পাথরঘাটায় এখনো কান্না

জেলা প্রশাসনের তদন্ত শুরু ভাড়াটিয়াদের মালামাল সরিয়ে নেয়ার নির্দেশ

আজাদী প্রতিবেদন

মঙ্গলবার , ১৯ নভেম্বর, ২০১৯ at ৩:৩৭ পূর্বাহ্ণ
557

পাথরঘাটায় পাঁচতলা ভবনের (বড়ুয়া ভবন) নিচতলায় বিকট শব্দে বিস্ফোরণের পর ওই ভবনে বসবাসকারী ৯ পরিবারকে সরিয়ে নেয়া হয়েছে। তবে তাদের মালামালগুলো পর্যায়ক্রমে সরিয়ে নেয়ার নির্দেশনা দিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। সবাই একসাথে মালামাল সরিয়ে নেয়ার সময় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি থেকে বাঁচতে এ ধরনের ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে বলে জানান জেলা প্রশাসকের নির্দেশে গঠিত তদন্ত কমিটির সদস্য স্থানীয় কাউন্সিলর মোহাম্মদ ইসমাইল হোসেন বালি।
বিস্ফোরণের ঘটনায় হতাহতের পর ওই এলাকায় এখনো কাঁদছেন নিহতের স্বজনারা। বিরাজ করছে শোকাবহ পরিবেশ। তবে গত রোববার রাত ১০টার দিকে ঘটনাস্থলের সামনের রাস্তা মানুষ ও যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হয়েছে। এ ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটির সদস্যরা এলাকা পরিদর্শন করেছেন। কথা বলেছেন যে বাসায় বিস্ফোরণ হয়েছে সেই বাসার ভাড়াটিয়াদের (অর্ণব ও তার মায়ের) সাথে।
এদিকে বিস্ফোরণের ঘটনায় গঠিত চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের তদন্ত কমিটি তাদের কার্যক্রম শুরু করেছে। চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) গঠিত তদন্ত কমিটির কাজও চলমান আছে। কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (কেজিডিসিএল) তাদের তদন্ত প্রতিবেদন ঘটনার দিন বিকেলেই দিয়ে দিয়েছে। গতকাল সকাল ১১টার দিকে চট্টগ্রামের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট এ জেড এম শরীফ হোসেনের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের কমিটি ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন- চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর ইসমাইল হোসেন বালি, কোতোয়ালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ওসি মোহাম্মদ মহসীন, ফায়ার সার্ভিসের উপ-সহকারী
পরিচালক পূর্ণ চন্দ্র মুৎসুদ্দী এবং কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (কেজিডিসিএল) মহাব্যবস্থাপক (বিপণন) আ ন ম সালেক। জেলা প্রশাসনের গঠিত কমিটিকে সাত কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দিয়েছেন জেলা প্রশাসক মো. ইলিয়াস হোসেন।
তদন্তের অংশ হিসেবে কমিটির সদস্যরা যে বাসায় বিস্ফোরণ ঘটেছে সে বাসার ভাড়াটিয়া মণি রাণী দেবী ও তার ছেলে অর্ণব দেবনাথের সঙ্গে কথা বলেছেন। এছাড়া প্রত্যক্ষদর্শী কয়েকজনের বক্তব্যও নিয়েছেন কমিটির সদস্যরা। মণি রাণী ঘটনার সময় বাসায় না থাকলেও তিনি বাসায় জিনিসপত্রের বিষয়ে বিভিন্ন তথ্য দিয়ে সহায়তা করেন তদন্ত কমিটিকে। একইভাবে বিস্ফোরণের ঠিক আগে পরটা আনতে গিয়ে বেঁচে যাওয়া তার ছেলে অর্ণব স্বচক্ষে দেখা ঘটনার বিভিন্ন দিক তদন্ত কমিটির সদস্যদের নজরে আনেন। কিভাবে অল্পের জন্য প্রাণে রক্ষা পান তার বর্ণনা দেয়ার পাশাপাশি সেদিনের বিধবস্ত সকালের দৃশ্যপটের নিয়েও বক্তব্য দেন।
এ বিষয়ে কমিটির সদস্য কাউন্সিলর মোহাম্মদ ইসমাইল হোসেন বালি জানান, তদন্ত শুরু হয়েছে। কমিটির সদস্যরা ঘটনাস্থলে এসে বিভিন্নজনের সাথে কথা বলেছেন। তথ্য নিয়েছেন ঘটনাস্থলে থাকা বিভিন্ন আলামত থেকে। সেফটিক ট্যাংকের ভাঙা অংশ ও এর ভেতরকার পরিবেশও খতিয়ে দেখা হয়েছে। ভবনের মালিকদের সাথে কথা হয়েছে কিনা এ ধরনের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, তাদের অবস্থান সম্পর্কে আমরা অবগত নই।
