পক্ষকাল পর বঙ্গোপসাগরে ফের মাছধরা শুরু

আহমদ গিয়াস, কক্সবাজার

সোমবার , ১১ মার্চ, ২০১৯ at ৯:২৭ অপরাহ্ণ
75

জলদস্যু আতংকে প্রায় পক্ষকাল ধরে গভীর বঙ্গোপসাগরে মাছধরা বন্ধ থাকার পর আজ সোমবার (১১ মার্চ) ফের মাছধরা শুরু হয়েছে।

জলদস্যু দমনে প্রশাসনিক আশ্বাসের প্রেক্ষিতে সোমবার বিকাল থেকে ট্রলারগুলো সাগরে রওয়ানা দেয়া শুরু করে।

সোমবার পর্যন্ত কক্সবাজার শহরের প্রধান পোতাশ্রয় থেকে শতাধিক ট্রলার সাগরে মাছ ধরতে যায়। সাগরের অবস্থা বুঝে বাকি ট্রলারগুলোও আজকালের মধ্যে সাগরে রওয়ানা দেবে বলে জানায় ট্রলার মালিক সমিতি।

জেলা ফিশিং বোট মালিক সমিতি সূত্র জানায়, গত জানুয়ারি মাসের শেষ দিন থেকে ফেব্রুয়ারি মাসের ২৪ তারিখ পর্যন্ত টানা ২৫ দিনে কক্সবাজারের পাটুয়ারটেক থেকে সেন্টমার্টিন পর্যন্ত অঞ্চলের গভীর বঙ্গোপসাগরে সহস্রাধিক মাছ ধরা ট্রলার জলদস্যুতা ও অপহরণের শিকার হয়।

সর্বশেষ গত ২৩ ও ২৪ ফেব্রুয়ারি ৪৪টি মাছধরা ট্রলারসহ ১৩৫ জন মাঝিমাল্লা অপহরণের শিকার হয় যাদেরকে মোটা অংকের মুক্তিপণ দিয়ে জলদস্যুদের কবল থেকে ফিরিয়ে আনা হয়।

আর এরপর থেকেই সাগরে বন্ধ হয়ে যায় মাছ ধরা। মাছধরা ট্রলারগুলো একে একে কূলে ফিরে আসে এবং ঘাটে নোঙর করে রাখে।

গভীর সাগরে মাছধরা বন্ধ থাকায় গত ১১ দিন ধরে শহরের প্রধান মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র ফিশারিঘাট থেকে মাছ সরবরাহও বন্ধ রয়েছে বলে জানান ফিশারিঘাটস্থ মৎস্য ব্যবসায়ী সমিতির পরিচালক জুলফিকার আলী।

জেলা ফিশিং ট্রলার মালিক সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক মাস্টার মোস্তাক আহমদ বলেন, ‘শীতের শেষে সাগরে পুরোদমে মাছ শিকার শুরু হলে কক্সবাজারের পাটুয়ারটেক থেকে সেন্টমার্টিন উপকূলের নিকটবর্তী প্রায় ২ হাজার বর্গ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে গভীর বঙ্গোপসাগরে ইলিশসহ ব্যাপকভাবে অন্যান্য সামুদ্রিক মাছ ধরা পড়ে। আর এরই সাথে শুরু হয় উৎপাত।একের পর ট্রলার ডাকাতি, মাঝিমাল্লাসহ অপহরণের পর মুক্তিপণ আদায় শুরু হলে ফেব্রুয়ারির শেষদিক থেকে সাগরে মাছ ধরা বন্ধ করে ঘাটে ফিরে আসে ট্রলারগুলো। কিন্তু জলদস্যু দমনে প্রশাসনিক আশ্বাসের প্রেক্ষিতে প্রায় পক্ষকাল পর সাগরে রওয়ানা দিচ্ছে ট্রলারগুলো। তবে আতংক এখনও রয়ে গেছে।’

তিনি জানান, সাগরের ওই বিস্তীর্ণ এলাকা ৩টি জলদস্যু গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। আর একেকটি গ্রুপে ৭০ থেকে ১শ’ জন পর্যন্ত সদস্য রয়েছে।

এ জলদস্যু গ্রুপের একটির সাথে অপর গ্রুপের সম্পর্ক রয়েছে বলেও ধারণা ট্রলার মালিকদের।

