পাঁচ খালের মুখ বন্ধ হচ্ছে?

জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্প হুমকিতে পড়ার আশঙ্কা বন্দর কর্তৃপক্ষ বলছে, সঙ্কট হবে না

আজাদী প্রতিবেদন | শুক্রবার , ১২ মার্চ, ২০২১ at ৫:৩০ পূর্বাহ্ণ

প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে গৃহীত চট্টগ্রাম মহানগরীর জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের উদ্দেশ্য ভেস্তে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। হালিশহর উপকূল হয়ে বঙ্গোপসাগরে পড়া ১১টি খালের মুখে নির্মিত পাঁচটি স্লুইসগেটের সামনে দেয়াল নির্মাণ করায় এই আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বে টার্মিনালের সীমানা দেয়াল ও রিটেইনিং ওয়াল নির্মাণ করতে গিয়ে পাঁচটি স্লুইসগেটের মুখ বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। একই সাথে আরো অন্তত তিনটি স্লুইসগেট ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এতে জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্প ছাড়াও চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের আড়াই হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত আউটার রিং রোডের একটি বড় অংশও হুমকির মুখে পড়েছে। অবশ্য বে টার্মিনাল নির্মাণে নেয়া পদক্ষেপগুলো কোনো ধরনের সংকট তৈরি করবে না বলে বন্দর কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে।
বন্দর কর্তৃপক্ষের একাধিক শীর্ষ কর্মকর্তা বলেছেন, যথেষ্ট যাছাই বাছাই এবং পরিকল্পনা করেই বে টার্মিনালের কাজ করা হচ্ছে। এতে জলাবদ্ধতা কিংবা রাস্তা নষ্ট হওয়ার মতো কোনো ঘটনা ঘটবে না। চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ এবং চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, আড়াই হাজার কোটিরও বেশি টাকা ব্যয়ে পতেঙ্গা থেকে সাগরিকা পর্যন্ত আউটার রিং রোড নির্মাণ করেছে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ। এই প্রকল্পের আওতায় সড়কটির সাড়ে পনের কিলোমিটার এলাকায় শহরের নানা দিক ঘুরে বঙ্গোপসাগরে মিলিত হওয়া ১১টি খাল রয়েছে। আউটার রিং রোড প্রকল্পের আওতায় এসব খালের মুখে স্লুইসগেট নির্মাণ করে সিডিএ। এসব স্লুইসগেট দিয়ে শহরের পানি গিয়ে বঙ্গোপসাগরে পড়বে। চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের সাড়ে পাঁচ হাজার কোটি টাকার জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের আওতায় খালগুলো সংষ্কার এবং নালানর্দমা পরিষ্কার করা হচ্ছে। এতে করে শহরের বৃষ্টির পানি এসব খাল হয়ে দ্রুতগতিতে বঙ্গোপসাগরে পড়বে বলে আশা করা হয়। এতে গত কয়েক বছর ধরে চট্টগ্রাম মহানগরীর প্রধান সমস্যা হয়ে উঠা জলাবদ্ধতা থেকে শহর বহুলাংশে রক্ষা পাবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়।
এদিকে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের আউটার রিং রোডের পাশেই চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বে টার্মিনাল গড়ে তুলছে। ব্যক্তি মালিকানাধীন এবং সরকারের কাছ থেকে খাস জমি নিয়ে প্রায় আড়াই হাজার একর জমিতে গড়ে তোলা হচ্ছে দেশের আগামী একশ’ বছরের বন্দর বে টার্মিনাল। বে টার্মিনাল নির্মাণের মূল কাজ শুরু না হলেও কিছু এলাকায় মাটি ভরাট এবং সীমানা দেয়াল নির্মাণের কাজ চলছে। আর এই কাজ করতে গিয়ে আউটার রিং রোডের নিচ দিয়ে সাগরে গিয়ে পড়া খালগুলোর ১১টি স্লুইসগেটের পাঁচটির মুখ বন্ধ করে দেয়া হচ্ছে। যাতে খালের পানি সাগরে গিয়ে পড়ার ক্ষেত্রে বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা তৈরি হবে। এর ফলে নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্প হুমকির মুখে পড়বে বলে সিডিএর পক্ষ থেকে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। স্লুইসগেটের মুখ বন্ধ করে বে টার্মিনালের সীমানা দেয়াল এবং রিটেইনিং ওয়াল নির্মাণে নিজেদের উদ্বেগের কথা জানিয়ে সিডিএর পক্ষ থেকে বন্দর কর্তৃপক্ষের নিকট জরুরি পত্র দেয়া হয়েছে। এতে অবিলম্বে এই ধরনের অপরিকল্পিত নির্মাণ বন্ধ করার অনুরোধ জানানো হয়েছে।
সিডিএর প্রধান প্রকৌশলী কাজী হাসান বিন শামস বন্দর কর্তৃপক্ষকে চিঠি দেয়ার কথা উল্লেখ করে বলেন, স্লুইসগেটের মুখ বন্ধ করে দেয়ার মতো ভয়াবহ পদক্ষেপ নিয়েছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। এটি একটি আত্মঘাতি পদক্ষেপ। ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে নানা ধরনের উদ্যোগ নেয়ার সুযোগ রয়েছে। খালের উপর স্ল্যাব দিয়েও কাজ করা যায়। কিন্তু কোনো ধরনের পরিকল্পনা না করে স্লুুইসগেটের মুখ বন্ধ করে দিয়ে সীমানা দেয়াল নির্মাণ দুঃখজনক। তিনি বলেন, ইতোমধ্যে পাঁচটি স্লুইসগেটের মুখ বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। আরো অন্তত তিনটি স্লুইসগেট ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এতে নগরীর জলাবদ্ধতা নিয়ে সংকট তীব্র হবে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

