পহেলা বৈশাখ ও একদা আমাদের গ্রাম

ডা. দিলীপ দে

রবিবার , ১৪ এপ্রিল, ২০১৯ at ৭:২৮ পূর্বাহ্ণ
157

আমাদের গ্রাম আলামপুরের বৈশাখী মেলাটা ছিল ছোটবেলায় আমার কাছে বিশেষ প্রিয়, গ্রামের মাঝখানটায় শতবর্ষী যে হরিমন্দির তার চারপাশটায় সবুজ চত্বরে মেলাটা বসতো। এ’মেলার প্রতি আমার একটা বিশেষ আকর্ষণ ছিল কারণ এখানে পূর্বের হাইদগাঁও গ্রামের কুমোরপাড়া থেকে আসতো পোড়ামাটির তৈরী বিবিধ জিনিষ, বাঁশ ও বেতের তৈরী সামগ্রী আসতো কেলিশহর এবং ধলঘাট থেকে,এবং পাটি আসতো ধলঘাট নাথপাড়া থেকে, আমার ঠাকুরমা তখনো বেঁচে ছিলেন, তাঁর সাংবাৎসরিক প্রয়োজনের এসব জিনিষ তিনি বেশ গুরুত্বের সাথে দেখে-শুনে কিনতেন, আমিও তাঁর সাথে কখনও কুমোরের দোকানের সামনে, কখনো বা কুলা-চালুনি কিম্বা ‘অর্জুন-শরের পিছা’ তথা ঝাড়ুর দোকানের সামনে যেতাম, বাড়ি থেকে মাত্র কয়েকশো হাত দূরে হওয়াতে দিনে কতোবার যে যাওয়া হতো তার ইয়ত্তা ছিল না। মেয়েদের জন্য তৈরী নানা মনোহারী দ্রব্যের দোকানও বসতো, তবে চায়ের দোকান কম হতো, অবশ্য অন্যান্য খাবারের দোকান থাকতো, রাত্রে প্যান্ডেল সাজিয়ে বেশ গান হতো-কখনো কীর্ত্তন- অধিকাংশ সময়ে পালা-কীর্ত্তন, আমার মনে আছে বেশ কয়েকবার কবিগানও হয়েছিল, তবে অতো রাতে জাগার অধিকার আমার তখনো ছিলনা। মন্দিরের সামনে ও পেছনে বেশ বড়ো দীঘি সদৃশ পুকুর আর সামনে আদিগন্ত খোলা মাঠ, চমৎকার বাতাসে শরীর জুড়িয়ে যেতো, আমাদের গ্রাম বলতে তখন এখানে ওখানে চারটে পাড়া, আর চারপাশে অনেকখানি সবুজ মাঠ,দীঘি ও পুকুর, এ গ্রামের লোকবসতি নানা কারণে তখনো যথেষ্ট ঘন ছিলনা।
বৈশাখী মেলায় আমরা এক ধরনের লটারীতে অংশ নিতাম মনে পড়ে,আমাদের গ্রামের এক দাদা সাবানের টুকরা দিয়ে প্রথমে কিছু ছোট সাইজের সাদা কাগজে ১,২,৩, -এরকম কিছু সংখ্যা লিখে রাখতেন, সাবানের লেখা শুকোলে দেখা যায়না, বেলা প্রায় তিনটের দিকে তিনি মেলায় এসে বসতেন, আমরা সবাই অধীর আগ্রহে তাঁকে ঘিরে দাঁড়াতাম ,তাঁর সাথে আসতো দেড় হাত বাই দেড় হাত সাইজের ছোট একটা টেবিল,একটা খাটো চেয়ার, টেবিলের জন্যে একটা সাদা চাদর; চাদরটা বিছিয়ে দাদা তার উপরে রাখতেন একটা লজেন্স ভর্তি কাঁচের বয়াম, পাশের একটা মাটির গামলায় রাখা হতো পানি,শুরু হতো আমাদের ভাগ্য পরীক্ষা, আমরা এক আনা দিতাম, আর ভাঁজ থেকে একটা কাগজ টেনে নিতাম, তাঁর সতর্ক ও শ্যেন দৃষ্টিকে ফাঁকি দিয়ে উঁকি দিতে চেষ্টা