পাহাড় চূড়ায় ড্রাগনের বিস্ময় (ভিডিও দেখুন)

সমির মল্লিক, খাগড়াছড়ি

মঙ্গলবার , ২৫ জুন, ২০১৯ at ১০:২৮ পূর্বাহ্ণ

পাহাড়ের গড় উচ্চতা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১২শ থেকে ১৫শ ফুট। এত উপরে মানুষের বসবাস কষ্টসাধ্য। বিস্ময়কর হলেও সত্যি, পাহাড়ের চূড়ায় ড্রাগন চাষে বিস্ময় জাগিয়েছেন মহালছড়ির কৃষক হ্লাশিং মং চৌধুরী। উপজেলার ধুমনিঘাট এলাকায় প্রায় ৪০ একরের বাগান গড়ে তুলেছেন তিনি।
বর্তমানে প্রায় ২২শ ড্রাগনগাছে ফল ঝুলছে। প্রতিটি গাছে কমপক্ষে ১০ থেকে ২০টি পাকা ফল। যত্ন ও নিয়মিত সূর্যের আলো পাওয়ায় পাহাড়ের চূড়ায় ড্রাগনের বাম্পার ফলন হয়েছে। বর্তমানে প্রতি গাছ থেকে ৪-৫ কেজি ড্রাগন ফল পাওয়া যাচ্ছে। সাধারণত সমতল বা কম উঁচু ভূমিতে ড্রাগন চাষাবাদ হয়। এত উঁচু হওয়ায় বিপত্তি সেচ নিয়ে। বর্ষায় সেচের দুশ্চিন্তা না থাকলেও শুষ্ক মৌসুমে বিপাকে পড়তে হয়। এখন প্রায় ১৫শ ফুট নিচের ঝিরি থেকে গভীর নলকূপের সাহায্যে পানি তুলতে হয়। তবে পানির চাপ কম থাকায় বাধ্য হয়ে প্রেশার মেশিন বসাতে হয়। পানির অভাবে উৎপাদন মাঝেমধ্যে
ব্যাহত হয়ে বলে জানিয়েছেন হ্লাশিং। সুউচ্চ পাহাড়ে বাগান গড়ে পুরো জেলায় আলোচিত হ্লাশিং মং। তিনি জানান, উঁচু পাহাড়ে বাগান গড়তে কঠিন পথ পাড়ি দিয়ে হয়েছে। যোগাযোগ ব্যবস্থার সংকট ছাড়াও এখানকার মূল সমস্যা সেচের পানির অপর্যাপ্ত। পানির সংকট বাগান করায় বড় বাধা। সেই সংকট নিয়ে ২০১৭ সালে শুরু করি ড্রাগনের আবাদ। তবে বর্তমানে ড্রাগন চাষ লাভজনক। পানির সংকট মেটাতে বসানো হয়েছে ৩ হাজার লিটার ধারণ ক্ষমতার ট্যাংক।
খাগড়াছড়ি হর্টিকালচার সেন্টারের ‘বছরব্যাপী ফল উৎপাদনের মাধ্যমে পুষ্টি উন্নয়ন প্রকল্প’-এর আওতায় ড্রাগন চাষ শুরু করেন হ্লাশিং। কয়েকটি ব্লকে ড্রাগনের আবাদ করা হয়। মাত্র ৫শ ড্রাগনগাছ নিয়ে শুরু হলেও বর্তমানে গাছের সংখ্যা প্রায় ২২শ। আরো ৯শ চারা রোপণের প্রস্তুতি চলছে। সঠিক পরিচর্যার কারণে বর্তমানে প্রতিটি গাছ থেকে ফল পাওয়া যাচ্ছে।
ড্রাগন বাগান পরিচর্যায় কাজ করা শ্রমিকেরা জানান, উঁচু পাহাড় হওয়ায় এখানে ড্রাগন চাষ কষ্টসাধ্য। ঝিরি থেকে পানি তুলতে হয়। এছাড়া পানির চাপ কম থাকায় সেচ দিতে বেগ পেতে হয়। তবে উঁচু পাহাড়ে হওয়ার কারণে এখানে সবসময় সূর্যের আলো পড়ে। এতে ফলনও ভালো হয়।