সিডিএর চিফ ইঞ্জিনিয়ার কাজী হাসান বিন শামস বলেন, আউটার রিং রোড থেকে ১০০ মিটার দূরে বে টার্মিনাল নির্মাণ করা হবে এবং মূল নকশা তৈরির সময় সিডিএর সাথে সমন্বয় করার শর্তেই প্রকল্পের ছাড়পত্র দেয়া হয়েছিল। এখন কোনো ধরনের সমন্বয় না করেই আউটার রিং রোড প্রকল্পকেই হুমকির মুখে ফেলে দেয়া হচ্ছে। যেভাবে মাটি খনন করা হচ্ছে তাতে আউটার রিং রোডে ধ্বস দেখা দেয়ারও আশংকা করছেন সিডিএর প্রধান প্রকৌশলী। তিনি অবিলম্ব বে টার্মিনালের অপরিকল্পিত সীমানা দেয়াল এবং রিটেইনিং ওয়াল নির্মাণের কার্যক্রম বন্ধ করারও অনুরোধ জানিয়েছেন।
বিষয়টি নিয়ে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের প্রকৌশল শাখার একাধিক কর্মকর্তার সাথে যোগাযোগ করা হয়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তারা সিডিএর চিঠি পাওয়ার কথা স্বীকার করে বলেন, বে টার্মিনালের সীমানা দেয়াল এবং রিটেইনিং ওয়ালে স্লুইচগেটের মুখ বন্ধ করা হচ্ছে না। পাঁচটি স্লুইসগেটের সামনে একটি ‘ইউ শেপ’ খাল খনন করে দেয়া হচ্ছে। পাঁচটি খালের পানিই নতুনভাবে খনন করা খালটিতে পড়বে। ওই খালটির দুইদিকের মুখই গিয়ে পড়বে বঙ্গোপসাগরে। শহরের পানি পাঁচটি খালের স্লুইসগেট দিয়ে বের হয়ে নতুন খালে পড়বে। নতুন খালের দুই মুখ দিয়ে পানি চলে যাবে বঙ্গোপসাগরে। বে টার্মিনালের ফলে কোন স্লুইসগেটের মুখই বন্ধ হবে না, শুধু গতিপথ পরিবর্তিত হবে বলে তারা স্বীকার করেন।
চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের একাধিক শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, সিডিএ পরিস্থিতির উপর কঠোরভাবে নজর রাখছে। ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান যদি অপরিকল্পিতভাবে কার্যক্রম চালাতে থাকে তাহলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধকালো পতাকা ওড়ানোর মাধ্যমে আন্দোলন অব্যাহত থাকে
পরবর্তী নিবন্ধঅভিনেত্রী রোমানা স্বর্ণা গ্রেপ্তার