পথচলায় নান্দীমুখ এর তিন দশক

সনেট দেব

বৃহস্পতিবার , ১২ ডিসেম্বর, ২০১৯ at ৫:২৭ পূর্বাহ্ণ

নাট্য সংগঠন নান্দীমুখ এর পথচলার ৩০বছর উপলক্ষে বছরব্যাপী অনুষ্ঠানমালার প্রথম আয়োজন ‘নান্দীমুখ আন্তর্জাতিক নাট্যোৎসব ২০১৯’ গত ১৪ থেকে ২২ নভেম্বর, চট্টগ্রাম শিল্পকলা একাডেমি মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয়। এবারের উৎসবে ভারত, ইরান, স্পেন ও বাংলাদেশের আটটি নাট্যদল তাদের প্রযোজনা সমূহ মঞ্চস্থ করে। এছাড়া বাংলা রাজনৈতিক থিয়েটার ও উৎপল দত্ত শীর্ষক আন্তর্জাতিক সেমিনারও অনুষ্ঠিত হয়। প্রতি বছরের ন্যায় এবারও নান্দীমুখ সারাদেশের চারজন প্রতিশ্রুতিবান নাট্য নির্দেশক কে নান্দীমুখ সম্মাননা প্রদান করে।

চট্টগ্রাম তথা বাংলাদেশের অন্যতম সক্রিয় নাট্য সংগঠন নান্দীমুখ’র প্রতিষ্ঠার ত্রিশ বছর উপলক্ষে গত ১৪ নভেম্বর সন্ধ্যায় নগরীর জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে উদ্বোধন হয় ‘নান্দীমুখ আন্তর্জাতিক নাট্যোৎসব ২০১৯”। মঙ্গল প্রদীপ প্রজ্বলনের মধ্য দিয়ে নান্দীমুখ আয়োজিত আন্তর্জাতিক নাট্য উৎসব এর শুভ সূচনা হয়। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে নয় দিন ব্যাপী নাট্যোৎসব’র উদ্বোধন করেন বিশ্ব আইটিআই এর সাম্মানিক সভাপতি রামেন্দু মজুমদার। নান্দীমুখ দল প্রধান অভিজিৎ সেনগুপ্ত’র সভাপতিত্বে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সম্মানিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রামস্থ ভারতীয় সহকারী হাই কমিশনার অনিন্দ্য ব্যানার্জী, নাট্য গবেষক আশীষ গোস্বামী ও ভারতের নাট্য পত্রিকা ভাবনা থিয়েটার সম্পাদক অভিক ভট্টাচার্য। প্রধান অতিথি ও উদ্বোধক রামেন্দু মজুমদার উৎসব উদ্বোধন করে বলেন, এ ধরনের আন্তর্জাতিক নাট্যোৎসব অত্যন্ত গুরুত্ব বহন করে। এতে একদিকে নতুন দর্শক তৈরি হয়, তেমনি তা নাট্য চর্চাকে সমৃদ্ধ করি। নাটক বা নাটকের দল বাছাইয়ে মানটা দেখা উচিৎ। অর্থাৎ কোন নাটকের দল বা নাটক এদেশে নিয়ে আসা বা অন্য দেশে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে সচেতন থাকা জরুরি। নাট্য চর্চায় জোরালো ভূমিকা নিতে হবে। দর্শকের গ্রহণযোগ্যতার উপর জোর দিতে হবে। নিয়মিত ও মানসম্মত নাট্য চর্চায় নাট্য সংশ্লিষ্টদের অগ্রণী অবদান রাখতে হবে। অন্যান্য বক্তারা বলেন নান্দীমুখ’র এই সাহসী উদ্যোগ প্রশংসনীয়। যা নিয়মিত করে যাচ্ছে নান্দীমুখ। এটি বাংলা নাট্য চর্চায় নব মেল বন্ধন তৈরি করবে। সংগীত শিল্পী শ্রেয়সী রায়’র নেতৃত্বে উদ্বোধনী সংগীত পরিবেশন করে অভ্যুদয় সংগীত অঙ্গন। প্রমা অবন্তী’র পরিচালনায় নৃত্য পরিবেশন করে ওড়িশি অ্যান্ড টেগোর ডান্স মুভমেন্ট সেন্টার। উদ্বোধন অনুষ্ঠান শেষে মূল মিলনায়তনে মঞ্চস্থ হয় অসীম দাস এর রচনা ও নির্দেশনায় নান্দীমুখ প্রযোজিত নাটক ‘আমার আমি’।