২০১৬ সালে শখের বশে বাগান শুরু করেন হ্লাশিং মং। বর্তমানে ৮-১০টি পাহাড়ে বিস্তৃত হয়েছে সেই স্বপ্ন। নানা জাতের প্রায় ২০ হাজার ফলদ বৃক্ষ রয়েছে তার বাগানে। নিয়মিত শ্রমিকের পাশাপাশি বাগানে কাজ করেন মৌসুমি শ্রমিক।
তিনি জানান, বাগানে নানা রকমের ফল রয়েছে। তবে বাণিজ্যিক ফল হিসেবে বর্তমানে ড্রাগন বেশ জনপ্রিয়। পাহাড়ের ঢালু অংশে রোপণের মাত্র এক বছরের মধ্যে এর ফলন পাওয়া যায়। চলতি বছরে ড্রাগনের ভালো ফলন হয়েছে। চলতি মৌসুমে ড্রাগন ফলের বিক্রিমূল্য তিন থেকে চার লাখ টাকা। তিনি জানান, পিংক রোজ রঙের ড্রাগনের কদর বেশি, দামও বেশি। আমার বাগান দেখে বর্তমানে অনেক চাষি ড্রাগন চাষে আগ্রহী।
খাগড়াছড়িতে উন্নত জাতের ফলদ বাগান সৃজন, অপ্রচলিত ও বিলুপ্তপ্রায় ফল চাষে জনগণকে উদ্বুদ্ধ করায় জাতীয় পর্যায়ে প্রথম হন হ্লাশিং। চলতি বছরের ১৮ জুন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর থেকে তিনি এই স্বীকৃতি পেয়েছেন।
খাগড়াছড়ি পাহাড়ি কৃষি গবেষণা কেন্দ্রের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মুন্সী রাশীদ আহমদ জানান, এত উঁচু পাহাড়ে ড্রাগন চাষের নজির এটাই প্রথম। প্রতিকূল প্রাকৃতিক পরিবেশের মধ্যে কৃষক হ্লাশিং ড্রাগন চাষ করে বিপ্লব ঘটিয়েছেন। কেবলই ড্রাগনই নয়, তার বাগানে প্রায় ২০ হাজার ফলদ বৃক্ষ রয়েছে। পাহাড়ি এলাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থার অপ্রতুলতা এবং পানির সংকটের কারণে ড্রাগন আবাদ কঠিন হচ্ছে। যোগাযোগে অচলাবস্থা কেটে গেলে লাভের মুখ দেখবে কৃষক।
হ্লাশিং চৌধুরীর বাগান সৃজনে অন্যতম প্রণোদনাকারী প্রতিষ্ঠান খাগড়াছড়ি হর্টিকালচার সেন্টার। প্রতিষ্ঠানটির উপ-পরিচালক মো. মোয়াজ্জেম হোসেন জানান, বছর তিনেক আগে মহালছড়ির ধুমনিঘাট এলাকায় হ্লাশিংয়ের বাগান পরির্দশন করি। উঁচু ভূমি হওয়ায় এখানে ড্রাগনের চাষাবাদ নিয়ে শঙ্কা ছিল। বছরব্যাপী ফল উৎপাদনের মাধ্যমে পুষ্টি উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় শুরুতে হর্টিকালচার থেকে প্রায় ৫শ চারা দেওয়া হয়। সঠিক যত্ন ও পরিচর্যার কারণে প্রথম বছরে ফলন আসে। তার সফলতা দেখে হর্টিকালচার সেন্টারের পক্ষ থেকে ২য় দফায় ড্রাগনের চারাসহ প্রয়োজনীয় প্রণোদনা প্রদান করা হয়। বর্তমানে তিনি জেলার অন্যতম সফল চাষি। তার উদ্যোগ স্থানীয় কৃষকদের জন্য বড় অনুপ্রেরণা।

সমির মল্লিকের ধারণ করা ভিডিওটি দেখতে ক্লিক করুনhttps://bit.ly/33KD7H7

x