পায়ে পায়ে পথচলা

দেবাশীষ বল

মঙ্গলবার , ১২ নভেম্বর, ২০১৯ at ১০:৫৬ পূর্বাহ্ণ
314

চমকে উঠেছিলাম বললে অতিশয়োক্তি হয়ে যাবে; বরং বলা যায় অবাক হয়েছিলাম বাবরের প্ল্যানটা শুনে। ঘটনা দিন পনেরো আগের। সেদিন সন্ধ্যায় সিআরবি-র শিরীষতলায় বসেছিল আমাদের ক্লাব ভার্টিক্যাল ড্রিমার্সের জেনারেল মিটিং। নানারকম ইস্যু , ক্লাবের পরিচালনা পদ্ধতি বিষয়ক আলোচনা , অদূর ভবিষ্যতে হিমালয়ে বিভিন্ন অভিযানের প্ল্যান নিয়ে আলোচনা শেষে আমরা যখন উঠি উঠি করছি তখনি বাবরের এই ঘোষণা। ও পায়ে হেঁটে বাংলাদেশের সবগুলো জেলায় যেতে চায়। শুনে আমরা অবাক হওয়ার পাশাপাশি ভীষণ খুশিও হলাম। খুশি হওয়ার কারণ মূলত দুটো। এক- আমরা একসাথেই আমাদের প্রিয় ক্লাব ভার্টিক্যাল ড্রিমার্সের যাত্রা শুরু করেছিলাম বলে আমাদের সম্পর্কটা বহুদিন আগেই ভ্রমণসঙ্গীর সীমারেখা ছাপিয়ে ‘ব্রাদার ফ্রম এনাদার মাদার’-এ গিয়ে ঠেকেছে। দুই, যেটা বিভিন্ন কারণে নিজে করতে পারছি না সেটাই প্রিয় কোন ছোটভাই করছে এই চিন্তাটাই মনে আশ্চর্য একটা ভালো লাগা ছড়িয়ে দেয়; খানিকটা ঈর্ষাও। আর ঈর্ষা হবে নাইবা কেন ! বঙ্গদেশের চৌষট্টিখানা জেলায় শুধু পায়ে হেঁটে ঘুরে বেড়ানো তো আর চাট্টিখানি কথা নয়। এই আশি-নব্বই দিনে কতো কতো স্মৃতি জমা হবে, চোখ দিয়ে চেখে দেখা যাবে হাজারো গ্রামের সবুজ সৌন্দর্য, দেখা মিলবে সরল-জটিল হাজারো মানুষের , ইট-পাথর-ইস্পাতের অগুনতি শহরে পড়বে পায়ের ছাপ আরও কতো কি!
এই লেখায় অনুসন্ধিৎসু পাঠক ঈর্ষার গন্ধ পেলে তাকে মোটেও দোষ দেয়া যাবে না। যা হোক, কথা বাড়িয়ে আর রোষ কুড়াবো না। আসল কথায় আসি। বাবরের ৬৪ জেলায় পায়ে হেঁটে যাওয়ার একটা বড় উদ্দেশ্য আছে। আমাদের নিত্যব্যবহার্য সিঙ্গেল ইউজ পলিথিনের (প্লাস্টিকের ওয়ানটাইম গ্লাস, কাপ, প্লেট, কোল্ড ড্রিংকসের পেট বোতল,স্ট্র, বাজারের পলিথিন ইত্যাদি ) ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে জনসচেতনতা তৈরি করতেই বাবরের এই “পায়ে পায়ে ৬৪ জেলা” শিরোনামের উদ্যোগ। Say_No_To_Single_Use_Plastic ট্যাগলাইনটিও তাই উদ্দেশ্যের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ।
বাবরের এই পদব্রজে যাত্রার খবরটা সোশ্যাল মিডিয়ার সীমানা ছাড়িয়ে মূল সংবাদ মাধ্যমে আসামাত্র দেখলাম বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। সংবাদমাধ্যমে বাবর এবং তার উদ্যোগটা নিয়ে লেখা সামপ্রতিক আর্টিকেলগুলো পড়ে বেশ ভালোও লাগলো। ও যে উদ্দেশ্য নিয়ে যাত্রা শুরু করেছে সেটা প্রচারের আলোয় এসে অন্তত কিছু মানুষ প্রতিদিন ব্যবহার করা প্লাস্টিক-পলিথিনের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে সচেতন হয়েছে বলে আমার বিশ্বাস। এজন্য সংবাদ মাধ্যমগুলোরও ধন্যবাদ প্রাপ্য।