নান্দীমুখের পথচলার ত্রিশ বছর উপলক্ষে ‘নান্দীমুখ আন্তর্জাতিক নাট্য উৎসব ২০১৯’ এর ২য় দিন সকাল ১০টায় চট্টগ্রাম শিল্পকলা একাডেমির আট গ্যালারী মিলনায়তনে বাংলা রাজনৈতিক থিয়েটার ও উৎপল দত্ত শীর্ষক সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ভারতের নাট্য গবেষক আশীষ গোস্বামী। প্রবন্ধের উপর আলোচনা করেন নাট্যজন মশিউর রহমান আদনান, অধ্যাপক ড.কুন্তল বড়ুয়া, ভারতের নাট্য পত্রিকা ভাবনা থিয়েটারের সম্পাদক অভিক ভট্টার্চায। সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন থিয়েটার পত্রিকার সম্পাদক রামেন্দু মজুমদার। সঞ্চালকের দায়িত্ব পালন করেন নান্দীমুখ দলীয় প্রধান অভিজিৎ সেনগুপ্ত। সুলিখিত এই প্রবন্ধে নট ও নাট্যকার উৎপল দত্তের বর্ণময় জীবনের নানা দিক উঠে এসেছে। যা তরুণ নাট্যকর্মীদের অনুপ্রাণিত করবে রাজনৈতিক থিয়েটার নিয়ে ভাবতে। অনুষ্ঠানের ৩য় দিনে নান্দীমুখ কথামালায় অংশগ্রহণ করেন দেশের বরেণ্য নাট্য ব্যক্তিগণ। মিলনায়তনে তির্যক নাট্যগোষ্ঠী মঞ্চস্থ করে তাদের প্রযোজনা রোমিও জুলিয়েট। এই নাটকের নির্দেশনা প্রদান করেন নাট্য নির্দেশক অসীম দাশ।
নান্দীমুখ আন্তর্জাতিক নাট্য উৎসব ২০১৯ এর চতুর্থ দিনে নান্দীমুখ কথামালায় অংশগ্রহণ করেন অধ্যাপক ম. সাইফুল আলম চৌধুরী, অধ্যাপক সঞ্জিব বড়ুয়া, নাট্যকার দীপক চৌধুরী ও নাওশীন ইসলাম দীশা। বক্তারা নান্দীমুখের ত্রিশ বছরের কার্যক্রমকে তুলে ধরেন। কথামালার পর গণ সঙ্গীত পরিবেশন করেন সৃজামি সাংস্কৃতিক অঙ্গন। মিলনায়তনে নাটক পরিবেশন করেন ভারতের ‘আমতা পরিচয়’। তাঁদের প্রশংসিত প্রযোজনা ‘সাবিত্রীবাঈ ফুলে। এই নাটকের কাহিনি বিন্যাস হলো- ‘সাবিত্রীবাঈ ফুলে’- ভারতের প্রথম নারী-শিক্ষিকার এক অনুপ্রেরণা-মূলক গল্প, যেখানে তিনি নারীর ক্ষমতায়নের পথিকৃৎ হয়ে উঠেছিলেন, আর এমন এক সময়ে- যা কল্পনাতীত। তাঁর জন্ম ১৮৩১-এর ৩রা জানুয়ারি। বাল্যবিবাহের অভিজ্ঞতা তাঁর সরাসরি হয়েছিল। মাত্র ১৩ বছর বয়সে তাঁকে ১৩ বছরের জ্যোতিরাও ফুলের সাথে বিবাহ দেয়া হয়। যে সময়ে বিবাহ ছিল সকল নারীর আকাঙ্ক্ষার মৃত্যু, যদিও এই যুগলের বিবাহ ইতিহাসের মাইল ফলক হয়ে দাঁড়ায়। জ্যোতিরাও তাঁকে পড়তে লিখতে শিখান। অতঃপর তিনি হয়ে উঠলেন ভারতের প্রথম নারী শিক্ষিকা। এই যুগল মিলিত ভাবে সকল বর্ণের শিশুদের পাঠদান করতেন লাগলেন এবং বর্ণ বৈষম্য ভেঙে চুরমার করে দিলেন। এই নব-যুগল প্রকৃত পক্ষে সকল জায়গা থেকে বিরোধিতার সম্মুখিন হতে লাগলেন। ভারতের এই বর্ণ বিভাজন সাবিত্রী-কে পীড়া দিতো।
উৎসবের পঞ্চম দিনে নান্দীমুখ কথামালায় অংশগ্রহণ করেন জাহাংগীর কবীর, তাপস শেখর, অসিত দাস পুলক, অলোক ঘোষ পিন্টু ও আলোক মাহমুদ। বক্তারা নান্দীমুখের ত্রিশ বছরের কার্যক্রমকে তুলে ধরেন। কথামালার পর সবার পথ (ভারত) পরিবেশন করে তাদের প্রশংসিত প্রযোজনা ‘ত্রিনয়ন’। এই নাটকের কাহিনী বিন্যাস- ত্রিনয়ন একটি অভিনব একক নাটক নান্দীমুখ আন্তর্জাতিক নাট্য উৎসবের ষষ্ঠ দিন মঞ্চস্থ হলো মুন প্যলেস (স্পেন) প্রযোজনা ‘ডিলেমাস উইথ মাই ফ্লামেনকো টেইলকোট’। এদিন