পাহারদার

আলী আসকর

শুক্রবার , ৬ ডিসেম্বর, ২০১৯ at ৬:৪৫ পূর্বাহ্ণ

বইমেলায় যাওয়ার পরিকল্পনা অনেক আগে থেকেই, প্রতিবছর প্ল্যান হয়, কিন্তু বাস্তবের রূপ দেখে না। একুশ এলে নানান কারণ সামনে এসে দৌড়াদৌড়ি করে। সব কারণগুলো একত্র করতে পারে না আকাশ। এভাবে প্রত্যেক বছরের পরিকল্পনা মাটি হয়ে যায় একসময়।
গত বছর একটা ফাটাফাটি অবস্থান তৈরি করেছিল আকাশ। লেখক সার্কেলের সাথে সেও যাবে। গোছানো-গুছানো সব ঠিক ঠাক। বাধ-সাধল মা। মা বলল শরীরটা তার ভালো যাচ্ছে না। দু’দিন দুটি ধাক্কা দিয়েছে পুরো শরীর। ধাক্কার পর পর মাথা ঘুরছে লাটিমের মতো। সাথে সাথে ডাক্তারের কাছে নিয়ে গিয়েছিল মাকে। ডাক্তার বলেছে ভয়ের কারণ নেই। দু’বেলা ভালো মতো খেলে আর ধাক্কাধাক্কি হবে না। ২০১৭ গেছে মায়ের সুখকর সময়। একবারের জন্যও ডাক্তারের কাছে যেতে হয়নি আকাশকে।
এখন মায়ের সাথে লেগে আছে বড় আপা। দুলাভাই আছেন সরকারি সফরে। এক মাসের উপরে কাটাবে ফ্রান্স। তারপর যাবে সুইজারল্যান্ড। সফর কাটিয়ে একগাদা সওদা নিয়ে ফিরবে বাড়ি। বড় আপা সব কাজেই করিৎকর্মা মহিলা। বড় আপাকে বইমেলার কথা বললে শোনামাত্রই রাজি হয়ে যায়। তবে শর্ত জুড়ে দেয় একটা। তার জন্যে আর্নেষ্ট হোমিওওয়ের দুটো বই আনতে হবে। ‘সমুদ্র ও মাছ’ এই বইটি অবশ্যই লাগবে তার। বইটি যেন ভালো কোনো অনুবাদ লেখকের হয়। রাজি হয়ে যায় আকাশ।
চট্টগ্রাম থেকে ঢাকার দূরত্ব বেশি নয়। ডাবল লাইনের রাস্তাটা পথ আরো ছোট করে দিয়েছে। তারপরেও তো ঢাকা। গ্রাম মফস্বল নয়। জিনিস পত্তর, হোটেল সবখানে আগুনের ভাপ আছে। টাকা খরচ হয় পানির মতো। সবকিছু হিসেব নিকেশ করে ঢাকার বহরটা বড় করেছে পকেটে।
ট্রেনে চেপে বসল আকাশ। বসেই বুঝতে পারল একটা ছোটখাটো ভুল করেছে সে। পাঁচ ঘণ্টার রাস্তা। রাত হলে চোখ বুঁজে বুঁজে মৃদু হেলে হেলে পথ পার করতে পারত। কিন্তু এখন বাইরে সূর্যের শাসন। এই সাত সকালেও সূর্যটা শক্ত দাঁত বসিয়ে দিয়েছে প্রকৃতিতে। কেন যে একটা বই সাথে থাকল না তার!
এসি চালু হয়ে গেছে ট্রেনের কামরা জুড়ে। ঠান্ডা হাওয়া নামছে দু’পাশ থেকে। আরো সাত-আট মিনিট বাকি ট্রেন ছাড়তে। তার পাশের একটা সীট খালি পড়ে আছে এখনো। একটা ভালো লোক মনে মনে কামনা করছে আকাশ।
‘প্লিজ….’