করতাম কোনমতে সংখ্যাটা উদ্ধার করা যায় কিনা , তবে খুব কাছে থেকে কাগজগুলো দেখার নিয়ম ছিলনা- দাদা’টা এগুলো একেবারে নিজের গায়ের কাছে নিয়ে রাখতেন ! কাগজটা নিয়ে পানিতে ডুবিয়ে দিতাম আর ভেসে উঠতো সাবানে লেখা সংখ্যা, সেটা কখনো শূন্য, কখনো তিন কখনো বা পাঁচ,আর তখন বেশ মজা হতো। তবে প্রায়শ:ই আমরা কেউই একটা বা দু’টো-র বেশি লজেন্স পেয়েছি বলে মনে পড়ে না,আর তখন এক আনা-য় দু’টো লজেন্স এমনিতেই পাওয়া যেতো, তবে মেলার আনন্দ বলে কথা, আমরা এগুলো বেশ উপভোগ করতাম। মেলায় কখনো কখনো বেশ কিছু বখাটে ছেলে এসে জুটতো,এগুলো ছিল এ নির্মল আনন্দের দিনে উটকো আপদ -এরা এলেই মনোহারী দোকানের পাশে যাওয়াটাই মেয়েদের জন্য হয়ে উঠতো এক কঠিন সমস্যা।
গ্রামে বৈশাখ ছিল নতুনত্বের মাস, বৈশাখ আসা মানে আমাদের বাড়ির বিরাট দীঘিতে ‘বড় জাল’ দেওয়া অর্থাৎ খুব ভোরে জেলেদের ডেকে তাদের দীর্ঘ জালটা ফেলা – তাতে প্রচুর মাছ ধরা আর মাছের খেলা দেখা। বৈশাখ মানে ধলঘাটের প্রসিদ্ধ ‘সিদ্ধেশ্বরের দোকান’ থেকে আনা নানা নতুন পদের বিশুদ্ধ ছানার মিষ্টি, আর সেকালে মানুষ হাসতে পারতো- সিদ্ধেশ্বর কাকা মিষ্টি মাপতে মাপতে কি সুন্দর হাসতেন- এগুলো হৃদয়ে শক্তির সঞ্চার করে, চিরজীবন স্মৃতি হয়ে অন্তরে একটা আনন্দের বাতি জ্বালিয়ে রাখে, দুর্যোগে মনকে সুস্থির রাখার ক্ষেত্রে কাজ দেয়। বৈশাখ মানে নতুন খাবার ,নতুন কাপড়। পয়লা বৈশাখে সকালে গুরুজনদের প্রণামের রেওয়াজ ছিল, ১লা বৈশাখে তেমন বিশেষ কোন পূজা হতো বলে মনে পড়েনা ,তবে হরিমন্দিরের নিত্য পূজোটা ঐদিন বিশেষভাবে করা হতো বলে মনে পড়ে। প্রায় সকল বাড়ি থেকে ওখানে পূজো যেতো, আর সকাল থেকে ওখানে শুরু হতো ঢোলের বাদ্যি-যা মেলার ঘোষণা দিতো। গ্রামের যেকোন মেলায় তৎকালে এই একটানা ঢোলের বাদ্যি শুনলেই বুঝা যেতো- মেলা বস্‌ছে। মন্দিরের আঙ্গিনায় এ মেলা হলেও এতে ছিল মূলতঃ লোকজ আমেজ। হিন্দুদের অনেক দেবদেবী আছে, কিন্তু ‘বৈশাখী’ নামে কোন দেবদেবী নেই, এ নামে তাই বিশেষ কোন পূজোর ব্যবস্থাও নেই, বৈশাখী উৎসব বা এ মেলার উৎস তাই নিতান্তই লোকজ।
