পথে পথে দিলাম ছড়াইয়া

আলাউদ্দিন খোকন

মঙ্গলবার , ১২ নভেম্বর, ২০১৯ at ১০:৫৯ পূর্বাহ্ণ
9

একজন মা। একজন সন্তানহারা জননী। এই দেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সন্তান-সম্ভ্রম-সর্বহারা একজন নারী রমা চৌধুরী। দেশ স্বাধীন হওয়ার পরেও চার যুগ যে মানুষটি খালিপায়ে ঝোলা কাঁধে পথে পথে হেঁটেছেন। নিজের লেখা গ্রন্থ মানুষের দ্বারে দ্বারে পৌঁছে দেয়ার একটি স্ব-নির্বাচিত জীবিকা বেছে নিয়েছিলেন। সেই মাথা উঁচু করে চলা নির্লোভ মানুষটির সাথে আমার কেটেছে দুই যুগ। সেই সময়ে আমাদের যাপিত জীবনের কথামালা ‘পথে পথে দিলাম ছড়াইয়া’র এক মহা অধ্যায় এই পর্ব। এই সময়ের লড়াইয়ের কথা নিয়ত আমাকে বিমূঢ় করে দেয়।
দুই হাজার পাঁচ সালের আঠারো মার্চ ঘুম ভাঙে দরজায় প্রচণ্ড ধাক্কায়। ঘুম ভেঙে দেখি সাড়ে নয়টা বেজে গেছে। এতো দেরি করে সাধারণত ঘুম থেকে উঠি না। একে তো শুক্রবার, তা আবার দিদিও বাড়িতে মানে পোপাদিয়ায়। আগের রাত প্রায় চারটা পর্যন্ত বই পড়েছি। দরজায় শব্দ না হলে কয়টায় উঠতাম জানি না। চোখ কচলাতে কচলাতে দরজা খুলে দেখলাম নাছের দাঁড়িয়ে আছে। নাছেরের বাড়ি পোপাদিয়ায়। অনেকদিন দিদির বাড়িতে মালী বা কামলা হিসেবে কাজ করেছে। পরে বেতন চালাতে না পারায় দিদি আমাকে বলে আমার ছোট বোন নার্গিসের ইপিজেডের একটা অফিসে চাকরির ব্যবস্থা করেছেন। সেই নাছেরকে হঠাৎ দেখে আমি একটু চমকে উঠলাম। সে চাকরি পেয়ে আর আমাদের সাথে যোগাযোগ রাখেনি। নাছের বিমর্ষ অবস্থায় জানালো, দিদি তো মারা গেছেন! বোয়ালখালী হাসপাতালে আছে। আমি এবার ভালো করে চোখ কচলাম। ভুল শুনছি না তো, ভুল দেখছি না তো! দেখলাম, না। ঠিকই দেখছি, ঠিকই শুনছি। আমি দিশেহারার মতো জিজ্ঞেস করলাম, কি বলেন? সে বললো, গতকাল রাতে দিদির মাথা ফেটে গেছে, কীভাবে কেউ জানে না। কে নাকি দিদির মাথায় আঘাত করেছে। তারপর সেন্সলেস হয়ে পড়ে থাকায় বিশ্বাসদের বাড়ির দুইটা ছেলে বোয়ালখালী হাসপাতালে রেখে এসেছে, বেওয়ারিশের মতো। এখন খবর শুনলাম দিদি আর নেই। গ্রামের কোন লোক দেখতে যায়নি ভয়ে, যদি মামলায় জড়ায়!
