। পরিবেশ সংক্রান্ত আইনে বলা আছে, ‘বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫ (সংশোধিত-২০১০) অনুযায়ী জাতীয় অপরিহার্য স্বার্থ ব্যতীত কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান কর্তৃক সরকারি বা আধা সরকারি বা স্বায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠানের মালিকানাধীন বা দখলাধীন বা ব্যক্তি মালিকানাধীন পুকুর ভরাট করা বা শ্রেণী পরিবর্তন করা যাবে না।’ এ ধরনের করলে তার শাস্তি হিসেবে জেল-জরিমানার কথা বলা হয় আইনে। কিন্তু পরিবেশ অধিদপ্তরের নিষেধাজ্ঞা কিংবা আইনের প্রতি তোয়াক্কা না করে পুকুর ভরাটে নেমে পড়েন এক শ্রেণির প্রভাবশালী মহল। ফলে দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে পুকুরগুলো।
পত্রিকান্তরে প্রকাশিত তথ্যে জানা যায়, নগরীর ১৯টি থানায় পুকুর ছিলো ৩৩ হাজার ২৬৫টি। এর মধ্যে সুনির্দষ্টভাবে ২ হাজার ৬৪১টি পুকুর সংরক্ষণের নির্দেশনা দেয়া হয়। কিন্তু এসব রক্ষা করা হয়েছে কি না এ বিষয়ে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। নগরীর পাহাড়তলীতে আমানত উল্লাহ সড়কের চন্দনাপুকুর, পদ্মপুকুর, ডিসি রোডের বড়মিয়া মসজিদ পুকুর, মুরাদপুর মোহাম্মদপুর মাজার সংলগ্ন পুকুরসহ আরো অনেক জলাশয় ভরাট করা হয়েছে। নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে এমন কর্মকাণ্ড চালানো হলেও নীরব ছিলো সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। জলাশয় ভরাট ঠেকানোর গুরুত্ব এখনো কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ। এ জন্য নজরদারীর অভাবকেই দায়ী করছেন পরিবেশবিদরা। পুকুর-জলাশয় ভরাটের কারণে বর্ষায় জলজটে নগরবাসীর ভোগান্তি ক্রমেই বাড়ছে বলে মন্তব্য তাঁদের।
আগে আমরা বিভিন্ন জায়গায় যে পরিমাণ দিঘি ও পুকুর দেখতাম, এখন তেমন একটা দেখা যায়না। কৌশলে দিনে দিনে ভরাট হয়ে যাচ্ছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমতি ছাড়া পুকুর ভরাটের কোন সুযোগ নেই, তারপরও হয়তো তাদের অগোচরে প্রতিনিয়ত পুকুর ভরাট হচ্ছে। তদারকি সংস্থা পরিবেশ অধিদপ্তরের অগোচরে কিংবা যোগসাজসে পুকর ভরাট হয়ে যাচ্ছে এটা মারাত্মক আকার ধারণ করবে। যেইভাবে হোক পুকর ভরাট বন্ধে পরিবেশ অধিদপ্তরের এখনি পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। পুকুর জীবনের একটি অংশ- এ বিষয়টাকে মাথায় রাখতে হবে। পুকুর রক্ষায় প্রত্যেককে নিজ নিজ অবস্থান থেকে এগিয়ে না আসলে বাকি পুকুরগুলোকে রক্ষা করা কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। শুধু সরকারের দিকে না তাকিয়ে, পুকুর ভরাটকারীর বিরুদ্ধে সবার দরকার সামাজিকভাবে সোচ্চার ও প্রতিরোধ করা। পুকুর ভরাটকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা ও শাস্তিই পারে পুকুর ভরাট বন্ধ করতে। যে কয়টি পুকুর এখনো বেঁচে আছে, তা রক্ষা নগরবাসীর নৈতিক দায়িত্ব। পাশাপাশি দায়িত্বশীল সংস্থাকে আরো গতিশীল হতে হবে। জনগনকে সচেতন হতে হবে, জনগণ সচেতন হলেই এই অনাচার বন্ধ হবে বলে অনেকে মনে করেন।

x