শব্দটা ট্রেন ছাড়ার মুহূর্তে বাড়ি খেল কানে। ঘাড় বাঁকা করে দেখল আকাশ। তার কাছাকাছি একটি মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মেয়েটির নাকে-কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম। বেশ তাড়াহুড়ো করে এসেছে বোঝা যাচ্ছে।
‘মেয়েটি বলল, ‘কপাল ভালো ছিল বলে ট্রেনটা মিস হয়নি। রাস্তাঘাটের কী ভয়াবহ অবস্থা, ভাবতেই গা ঘিন ঘিন করে।’
‘আকাশ চুপ হয়ে থাকে। গায়েপড়ে কথা বলা লোকগুলো সে একদম পছন্দ করে না। এই মেয়েটা যদি সারা রাস্তায় বকবক করে? এ রকম একটি মেয়ে তার যাত্রার সঙ্গী হবে? আকাশের মাথায় বিরক্তির পরিমাণটা ক্রমশ বাড়তে থাকে।
‘একটা টিস্যু পেপার হবে?’ মেয়েটি ওর দিকে না তাকিয়েই জিজ্ঞেস করল।
‘না, নেই। ’
‘একটা প্রয়োজনীয় জিনিস কাছে রাখতে মানুষ সবসময় ভুল করে। এই ভুলটা আমার বেশি বেশি হয়।’
একটা ধাক্কা দিয়ে ট্রেন চলা শুরু করল। একটু একটু করে গতিও বেড়ে যাচ্ছে তার। দীর্ঘদিন পর ট্রেনে চড়ে বেশ উৎফুল্ল বোধ করছে আকাশ।
‘আমি ফারজানা ফাইজা। ফারজানা কেউ ডাকে না। সবাই বলে ফাইজা। কিন্তু ফাইজার চেয়ে ফারজানা নামই কানে ভালো লাগে।’
‘আকাশ আশপাশে কয়েকবার তাকায়। পূর্বপাশের একটা যুবক গভীর মনোযোগ দিয়ে তাদের কথাগুলো শুনছে, পাশের লোকটা তাদের নিয়ে কী ভাবছে আল্লাহই জানে।’
মেয়েটি তার ব্যাগ থেকে একটি বই বের করে কোলে রাখল। সমরেশের কালো বেলা। এই বইটি আকাশেরও অনেক আগে পড়া। কাহিনিটা স্বচ্ছ কাঁচের মতোই তার মাথায় এখনো জিইয়ে আছে।
‘আমার প্রিয় লেখক। কালবেলা বইটি তিনবার পড়েছি। এবার পড়লে চারবার হয়ে যাবে। বিরিয়ানির মতোই এর কাহিনি। ঝাল এবং স্বাদে টইটম্বুর। ’
কী এক বিতিকিচ্ছি পরিবেশ তৈরি করছে মেয়েটি। পাশের যুবকটি আরো বেশি উৎসুক দৃষ্টি ফেলে মেয়েটির দিকে তাকাচ্ছে। বইমেলার আনন্দটা ধীরে ধীরে মাটি হতে চলেছে তার। জানলা খোলা থাকলে আকাশ বাইরের আকাশ দেখত। কিন্তু এক সময় নিয়তির উপরই নিজেকে ছেড়ে দিল সে।
‘আপনি কে আমি জানি।’
আকাশ চমকে তাকাল মেয়েটির দিকে। জানে মানে? তার জানা মতে মেয়েটির সাথে তার কখনো দেখা-সাক্ষাৎ হয়নি। ফাইজা নামে কোন মেয়েটেয়ে তাদের ক্লাসেও ছিল না। মেয়েটি কি তাকে ব্ল্যাকমেইল করতে চাইছে? এ রকম ঘটনাই তো রোজ এদিক-ওদিক অহরহ হচ্ছে। আকাশ সতর্কতার সাথে নিজেকে প্রস্তুত করতে শুরু করল।
‘আপনার ‘ও’ গল্পটি অনেক চমৎকার। কাহিনির বাঁধুনিও দারুণ। ‘ও’র মৃত্যুটা আমার কাছে অস্বাভাবিক মনে হয়েছে। অবশ্য স্বাভাবিক হলে গল্পটা মার খেতো। ’
একটা বিরাট নি:শ্বাস ফেলল আকাশ। আসল বিষয়টা তার কাছে এখন পরিষ্কার হলো। মেয়েটি তার গল্পের পাঠক। পাঠকের গন্ধ ফেলে লেখকের মন ভালো হয়ে যায়। ধীরে ধীরে আকাশের আকাশও পরিষ্কার হতে থাকল। মনটা মুহূর্তে খালবলে হতে শুরু করল তার।
ফাইজা বইয়ের পাতায় ডুবে আছে। ১০ মিনিট। ২০ মিনিট। ১ ঘন্টা। ২ ঘন্টা। অনেকক্ষণ। মাঝে মাঝে ফাইজার দিকে চোখ ফেলছে আকাশ। চিকেন বার্গার চিকেন বার্গার’ বলে কয়েকবার শব্দ করে গেল ট্রেনের স্টাফ। একবারও ওদিকে তাকাল না ফাইজা।
