পথের গান

আনন্দময়ী মজুমদার

শনিবার , ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ at ৮:৫২ পূর্বাহ্ণ
32

১) আমরা বড় হয়েছি বিচিত্র মানুষের ভিড়ে। সকলের চলনবলন, ভাষা, গান, উৎসব আলাদা। কিন্তু জড় হয়ে যেতাম ঠিকই একে অন্যের কাছে। অনেকটা আমাজন বা সুন্দরবনের পাখিদের মতো।
পেছনে ছিল একটা ক্যাম্পাস। আর ছিল ক্যম্পাসের শিশুরা। আর মা-বাবাদের মধ্যে, মূলত মায়েরা।
মায়েদের কাঁটাতার জিনিসটা জানা থাকত না। সংশয়বাদী লোকেরা তাই বেশি সুবিধে করতে পারত না।
সব রঙের মানুষ মিলে একসঙ্গে হইচই করা, আড্ডা দেওয়া, সিনেমা দেখা, মজলিস করা, বেড়াতে যাওয়া, হুজুগ আর আকাঙ্ক্ষা গুরুত্ব পেত।
২) কৌতূহল মেটাতে প্রায় আমরা গির্জায় গেছি।
গুরুদুয়ারায় রবিবার করে লুচি দিয়ে ঝাল-ঝাল তরকারি আর গাজরের হালুয়া খেতে গেছি সকলের সঙ্গে বাসে চড়ে।
ঈদে শাদা জামায় হাজির হয়ে গেছি যথারীতি বিরিয়ানি আর ফিরনি খাবার লোভে।
দুর্গা পুজো, সরস্বতী পুজোয় গেছি আর সেখানে দেখেছি সকলে নিমন্ত্রিত।
৩) ভক্তিগীতি নানারকম পারি; নজরুলের বেশিরভাগ, রামপ্রসাদীও আছে। আমার মা একসময় নজরুলের যে-গানটা করতেন সেটা হল ‘এই সুন্দর ফুল এই সুন্দর ফল/ আর মিঠা নদীর পানি/ খোদা তোমার মেহেরবানি।’
আমরা ক্যারল শিখেছি আর নিয়মিত স্কুলে করতাম, ‘উই প্রেইজ ইয়োর নেম মোস্ট ব্লেসড লর্ড/ উই গ্লোরিফাই ইয়োর নেইম/ দ্য কিং অভ হেভন এন্ড আর্থ ও লর্ড/ আন্ড দাস উই প্রেইজ ইয়োর নেইম।’
গান শুনে একবার আমার ক্লাস-টিচার মিস্টার সেনফুমা গানটা একক শুনতে চেয়েছিলেন। আমার মোটেও সেরকম প্ল্যান ছিল না বলে তিনি শুনতে পাননি।
৪) আমরা বাংলাদেশের অনুষ্ঠানে নজরুলের গান কোরাসে করেছি, ‘মোরা একই বৃন্তে দুটি কুসুম/ হিন্দু মুসলমান/ মুসলিম তার নয়নমণি/ হিন্দু তাহার প্রাণ।’ এসব গানটান শেখাতেন দুই লাজুক প্রকৃতির মানুষ – আমার মা-বাবা।
সেখানে নাচ গান নাটক আর আবৃত্তিও হত। কেউ রেহাই পেত না। চাইতও না।
মজলিস ব্যাপারটা সকলের ফেভারিট। আর সেকালে টিভি ছিল না, কম্পিউটার ছিল না। তাই সামাজিকতাই ছিল সংযোগের একমাত্র বিনোদন।
বন্ধু সাইদ, যে ভাল বাংলা বলতে পারত না, সেও একক আবৃত্তি করত, ‘সফদর ডাক্তার/ মাথা ভরা টাক তার/ খিদে পেলে পানি খায় চিবিয়ে।’
বান্ধবী রাকা পেছনে দাঁড়িয়ে কোরাসে গাইত, ‘এই কউমাছিদের ঘরছাড়া কে করেছে রে।’ মৌমাছি শব্দটা সে কউমাছি বলত।
৫) আমাদের নিচের তলায় এক ডাকসাইটে মহিলা থাকতেন। লম্বা চওড়া, গাল দুটো অসম্ভব গোলাপি। শাদা গোলাপের মতো ফরসা। মিসেস খান। তাদের তিন ছেলেমেয়ে ছিল। ওয়াক্কাস, স্যারা আর সাদ। লম্বা লম্বা জাপানি কাটের চুল চোখ ঢাকা।
খান-রা পাকিস্তানের পরিবার। মিসেস খান দিনদুপুরে আমাদের বাড়ি হানা দিতেন ‘মিসেস মজুমদার’ বা আমার মায়ের সন্ধানে। কীভাবে কেক বানাচ্ছেন, দিন কেমন যাচ্ছে, বাচ্চারা কেমন দুষ্টুমি করে, নেমন্তন্ন করে কী কী খাওয়াবেন, এইসব গল্প করতে।
৬) এটা ছিল আফ্রিকা। আমার মা একাত্তরে তার বাবা আর ভাইকে হারিয়েছেন। মানে পাকিস্তানী দালালরা খুঁজে বের করে পাকিস্তাানী আর্মির হাতে তুলে দিয়েছে। একাত্তর আমাদের পরিবারের মাটিতে সব জায়গা জুড়ে অদৃশ্য কালি দিয়ে লেখা। সে আঁধারটুকু এই ব্যক্তিগত পারিবারিক গল্পে থাকার কথা না। আমাদের পাকিস্তানী পড়শি নেহাত একজন নিরীহ মা ছিলেন। আমার মায়ের গানের গলা তার এত ভালো লাগত বলে খাইয়েদাইয়ে গান করতে বলে, সেই গান রেকর্ড করে পরদিন সেই রেকর্ড উচ্চস্বরে ছেড়ে দিতেন আর মা লজ্জা পেতেন।
এর মধ্যে একটা গান ছিল নজরুলের সেটা আগেই বলেছি – ‘এই সুন্দর ফুল এই সুন্দর ফল আর মিঠা নদীর পানি/ খোদা তোমার মেহেরবানি।’