তিনি আরো জানান, জলদস্যুদের তিনটি গ্রুপের সদস্যদের অধিকাংশই বয়সে তরুণ। এই ৩ জলদস্যু বাহিনীর সদস্যরা মূলত চট্টগ্রামের বাঁশখালী, কুতুবদিয়া, পেকুয়ার রাজাখালী, মহেশখালী শাপলাপুর, ধলঘাটা ও মাতারবাড়ি এলাকার এবং জলদস্যু গ্রুপের অধিকাংশ সদস্যই এ পেশায় নবীন বলেও জানান জেলেরা।

ট্রলার মালিকরা সাগরে ডাকাতি রোধে কোস্টগার্ডের তৎপরতা বৃদ্ধি, সী-গার্ড গঠন, ড্রোন মোতায়েন এবং মেরিন র‌্যাব প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্ব দেন। ইয়াবা রোধে যেভাবে র‌্যাব সাগরে দায়িত্ব পালন করে সেভাবেই জরুরি ভিত্তিতে সাগরে র‌্যাবের তৎপরতা বৃদ্ধিরও দাবি তোলেন তারা।

কোস্টগার্ড পূর্ব জোনের অপারেশন অফিসার লে. কমান্ডার সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘জলদস্যু দমনে অভিযান অব্যাহত রাখা হয়েছে। কিছু জলদস্যু বাইরের এলাকা থেকে এসে কক্সবাজার উপকূলে হানা দিয়ে পালিয়ে যাওয়ার খবর পাচ্ছি। এরপর থেকে অভিযান জোরদার করা হয়েছে।’

র‌্যাব-৭ এর সহকারী পরিচালক মিমতানুর রহমান জানান, আত্মসমর্পণের পর কিছু নতুন জলদস্যু সাগরে জেলেদের উপর নির্যাতন চালাচ্ছে শুনেছি। তাদের বিরুদ্ধে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। অতি দ্রুতত সময়ের মধ্যে তাদের দমন করা হবে।

প্রসঙ্গত, গত বছরের ২০ অক্টোবর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান খান কামালের কাছে অস্ত্র জমা দিয়ে আত্মসমর্পণ করে মহেশখালী ও কুতুবদিয়ার উপকূলীয় এলাকার ছয়টি জলদস্যু বাহিনীর ৪৩ সদস্য।

এ সময় ৯৪টি অস্ত্র ৭ হাজার ৬৩৭টি গোলাবরুদও হস্তান্তর করে তারা। কিন্তু আত্মসমর্পণের পরও জলদস্যুদের তৎপরতায় উদ্বিগ্ন জেলেরা।

ট্রলার মালিক সমিতি সূত্র জানায়, কক্সবাজারে প্রায় ৭ হাজার এবং সারাদেশে প্রায় ৩৫ হাজার মাছধরার ছোট-বড় যান্ত্রিক নৌকা রয়েছে। এরমধ্যে বড় নৌকায় বা ইলিশ জালের বোটে ৩০ থেকে ৪০ জন এবং ছোট নৌকায় ৫ থেকে ১৭ জন জেলে থাকে।

আবার দরিয়ানগর ঘাটের ইঞ্জিনবিহীন ককশিটের বোটে থাকে মাত্র ২ জন জেলে।

বড়বোটগুলো সাধারণত: গভীর সাগরে ইলিশ মাছ ধরে। আর ছোট বোটগুলো বেহুন্দি জালের।

গত প্রায় পক্ষকাল গভীর সাগরে মাছধরা বন্ধ থাকলেও বেহুন্দি জালের বোটগুলো মাছধরা বন্ধ করেনি। এসব বোট উপকূলের কাছাকাছি ‘পাঁচকাড়া’ মাছ ধরে।

বেহুন্দি জালের ট্রলারগুলো দিনে গিয়ে দিনেই ফিরে আসে। এসব ট্রলারে ছোট আকারের নানা প্রজাতির সুস্বাদু মাছ ধরা পড়ে।

এরমধ্যে তাইল্যা, ঘুইজ্জা, পোয়া, রূপচান্দা, ছুরি, লইট্টা, বরা, নাইল্যা, পুটি, ফাইস্যা, বাটা, অলুয়া মাছ, চিংড়িসহ আরো নানা প্রজাতির মাছ রয়েছে।

x