যা হোক, উদ্যোগ প্রসঙ্গ বাদ দিয়ে আসি উদ্যোক্তায়। পত্রপত্রিকায় যে বাবরকে লোকে জানছে সে বাবরকে আমি বা আমরা আরেকটু বেশী জানি দাবী করলে মিথ্যে বলা হবে না। তাই এই লেখাটা একটু অন্যভাবেই লিখছি ।
চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ থেকে ডাক্তারি পাস করে বাবর আর দশজন ডাক্তারের মতোই পেশায় ঢুকে পড়েছিলো। পেশায় দায়িত্ব-ব্যস্ততা থাকবেই, তবে বাবর এমন একটা সেক্টর বেছে নিয়েছিল যেটাতে ওর বোহেমিয়ান সত্তা মনের খোরাক মেটানোর মতো অন্তত কিছুটা সুযোগ পেয়েছিলো। ‘পেয়েছিলো’-র মতো ক্রিয়াপদের অতীতরূপ ব্যবহারের কারণ জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থার চাকরিটাও গতমাসে ছেড়ে দিয়েছে। মোটা অংকের বেতনের এই চাকরি পেলে সচরাচর কেউ ছাড়ে না, বরং বর্তেই যায় কিন্তু বাম কাঁধে জিপসী এঞ্জেল ভর করলে এমন আর্থিক নিশ্চয়তার সংস্থানে মন টেকা কঠিন। বাবরের ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। নইলে ডাক্তারি পেশার ব্যস্ততা সত্ত্বেও ভারতের নেহেরু ইন্সটিটিউট অফ মাউন্টেনিয়ারিং থেকে পাক্কা ২৮ দিনের লম্বা কোর্স করতে যাওয়া এবং সফলভাবে প্রশিক্ষিত হয়ে আসাটা সম্ভব হতো না। শুধু কি তাই! এইতো কদিন আগেই ও ভারতীয় অংশের হিমালয় থেকে টানা তিনটা অভিযান করে ফিরেছে। বাংলাদেশের পর্বতারোহণের প্রেক্ষাপটে এটা নিঃসন্দেহে দারুণ ব্যাপার। শুধু পর্বতারোহণই নয়, সাইক্লিংয়েও হাত পাকিয়েছে বাবর। এই তো বছরখানেক আগেই দুই চাকায় পাড়ি দিয়ে এসেছে ৬৪ জেলা। এবার পালা দু’পায়ে সবগুলো জেলা ছোঁয়ার; সেই সাথে জনসচেতনতামূলক কাজ তো রয়েছেই।
এই টার্গেট পূরণ করতে বাবরের আনুমানিক ৭০ থেকে ৮০ দিন লাগতে পারে। অবশ্য শারীরিক সুস্থতা আর আবহাওয়ার ওপরও নির্ভর করবে অনেককিছু। মাস তিনেক পরে বাবর আলী ফিরে এলে আমরা অনেক অনেক গল্প শুনতে পারবো নিশ্চিত। ততদিন পর্যন্ত বাবরের পায়ের তলায় থাকুক শর্ষে।
ওর এই ড্রিম প্রজেক্ট শুরু হওয়ার আগে ফেসবুকে নিজের পরিকল্পনার কথাও জানান দিয়েছে বাবর। পাঠকদের জন্য ফেসবুক স্ট্যাটাসটা তুলে দিলাম –
“এই প্ল্যানটা আমার অনেকদিনের লালন করা। চাকরি ছাড়ার সময়ই মাথায় ছিল কমসে কম ৬ মাসের একটা ব্রেক নেব। প্রাথমিকভাবে হিমালয়ে মাস দুয়েক কাটাব সেটা আগেই ঠিক করা ছিল। এর পরে কি করা যায় সেটা থেকেই ভাবনাটা আসে। দেশের ৬৪ জেলা পায়ে হেঁটে ঘুরে দেখলে কেমন হয়?