আরেকটা ছিল রবীন্দ্রগান।
সেটা ছিল নিম্নরূপ :

কত অজানারে জানাইলে তুমি,
কত ঘরে দিলে ঠাঁই-
দূরকে করিলে নিকট, বন্ধু,
পরকে করিলে ভাই।
পুরনো আবাস ছেড়ে় যাই যবে
মনে ভেবে মরি কী জানি কী হবে,
নূতনের মাঝে তুমি পুরাতন
সে কথা যে ভুলে যাই।
জীবনে মরণে নিখিল ভুবনে
যখনি যেখানে লবে,
চির জনমের পরিচিত ওহে,
তুমিই চিনাবে সবে।
তোমারে জানিলে নাহি কেহ পর,
নাহি কোন মানা, নাহি কোন ডর,
সবারে মিলায়ে তুমি জাগিতেছ-
দেখা যেন সদা পাই।

৭) এছাড়া আমাদের বন্ধুদের মধ্যে ছিল উগান্ডার কৃষ্ণবর্ণ মানুষ মিস্টার ম্যাঙ্গেনি, যিনি সম্ভবত ধর্মকর্ম নিয়ে বেশি মাথা ঘামাতেন না কিন্তু খাওয়াতেন অতি উত্তম।
ছিলেন মিস্টার গান্ধী যাদের মেয়ে দীপা আমার বিশেষ বন্ধু ছিল। আমরা দুইজন মিলে আমাদের পাশের বাড়ির উগান্ডার শিশু আমান্ডাকে আদর করতাম, আর উল্টোপাল্টা বাংলা শিখাতাম। ‘আমান্ডা, বলো আমি একটা বোকা।’ ছোটো মেয়েটা বলত, ‘আমি একটা বোকা।’ আমান্ডার মা আমাদের উগান্ডার বন্ধু ছিল। কোনোদিন কোনো সমস্যা দেখা দেয়নি।
বাংলাদেশের কুমিল্লা, বরিশাল, ঢাকা, খুলনা, চট্টগ্রাম, সিলেট রাজশাহী, আর ভারতের উড়িষ্যা, বাংলা, বিহার, রাজস্থান, উত্তরপ্রদেশ, তামিল নাড়ু, অন্ধ প্রদেশ, শ্রীলংকা আর পাকিস্তানের কিছু ঘর পরিবার মিলে মিলেমিশে থাকতেন এক বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে।
কেউ কারো পেছনে লাগতেন না বলা যায়।
ঝামেলা হলে, সেটা একরঙা পাখিদের মধ্যেই কখনো কখনো হত।
৮) একবার বাংলাদেশের এক মহিলা দেশপ্রেমের অছিলায় আমাদের মাকে পেছনে কটাক্ষ করেছিলেন। পাকিস্তানী সেই নিরীহ গোছের আন্টির সঙ্গে মেলামেশার জন্য। তো মা পরবর্তীকালে সমুদ্রের ফেনার মত সেইসব আবর্জনা ফিরিয়ে দিয়েছিলেন।
কারণ মায়ের বাবা আর মুক্তিযোদ্ধা ভাই যে একাত্তরে শহীদ, আর পরিবার যে উদ্বাস্তু হয়ে দেশের মধ্যেই অনেকদিন মুসলিম সেজে পথে-পথে ঘুরেছে, একসময় ছোটোমামার বাড়ি গিয়ে মুক্তিযুদ্ধের সময় বাকি পরিবার থেকে আলাদা কাটিয়েছে আর পরে ধ্বস্ত একটা জীবন মেরামত করে নিয়েছে, সেটা সকলে জানত না। মা-ও যেচে কাউকে জানাতেন না।
৯) সেই সময় থেকে আমরা বাংলা, ইংলিশ, হিন্দী আর উর্দু কানের কাছে শুনে অভ্যস্ত। বাংলা ইংলিশ আর হিন্দি সিনেমা দেখি আর গান শিখি যথারীতি, না যেচেই।
যতক্ষণ না কেউ আমাদের শ্রদ্ধার বেড়া ছিঁড়ে ফেলছে ততক্ষণ অন্যলোকের ভাষা আমাদের কানে অদ্ভুত কিছু মনে হয় না।

x