পরীক্ষকদের সম্মানী হাতিয়ে নিতে সক্রিয় প্রতারক চক্র

প্রতিকার না পাওয়ায় থানায় যেতে অনীহা

ঋত্বিক নয়ন

রবিবার , ১৭ নভেম্বর, ২০১৯ at ৮:৫৯ পূর্বাহ্ণ
82

আর ক’দিনের মধ্যেই এসএসসি পরীক্ষার উত্তরপত্র মূল্যায়ন বাবদ পরীক্ষকদের সম্মানী দেবে শিক্ষাবোর্ড। আর এ সুযোগে সক্রিয় হয়ে উঠেছে প্রতারকচক্র। পুরনো কায়দায় পরীক্ষকদের ফোন করে ব্যক্তিগত মোবাইল একাউন্টের খোঁজ খবর নেওয়া শুরু করে দিয়েছে তারা। ইতোমধ্যে চট্টগ্রাম নগরী ও জেলার বিভিন্ন স্কুলের অন্তত অর্ধশতাধিক শিক্ষককে ফোন করা হয়েছে বিভিন্ন নম্বর থেকে। ও প্রান্ত থেকে বলা হচ্ছে, ‘হ্যালো, আমি ডিবিবিএল (ডাচ বাংলা ব্যাংক লিমিটেড) থেকে বলছি। আপনার একটি রকেট একাউন্ট আছে। আপনার নাম অমুক। আপনার একাউন্টটি ডিঅ্যাক্টিভ হয়ে আছে। আপনি পরীক্ষার খাতা কেটেছেন। কিন্তু আপনার একাউন্টে টাকা ঢুকছে না। আমাদের কিছু তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করুন। আমরা আপনার একাউন্টটি আবার অ্যাক্টিভ করে দিচ্ছি।’
একাউন্টে টাকা স্থানান্তরের আগে পরে গত বছরও একই কায়দায় ফোন করা হয়েছিল। যাদের ফোন করা হয় তাদের কাছ থেকে এভাবেই গোপন কোডসহ প্রয়োজনীয় তথ্য নিয়ে নেওয়া হয়। তবে এবার শিক্ষকদের অনেকে সতর্ক থাকায় প্রতারক চক্রের পাতা ফাঁদে পা দেননি। এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট থানা পুলিশেরও শরণাপন্ন হননি কেউ। কারণ হিসেবে তাঁরা জানিয়েছেন, গতবার প্রতারক চক্রের ফাঁদে পা দিয়ে তারা থানায় জিডি করেছিলেন। কিন্তু এক বছর অতিক্রান্ত হতে চললেও সেই টাকা উদ্ধার কিংবা প্রতারক চক্রের সদস্যদের গ্রেপ্তারে পুলিশ ব্যর্থ।
চট্টগ্রাম শিক্ষাবোর্ডের উপ পরিচালক (হিসাব ও নিরীক্ষা) মো. তাওয়ারিক আলম আজাদীকে বলেন, পরীক্ষকদের সচেতন হওয়ার কোন বিকল্প নেই। আমরা নানাভাবে পরীক্ষকদের সচেতন করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। এখন পর্যন্ত এ সংক্রান্ত কোন অভিযোগ আমাদের কাছে আসেনি। তবে আগামী বছর থেকে আমরা পরীক্ষকদের ব্যাংক একাউন্ট সোনালী ব্যাংকে করতে বলেছি। এ বছরের সম্মানী ডাচ বাংলা ব্যাংকে করা একাউন্টেই যাবে। আশা করি সোনালী ব্যাংকের একাউন্ট চালু হয়ে গেলে এ সমস্যা হবে না। পটিয়া মুকুট নাইট উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবদুল মন্নান আজাদীকে বলেন, তাঁর স্কুলে তিনিসহ তিনজন শিক্ষককে ফোন দিয়েছে প্রতারক চক্র। তবে তাদের প্রতারণার বিষয়টি জানা থাকায় চক্রের সদস্যরা সুবিধা করতে পারেননি। তিনি বলেন, গত বছরও একই স্টাইলে তাঁকে ফোন দেওয়া হয়েছিল। প্রতারক চক্রের সদস্যরা সাধারণত: ব্যস্ততার সময়কেই বেছে নেয় ফোন করার জন্য। যেমন গত বছর তাঁকে যখন ফোন দেওয়া হয়েছিল তখন তিনি নতুন ব্রিজ থেকে টেম্পো যোগে নিউমার্কেট আসছিলেন। ওই অবস্থায় তিনি প্রতারক চক্রের সদস্যটির কথা মতো রকেট একাউন্টের পিন কোডসহ প্রয়োজনীয় তথ্য দিয়ে দিয়েছিলেন। সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার পরপরই তাঁর মনে হলো এটা প্রতারক চক্রের কারসাজি হতে পারে। এই ভেবে সাথে সাথেই তিনি পিন কোড পরিবর্তন করেন। তাৎক্ষণিক বুদ্ধির কারণেই তাঁর টাকা একাউন্ট থেকে খোয়া যায়নি। কিন্তু তাঁর স্কুলের শিক্ষক সুলতান আহমদ এবং সুবর্ণা দাশ টাকা খুইয়েছেন।