এদিকে পাথরঘাটা ব্রিকফিল্ড রোডে বিস্ফোরণের পর দেয়ালধসের ঘটনা তদন্তে গঠিত তদন্ত কমিটির আকার বড় হয়েছে। পাঁচ সদস্যের কমিটি এখন বেড়ে সাতজনে দাঁড়িয়েছে। নতুন করে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কৃর্তপক্ষ (সিডিএ) এবং বিস্ফোরক অধিদপ্তরের প্রতিনিধিকে এই দলে যুক্ত করা হয়েছে।
ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে তদন্ত দলের প্রধান অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট এ জেড এম শরীফ হোসেন বলেন, তদন্তের সুবিধার্থে দলে সিডিএ এবং বিস্ফোরক অধিদপ্তরের প্রতিনিধি রাখা হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, প্রাথমিকভাবে দুর্ঘটনাটি গ্যাসজনিত কারণে ঘটেছে মনে হচ্ছে। তবে কী গ্যাস বলা যাচ্ছে না। তদন্ত শেষ হোক। এর আগে গঠিত ৫ সদস্যের তদন্ত কমিটিতে তাদের সঙ্গে আরও দুজন যুক্ত হলো দুই সংস্থার প্রতিনিধি।
তদন্ত শুরুর বিষয়ে কমিটির সদস্য পূর্ণ চন্দ্র মুৎসুদ্দী জানান, আমরা ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী, ভিকটিমসহ সংশ্লিষ্ট অনেকের সঙ্গে কথা বলছি। তাদের বক্তব্য রেকর্ড করা হচ্ছে। যে বাসায় বিস্ফোরণ হয়েছে সেই বাসার রান্নার চুলা পরীক্ষা করা হয়েছে। ওই ভবনের গ্যাসের লাইন পরীক্ষা করা হয়েছে। কেজিডিসিএলের মহাব্যবস্থাপক (বিপণন) আ ন ম সালেক বলেন, গ্যাসজনিত কারণে এ বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। তবে গ্যাসের লাইনে কোনো লিকেজ পাইনি। সেফটিক ট্যাংকের গ্যাস থেকে এটা ঘটতে পারে। আবার রান্নার চুলার নল খোলা দেখেছি। বিষয়টা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, বিস্ফোরণস্থলে এখনও কৌতূহলী মানুষের ভিড় লেগে আছে। নগরীর বিভিন্ন এলাকা থেকে লোকজন আসছেন ঘটনাস্থল দেখতে। আশপাশের এলাকার বাসিন্দাদের মধ্যে এখনও আতঙ্ক বিরাজ করছে। বিকট শব্দে ভয়াবহ বিস্ফোরণের ঘটনা মন থেকে মুছতে পারছেন না এলাকার লোকজন। বিস্ফোরণস্থল পাঁচতলা ভবনটিকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে ঘোষণা করেছে ফায়ার সার্ভিস কর্তৃপক্ষ। ওই ভবনের সব বাসিন্দারা বাসা ছেড়ে চলে গেছেন। পুরো ভবনটি এখন যেন মৃত্যুপুরী।
ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তা পূর্ণ চন্দ্র মুৎসুদ্দী জানান, বিস্ফোরণে ভবনের নিচতলায় দেওয়াল বিধ্বস্ত হয়েছে। এর ফলে পুরো ভবনটিই এখন ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে পরিণত হয়েছে। রোববার উদ্ধারকাজের সময়ই আমরা ভবনটিকে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করে বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে চলে যেতে বলেছিলাম। গতকাল সকালে বিস্ফোরক অধিদফতরের একটি দলও ঘটনাস্থলে যায়। বিস্ফোরক অধিদফতরের পরিদর্শক মো. তোফাজ্জল বলেন, গ্যাস লিকেজের কারণে এ ঘটনা ঘটেছে বলে মনে হচ্ছে।
সিএমপির গঠিত তিন সদস্যের কমিটি রোববার থেকে তদন্ত শুরু করেছে বলে জানিয়েছেন কমিটির প্রধান নগর পুলিশের উপ-কমিশনার (দক্ষিণ) এস এম মেহেদী হাসান। তিনি জানান, রোববারই আমরা ভবনের বাসিন্দাসহ প্রত্যক্ষদর্শী এবং এলাকার লোকজনের সঙ্গে কথা বলেছি। আমাদের তদন্ত চলমান আছে। কমিশনার স্যারের নির্দেশনা অনুযায়ী তিন কার্যদিবসের মধ্যেই আমরা তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেব। তিন সদস্যের এই কমিটিতে নগর পুলিশের বিশেষ শাখার অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (পুলিশ সুপার পদমর্যাদা) মঞ্জুর মোরশেদ এবং কোতোয়ালী জোনের সহকারী কমিশনার নোবেল চাকমা রয়েছেন।
এর আগে ঘটনার দিন রোববার সন্ধ্যায় কেজিডিসিএলের তদন্ত কমিটি প্রতিবেদন জমা দেয়। এতে গ্যাসের লাইনে কোনো লিকেজ না পাওয়া এবং রাইজার অক্ষত থাকার কথা বলা হয়েছে।

x