পাকিস্তানে ট্রাকচিত্র এবং নারী অধিকার সচেতনতা বৃদ্ধি

শাফিনূর শাফিন

শনিবার , ১৮ জানুয়ারি, ২০২০ at ১১:৩০ পূর্বাহ্ণ
10

আমাদের দেশে যেমন রিকশা আর্ট, তেমনি পাকিস্তানে ট্রাক আর্ট খুব জনপ্রিয়। ট্রাক আর্টকেই কাজে লাগিয়ে সামাজিক বিভিন্ন সচেতনতা তৈরির কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে পাকিস্তানে। বিশেষ করে নারী অধিকার বিষয়ে বিভিন্ন স্লোগান বা বক্তব্য সারাদেশের রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াচ্ছে ট্রাকে ট্রাকে। এসব ট্রাক আর্টে মূলত নানা রঙে রাঙিয়ে নারীর শিক্ষা অধিকার, নারীর ক্ষমতায়ন এবং নারীদের অধিকার সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা ইত্যাদি বিষয় ফুটিয়ে তোলা হচ্ছে বিভিন্ন চিত্রে গল্পের মাধ্যমে। এসব চিত্র সবাই খুব আগ্রহ নিয়ে দেখে এবং যে বার্তাগুলো পৌঁছানো দরকার এভাবেই প্রত্যন্ত অঞ্চলেও ঘরে ঘরে পৌঁছে যাচ্ছে।
নারীদের শুধু ঘরে বন্দী না করে শিক্ষার সুযোগ দিলে কীভাবে এতে সমাজ, পরিবার এবং রাষ্ট্র উপকৃত হবে তা বেশ ইতিবাচকভাবে তুলে ধরা হচ্ছে। পাকিস্তানে নারী নির্যাতন হার ৩০%। প্রতি বছর অনার কিলিং এর নামে ৫০০০ নারীকে হত্যা করা হয়। ইউনিসেফের রিপোর্ট অনুযায়ী ২১% মেয়েশিশুর বিয়ে হয়ে যায় বয়স ১৮ হবার আগেই। নারীশিক্ষার হার ৪৮%, যদিও এই রিপোর্ট প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছিল নারীসাক্ষরতা আর নারীশিক্ষা এক নয় বলে। এমন নেতিবাচক সংবাদকে পেছনে ফেলে বর্তমান সরকার চেষ্টা করে যাচ্ছে নারী নির্যাতন হার কীভাবে কমিয়ে আনা যায়। পাকিস্তানে বহু প্রত্যন্ত অঞ্চলে এখনো বিদ্যুৎ সুবিধা সেভাবে পৌঁছাতে পারেনি। সুতরাং টিভি বা ইন্টারনেট সুবিধা যেসব অঞ্চলে নেই সেখান জনসচেতনতা বাড়ানোর লক্ষ্যে পাকিস্তান সরকার এবং কিছু উন্নয়ন সংস্থা ট্রাক চিত্রের মাধ্যমে গণসচেতনতা বাড়ানোর পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। এইক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে ট্রাক ড্রাইভাররাও উদ্ভুদ্ধ হচ্ছে নিজ পরিবারের নারীদের বিভিন্ন সামাজিক সুযোগ সুবিধা দেয়ার ক্ষেত্রে এবং বিদ্যালয়ে পাঠাতেও উৎসাহী হচ্ছে। ট্রাকচিত্রের মাধ্যমে নারীশিশুদের অল্প বয়সে বিয়েকে নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে, সেইসাথে ডমেস্টিক ভায়োলেন্সের হার কমানোর ক্ষেত্রেও ট্রাক চিত্র বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই চিত্রগুলো মূলত নারীর পর্যবেক্ষণ থেকে আঁকা হয়েছে। যেমন অল্প বয়সে বিয়ে এবং মা হবার ফলে একজন নারী