নগরীর রেলওয়ে হাসপাতাল কলোনি সিটি কর্পোরেশন উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক ডলি ফাতেমা আজাদীকে বলেন, তাঁদের স্কুলের তিন শিক্ষকের কাছে ফোন এসেছে বলে তিনি জানেন। তিনি বলেন, গতবছর প্রতারক চক্রের খপ্পড়ে পড়েছিলাম। এবার তাই তাদের ফোন এলে আমি কেটে দেই। থানায় জিডি করেছেন কিনা জানতে চাইলে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, গতবার প্রতারক চক্রের খপ্পরে পড়ে ২০ হাজার টাকা খুইয়েছি। কোতোয়ালী থানায় জিডিও (নং-১৮৭) করেছিলাম। কিন্তু এক বছরেও টাকা ফেরত পাওয়া দূরে থাক, চক্রের কেউ ধরা পড়েছে এমন তথ্য জানা নেই। থানা থেকে এস আই সজল দাশ একবার ফোন করেছিলেন। ব্যস ১১ পৃষ্ঠার ৬ষ্ঠ কলাম
ওই পর্যন্ত। তাই এবার আর থানাকে জানানোর প্রয়োজন মনে করিনি। মুকুটনাইট স্কুলের এক শিক্ষকের টাকা কোতোয়ালী থানা পুলিশ উদ্ধার করেছে বলে ওসি কোতোয়ালী বলেছেন। তাঁর টাকা উদ্ধার হলে আমারটা কেন হলো না বুঝতে পারছি না। আর টাকা উদ্ধার হলো, কিন্তু আসামী ধরা পড়লো না, এটাওতো রহস্যজনক।
একইভাবে পটিয়ার হাবিলাইশদ্বীপ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক শীতল চন্দ্র শীলের কাছেও ফোন করে প্রয়োজনীয় তথ্য চাওয়া হয় একই কায়দায়। গত বছর তিনি প্রতারিত হয়ে পটিয়া থানায় জিডি করেছিলেন। কিন্তু এ পর্যন্ত তাঁর হারানো টাকা কিংবা অপরাধীর সন্ধান দিতে পারেনি থানা পুলিশ।
ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলে আরো জানা গেছে, ২০১৮ সালের এসএসসি পরীক্ষার উত্তরপত্র মূল্যায়ন বাবদ পরীক্ষকদের সম্মানী বাবদ টাকা ডাচ বাংলা ব্যাংকের মাধ্যমে ২ ডিসেম্বর পরীক্ষকদের ব্যক্তিগত মোবাইল একাউন্টে স্থানান্তর করা হয়। কিন্তু টাকা স্থানান্তর হওয়ার আগে থেকেই একটি জালিয়াত চক্রের শিকার হয়ে বহু পরীক্ষক সম্মানীর টাকা খুইয়েছিলেন। অন্যদিকে, টাকা স্থানান্তরের পর যাদের ফোন করা হয় তাদের বলা হয়, আপনার রকেট একাউন্টটি ডিঅ্যাক্টিভ হয়ে আছে। সেটি আপডেট করতে হবে। একাউন্ট আপডেট করা না হলে টাকা তোলা যাবে না। এই ফাঁদে পা দিয়ে ঘটনার শিকার হন পরীক্ষকরা।
পরীক্ষকদের মোবাইল একাউন্টে টাকা স্থানান্তরের মুহূর্তে জালিয়াত চক্র সক্রিয় হওয়ার নেপথ্যে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক ও শিক্ষাবোর্ডের কেউ জড়িত থাকতে পারেন বলে ধারণা করছেন ভুক্তভোগী পরীক্ষক ও বোর্ড সংশ্লিষ্টরা। তাঁরা বলছেন, শিক্ষকদের ব্যক্তিগত মোবাইল একাউন্টে টাকা স্থানান্তরের তথ্য সংশ্লিষ্ট শিক্ষক, শিক্ষাবোর্ড ও ব্যাংক সংশ্লিষ্টদের বাইরে কারো জানার কথা নয়। কিন্তু টাকা স্থানান্তরের মুহূর্তেই পরীক্ষকদের ফাঁদে ফেলে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে জালিয়াত চক্র। চক্রের শিকার হয়ে সম্মানীর টাকা খোয়ানো শিক্ষকের সংখ্যা নেহাত কম নয় বলে মনে করেন ভুক্তভোগী পরীক্ষকরা।

x