বইমেলার মহাযজ্ঞ ঘুরে ঘুরে দেখল আকাশ। তাকে তাকে সাজানো বইয়ের সমুদ্র। দেশি-বিদেশি বইয়ে মিলেমিশে একাকার। প্রথমদিনে কেনাকাটার আগ্রহ তার নেই, লম্বা সময় নিয়ে এসেছে আকাশ। পকেটে প্রচুর কচকচে টাকা নিঃশব্দে গুনগুনে ব্যস্ত। দু’হাতে খরচ করলেও এই টাকা এক মাসেও শেষ হবে না।
এ পর্যন্ত আকাশের তিনটে বই বেরিয়েছে। দুটি বই রোমান্টিক গল্পের, একটি বই কবিতার। এবারও একটি প্রকাশনা সংস্থা পাণ্ডুলিপি চেয়েছিল। আরো যাচাই-বাচাইয়ের জন্য পাণ্ডুলিপি দেয়নি আকাশ।
বিশাল প্যাভিলিয়নে শোভা পাচ্ছে আকাশের দুটি বই। পাশাপাশি লেগে হেসে চলেছে এই বই দুটি। কী এক মহানন্দ কাজ করছে গোটা শরীরে। এই খুশি সীমাহীন মহাকাশের চেয়েও কম নয়।
ঢাকার হোটেলের খাওয়া-দাওয়ার ব্যাপারে আকাশের বিশেষ জ্ঞান নেই। বাবা বলে দিয়েছিলেন ফকিরাপুলের ওদিকে থাকতে। মফিজ রেস্তোরাঁ নামে একটা হোটেল আছে ওখানে খেতে। মফিজ রেস্তোরাঁ একের ভিতর দুই। আবাসিক ওপরে। খেয়েই উপরে ঘুমোতে যাওয়া। বাবা এভাবেই বর্ণনা করেছিলেন। বাবার পছন্দের হোটেলেই ঢুকল আকাশ।
হাত মুখ ধুয়ে খাবার টেবিলে বসল আকাশ। বেশ ঝকঝকে টেবিল। টেবিলে গ্লাসের নিচে দুই রকমের ম্যানু। ম্যানু দুটোতে নীরবে হাঁটতে থাকল আকাশের চোখ।
‘কী খাবেন স্যার?’ পাশে এসে হাসিমাখা মুখ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ওয়েটার। ধোপদুরস্ত পরিচ্ছন্ন এক বালক। বয়স সতেরো আঠারো হবে।
‘রূপচাঁদা আর একটি ভর্তা।’
‘বেগুন, ইছা শুটকি, আলু ভর্তাও আছে স্যার।’
‘একটি আনলেই হবে। আচ্ছা শুটকিই দাও।’
হাসিমাখা চেহারা নিয়ে ওয়েটার চলে গেল। মফিজ রেস্তোরাঁ নামে কোন রেস্তোরাঁর নাম আগে কখনো শুনেনি আকাশ। মফিজ নিয়ে আগে দাঁতের মাজনের একটা বিজ্ঞাপন হতো টিভিতে। কতোদিন হলো সেই বিজ্ঞাপনটি আর চোখে পড়ে না। দ্রব্যটি একবার চালু হয়ে গেলে তার বিজ্ঞাপনটিও এক সময় বন্ধ হয়ে যায়।
বাম পাশে তাকিয়ে চমকে উঠে আকাশ। ফাইজা না? এক মিনিট তাকিয়ে থাকে ও টেবিলের দিকে। মেয়েটির পাশে তিনটি উঠতি বয়সের তরুণ। ইউনিভার্সিটির কাছাকাছি টাইপের বয়স। একটি ছেলের দু’কানে সোনার রিং। ওই ছেলেটিই মাথা নাড়িয়ে নাড়িয়ে কথা বলছে। বাকি তিনজনই হাঁ করে রিংপরা ছেলেটির দিকে তাকিয়ে আছে।
আকাশ এক সময় নিজের ভুল বুঝতে পারল। প্রাণী জগতের মধ্যে মানবজাতিই বোধ হয় ভুলচুল বেশি করে। নিজের কাছে নিজেই লজ্জিত হলো সে।
শুটকির জন্ম চট্টগ্রাম হলেও চট্টগ্রামের লোকেরা শুটকি পাকাতে জানে না’ এই অবিশ্বাস্য কথাটি বিশ্বাস করতে শুরু করল আকাশ। আহামরি এই শুটকির ভর্তা। ইচ্ছে করে আরো তিন প্লেট নেয়। কিন্তু এ কাজটি সে কিছুতেই করতে পারে না। আশপাশের মানুষগুলোর কাছে সে আলোচনার পাত্র হয়ে দাঁড়াবে। ওয়েটারও তাকে অন্যকিছু ভাবতে শুরু করবে। কাল বেঁচে থাকলে সে আবার এই ভর্তা দিয়ে ভাত খাবে। মা কেন যে তাকে এ রকম একটি ভর্তা কোনোদিন খাওয়াইনি!
