পাঠক-লেখকের প্রাণবন্ত মেলবন্ধন

প্রকাশকরাও পাচ্ছেন ভালো সাড়া

মোরশেদ তালুকদার

মঙ্গলবার , ১২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ at ৪:২৩ পূর্বাহ্ণ
101

তেজহীন সূর্যটা অস্ত যাচ্ছে পশ্চিম গগনে। ফুরিয়ে আসছিল দিনের আলো। ধরণীর বুকে ধীরে ধীরে নেমে আসছে অন্ধকার। অথচ নগরীর এম এ আজিজ স্টেডিয়াম সংলগ্ন ৮০ হাজার বর্গফুটের জিমনেশিয়াম মাঠে সেই আঁধারের আঁচও লাগেনি। কারণ, এই মাঠেই বসেছে প্রাণের বইমেলা। নতুন বইয়ের দ্যুতিতে প্রকৃতির সব অন্ধকার তাই এখানে মলিন।
গতকাল ছিল বইমেলার দ্বিতীয় দিন। বিকেল তিনটায় সাধারণের জন্য উন্মুক্ত হয় মেলাফটক। ‘জ্ঞানের আশ্রয়’ পুস্তকের টানে মেলায় প্রবেশ করতে শুরু করেন বইপ্রেমীরা। পাঠকের টানে ছুটে আসেন লেখকরাও। দু’য়ের মেলবন্ধনে ধীরে ধীরে মেলা প্রাঙ্গণ হয়ে উঠে আরো প্রাণবন্ত। এ প্রাণের জোয়ার ছিল রাত প্রায় সাড়ে নয়টা পর্যন্ত। বৃহৎপরিসরে বইমেলার আয়োজন চট্টগ্রামে এই প্রথম। তাই কিছুটা আশা-নিরাশার দোলাচলে ছিলেন প্রকাশকরা। বিশেষ করে যারা মেলায় স্টল দিয়েছেন। বিকিকিনি হবে তো? এমন প্রশ্ন ছিল তাদের মনে। মেলার দ্বিতীয় দিনেই এ প্রশ্নের উত্তর পেয়েছেন তারা। কারণ, পাঠকরা নিরাশ করেনি। ফলাফল, বিক্রির আনন্দে উদ্বেলিত প্রকাশদের ঠোঁটে ছিল তৃপ্তির হাসি। এ হাসি বজায় থাকবে মেলার শেষ দিন ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। এমন প্রত্যাশাই তাদের।
ঢাকা থেকে এসেছেন প্রকাশনী সংস্থা ‘কুঁড়েঘর’। বইমেলায় যে কয়েকটি স্টল দৃষ্টি আর্কষণ করেছে পাঠকের তার একটি ছিল ‘কুঁড়েঘর’। এ প্রকাশনী সংস্থার ম্যানেজার মাসুদ হোসেন সুমন দৈনিক আজাদীকে বলেন, ‘রাজধানীতে চলমান জাতীয় বইমেলায় আমাদের স্টল রয়েছে। প্রথমবার চট্টগ্রামে এসেছি। সাড়া কেমন মিলবে সেটা নিয়ে কিছুটা সংশয়ে ছিলাম। কিন্তু সেই সংশয় দূর হয়েছে। সাড়া পাচ্ছি।’ মাসুদ হোসেন সুমন আরো জানান, এবারের বইমেলাকে ঘিরে ২৫ টি বই প্রকাশ করেছে তাদের প্রকাশনী সংস্থা। বেশিরভাগই অনুবাদ ও কবিতার বই। বসন্তের প্রথমদিনেই প্রায় প্রতিটি বই মেলায় ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে পৌঁছুবে বলেও জানান তিনি।
চট্টগ্রামের নামী প্রকাশনা সংস্থ ‘আবির প্রকাশন’। গবেষণা, প্রবন্ধ, নিবন্ধ, জীবনী, গল্প, উপন্যাস, ভ্রমণ কাহিনি, কাব্যগ্রন্থ এবং শিশুতোষসহ ৫৭টি বই বেরিয়েছে এ প্রকাশনী সংস্থা থেকে। ‘আবির প্রকাশন’ এর কর্ণধার মুহম্মদ নুরুল আবসার দৈনিক আজাদীকে বলেন, এবারের আয়োজনটি অনেক সুন্দর হয়েছে। বিগত সময়ের তুলনায় ভাল হয়েছে। পাঠকদের কাছ থেকেও সাড়া পাচ্ছি। আনন্দের খবর হচ্ছে, শহরের বাইরে থেকে লোকজন আসছেন। অবিভাবকরা ছেলে-মেয়েদের নিয়ে আসছেন উপজেলা থেকে। তারা বইও কিনছেন।