আমার কিছুই বিশ্বাস হলো না নাছেরের কথা। ইদানীং নাছের একটু উল্টাপাল্টা হয়ে গেছে, শুনেছিলাম দিদির কাছে। আমি তাই নাছেরকে বললাম, কি আবোল তাবোল বলছেন? কার কথা শুনতে কার কথা শুনেছেন ঠিক নেই, আপনি নিজে দেখেছেন? সে বললো, না, আজ শুক্রবার অফিস নাই তাই সকালে নয়া হাটে গিয়েছিলাম বাজার করতে, সেখানে সবাই বলাবলি করায় খবর নিয়ে জানলাম দিদির এই অবস্থা। আরো শুনলাম বাড়িতে নতুন লোক রেখেছেন দিদি, মিজান নামে ভোলার একটা ছেলেকে। সেই ছেলেটা নাকি আছে হাসপাতালে। তবে আমি হাসপাতালে না গিয়ে সোজা আপনার কাছেই এসেছি। এতোকথা শুনে আমি বললাম, হাসপাতাল তো শহরে আসবার পথেই, নেমে একটু দেখে আসতে পারলেন না? বুঝলাম সে নিজেও মামলার ভয়ে যায়নি দিদিকে দেখতে।
দ্রুত রেডি হয়ে নিলাম। টয়লেট করারও সময় পেলাম না। নাছেরকে নিয়েই রওয়ানা দিলাম। যদিও নাছের যেতে চাচ্ছেন না। সিএনজি নিয়েই চলে গেলাম বোয়ালখালী হাসপাতালে। টাকা খুব বেশি আমার হাতে থাকেনা। দিদি কয়েকমাস ধরে বাড়িতে, আশ্রমের জন্য ভিটে ভরাট করে ঘর করাচ্ছেন। এদিকে দিদির চিঠি নিয়ে আমি বই বিক্রি করছি শহরে। আগের দিন বৃহস্পতিবার ছিলো। বেশ কিছু বই বিক্রি হয়েছে। দিদির রাতে আসবার কথা, আসলেন না। টাকাগুলো বাড়ির কাজের জন্য নিয়ে যেতেন খুশি হয়ে। বেশি না, সব মিলিয়ে তেরোশো টাকা। সেই টাকাটাই এখন সম্বল করে বোয়ালখালীর দিকে ছুটলাম। নাছের দূর থেকে দিদির বাড়ির কাজের ছেলে মিজানকে দেখিয়ে দিয়ে পালিয়ে গেলো, ভয়ে। আমি মিজানকে জিজ্ঞেস করে জানার চেষ্টা করলাম। মিজান আমাকে দেখে প্রথমে পালাতে চাইলেও পরে সাহস করে কথা বললো। কীভাবে কি হয়েছিলো আগের রাতে, সে জানে না। তবে, কেউ মাথায় প্রচণ্ড আঘাত করেছে সেটা শুনেছে। আমি বললাম, লাশ কোথায়? বাড়ি নিয়ে যেতে হবে না? শুনে মিজান চমকে উঠলো। বললো, দিদি মারা গেছে? আমি বললাম আমাকে জিজ্ঞাসা করছো, তুমিই তো এখানে ছিলে? সে অবাক হয়ে বললো, আপনাকে কে বলেছে? আমি বললাম, নাছের শহরে গিয়ে আমাকে সেই খবরই তো দিয়েছে! মিজান আমাকে নিয়ে গেলো ওয়ার্ডে। গিয়ে যা দেখলাম তাতে নিজেকে ধরে রাখা কঠিন। সমস্ত শরীর শিউড়ে উঠলো। পৃথিবীতে এমন ঘটনাও ঘটতে পারে আমার জানা ছিলো না।
বোয়ালখালী হাসপাতালের সাধারণ ওয়ার্ডের ফ্লোরে ছেঁড়া একটা বেডে সারা শরীরে রক্ত, বমি, কাদা, মাটি মেখে আলুথালু নিঃসাড় পড়ে আছেন দিদি। পায়খানা প্রস্রাবে শাড়ি কাপড় একাকার। জীবিত না মৃত কিছুই বুঝতে পারছি না। মাছি উড়ছে চারপাশে। দুর্গন্ধে আশপাশে সবাই নাক চেপে বসে আছে। কাছে গিয়ে দেখলাম মাথা পুরোটাই ব্যান্ডেজ করা। শরীরে কোন কম্পন নেই। পাশে কোন আয়া, সিস্টার ডাক্তার কেউ নেই। আমি দিশেহারা, কি করবো বুঝতে পারছি না। চিৎকার করে ডাক্তার ডাকলাম। একজন সিস্টার এসে বললেন, কি