‘আপনি?’
আকাশ চমকে মাতা উঁচু করে তাকাল। এ মেয়েটিই কি ফাইজা? ট্রেনের ফাইজাকে তার চোখ মেলে তাকানো হয়নি। এক আধটু যা তাকিয়েছে তাও আবছা, অস্পষ্ট। মেয়েটি চমৎকার দৃষ্টি ফেলে এখন তার চোখে তাকিয়ে আছে। নিজেকে বেশ অসহায় অসহায় লাগছে আকাশের।
‘আমি ফাইজা। ট্রেনে দেখা হয়েছিল। আপনার দুটি গল্প বই কিনলাম। অটোগ্রাফটা পরে নিয়ে নেবো। আমি আরো ক’দিন ঢাকায় আছি।’
ফাইজার পেছনে পেছনে ছেলে তিনটে হেঁটে চলল। একটা আমুদে পরিবেশ সৃষ্টি হয়ে গেছে ইতোমধ্যে। আশপাশের সবাই সমীহের দৃষ্টিতে দেখল। অনেক দিন পর আকাশ বুঝতে পারল লেখক হিসেবে তার একটা জায়গা তৈরি হয়ে গেছে।
একগাদা বই নিয়ে দোতলায় উঠতে বেশ কষ্ট হলো আকাশের। কিছু দুর্লভ খ্যাতনামা লেখকদের বই সংগ্রহ করতে পেরে ভীষণ খোশ মেজাজে আছে সে। সাত নোবেল বিজয়ির একটি গল্প সংকলন সংগ্রহ করতে পেরেও যারপরনাই পুলকবোধে আছে। কালও নতুন বইয়ের সংগ্রহে মেতে থাকবে সে। বই কেনার লোভের চেয়ে বড় লোভ বোধ হয় দুনিয়ায় আরেকটিও নেই।
হোটেলে একটি চেয়ারও কোথাও খুঁজে পাচ্ছে না আসিফ। গতকাল কিছু কিছু টেবিল ফাঁকা ছিল। কালকের শুটকির ভর্তাটি এখনো জিব্বায় লেগে আছে। আজও সে শুটকির অর্ডার দেবে।
তিন হাত দূরে একটা সীট পেয়েও গেল আকাশ। কালকের বয়টাকে এখন কোথাও আর দেখা যাচ্ছে না। কাল ভালো ব্যবহার করেছিল ছেলেটা। পঞ্চাশ টাকা বখশিস দিয়েছিল। বখশিস পেয়ে বেশ গদগদ চেহারা হয়ে গিয়েছিল তার।
শুটকি থেকে হঠাৎ সরে গেল আকাশ। হান্ডির কাচ্ছি বিরানির বেশ নামডাক চট্টগ্রামে। মফিজ রেস্তোরাঁয়ও কাচ্ছি বিরানি খাবে। কাচ্ছি বিরানির অর্ডার নিয়ে চলে গেল তরুণ বয়।
আকাশ গ্রীবা উঁচু করে এদিক-ওদিক চোখ বুলাচ্ছে। অবচেতন মনেই সে যেন কাউকে খুঁজে বেড়াচ্ছে। কাকে খুঁজে বেড়াচ্ছে আকাশ? কাল মাঝ বরাবর টেবিলে ফাইজা তিন বন্ধুকে নিয়ে বেশ আমুদে চেহারায় ফাইজাকে দেখা গিয়েছিল। আজ একজনকে কোথাও দেখা যাচ্ছে না। কানে রিং পরা আউল ঝাউলা মার্কা ছেলেটা ফাইজার কে হয়? মাথার ভিতর নানান প্রশ্ন দৌড়তে থাকে আকাশের।
একুশের সকালটা চট্টগ্রামে বার বার দেখা হয়েছে, কিন্তু ঢাকার একুশের সকালটা একবারও দেখা হয়নি। একুশে ফেব্রুয়ারি আকাশ সারাদিন পাঞ্জাবি পরে, কালও সে পাঞ্জাবি পরবে ঠিক করে। সাদা পাঞ্জাবির সাথে কালো পায়জামা পরবে ঠিক করে। সাদা পাঞ্জাবির সাথে কালো পায়জামা, কেমন লাগবে ওকে? শহিদ মিনার, বইমেলায় থাকবে প্রচণ্ড ভিড়, কেউ কাউকে দেখার দুই মিনিট ফুরসতও হবে না।
এখন বাজে এগারোটা বিশ। আর চল্লিশ মিনিট পর একুশের প্রথম প্রহর শুরু হবে। একুশের কালজয়ী গানটা বেজে উঠবে। আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি……!