বর্ষ-বিদায় ও বর্ষ-বরণ এই দুই পর্বের ‘পরব’ ছিল এর মধ্যে পরস্পর-সম্পৃক্ত, চৈত্রের শেষ দু’সপ্তাহ ধরে চলতো নানা নাড়ু তৈরীর ধুম,সবাই শীতের মৌসুমে কিনে রাখতো তরল খেজুর গুড়- যা নাড়ু (চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায়‘ লঅন্‌ )বানাবার জন্যে উত্তম, এ গুড়ের একটা চমৎকার সুগন্ধ ছিল। গ্রামে দিনভর ঢেঁকি ঘর থেকে ভেসে আসতো দ্রুত লয়ের ঢেঁকির শব্দ, সেখানে খৈ ভাজা, মুড়ি ভাজা চলছে, সেই সাথে চিঁড়ে কাটা, খৈ-মুড়ি গুঁড়ো করা’র জন্যই মূলতঃ তৎকালে ঢেঁকির ব্যবহার। গ্রামে গ্রামে তখন প্রত্যেকের উঠোনে গভীর রাত পর্যন্ত পালা করে নাড়ু তৈরী হতো কাঠের তৈরী ছাঁচে ফেলে, ছাঁচগুলো ছিল যেমন- ফুল, ফল,মাছ, পাখী ইত্যাদি নানা আকার আকৃতির, একটা কাঠের টুকরায় অনেকগুলো ছাঁচ থাকতো, আর এক একজন মহিলার হাতে এরকম এক একটা কাঠের ছাঁচ। মহিলাদের আড্ডা আর নাড়ু তৈরী চলতো সমান তালে। তখন ধলঘাটে চৈত্রের শেষের দিকে নাটক হতো,অভিভাবক কারও সাথে যাওয়ার অনুমতি কদাচিৎ মিলতো, নাটক দেখে এসে দেখতাম তখনও নাড়ু তৈরী হচ্ছে,পাড়ার মহিলারা সবাই পরিষ্কার পাটি বা তলই বিছিয়ে বসেছে উঠোনে কেরোসিনের কুপি ও ল্যাম্প জ্বালিয়ে- মাঝখানে খৈ এর ছাতু-তে তরল গরম খেজুরের গুড় দিয়ে মাখা হয়েছে, এগুলো সাঁজে ফেলে সবার হাত দিয়ে তৈরি হচ্ছে নানা আকারের নাড়ু। খৈ ছাড়াও মুড়ি’র ছাতু-তে এবং সীম বীচির গুঁড়ো-তে গুড় মিশিয়ে সাঁজে ফেলে নাড়ু তৈরি হতো।
চৈত্রের শেষ দু’দিনের অনুষ্ঠানমালা ছিল আরও বৈচিত্র্যধর্মী ও প্রাণবন্ত-সার্বিকভাবে এটাকে বিষু-পরব্‌(চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় ‘বিউ’ পরব্‌) বলা হয়- যেটা আসলে বিষুব-সংক্রান্তি’র-ই অপর নাম, এটা মূলতঃ ঋতু ও প্রকৃৃতি- নির্ভর লোকজ ক্রম-উদ্ভবের অংশ, এর দু’টি পর্যায় -১.ফুল বিষু,আর ২.মূল বিষু ; ফুল বিষু-র দিন সকালটা বরাদ্দ থাকতো সারা ঘরদোর পরিষ্কার করার জন্যে, পাকঘর থেকে ঠাকুরঘর পর্যন্ত এর আওতায় পড়তো, সুন্দর করে নিকানো হতো ঘরের মেঝে। বিকেলে ঘরের সবাই বসতো ফুল নিয়ে, বেতের সরু সুতোয় গাঁথা হতো সোজা-সাপটা ফুলের লহর, প্রবেশ দরজার উপরে আড়াআড়ি ভাবে বেঁধে দেয়া হতো বিষু-ফুলের লহর, বিষু ফুল কোন বাগানে বা গেরস্থ-বাড়িতে জন্মায়না, এগুলো এক পাঁপড়ি-ওয়ালা গন্ধহীন বেগুনী রং-এর ফুল যা বাংলার খালের পাড়ে পাড়ে কাঁটা জাতীয় ঝোঁপে জন্মায়। এত আদিম আটপৌরে ফুল দিয়ে তৈরি লহরে ঘর সাজানো দুনিয়ার আর কোথাও নেই। এর সঙ্গে কাঠ-গোলাপ ফুলের লহরও দরজার উপরে শোভিত হতো,সাথে ঝুলানো হতো পাতা সমেত সতেজ নিমের ছোট ডাল। সন্ধ্যায় উঠোনে জড়ো করে রাখা কেয়াফুলের ঝোঁপ,বেতস পাতা, বিষু ফুলের ডাল-পাতা (চাটগাঁ’র ভাষায়-‘বিষ কাডালি/ কাটালি’),শুকনো খড়-সহ রকমারী জিনিষ পোড়ানো হতো, এর চারপাশে সবাই ঘুরে ঘুরে শরীরে ধোঁয়া লাগাতো শরীর রোগমুক্ত রাখার উদ্দেশ্যে আর নীচের মতো একটা ছড়া আওড়াতো:‘‘জাগ্‌ জাগ্‌ জাগ্‌,/ যতো সোনা-রূপা ধন সম্পদ/ আঁর্‌অ বাড়িত্‌ জাগ্‌।