ব্যাপার? আমি বললাম, এই রুগীর পাশে কেউ নেই কেনো? সিস্টার বললো, কাল থেকেই তো এখানে পড়ে আছে। এর সাথে তো কেউ ছিলো না। আমরা স্যালাইন লাগিয়ে রেখেছি, লোক না থাকায় কোন চিকিৎসা হয়নি, ঔষধ পত্র কে আনবে? আমার মাথায় রাগ উঠে গেলো। চিৎকার করে বললাম, জানেন কাকে আপনারা ফেলে রেখেছেন বিনা চিকিৎসায়? আপনাদের নামে আমি মামলা করবো, আপনারা দেশের একটা সম্পদ এভাবে ফেলে রেখেছেন। আরো অনেককিছু বললাম। আমার চিৎকার চেঁচামেচিতে অনেক লোক জড়ো হলো। কোথা থেকে যেনো ডিউটি ডাক্তারও চলে এলো। আমাকে জিজ্ঞাস করায় দিদির পরিচয় দিলাম। ডাক্তার দুঃখপ্রকাশ করে বললেন, আমরা তো জানি না, ওনাকে অজ্ঞাতনামা হিসেবে এখানে ভর্তি দেখানো আছে। ঠিক আছে আমি দেখছি কি অবস্থা। ডাক্তার দ্রুত লোকজন ডেকে একটা বিশেষ বেডে নিয়ে গেলেন দিদিকে। দ্রুত অক্সিজেন লাগানো হলো। কিছু ইনজেকশন দেয়া হলো। আশ্চর্য হলাম আমাকে ঔষধ আনবার জন্য বললো না। নিজেদের স্টক থেকেই ঔষধ পত্র ব্যবস্থা করে দিলো! আমি পাশে দাঁড়িয়ে দেখছি আর ভাবছি, কি করবো? কার সাহায্য চাইবো। আমি তো পোপাদিয়ায় নিষিদ্ধ, এখন কোথায় যাবো? ডাক্তার দিদিকে দেখে জানালেন ওনার অবস্থা একেবারেই শেষ পর্যায়ে। যে কোন সময় মারা যেতে পারেন। আপনারা যত দ্রুত সম্ভব মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। আমি তখন দিশেহারা। কীভাবে কি করবো উপায় খুঁজে পাচ্ছি না।
মাঝে মাঝে অসম্ভব বা কাকতালীয় কিছু ঘটনা ঘটে, যাকে আমরা অলৌকিক বলি। আমি এখানে অলৌকিক কিছু না পেলেও একটা সাহস করবার মতো বস্তুর সাক্ষাত পাই। আমি চালচুলোহীন ভবঘুরে মানুষ। নিজের বলে তো কিছুই নাই। নিজের জন্য কিছু রাখতে নাই সন্ন্যাস জীবনে। আমিও দিদির কাছে যাওয়ার পর থেকে সেই জীবন যাপন করছি। নিজের নাই, তবু আমাকে জোর করেই আমার ছোট বোন নার্গিস একটা মোবাইল উপহার দেয়। এই ঘটনার ঠিক দুইদিন আগে। আমার কথা শুনে সবাই অবাক হবেন তবু বলছি, আমার আশেপাশের বন্ধুবান্ধবরা সবাই যখন সেই দুই হাজার সালের অনেক আগে থেকে মোবাইল ব্যবহার করছে, সেখানে আমি দুই হাজার পাঁচ সালে এসেও মোবাইল ব্যাবহার করছি না। মোবাইল কেনার সামর্থ্য আমার ছিলো না। আমাকে আমার বোন একটা নোকিয়া এগারোশো মডেলের মোবাইল দিয়েছিলো। এই মোবাইলটাই আমার একান্ত আপন, একান্ত সহযোগী হয়ে ওঠে। আমি পরিচিত জনদের সাথে যোগাযোগের পথ খুঁজে পাই।
বোয়ালখালী হাসপাতালে থাকতে থাকতেই আমি প্রথম ফোন করি দিদির পাঠক, আমার বন্ধু হয়ে ওঠা ডাক্তার কৌশিক দাশকে। আমি তখন প্রথম আলো বন্ধুসভা চট্টগ্রাম এর সাধারণ সম্পাদক। সে কারণে অনেকের সাথেই আমার যোগাযোগ ছিলো। এছাড়াও আরো কিছু সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠনের সাথে সংযুক্ত থাকার সুবাদে একটা পরিচিত গণ্ডি তৈরি হয়ে যায়। ফোন করি চট্টগ্রাম বন্ধুসভার তখনকার সভাপতি বিপ্রতীপ অপু, সাহিত্য সম্পাদক মাহমুদ আলম সৈকত সহ আরো কয়েকজনকে। ওনাদের জানাই দিদির অবস্থা। আরো জানাই খুব দ্রুত চট্টগ্রাম মেডিকেলে নিয়ে আসছি, ওনারা যেনো একটু পাশে থাকেন।