দরজায় কারুর টোকা পড়ল। দুই সেকেন্ড পর আবারও পড়ল। দরজা খুলবে কি খুলবে না একপ্রস্ত ভাবল। দরজা না খোলার কোন যৌক্তিক কারণ খুঁজে পেল না আকাশ।
‘আপনি?’
‘প্লিজ আমাকে ভেতরে আসতে দিন।’
আকাশের মুখ থেকেই কিছু বের হওয়ার আগেই ফাইজা কামরায় ঢুকে পড়ল।
‘আমি আশ্রয় চাই। একটি রাতের আশ্রয় চাই। আমি খুব ভয় পাচ্ছি। যেকোনো মুহূর্তে আমার বিপদ নেমে আসতে পারে।’
‘কীসের বিপদ?’
‘হোটেলে কিলিংগ্রুপ অবস্থান নিয়েছে।’
‘কিলিং গ্রুপ?’
‘হ্যাঁ, কিলিং গ্রুপ। আমাকে যেকোনো মুহূর্তে আজ রাতে আক্রমণ করবে ওরা।’
আপনি হোটেল কর্র্তৃপক্ষকে জানান। পুলিশকে জানান। পুলিশের কোড নম্বর দেবো?’
না, না। এ কাজ করা যাবে না। আজকের রাতটি এখানে কাটিয়ে দিলে আমি বেঁচে যাবো। প্লিজ, আমাকে ভিক্ষা দিন।
আকাশের মাথায় মহাকাশের বিস্ময়ের চেয়ে বড় বিস্ময় চক্কর খেতে থাকল।
সে কোনো এক মহাচক্রের আবর্তে ভাসতে যাচ্ছে। এই মুহূর্তে মস্তিষ্কের নিউরনগুলো কোন সঠিক সিদ্ধান্ত দিতেও ব্যর্থ হলো।
‘আমি সারা রাত চুপ করে সময় পার করবো। একটি কথাও বলবো না। যেখানে বসে আছি, ওখানেই সারা রাত কাটিয়ে দেবো।’ ফাইজার করুণ আকুতি ঝড়ে পড়ল।
আকাশ বুঝতে পারল সে মহা ঝামেলায় ফেঁসে যাচ্ছে। এ মুহূর্তে কী করা যায় সে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। হোটেলের লোকজনকে বললে বিষয়টা আরো জটিল হয়ে যেতে পারে। সে কি ওপরঅলার ওপর সবকিছু ছেড়ে দেবে? ওপরঅলা কি আজ তার পক্ষে থাকবে? থাকলে সে সৃষ্টিকর্তার ওপর কোনোদিন অকৃতজ্ঞ হবে না।
ফাইজার দু’চোখ ছলছল করছে। কাঁদো কাঁদো ভাব চেপে বসেছে চেহারায়। জীবনে একটি ঝুঁকিও সে কোনো সময় নেয়নি। ব্যবসা তো মানুষই করে-একটা ঝুঁকি নিয়ে ফেলার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করল আকাশ।
‘আপনি বিছানায় ওঠুন, আমার মেঝেয় থাকার অভ্যাস আছে।’
‘আমি যেখানে বসে আছি সেখানে রাতটা কাটিয়ে দেব। আপনার বইগুলো এখনো পড়া হয়নি। আজ রাতেই শেষ করে ফেলব। ‘মন মানে না’ বইটি কি রোমান্টিক উপন্যাস?’