কথামালায় অংশগ্রহণ করেন চট্টগ্রাম গ্রুপ থিয়েটার ফোরামের সাধারণ সম্পাদক মো. শাহ আলম ও নাট্যাধারের দলীয় প্রধান মোস্তফা কামাল যাত্রা। কথামালার পর মুক্তমঞ্চে নৃত্যালেখ্য পরিবেশন করে ওডিসি এন্ড ট্যাগোর ড্যান্স মুভমেন্ট সেন্টার, নৃত্যালেখ্যটি নির্দেশনাদেন নৃত্য শিল্পী প্রমা অবন্তী। মিলনায়তনে মুন প্যলেস (স্পেন) পরিবেশন করে তাদের প্রশংসিত প্রযোজনা ‘ডিলেমাস উইথ মাই ফ্লামেনকো টেইলকোট’। নাটকে দেখা যায়, গাউনের পেছনের উদ্বিগ্নতা, ১৮৪৪-এর ফ্ল্যামেনকো নাচে নারীর কথন। সমাজে এই নারী নৃত্যশিল্পীদের প্রতি সমাজের ধারনা এবং কিভাবে এ সকল শিল্পী ইউনেস্কো দ্বারা স্বীকৃত পৃথিবীর অন্যতম সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য নিজের স্থান করে নিল তারই এক অনবদ্য গল্প নিয়ে এই নাটক।
উৎসবের সপ্তম দিনে নান্দীমুখ কথামালায় অংশগ্রহণ করেন শামসুল কবির লিটন, রচপেশ কান্তি দে, শাহ তামরাজ, মনসুর মাসুদ, শামিম আহমেদ ও শাহীন চৌধুরী। কথামালার পর মুক্তমঞ্চে পঞ্চ কবির গান পরিবেশন করে আনন্দধ্বনি। মিলনায়তনে চাকদাহ নাট্যজন (ভারত) মঞ্চস্থ করেন ‘বিল্বমঙ্গল’। এটি একটি অনন্য প্রেমের নাটক, যেখানে বল্ব বারবনিতা চিন্তা’র প্রেমে পড়ে। দুটো কড়ি ফেলে যার সঙ্গ পাওয়া যায় তাঁকে ওই মায়া নিয়ে কেন দেখে বিল্ব? শরীর ভালোবাসার উত্তাপকে এনে দেয়, আবার ভালোবাসা স্পর্শ পেলে উতরোল। এই অবিশ্বাসী সময়ে নতুন যুবক নতুন যুবতীর কানে এই কথাটি বলতে চায়। অষ্টম দিনে নান্দীমুখ কথামালায় অংশগ্রহণ করেন নাট্যকার রবিউল আলম, অভিনেত্রী সাবিরা সুলতানা বীনা, অভিনেত্রী কংকন দাস, ও অভিনেতা সাইফুল ইসলাম। কথামালার পর মুক্তমঞ্চে একক সংগীত পরিবেশন করেন নরেন চক্রবর্তী। মূল্মঞ্চে ক্রেজি বডি গ্রচপ (ইরান) মঞ্চস্থ করেন ‘মিস্টেরিয়াস গিফট’। নাটকে দর্শক দেখতে পায়, একক শারীরিক পার্ফমেন্সে সমসাময়িক নৃত্য এবং মার্সাল আর্ট। একটি মানুষের জন্ম থেকে মৃত্যুর গল্প যা আপনাকে নিজের মুখোমুখি করে চ্যলেঞ্জ এর দ্বারা নিজেকে পরিণত করেছে।
অনুষ্ঠানের শেষ দিনে গত ২২ নভেম্বর মুক্তমঞ্চে ছিল নান্দীমুখ সম্মাননা ও সমাপনী অনুষ্ঠান। এই অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন নাট্যজন আতাউর রহমান ও বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন নাট্যজন ম. হামিদ। এবারের নান্দীমুখ সম্মাননা প্রাপ্তরা হলেন- অসীম দাশ, ত্রপা মজুমদার, স্বপন ভট্টাচার্য ও মো. মোসলেম উদ্দিন সিকদার। সমাপনী অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন নান্দীমুখ এই আয়োজনের ভেতর দিয়ে বিশ্ব নাটকের সাথে চট্টগ্রামের দর্শক ও নাট্যকমিদের পরিচয় করিয়ে দেয়ার যে দায়িত্ব পালন করছে তা নিঃসন্দেহে সাধুবাদ পবার যোগ্য। সম্মননা অনুষ্ঠান শেষে মিলনায়তনে ভারেতের জ্যোতি ডোগরা পরিবেশন করে নাটক ব্লাক হোল। নাটক শেষে অতিথিরা ফানুস উড়িয়ে এই আন্তর্জাতিক নাট্য উৎসবের সমাপ্তি ঘোষণা করেন।

x