পলিসিস্টিক ওভারিয়ান সিনড্রোম

ডা.প্রধীর রঞ্জন নাথ

শনিবার , ২৩ নভেম্বর, ২০১৯ at ৫:৩৬ পূর্বাহ্ণ
270

প্রায়ই নারীদের বলতে শোনা যায়, তাদের ওভারিতে (ডিম্বাশয়) সিস্ট আছে। কেউ বলে তার হরমোনের সমস্যা। বিষয়টি হল হরমোনের ভারসাম্যহীনতার কারণে একজন নারীর শারীরিক কিছু পরিবর্তন এবং ওভারিতে বিশেষ ধরনের কিছু সিস্ট তৈরি হওয়ার এই সমস্যার সামগ্রিক নাম পলিসিস্টিক ওভারিয়ান সিনড্রোম। প্রজননক্ষম নারীদের ২ থেকে ২০ শতাংশ এই সমস্যায় আক্রান্ত। বাংলাদেশে উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে এই সমস্যার শিকার নারীর সংখ্যা। কারণ, তাদের শরীরের ওজন বৃদ্ধি, স্থুলতা, শারীরিক পরিশ্রমের অভাব, ফাস্টফুড ও তেল চর্বিযুক্ত খাবার বেশি গ্রহণ ইত্যাদি। পরিনামে শরীরে এন্ড্রোজেন হরমোন বাড়ে, হরমোনের সামঞ্জস্য বিনষ্ট হয়। ডিম্বাশয়ে সমস্যা এবং সিস্ট তৈরি হয়। অনেক সময় জিনগত ও ইমিউন সিস্টেমের দুর্বলতাও এই সমস্যার জন্য দায়ী।
পলিসিস্টিক ওভারি কী : স্বাভাবিক ওভারির চেয়ে মাপে বড় এবং তাতে অসংখ্য ফলিকল (ছোট সিস্ট) ভর্তি থাকে। পরিসংখ্যান নিয়ে দেখা গেছে প্রায় ২০% নারীর পলিসিস্টিক ওভারি থাকে। তবে এটাও জেনে রাখুন, পলিসিস্টিক ওভারি থাকলেই যে পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম হবে, তা নয় কিন্তু। প্রতি ১০০ জনে মাত্র ৬-৭ জন এই শারীরিক সংকটে ভোগেন। পলিসিস্টিক ওভারিয়ান সিনড্রোম (পিসিওএস) একজন নারীর জীবনে নানা পর্যায়ে বিপর্যয় ডেকে আনে। মেন্সট্রুয়াল সাইকেল অবিন্যস্ত হয়ে যায়। হরমোন উৎপাদনের ব্যালেন্স বিঘ্নিত হয়।
কারণ : পলিসিস্টিক ওভারিয়ান সিনড্রোম কেন হয় শত মাথা খুঁড়েও তার নির্দিষ্ট কারণ বের করা যায়নি। তবে এটা দেখা গেছে কোথাও যেন একটা কিছু ফ্যামিলি লিংক কাজ করে। মা দিদিমা বা নিকটাত্মীয় এ সমস্যায় ভুগে থাকলে সতর্ক থাকতে হবে। অ্যাবনর্মাল হরমোন লেভেলই মূলত পিসিওএস ডেকে আনে। দেখা গেছে যাঁরা পলিসিস্টিক ওভারিয়ান সিনড্রোমে ভোগেন, তাদের ওভারি থেকে মাত্রাতিরিক্ত টেস্টোস্টেরন ক্ষরণ হয়। অন্যদের তুলনায় শরীরে বাড়তি টেস্টোস্টেরন থাকে বলেই মনে করা হয় পলিসিস্টিক ওভারিয়ান সিনড্রোমের যাবতীয় উপসর্গ প্রকট হয়। তাছাড়া ইনস্যুলিন রেজিস্ট্রেন্সও দেখা দেয়। ইনস্যুলিনের কাজ শরীরে গ্লুকোজের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করা। দেখা গেছে পিসিওএস এ ইনস্যুলিন ক্ষরণ হলেও শরীর তাতে তেমনভাবে সাড়া দেয় না। তাই রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা বাড়ে। এতে একটা রি-অ্যাকশান সাইকেল তৈরি হয়। বেড়ে যাওয়া গ্লুকোজের মোকাবিলা করতে আরো ইনস্যুলিন ক্ষরণ হয়। বাড়তি ইনস্যুলিন মানে ওজন বাড়ে শরীরের। পিরিয়ড অনিয়মিত হয়ে যায়, টেস্টোস্টেরনের মাত্রাও হু হু করে বাড়ে।