‘হ্যাঁ।’
‘তাহলে তো আর ঝিমুনিটা আক্রমণ করতে পারবে না। আপনার চেহারা সুরতে রোমান্টিকতার ক্ষুদ্রতম কণাও খুঁজে পাওয়া যায় না। অথচ আপনি গল্পে পানির মতোই প্রেম ঢেলে দিতে পারেন।’
আকাশের বুকটা একটু একটু ফুলতে থাকে।
‘আপনি কি সকাল সকাল বেরিয়ে পড়বেন?’
‘এখন বলতে পারছি না।’
‘একুশের দিন তো সবাই দলে দলে শহিদ মিনারে যায়। সকালে শহিদ মিনার দেখার মজাই আলাদা। কী বলেন?’
‘আমার ঘুম পাচ্ছে। এখন বারোটা বিশ বাজে।’
‘আমি বোকার মতোই বক বক করছি। এই বাজে অভ্যাসটা কিছুতেই আমার পিছু ছাড়ছে না। আপনি ঘুমান, আমি বিছমিল্লাহ বলে পড়া শুরু করছি।’
ফাইজা দ্রুত তার পেকেট থেকে বই বের করে পড়া শুরু করল। দক্ষিণ পাশের বাল্বটা আলো দিয়ে যাচ্ছে। এই কড়া আলোতেই আকাশ চোখ বন্ধ করল।
বাস স্টেশনে পৌঁছতে পৌঁছতে সাতটা বেজে গেল আকাশের। ও ডানে বামে একবার চোখ বুলিয়ে দেখল। যাত্রীদের হুড়োহুড়ি তেমন লক্ষ করা যাচ্ছে না। একুশে ফেব্রুয়ারির গান ভেসে আসছে কোনো এক অজানা জায়গা থেকে। এই অসাধারণ গানটিও দুইবার কানে নেয়ার ফুরসত পাচ্ছে না সে। কাউন্টারে একজন লোক দাঁড়িয়ে আছে। খুব সহজে টিকেট পেয়ে গেল আকাশ।
এগারোটা বিশে গাড়ি ছাড়ার ঘোষণা হচ্ছে। ঘোষণাটা পুন:পুন হচ্ছে। লাইন ধরে যাত্রীরা বাসের দিকে যাচ্ছে। বিরাট বাস। এই বাসটি নতুন সংযোজন বলে মনে হলো আকাশের।
সিট নম্বর তেরো। জানলার পাশেই সিট। জানলার পাশের সিট পেয়ে বেশ পুলকবোধ করল সে। যাত্রীরা বসে গেছে যার যার সিটে। শুধু আকাশের পাশের সিটটি খালি। বারো নম্বর সিটটি খালি।
সাতটা বিশ মিনিটের কাঁটায় কাঁটায় হুড়মুড় করে বাসে ঢুকল ফাইজা। তাকে প্রচণ্ড এলোমেলো দেখাচ্ছে। চোখে-মুখে বিরাট হাম হাম ভাব। সে আকাশের দিকে না তাকিয়েই নিজের সিটে বসে পড়ল।
লেখক মানুষেরা যে এত বোকা হয় জানা ছিল না। জানলে…… গজ গজ করতে করতে টিকেটটা ব্যাগের ভেতর ঢুকাতে থাকল ফাইজা।
আড়চোখে ফাইজার মুখে তাকাল আকাশ। আষাঢ়ে মেঘের মতো তার মুখ থম থম করছে। অসম্ভব রাগের চূড়ায় অবস্থান করছে সে।
১২ নম্বর টিকেটটা ফাইজা কীভাবে পেল মাথায় আসছে না আকাশের। টিকেট কাউন্টারে তার সামনে যে যাত্রীটা ছিল সে একজন পুরুষ। ট্রেনেও একই অবস্থা হয়েছিল। বইমেলায় আসা-যাওয়া নিয়ে যা কিছু হচ্ছে এসবই কি স্বপ্ন? সে কি স্বপ্নের ভেতর বসবাস করছে? বাস্তবে কি এটা সম্ভব? ফাইজার অলক্ষ্যে সে তিন তিনবার হাতে চিমটি কেটে দেখল। চিমটির স্নায়ুতন্ত্র ঠিকই কাজ করছে। কোনো স্বপ্নের জগতে নেই আকাশ। ও ফাইজার দিকে আবারও আড়চোখে তাকাল।
একটা কমলালেবু বের করল ফাইজা। খোসা খুলতে খুলতে বলল, ‘খেয়ে দেখুন, আপনি স্বপ্ন দেখছেন না, আপনি বাস্তবেই আছেন।’
হাত বাড়াল আকাশ। দুই কোয়া তালুতে নিল। মুখে দেবে কিনা এক প্রস্ত ভাবল।
যে ভাবা সে কাজ। একটি কোয়াও মুখে নিল না সে। কোয়া দুটোকে আঙুলে চেপে আগের মতোই বসে থাকল।
‘আপনার কি কোনো শত্রু আছে?’ প্রশ্ন করে আকাশের মুখে চেয়ে থাকল ফাইজা।
‘শত্রু? আমার কোনো শত্রু নেই।’
‘আমি যদি বলি আপনার ভয়ংকর কিছু শত্রু আছে বিশ্বাস করবেন?’
