পরীক্ষায় ‘প্রশ্নপত্র ফাঁস’ শিক্ষায় সর্বনাশ!

সফিক চৌধুরী

শনিবার , ২ ডিসেম্বর, ২০১৭ at ৭:০৬ পূর্বাহ্ণ
245

আমাদের সমাজে হচ্ছেটা কি? এভাবে কোথায় চলেছি আমরা? আমাদের পুরো শিক্ষা ব্যবস্থাই এখন পরীক্ষাবান্ধব! আমাদের দেশে এখন একটি শিশু তার প্রাথমিক বিকাশকালীন সময়েই মুখোমুখি হচ্ছে পাবলিক পরীক্ষার! বিশ্বকে জানার এবং জ্ঞান আহরণের প্রতি শিশুর আগ্রহ সৃষ্টির আগেই আমরা তাকে প্রতিযোগিতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিচ্ছি, তাতে শিশু জানলো কি জানলো না তা নিয়ে আমরা বিন্দুমাত্র চিন্তিত নই! আমাদের মূল চিন্তা সে জিপিএ পাঁচ/গোল্ডেন জিপিএ পেল কিনা! আর এই অশুভ প্রতিযোগিতায় আমাদের অভিভাবকগণ শ্রেণীকক্ষের চেয়ে কোচিং সেন্টার নির্ভর হয়ে পড়ছেন বেশি। আমাদের বর্তমান পুঁজিবাদী সমাজ ব্যবস্থায় জ্ঞান অর্জনের চেয়ে সার্টিফিকেট অর্জনই যেন আজ মুখ্য। সেদিন এক আলোচনা চক্রে ইমেরিটাস অধ্যাপক আনিসুজ্জামান স্যার বলেন, ‘আমাদের শিক্ষার অবস্থা শোচনীয়। এর কারণ, আমরা শিক্ষাকে নামিয়ে নিয়ে এসেছি পরীক্ষায় প্রথম হওয়ার মধ্যে। ভালো শিক্ষা কোথায় পাওয়া যায়? জবাব হচ্ছে, যে স্কুলে শিক্ষার্থীরা পাবলিক পরীক্ষায় ভালো করে। সমস্ত শিক্ষা ব্যবস্থা এই পরীক্ষাকেন্দ্রিক হয়ে গেছে।’

এভাবে ধীরে ধীরে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাকে পরীক্ষাকেন্দ্রিক করা হলেও আমরা সকলেই ছিলাম এবং আছি নিশ্চুপ! আর এই পরীক্ষাকেন্দ্রিক বাস্তবতায় বর্তমান সময়ে সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় পরীক্ষায় ‘প্রশ্নপত্র ফাঁস’।

অস্বীকার করার উপায় নেই, পরীক্ষায় ‘প্রশ্নপত্র ফাঁস’ আমাদের সমাজে বিগত দিনেও ছিল, যদিও তা কখনোই এমন মহামারি আকারে ছিল না। কিন্তু, বিগত কয়েক বছরে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় যখনি পাবলিক পরীক্ষা বেড়েছে, তখনই ‘প্রশ্নপত্র ফাঁস’ মহামারিতে রূপ নিয়েছে। পত্রিকার ভাষ্যমতে, এখন নাকি প্রশ্ন ফাঁসের আছে বিশাল এক বাজার। সবচেয়ে দুঃখজনক আর উদ্বেগের বিষয়, এই প্রশ্নপত্র ফাঁসে যারা জড়িত বলে আটক হয়েছেন বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যাদের সন্দেহ করছেন তাঁদের বেশিরভাগই দেশের নামকরা কিছু পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আর বিশ্ববিদ্যালয় চত্বর নাকি প্রশ্ন ফাঁসের বাজার! বিশ্ববিদ্যালয়কে বলা হয় গবেষণার প্রজনন ক্ষেত্র। গবেষণার মাধ্যমে জ্ঞান সৃষ্টি, উদ্ভাবনী চিন্তা চেতনার বিকাশ প্রধানতঃ বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়। বিশ্বায়ন ও মুক্তবাজার অর্থনীতির এই যুগে বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল উদ্দেশ্য আধুনিক বিশ্বের জন্য সময়োপযোগি জ্ঞান ও গবেষণাধর্মী শিক্ষার বাতাবরন তৈরি করা। আর সেই বাতাবরন তৈরি করে বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী শিক্ষার্থীরাই। একটি বিশ্ববিদ্যালয় জ্ঞান ও গবেষণায় তখনই এগিয়ে যায়, যখন মূলত এগিয়ে যায় তার মেধাবী শিক্ষার্থীরা। কিন্তু, আমরা যখন প্রশ্ন ফাঁস কেন্দ্রিক চক্রে কিছু গুটি কয়েক কলংকিত শিক্ষার্থীকে জড়িয়ে পড়তে দেখি তখন আমরা হতাশ না হয়ে পারিনা। তাদের এই অনৈতিক কর্মকাণ্ডের ফলে কলংকিত হয় পুরো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সুনাম। প্রশ্ন ফাঁসে আর সেই বাজার নিয়ন্ত্রণে শুধু যে কিছু উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের গুটিকয় শিক্ষার্থী জড়িত তা নয়, এই অবৈধ কর্মকাণ্ডে শিক্ষা সংশ্লিষ্ট কিছু কর্মকর্তাকর্মচারী, ছাত্রছাত্রনেতা, শিক্ষক, কোচিং সেন্টার, প্রেসের কর্মচারী এরাই প্রশ্ন ফাঁসের মূল নিয়ন্ত্রক। আর প্রশ্ন ফাঁসের এই সমাজ বিনাশী কর্মকাণ্ডে প্রযুক্তিই নাকি সবচেয়ে বড় নিয়ামক।