লক্ষণ : এই রোগের গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ বা উপসর্গ হচ্ছে অনিয়মিত মাসিক, ওজন বৃদ্ধি, শরীর বা মুখমন্ডলের মধ্যে লোমের অত্যধিক বৃদ্ধি অন্যতম। এসব রোগীর অনেকেরই খাবার গ্রহণের তুলনায় ওজন দ্রুত বাড়তে থাকে, অনেকের চুল পাতল হয়ে যায় আবার কারও কারও গলায় ও ঘাড়ে চামড়া কালো হতে থাকে। অনেকের মধ্যে বিষন্নতা ভর করে এবং মুখে ব্রণ দেখা দেয়। ওজন বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে এসব রোগীর মাসিক আরো অনিয়মিত হতে থাকে। বন্ধ্যাত্ব ও গর্ভপাত ইত্যাদি দেখা দেয়।
বিভিন্ন উপসর্গ ও সমস্যা : পলিসিস্টিক ওভারিয়ান সিনড্রোম শরীরে অনেক সমস্যা বয়ে আনে। ইনস্যুলিন রেজিস্‌্‌ন্ট্রান্স এর জন্য ডায়াবেটিস দেখা দেয়। দেখা গেছে প্রতি ১০ জনের মধ্যে এক থেকে দুজনের অবধারিতভাবে ডায়াবেটিস ধরা পড়ে। ৪০-এর বেশি বয়স বা পরিবারে ডায়াবেটিস এর ইতিহাস থাকলে সমস্যা প্রবন আপনার জীবন ওবেসিটি (বিএমআই বা বডিমাস ইনডেঙ ৩০-এর ওপর) জটিলতা বাড়ায়। পিসিওএস থাকলে উচ্চ রক্তচাপের প্রবণতা বাড়ে। জীবনে পরবর্তীকালে হার্টের অসুখও হতে পারে। আরেকটা ঝুঁকির ব্যাপারে থাকে। বছরে তিনবারের কম পিরিয়ড হলে এন্ডোমেট্রিয়াম পুরু হয়ে যায়। খুব সামান্য সংখ্যক নারীর এন্ডোমেট্রিয়াল ক্যানসার হতে পারে। দিনের বেলা নাক ডাকতে পারে। একটা অবসন্নভাব এবং ঝিমুনি লাগে।
পরীক্ষা-নিরীক্ষা : পিসিওএস হয়েছে বুঝতে রক্ত পরীক্ষা যথেষ্ট। স্বাভাবিকের চেয়ে বাড়তি মাত্রায় টেট্রোস্টেরণ পাওয়া যায়। তাছাড়া আলট্রাসাউন্ড স্ক্যান করার হলে পলিসিস্টিক ওভারি ধরা পড়ে।
জীবন যাত্রায় পরিবর্তন : অধিক প্রোটিন ও ফাইবারযুক্ত খাবার খান, খাদ্য তালিকায় শাকসবজি, ফলমূল, ভিটামিন-বি, ভিটামিন-সি, ভিটামিন-ই সমৃদ্ধ খাবার রাখুন। প্রচুর পানি পান করুন। একেবারে না খেয়ে নিয়মিত বিরতিতে একটু পরপর খাবেন। চা, কফি কম খাবেন।
* নিয়মিত ব্যায়াম করুন এবং সক্রিয় থাকুন। দুশ্চিন্তা, হতাশা থেকে দূরে থাকুন, শরীরের ওজন নিয়ন্ত্রনে রাখুন। ধুমপান ছাড়ুন।
হোমিওপ্যাথিক প্রতিবিধান : পলিসিস্টিক ওভারিয়ান সিনড্রোম নিরাময়ে হোমিওপ্যাথিতে ফলদদায়ক ওষুধ আছে। লক্ষণ সাদৃশ্যে নির্দিষ্ট মাত্রায় নিম্নলিখিত ওষুধ ব্যবহার করে এই রোগ সম্পূর্ণ আরোগ্য লাভ করে।
যথা- ১. এপিস মেল ২. ল্যাপিস এলবাস ৩. ক্যালকেরিয়া আয়োড ৪. ক্যালকেরিয়া কার্ব ৫. কোনায়াম ৬. আয়োডিয়াম ৭. গ্রাফাইটিস ৮. লাইকোপোডিয়াম ৯. থুজা ১০. মেডোরিনাম, ১১. নেট্রামমিউর ১২. পালসেটিলা ১৩. ল্যাকেসিস ১৪. এসিড ফ্লোর ১৫. সালফার ১৭. বোরাক্স ১৮. ফসফরাস ১৯. ক্যালকেরিয়া সালফ ২০. হিপাল সালফ ২১. কেলিব্রোম ২২. টেরিনটিউলা ২৩. আর্নিকা ২৪. সাইলেশিয়া সহ আরো অনেক ওষুধ আছে। তারপরেও চিকিৎসকের পরামর্শে ওষুধ সেবন করা উচিত।

x