/ উতর পারগ্যা পোয়া-রে/খস্‌ খাজুলী লোই যা রে,/ ট্যাঁ’র্‌ ছালা দি যা রে/ জাগ্‌ জাগ্‌ জাগ্‌…”।

পর দিন তথা ‘মূল বিউ’ দিন সকালে- কাঁচা হলুদ ও সরিষা বাটা, সরিষার তৈল ইত্যাদি স্বাস্থ্যকর প্রাকৃতিক ভেষজ দ্রব্যের সমন্ব্বয়ে তৈরী ‘সর্বৌসধি’ বাটিতে নিয়ে প্রথমে গায়ে মাখতে হয়- তারপরে পুকুরে স্নান, ভেজা কাপড়ে ঘাঁটায় এসে হাতে নিতে হয় ‘সেরী’(এক সের ধান বা একসের চাল মাপার জন্যে বেত ও বাঁশের তৈরী ভান্ড ),তার ভেতরে স্থিত থাকে কিছু খৈ, মুড়ি’র সঙ্গে মিশ্রিত তেলহীন ভাবে খোলায় ভাজা আট পদের জিনিষ যথা মুগডাল,বাদাম, তিল, তিসি,মুড়ি ইত্যাদির সংমিশ্রণে তৈরী ‘আট্‌-করইয়া’,নাড়ু তথা ‘লঅন’; অপর হাতে থাকবে ফসল কাটার কাঁচি, ওটা দিয়ে মাটিতে একটা কাল্পনিক শত্রু আঁকতে হয়, তার হাত পা মাথা কাটতে হয়,তার উপরে ছড়িয়ে দিতে হয় ‘সেরী’-তে রাখা নানাবিধ ফসলের সংমিশ্রণ;আমার মনে হয়- এই শত্রু হচ্ছে পঙ্গপাল, তাকে পরাস্ত করে ফসল ঘরে তোলার ক্ষেত্রে কৃষকের যে সাফল্য, জয়ের যে আনন্দ- এটা তারই বহিঃপ্রকাশ। ঐদিন সকালে কৃষকের গরুগুলোকে বেশ সাজানো হতো,গরুর লড়াই-ও হতো। মাথায় কলার বাকলের তাজ, গলায় কাঠগোলাপের মালা, ,গরুগুলো যখন মাঠে দৌড়াতো তখন তাদেরকেও বেশ আনন্দিত মনে হতো, এদিনটা তাদের একধরনের ছুটির দিন-কাঁধে জোয়াল নেই, সবার দৃষ্টি সেদিন তাদের উপর নিবদ্ধ, এসবে তারা যে নিজেদের বেশ গুরুত্বপূর্ণ কেউকেটা মনে করছে তা বেশ বুঝাই যেতো! তারপরে মধ্যাহ্নের খাবার: দৈনন্দিন জীবনে অভ্যস্ত বিভিন্ন রকমের সব্জীর বাইরেও অজস্র রকম সব্জীর সমাহারে প্রস্তুত হয় একটা তরকারী- যা প্রকৃতঅর্থে একটি উত্তম হেলথ্‌ ফুড, চাটগাঁইয়া ভাষায় যাকে বলে ‘আড্‌-ওওরা’। এছাড়াও খাওয়া উৎসবে চলে নাড়,‘আট-করইয়া’ ইত্যাদি।‘মূল বিউ’র দিন সকালে কেলিশহরের রমেশ রায়-এর হাটের পার্শ্ববর্তী মাঠে বলীখেলা’র আয়োজন হতো যা অনেকের কাছে বেশ উপভোগ্য হতো, বেশ জমতো। চৈত্র সংক্রান্তির আগে হতো শিবের গাজন। এটা মূলত জেলে সমপ্রদায়ের লোকেরা করতো। এটা দিনের বেলা বাড়ি বাড়ি গিয়ে অভিনয়ের মতো একটা বিষয়, সংক্ষিপ্ত, তবে অনেকের কাছেই বেশ উপভোগ্য ছিল। কবিয়াল রমেশ শীল লিখছেন,‘চৈত্রমাস বছরের শেষ,সৃষ্টি হত এক পরিবেশ/ বাড়ি বাড়ি শিবের গাজন।