শারীরিকভাবে কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে তা একজন নারীই বর্ণনা করছে এসব চিত্রে। একইভাবে শিক্ষার গুরুত্বও একজন নারী কীভাবে দেখেন তার জীবনে এতে কি উপকার হবে তা চিত্রের মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। এই ট্রাকগুলো বর্ণীল ফুলের চিত্রের মাধ্যমে কবিতার লাইন তুলে দিয়ে কিছু স্লোগানও যুক্ত করা হয়।
নৃবিজ্ঞানী সামার মিনাল্লাহ খান এই উদ্যোগ নেয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি কাজ করেছেন। এছাড়াও অভিনেত্রী মেহুয়িশ হায়াতও এইক্ষেত্রে সচেতনতা বাড়ানোর লক্ষ্যে মাঠ পর্যায়ে কাজ করছেন। তবে সাংস্কৃতিক কর্মী বা শিক্ষকেরা যারাই এই বিষয়ে কাজ করছেন, তারা চেষ্টা করছেন এসব চিত্র যেন সঠিক বার্তা পৌঁছায়। কোনভাবেই যেন সামাজিক এবং পাকিস্তানি পারিবারিক বা ধর্মীয় মূল্যবোধকে আহত না করে চিত্রগুলো তৈরি হয় সেদিকে খেয়াল রাখা হয়। সামার বলেন, “কোহিস্তানে ভ্রমণের পরপরই আমার মাথায় এই আইডিয়া খেলে যায় ট্রাকচিত্রকে কীভাবে আমরা কাজে লাগাতে পারি সচেতনতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে।“ এই উদ্দেশ্যেই তিনি একটি প্রজেক্ট শুরু করেন খায়বার পাখতুঙ্খাতে।
একটি ট্রাকে এমন লেখা থাকে, “বাবা আমার সোনা রূপা চাই না, আমাকে বই আর কলম এনে দাও।“ আবার কোন কোন ট্রাকে দেখা যায় একটি মেয়ে বলছে, “জ্ঞানই আলো, জ্ঞানই শক্তি” বা “বই সমস্ত জ্ঞানের আধার”। এই ধরনের বার্তা নারীদের জন্যও আশাপ্রদ। হায়াত খান সেসব ট্রাকচিত্রশিল্পীদের একজন যিনি এই ধরণের সচতনতামূলক চিত্র আঁকতে ভালোবাসেন। তিনি বলেন, “প্রথম দিকে একটু অসুবিধাই হতো মুলতান আর কোহিস্তানের ট্রাক ড্রাইভার বা ট্রাকের মালিকদের বোঝাতে এই ধরনের চিত্র রাখার গুরুত্ব কি। বহুদিন সময় লেগেছে তাদেরকে সচেতন করতে। কিন্তু এখন তারাই বলেন এই ধরনের বার্তা বেশি বেশি করে লিখে দিতে।“ আব্দুল মান্নান নামে এক ট্রাক ড্রাইভার বলেন, “লাহোর থেকে মুলতান যাওয়ার পথে একটা ট্রাকে এমন চিত্র দেখে আমার মন ভরে গেলো। পরে আমি নিজের ট্রাকেও এই চিত্র আঁকলাম।“ হাজি খান নামের আরেক ট্রাক ড্রাইভার বিশ্বাস করেন এভাবে ট্রাকচিত্রের সামাজিক পরিবর্তন আসবেই। ট্রাক আর্ট খুব ধীরে হলেও বেশ কার্যকরী ভূমিকা রাখছে। ট্রাক আর্টকে বলা হচ্ছে চলমান বিলবোর্ড। ২০১৮ থেকে এই বিষয়ে ব্যাপক কাজ করার ফলে সামার আশা করছেন নারী শিক্ষার হার বাড়াতে এটি সাহায্য করবে। ৫৬% নারী শিশু স্কুল থেকে ঝরে পড়বে না যদি ট্রাক চিত্রের বার্তা সঠিক পথে যায়। সামারের এই প্রজেক্ট ইউনেস্কো থেকে অনুমোদন পেয়েছে।