আমাদের মূল্যবোধের সংকট আজ কোন পর্যায়ে তা টের পাওয়া যায়, যখন প্রশ্ন ফাঁসে জড়িত সন্দেহে ঢাবি’র নাভিদ নামে এক শিক্ষার্থী আটক হওয়ার পর আমরা জানতে পারি প্রশ্ন ফাঁসের টাকা নাকি প্রথম প্রথম তার মায়ের ব্যাংক হিসাবেই জমা হতো! নাভিদের মা একজন স্কুলশিক্ষিকা। একজন স্কুলশিক্ষিকা সচেতন মা কী জানতে চাননি তাঁর বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ছেলে এতো টাকা কোত্থেকে তাঁর হিসাবে জমা রাখছে বা লেনদেন করছে? নাকি তিনি জানতেন?

একটি জাতীর সম্পদ হলো তাঁর ভবিষ্যৎ প্রজন্ম, সেই ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে নৈতিক ও মূল্যবোধের শিক্ষায় শিক্ষিত করে গড়ে তোলার দায়িত্ব বর্তমান প্রজন্মের। কিন্তু এভাবে মহামারীর মতো প্রশ্নপত্র ফাঁসের মাধ্যমে আমরা আমাদের কেমন ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গড়ে তুলছি তা কি আমরা একবারও ভেবে দেখেছি? বলা হয়, কোনো জাতিকে ধ্বংস/পঙ্গু করার জন্য সে জাতির শিক্ষাব্যবস্থাকে ধ্বংস করলেই চলে, কারণ তাতে যে প্রজন্ম বেড়ে উঠবে তারা হবে জ্ঞানবিজ্ঞান, দক্ষতা আর যোগ্যতায় অসাড়, তাদের দ্বারা ভবিষ্যতে পুরো জাতিই অবলুপ্ত হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়। আমাদের ভাবনার সময় এসেছে, এভাবে মহামারির মতো প্রাথমিক স্তর থেকে উচ্চ শিক্ষার সব স্তর এবং চাকুরির নিয়োগসহ সবখানে ‘প্রশ্নপত্র ফাঁস’ আমাদের কেমন ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তৈরি করছে, এরা কি পারবে আগামী দিনে আধুনিক বিশ্বের সাথে নিজেদের খাপ খাওয়াতে? প্রশ্ন ফাঁসের মাধ্যমে আমরা সত্যিকার যোগ্য মেধাবীদের হারিয়ে ফেলছি, যা কোনোমতেই দেশের জন্য মঙ্গলজনক নয়।

প্রশ্নপত্র ফাঁস হচ্ছে কেন? প্রথমত, নিশ্চয়ই আমাদের সমাজেরই কারও কারও কাছে এর চাহিদা আছে, এখন প্রশ্ন এসে যায়, তারা কারা? জবাবটিও সোজা, যারা মেধার জোরে টিকে আসতে অক্ষম। দ্বিতীয়ত, যারা চায় না আমরা জাতি হিসেবে পরিপূর্ণ হয়ে গড়ে উঠি। এখন এই যে প্রশ্নপত্র ফাঁস নিয়ে অনৈতিকতা তা বন্ধ করবে কে? এর জন্য প্রথমত দরকার নাগরিক সচেতনতা এবং সরকারের কঠোর অবস্থান, কঠোর শাস্তির বিধান রেখে আইন প্রণয়ন এবং নির্মোহ হয়ে তার যথাযথ প্রয়োগ।

আমরা অনেক সময়ই দেখি, প্রশ্নপত্র ফাঁস নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ প্রায় সময়ই তা স্বীকারই করতে চাননা, প্রায়শই তাদের এড়িয়ে যাওয়ার মনোবৃত্তি। আবার কিছু ক্ষেত্রে ‘পিলো পাসিং’ গেমের মতো অন্যের উপর দায় চাপানো। কিন্তু এভাবে আর কতদিন? আসুন, প্রশ্নপত্র ফাঁস বন্ধে প্রতিবাদী হই। নিজে বাঁচি আর আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বাঁচাই।

x