/পল্লীর সংস্কৃতি যত, প্রায় সব তিরোহিত/শুনা যায়না ঢাকের বাজন।’রমেশ শীল এখানে শিবের গাজন-কে ধর্মীয় সংস্কৃতির অংশ হিসেবে উল্লেখ না করে ‘পল্লীর সংস্কৃতি’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন, পৌরাণিক কাহিনী অবলম্বনে গান রচিত হলেও গাজনের মূল আবেদন লৌকিক।
দুঃখের বিষয়, লোকজ সংস্কৃতির উৎস যে গ্রাম- সেখানেই আজ তা হারিয়ে যেতে বসেছে , গ্রামে এখন আর তেমন মেলা হয় না, আমাদের গ্রামের বৈশাখী মেলাটা তার উত্তাপ ও প্রাণ -দুই’ই হারিয়েছে, তার সামনের দীঘি-সদৃশ পুকুরটিতে এখন মুরগীর খামার; আলামপুরে রাজদূত ও বিখ্যাত তিব্বত গবেষক শ্রী শরৎচন্দ্র দাশদের বাড়ির সামনে, চৈত্র মাসে (বাসন্তী পূজার অষ্টমী তিথিতে অন্নপূর্ণা পূজার সময়ে)একটা মেলা বসতো দেখেছি, সেটা এখন আর বসে না, ধলঘাটে চৈত্রের শেষে যে নাটক হতো তাও এখন আর হয়না। আমার মনে আছে, ছোট বেলায় হাইদগাঁও-এ ‘শ্রীমতি স্নান’ তথা বারুণী স্নান হতো, সেখানে স্রোতস্বিনী নদীতে পুণ্যস্নান হতো, আমি ঠাকুরমার সাথে যেতাম, বিকেলে রোদ পড়ে এলে ফিরতাম নিজের গ্রামের দিকে,ফেরার পথে কেলিশহর ও কেচিয়াপাড়া ফেলে এলেই শোনা যেতো আরেকটা মেলার বাদ্যি, চারিদিকে জনশূন্য নির্জন বিল, মাঝখানে অনেক উঁচু পাড়ের বিস্তীর্ণ সবুজ ঘন ঘাসে ঢাকা একটা দীঘি-সদৃশ পুকুর সেখানে কোন মন্দির ছিল না, কোন পূজা-অর্চ্চণা’র-ও আয়োজন দেখা যায়নি, কেবল কয়েকটা পুরানো তাল গাছ যাতে অনেক বাবুই পাখীর বাসা আর তাদের নিরন্তর আনাগোনা-এটুকুই, সেখান থেকেই ভেসে আসছে মেলার বাদ্যির আওয়াজ, আমরা সেখানে জিরুতাম খানিকক্ষণ। সে মেলা এখন আর নেই, অর্থাৎ এরকম বহু মেলা হারিয়ে গেছে সেই সাথে হারিয়েছে লোকজ ঐতিহ্যের অনেকগুলো সমৃদ্ধ ভাণ্ডার। এগুলো হারিয়ে যাওয়ার কারণসমূহ এবং এগুলোকে উদ্ধার করার উপায় খুঁজতে হবে। তবেই আবহমান কাল থেকে লালিত ঐতিহ্য হয়তো বা আবার প্রাণ ফিরে পাবে। কারণ লোকজ সংস্কৃতি বিচ্ছিন্ন মানুষ দ্রুত তার পরিচয় হারিয়ে ফেলে, পরে সে যাযাবর আর হাভাতে মানুষের মতো- নিজেকে চিনতে পারে না। সবাইকে বাংলা নববর্ষে শুভেচ্ছা।
লেখক : শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ, প্রাবন্ধিক ও গবেষক।

x