‘না।’
‘নিজের নিরাপত্তা কে আপনি কি একেবারেই পাত্তা দেন না?’
‘আমি তো আগেই বলেছি আমার কোন শত্রু নেই। একজন লেখকের শত্রু থাকতে পারে না।’
‘পারে।’
‘পারে?’
‘হ্যাঁ পারে। বাংলাদেশেও এর নজির আছে। আছে না?’
আকাশ কোন জবাব দেয় না। সে বোকার মতো চুপ হয়ে থাকে।
‘দুনিয়ায় সবচে’ বোকা মানুষগুলো হলো এই লেখকেরা। অথচ নিজেরা এদেরকে বড়ই চালাক মনে করে।’
‘লেখকরা বোকা হয় এই আমি প্রথম শুনলাম।’
‘সকালবেলা যখন আপনি কামরা থেকে পালাচ্ছিলেন তখন ভেবেছিলেন আমি ঘুমেই ডুবে আছি। আপনার পালানোর দৃশ্যটা একেবারেই সিনেমার মতো ছিল। বইগুলো নিতেও ভুলে গিয়েছিলেন।’
‘একদম ঠিক বলেছেন। বইগুলো খাটের নিচেই ছিল।’
‘খাটের নিচে না, বইগুলো ব্যাগের ভেতরই আছে।’
‘ব্যাগের ভেতর? কোন ব্যাগের ভেতর?’
‘আমার ব্যাগে।’
‘আপনার ব্যাগে।’
‘হ্যাঁ, আমার ব্যাগে।’
‘আপনি বারবার আমার শত্রুর কথা বলছিলেন। আমার শত্রু কি আপনি?’
‘না, আমি আপনার শুভাকাঙ্ক্ষী।’
‘একজন অচেনা মানুষ একজনের শুভাকাঙ্ক্ষী হয় কী করে?’
‘অচেনা মানুষই দুনিয়ায় বড় শুভাকাঙ্ক্ষী হয়। কাছের জনেরাই কাছের মানুষের বেশি ক্ষতি করে।’
গাড়ি হঠাৎ ব্রেক কষলে ওরা দুজনই সামনের দিকে ঝুঁকে গেল। আকাশ নিজের পিঠটাকে জুতমত করে সীটে ঠেসে বলল, ‘আমি একটু চোখ বুজব। মাথাটা ঘুরছে। রাতে একটুও ঘুম হয় নি।’
‘ঠিক আছে, ঘুমান। আমিও চোখ বন্ধ করছি।’
আকাশ চোখ বন্ধ করল। অনেক্ষণ চোখ বন্ধ করে রাখল। চোখে ঘুম ঘুম ভাব থাকলেও ঘুম আসছে না। সীটটা সে আরও পেছনে নামিয়ে দিল। এখন ঘুম আসলেও আসতে পারে। আবার চোখ বুঝল আকাশ।
আড়াই ঘণ্টা পর গাড়ি এসে দাঁড়াল চুম্বক হোটেলের সামনে। হুডোহুড়ি করে নেমে যাচ্ছে যাত্রীরা। ফাইজা একটা ছোট ব্যাগ কাঁধে ঝুলিয়ে নেমে পড়ল। ফাইজার পিছে পিছে হাঁটতে থাকল আকাশও।
ফাইজা একটা টেবিল দেখিয়ে বলল, ‘আমি ওখানেই থাকব। দেরি করা যাবে না। বিশ মিনিট বিরতি।’
বাসের লোকজনে বিশ মিনিট বললেও খাওয়া-দাওয়ায় আধা ঘন্টার চেয়ে বেশি সময় লাগে। বাথরুম থেকে ফিরে ন্যাপকিন দিয়ে মুখ মুছল আকাশ। এখন নিজেকে বেশ ফ্রেশ ফ্রেশ লাগছে তার। মাথার ঝামেলাটা এখন কিছু কিছু কমে গেছে। ও ফাইজার মুখোমুখি বসে টেবিলের ওপর চোখ ফেলে রাখল।
‘কী খাবেন, সাদা ভাত না বিরানি?’