আমার কাছে তখন সম্বল মাত্র এগারোশো টাকার মত। দিদিকে মেডিকেলে নিয়ে যাওয়ার এম্বুলেন্স ভাড়া দিতে হবে আটশো টাকা। তারপর আরো টুকিটাকি তো আছেই। সাথে কোন কাপড় নেই। যেটা পরনে ছিলো, শুধু শাড়ি সেটা যেমন ছেঁড়া তেমন রক্ত বমি পায়খানা প্রস্রাবে একাকার। গ্রামে দিদি ঘরে থাকলে ব্লাউজ পেটিকোট কিছুই পরতেন না। সেই অবস্থাতেই মাথা ফাটিয়ে হাসপাতালে পড়ে আছেন। ওখানকার একজন আয়ার কাছ থেকে পুরানো একটা শাড়ি দেড়শো টাকায় কিনে সেটা পরালাম। আয়াকে আরো একশো টাকা দিয়ে দিদির সারা গায়ে লেগে থাকা মলমূত্র কিছুটা পরিষ্কার করিয়ে এম্বুলেন্সএ উঠালাম। মেডিকেলের নিজস্ব এম্বুলেন্সে তাও একটা চাদর পেলাম না দিদির গায়ে জড়ানোর জন্য, এদিকে আমার টাকাও শেষ। একটা চাদরও আর কেনা হলো না। এম্বুলেন্সে তুলে অক্সিজেন লাগিয়ে দেয়া হলো। গাড়ি ছুটে চললো চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের দিকে। এম্বুলেন্স এর ড্রাইভার গাড়ি চালাচ্ছেন আর বারবার পেছন ফিরে তাকাচ্ছেন। এই বুঝি রুগী মারা গেলো! গাড়ি বুঝি আবার ব্যাক করতে হচ্ছে। প্রচণ্ড গতিতে গাড়ি কালুরঘাট পৌঁছালো। কালুরঘাট ব্রীজ তখন ভাঙা, কাজ চলছে। নদী পারাপার করছে ফেরি। ফেরিঘাটে প্রচণ্ড জ্যাম। এম্বুলেন্স ড্রাইভার ঘাটের লোকদের কিছু একটা বোঝালো, দেখলাম কাজ হয়েছে। শুধু এম্বুলেন্স দ্রুত একটা ফেরি দিয়ে পার করে দিলো। পরে ড্রাইভারকে জিজ্ঞাসা করায় বললো, দিদির পরিচয় দিয়েছে এবং একটু বাড়িয়েই বলেছে। একারণে এই সুবিধা পাওয়া গেলো। গাড়ি ফেরি পার হয়ে ছুটলো শহরের দিকে। আর ড্রাইভার ফিরে ফিরে তখনো দেখছে দিদি চলে গেলো কিনা। আমি ভাবছি অন্যকথা। যদিও আমার বিশ্বাস দিদি এভাবে চলে যেতে পারেন না। কোন কিছু না বলে আমাকে একা রেখে এভাবে যেতে পারেন না। তবু বাস্তবতা অন্য রকম, তাই সেটাও ভাবতে হচ্ছে। যদি দিদি চলে যায় কী করবো তখন? কোথায় নিয়ে যাবো? জীবন্মৃত দিদিকে নিয়ে না হয় লড়াই করতে পারবো মেডিকেলে, কিন্তু দিদি মারা গেলে কোথায় নিয়ে যাবো আমি? আমার তো কোন নেয়ার জায়গা নেই। আমি, দিদি পথের মানুষ। দিদি বারবার যদিও বলেছেন টুনুর সমাধির পাশে যেনো তাঁকে সমাধি দেয়া হয়। কিন্তু সেখানে তো আমি নিষিদ্ধ! আর সেখানকার পরিস্থিতিও আমার জানা নেই। ঘরের কামলা ছেলে মিজানের কাছ থেকে শুনেছি – দিদির ছেলে জহর ঘরের সব জিনিসপত্রে আগুন লাগিয়ে দিয়ে কোথায় চলে গেছেন! সেই বাড়িতে কীভাবে নিয়ে যাবো দিদিকে?
গাড়ি চলছে জীবনের দিকে আর আমি ভাবছি মৃত্যুকে নিয়ে।

x