পরিবারের পূর্বসূরিদের প্রতি সততার অনন্য দৃষ্টান্ত

মাহবুব পলাশ : মীরসরাই

সোমবার , ৪ নভেম্বর, ২০১৯ at ১০:২০ পূর্বাহ্ণ
24

আমাদের দেশে এখনো পৈত্রিক সম্পদে নারীর উত্তরাধিকার/হক দেয়ার ক্ষেত্রে খুব অনুদার মনোভাব ও সংকীর্নতা রয়েছে। বাবা মা কন্যা সন্তানকে বঞ্চিত করছে, ভাই বোনকে বঞ্চিত করছে। এমন যখন অবস্থা তখন মীরসরাইর উত্তর সোনাপাহাড় গ্রামে দাদার তিন বোনের তৃতীয় থেকে পঞ্চম জেনারেশন ওয়ারিশদেরকে ডেকে ডেকে নারীর হক আদায় করে দেয়ার এক নজীর বিহীন ঘটনা ঘটেছে। জানা গেছে ঐ গ্রামের বাসিন্দা এনামুল গোফরান চৌধুরী তাঁর দাদার তিন বোনের প্রায় ১৫০ বছর আগের প্রাপ্য পৈত্রিক সম্পত্তির উত্তরাধিকার/হক তাঁদের বর্তমান স্থিত কারো চতুর্থ জেনারেশন কারো পঞ্চম জেনারেশন ওয়ারিশদেরকে ডেকে ডেকে ধরে ধরে এনে বুঝিয়ে দিয়েছেন। এসব ওয়ারিশদের অনেকের বয়স ৭০ থেকে ৯০ এর কোঠায়। এ ঘটনায় এমন দৃশ্যের অবতারণা হয়েছে যে আনন্দে বিস্ময়ে অনেক ওয়ারিশ কেঁদে ফেলেছেন। সবাই বলেছেন কই আমাদের ওয়ারিশরা তো কখনোই কাউকে বলে গেছে বলে জানা নাই যে এই সম্পত্তিতে আমাদের হক রয়েছে। এসব বয়োবৃদ্ধ ওয়ারিশদের অনেকেই এই বয়সে এসে অপ্রত্যাশিত কিছু অর্থ পেয়ে যারপরনাই উপকৃত হয়েছেন বলে শুকরিয়া আদায় করেন। এই প্রসঙ্গে জনাব এনামুল গোফরান চৌধুরী বলেন সম্পদে কন্যা সন্তানের উত্তরাধিকার বা হক দেয়া কারো ঐচ্ছিক বিষয় হতে পারেনা। এটা কারো দয়া দাক্ষিণ্য বা বদান্যতাও নয়। এটা দায় ও কর্তব্য। কন্যা সন্তানও পুত্র সন্তানের মতই পিতা মাতার রক্তের ধারাবাহিকতা বহন করে বলেই পিতা মাতার সম্পদেও উত্তরাধিকার পাওয়া ন্যায্য অধিকার। এটা কোনভাবেই আত্মসাৎ বা তসরুফ করা কারো জন্যই উচিৎ ও মঙ্গলজনক নয়। তিনি আরো বলেন আমি যা করেছি তার কৃতিত্ব আমার নয় বরং আমার দাদা খায়েজ আহমেদ চৌধুরী ও বাবা ফয়েজ চৌধুরীর। আমার দাদা তাঁর তিন বোনের নাম আরএস জরীপে (ব্রিটিশ আমল) রেকর্ড করিয়ে গেছেন। আর আমার বাবা স্বাধীনতার পরে বিএস জরীপে তাঁর তিন ফুফুর আওলাদদের নাম যথাযথ ভাবে রেকর্ড করিয়ে গেছেন বলে আমি তাঁদের হকগুলো পরিশোধ করতে পেরেছি। আমি উপলব্ধি করলাম আমার পরবর্তী জেনারেশন আর দাদার তিন বোনের বর্তমান বা পরবর্তী জেনারেশনের কেউ আর কাউকে চিনবেনা জানবেনা অর্থাৎ কোন পরিচয় থাকবেনা। সুতরাং এই হক বা দায় শোধ করা আর সম্ভব হবেনা। তাই আমি সবাইকে ডেকে ডেকে ধরে ধরে এনে তাঁদের হক হস্তান্তর করেছি। এটা আমার দাদা ও বাবার ইচ্ছার প্রতিফলন মাত্র। তাঁরা কাগজে কলমে রেকর্ড পত্রে উত্তরাধিকার/হক দিয়ে গেছেন আর আমি স্বশরীরে হস্তান্তর করেছি মাত্র। এটা আমাদের পারিবারিক বা বংশের ঐতিহ্য। দাদার বোনদের পঞ্চম জেনারেশনের সাথে পরিচয় ও সম্পর্ক কিভাবে রক্ষা করেছেন, এটাও তো একটা বিস্ময়ের ব্যপার এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করতে পারলে খুব ভালো, এতে সওয়াবও আছে অনেক, এ বিষয়ে পবিত্র কোরআন ও হাদীসে অনেক বাণী আছে। অবশ্য এজন্য মন ও সামর্থ্য দুটোই থাকতে হয়। গত ২৭ সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠিত আমার বাবার মৃত্যুবার্ষিকীতে আমাদের এমন কিছু আত্মীয় এসেছেন যাঁদের নানার নানার বাড়ি আমাদের বাড়ি। তিনি আরো বলেন দাদার বোনদের উত্তরাধিকার/হক পরিশোধ করে যেতে পেরে খুব পরিতৃপ্ত বোধ করছি। এতে আমার বাবা দাদা ও দাদার বোনেরা নিশ্চয়ই আমার উপর সন্তুষ্ট হবেন। ইহ ও পরজগতে কোন দাবী রাখবেন না।
উক্ত উত্তরাধিকার পরিশোধ কার্যক্রমের সাথে সম্পৃক্ত জোরারগঞ্জ সাব রেজিস্ট্রি অফিসের সংশ্লিষ্ট কমিশন ও দলিল লিখক জসীম উদ্দিন বলেন উনাদের ওয়ারিশেরা এত বয়োবৃদ্ধ ও চলৎশক্তিহীন যে বাসা বাড়িতে গিয়ে গিয়ে কমিশন উনাদের স্বাক্ষর নিতে হয়েছে। কিন্তু সত্তোরোর্ধ বয়সের কি পুরুষ কি মহিলা ৪০/৪৫ জন মানুষের কারোই টিপ সই নিই নাই সবাই নাম স্বাক্ষর করেছেন দলিলে। উনাদের পুরো পরিবার ঐ আমল থেকেই শিক্ষায় ও আদর্শে এতোটা সৎ দেখে অবাক হচ্ছি।

x