চট্টগ্রামের সাহিত্যাঙ্গণের পরিচিত মুখ অধ্যক্ষ ড. আনোয়ারা আলম। বইমেলার দ্বিতীয় দিন বিশ্বকবি রবীন্দ্র ঠাকুরের উপর আলোচনায় অংশ নিতে এসেছিলেন তিনি। একফাঁকে কথা হয় তার সঙ্গে। দৈনিক আজাদীকে বললেন, ‘মেলায় ঢুকতেই ঢাকার আমেজ পাচ্ছি। এবারের বইমেলাকে ঘিরে ভবিষ্যতেও আশা দেখছি। আগামীতে আরো জমজমাট হবে এই বইমেলা।’
‘প্রচার আছে ঢাকার প্রকাশনী সংস্থাগুলো থেকেই খ্যাতিমান লেখকদের বই বের হয়। সেই প্রকাশনী সংস্থাগুলো অংশ নিয়েছে এবারের মেলায়। ফলে চট্টগ্রামের প্রকাশকরা বিপণনের প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়বেন?’ এমন প্রশ্নে অধ্যক্ষ ড. আনোয়ারা আলম বলেন, ‘না। সুস্থ প্রতিযোগিতা হবে। ভালো বইগুলো কিন্তু পাঠক ঠিকই খুঁজে নিবেন। সেটা যে প্রকাশনী সংস্থা থেকেই বের হোক না কেন। এখন যারা পরিচিত লেখক, যারা বাংলা একাডেমি বা একুশে পদক পাচ্ছেন তাদের বই কিন্তু চট্টগ্রামের প্রকাশনী সংস্থাগুলো থেকেই বের হয়েছিল। এখনো তাদের বই কিন্তু চট্টগ্রামের প্রকাশনী সংস্থা থেকে প্রকাশিত হয়।’
মেলায় দেখা হয় তরুণ লেখক আখতারুল ইসলামের সঙ্গে। শিশুসাহিত্যের নিবেদিত প্রাণ এই তরুণ লেখকের এবার পাঁচটি বই বেরিয়েছে। এগুলো হচ্ছে- সায়েন্স ফিকশন ‘জিরো’, ‘ফুটেছে আলোর ফুল’, ‘একটি সবুজ পৃথিবী চাই’, ‘ইচ্ছেপূরণ পাখি’ এবং ‘টাপুরটুপর আনন্দপুর’। এ তরুণ লেখক দৈনিক আজাদীকে বলেন, এবারের বইমেলার পরিবেশ অনেক উন্নত। সাড়াও পাচ্ছি পাঠকদের কাছ থেকে।’ ঢাকার প্রকাশনী সংস্থাগুলোর অংশগ্রহণ বিষয়ে তিনি বলেন, পাঠকদের ঢাকায় যেতে হচ্ছে না। এখান থেকেই চাহিদা পূরণ হচ্ছে।
ছেলে ইজাজ আসিফ ও মেয়ে নাজিফা আকতারকে নিয়ে মেলা এসেছিলেন গৃহিণী নাজিফা আকতার। দৈনিক আজাদীকে তিনি জানান, ছেলে সেন্ট মেরীস স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ে এবং স্টেডিয়াম এলাকায় ক্রিকেট ফ্যাক্টিস করে। মেয়ে নাজিফা নাসিরাবাদ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণিতে পড়ে এবং স্টেডিয়াম এলাকায় ব্যাডমিন্টন প্র্যাক্টিস করে। বইয়ের প্রতি আগ্রহী করে তুলতেই ছেলে-মেয়েকে নিয়ে মেলায় এসেছেন। এবারের মেলার পরিবেশও বেশ ভালো লাগছে। এমনিতেই সারাবছর ছেলে-মেয়েকে বই কিনে দেন। মেলা থেকেও কিনে দিবেন।’