যাই হোক, অনেক প্ল্যানিং এর পরে আর কয়েকদিনের মধ্যেই আমি পথে নামতে যাচ্ছি।গত মাসখানেক ধরে খেটেখুটে একটা রুট বানিয়েছি।দেশের ৬৪টা জেলা ছুঁতে সময় লাগবে ৭০-৮০ দিন।পাড়ি দিতে হবে ৩০০০ কিলোমিটার + পথ।সবকটা জেলা ছুঁলেও সবকয়টার হয়তো জেলা সদরে যাওয়া হবে না।কিছুক্ষেত্রে উপজেলা সদরেও থাকব।এই দীর্ঘ যাত্রাপথে আমার দরকার আপনাদের সাহায্য।আমার মূল যে সহায়তাটা দরকার সেটা হল আবাসন সংক্রান্ত।আমার যাত্রাপথের কোন জেলায়/উপজেলায় আপনার নিজ বাড়ী/বন্ধু/আত্মীয়-স্বজন/সহকর্মীর বাড়িতে আমার থাকার ব্যবস্থা করে দিতে পারলে আমি খুবই আনন্দিত হব। বেশ কিছু জেলা/উপজেলা পরিষদ ডাকবাংলোতে থাকার মতো ব্যবস্থা আমার করা থাকলেও আমি ওসব ডাকবাংলোতে একা রাত কাটানোর চেয়ে মানুষের সঙ্গ অধিক উপভোগ করব বলেই ধারণা। আর থাকার ক্ষেত্রে আমার এক্সপেকটেশন ন্যূনতম। কোনোরকম পিঠ ঠেকাতে পারলেই হয়। পাহাড়ে যারা যায়,তারা অল্পেই তুষ্ট থাকে কিন্তু!
আবাসনের জায়গাটা মূল রাস্তা থেকে দূরে হলেও খুব একটা সমস্যা হবে না। কারণ প্ল্যান অনুযায়ী প্রত্যেকদিন সন্ধ্যা নাগাদ কোন একটা নির্দিষ্ট জায়গায় হাঁটা শেষ করে আমি যেখানে আবাসনের ব্যবস্থা হয়েছে/হতে পারে সেখানে যাব (দূরত্ব বেশি হলে এক্ষেত্রে আমি যানবাহনও ব্যবহার করতে পারি)। পরদিন ঠিক সেই জায়গাটা থেকে হাঁটা শুরু করব।
আবাসনের ব্যাপারে কেউ আমাকে হেল্প করতে পারলে এই পোস্টের কমেন্টে কিংবা ইনবক্সে জানাতে পারেন।
বিশাল এই ভ্রমণ ঠিকভাবে শেষ করাটা নির্ভর করবে অনেকগুলো ব্যাপারের উপর।নিজের শারীরিক সুস্থতা, আবহাওয়া, টানা এতদিন হাঁটার ধকল,রাস্তাঘাটে নিরাপত্তা ইত্যাদিই মূল চ্যালেঞ্জ।
এই ভ্রমণকালীন Single Use Plastic এর ব্যবহার কমানোর জন্য আমি সচেতনতা বৃদ্ধির চেষ্টা করে যাব।
আমার যাত্রাপথের রুট সম্পর্কে আমি আমার নিজের ওয়ালে আপডেট দিব। দিনশেষে। কেউ যদি তার নিজের জেলায় হাঁটার সময় আমাকে সঙ্গ দিতে চান কিংবা কিছু নির্দিষ্ট দূরত্ব আমার সাথে হাঁটতে চান অথবা আপনার নিজ জেলা/উপজেলায় এক কাপ চা/কফি খেতে চান এই অধমের সাথে,তাহলে আমাকে অবশ্যই জানাবেন।
সবার ভালোবাসা কাম্য। “

x