‘সাদা ভাত।’
‘শরীরের প্রতি তো অনেক যত্ন নেন মনে হচ্ছে। আসলে হোটেলের বিরানি টিরানি না খাওয়াই ভালো। আমরা রোজই বিষ খাচ্ছি। আমার আশ্চর্য লাগে প্রতিদিন এতো বিষ খেয়েও কীভাবে আমরা সত্তর আশি পার করে দেই।’
বয় এসে সাদা ভাত আর কোরাল মাছের অর্ডার নিয়ে চলে গেল। আকাশ ফাইজার হাতে চোখ রেখে বলল, ‘আমি সরি।’
‘সরি? সরি বলছেন কেন?’
‘আপনাকে অনেক ভুল বুঝেছি।’
‘ভুল বোঝার কারণ হয়েছে বলেই তো ভুল বুঝছেন।’
‘আসলে আমার মাথাটা না গোবরে ভরা। কয় কেজি গোবর আছে ওপরঅলাই জানে।’
‘গোবর হলেও কিন্তু ভালো গোবর। এই গোবর আপনাকে লেখক বানিয়েছে।’
‘কী জানি।’
‘শুরু করেন, পনের মিনিট ছুঁয়ে গেছে।’
‘হ্যাঁ হ্যাঁ, খাচ্ছি খাচ্ছি।’
আকাশ এক চিমটে জিরা মুখে দিয়ে বলল, ‘আপনি কোথায় পড়েন?’
‘চাকরি করি।’
‘চাকরি করেন! কোথায় চাকরি করেন?’
‘পোস্টিং চট্টগ্রাম। সরকারি চাকরি।’
‘কীসের চাকরি?’
‘পাহারাদারি।’
‘পাহারাদারি কোন পোস্ট আছে নাকি?’
‘আমাদের ডিপার্টমেন্টে আছে।’
‘ঢাকায় কোথায় গিয়েছিলেন?’
‘পাহারাদারি করতে।’
‘আপনি চমৎকার বলতে পারেন।’
‘আমি এক হাজার তিনটি ডিটেকটিভ বই পড়েছি। সবগুলোই বাইরের লেখা।’
‘একটা কার্ড হবে?’
‘ব্যাগে আছে, পরে দেবো।’
‘আচ্ছা ঠিক আছে।’
বাতি নিভে গেলে বাসের ভেতরের জায়গাটায় অন্ধকার নেমে এল। বাইরে দূরে কোথাও টিম টিম করে কয়েকটা থামের বাতি জ্বলছে। এসি না চললে ও এক্ষুণি বাসের কাচটা খুলে দিত।
একেখান এসে বাস থেমে গেল। হঠাৎ চার পাঁচজন লোক ভেতরে ঢুকে পড়ল। চারজন লোকই ফাইজাকে স্যালুট করল। স্যার স্যার করতে থাকল ছাত্র-ছাত্রীদের মতো। বিশাল বিস্ময়ের বোঝা নিয়ে আকাশ বাড়ির দিকে হাঁটতে থাকল।
ফেসবুকের একটি স্ট্যাটাস দেশের আনাচে কানাচে তুফান চালিয়ে দিল। মুহূর্তে এই স্ট্যাটাসে হাজার হাজার শেয়ার কমেন্ট পড়তে থাকল। তরুণ লেখক আকাশ ইকবাল আততায়ীর গুলিতে নিহত হয়েছেন। আততায়ীকে গ্রেফতারের জন্য থানার নিরাপত্তা কর্মিরা জোর অভিযান শুরু করেছেন।
সকাল সকাল গোয়েন্দা দফতর থেকে একটি শোক বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়েছে। ফারজানা ফাইজা নামে এক চৌকস তরুণ কর্মি আত্মহত্যা করেছে। এই আত্মহত্যার সাথে লেখক আকাশ ইকবাল হত্যাকান্ডের কোনো যোগ আছে কি না গোয়েন্দা দফতর থেকে একটি বিশেষ টিম তদন্ত শুরু করেছে।

x