প্রসঙ্গত, মেলার আয়োজন করছে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন। তবে চট্টগ্রামের বিভিন্ন প্রকাশনী সংস্থা, সাহিত্যিক, লেখক, বৃদ্ধিজীবী এবং অন্যান্য শিল্প-সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতরাই সম্মিলিতভাবে এ মেলা বাস্তবায়ন করবেন। বইমেলা চলবে আগামী ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। প্রতিদিন বিকেল ৩ টা থেকে রাত ৯ টা পর্যন্ত মেলা উন্মুক্ত থাকবে। তবে ছুটির দিন সকাল ১০ টা থেকে রাত ৯ টা পর্যন্ত উন্মুক্ত থাকবে। এবারের মেলার আয়তন প্রায় ৮০ হাজার ৩০০ বর্গ ফুট। স্টল থাকছে ১১০ টি। এর মধ্যে ঢাকার প্রকাশকদের জন্য ৬০টি এবং চট্টগ্রামের প্রকাশকদের স্টল থাকছে ৫০টি।
মেলায় নতুন বই :
চট্টগ্রামের খ্যাতিমান প্রকাশনা সংস্থাগুলোর অন্যতম ‘শৈলী’। এবারের বইমেলায় এ প্রকাশনা সংস্থা থেকে ৩১টি বই বের হয়েছে। এর মধ্যে প্রবন্ধ আছে ৬টি। এগুলো হচ্ছে- ড. মইনুল ইসলামের ‘বাংলাদেশের রাষ্ট্রচরিত্র ও অনুন্নয়ন’ (নতুন মুদ্রণ), দিলীপ কুমার বড়ুয়ার ‘হৃদয়ে রবীন্দ্রনাথ, চেতনায় নজরুল’, কাঞ্চনা চক্রবর্ত্তীর ‘মুক্ত করো ভয়’, মুসলেহ উদ্দিন মুহাম্মদ বদরুলের ‘অবসরে অন্তহীন ভাবনা’, শামীম হাসানের ‘শিশু স্বাস্থ্যের আরো বারো’, এবং রওশন আরা বিউটির ‘সুরের আকাশে শুকতারা’ (৫ম খণ্ড)। শৈলী থেকে গল্পের বই বেরিয়েছে বিচিত্রা সেনের ‘নীল খাম’ নামে।
কাব্যগ্রন্থ বেরিয়েছে ৮টি। সেগুলো হচ্ছে- রনিতা জামানের ‘ভালাবাসার মায়াডোরে’, লুনা দাশের ‘বিমুগ্ধ আলিঙ্গন’, কৌশিক রেইনের ‘ভিজেছি মনের বৃষ্টিতে’, আহসানুল হকের ‘স্মৃতির শ্মশানে তিন বসন্ত’, কল্যাণ বড়ুয়ার ‘চেনা পথে অচিন পাখি’, রুম চৌধুরীর ‘একমুঠো মেঘ’, কাজী মোহাম্মদ শাহজাহানের ‘প্রাণপাখি বুকে রাখি’ এবং নীলিমা শামীমের ‘ভালাবাসায় হাত বাড়িয়ে’। এ প্রকশানা সংস্থা থেকে বেরিয়েছে ১৩টি শিশুসাহিত্য। এগুলো হচ্ছে- অমিত বড়ুয়ার ‘রোদের কণা পাখির পালক’, আজিজ রাহমানের ‘রোদ তুলেছে আনন্দ ঢেউ’, চন্দ্রশিলা ছন্দার ‘তিতলির ভালো কাজ’, সজল দাশের ‘সাইকেল’, বিশ্বজিত বড়ুয়ার ‘গাঁয়ের পথে পালকি চলে’, মিলন বনিকের ‘ঘুমপরিদের আনন্দমেলায়’, রুনা তাসমিনার ‘সূর্য নাচে রং তুলিতে’, ইফতেখার মারুফের ‘মেঘের রাজ্যে বীথি’, সনজিত দে-র ‘স্বপ্নমাখা ভোর’, মর্জিনা আখতারের ‘দুরন্ত শৈশব’, তহুরীন সবুর ডালিয়ার ‘ছড়ার সাথে পড়ার সাথে’, সজল দাশের কিশোর ‘মুক্তিযোদ্ধার গল্প’ এবং সেন কান্তি দাশের ‘ডুবুরি ও বনদেবী’।
সম্পাদনা গ্রন্থ বেরিয়েছে দুইটি। এগুলো হচ্ছে- ইসমাইল জসীমের ‘আমার মায়ের মুখের হাসি’ সজল দাশের ‘আমরা যদি না জাগি মা’।

x